The Business Standard বাংলা
পর্তুগিজদের হাত ধরে আসা মরিচ যেভাবে বাঙালির হলো!

পর্তুগিজদের হাত ধরে আসা মরিচ যেভাবে বাঙালির হলো!

বাঙালির খাওয়া মানেই সাথে থাকা চাই লবণ, পেঁয়াজ আর মরিচের আলাদা সংযোজন। খেতে বসে যদি একটা কামড়ই না পড়ে মরিচের গায়ে, তবে কি বাঙালির ভোজনে তৃপ্তি আসে? হোক সে কাঁচা মরিচ, শুকনো মরিচ কিংবা গুঁড়োমরিচ। স্বাদে-গন্ধে এর যে নিজস্বতা তা রান্নায় নিয়ে আসে স্বতন্ত্রতা। মরিচ ছাড়া উপমহাদেশের হেঁশেল অপরিপূর্ণ। ঘরের কোণে মরিচ গাছ, লাল মরিচ ধরে পেঁয়াজ তোমার কথা ভেবে চোখে পানি ধরে (খনার বচন)। বর্তমানে আমাদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে মরিচ নামের একই ছোট্ট রসদটি। মিষ্টান্ন বাদে যেকোনো খাবারেই এই মরিচের একটু ছোঁয়া চাই-ই চাই! তাই ছোট্ট উঠোনে কিংবা বারান্দায়, কিংবা বয়ামের তাকে বা ফ্রিজের ফাঁকে মরিচের উপস্থিতি এই অঞ্চলে সর্বদাই লক্ষ্যণীয়। *মরিচের বিশ্বপরিচিতি ঘটে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের হাত ধরেই* তবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে যাওয়া আজকের এই মরিচ কিন্তু আমাদের ভারতবর্ষীয় কোনো উদ্ভিদ নয়। এর আদি উৎপত্তি মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অংশে। কোথাও কোথাও আবার বলা হয়েছে, মরিচের আদি উৎপত্তি কলম্বিয়া আর ব্রাজিলের মধ্যবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে। আবার কোথাও বলা আছে, আমেরিকান আদিবাসীরা নাকি মরিচ ব্যবহার করতো প্রায় ৭৫০০ বছর আগে থেকেই! তবে উৎপত্তি যেখানেই হোক, তা প্রথম মানুষের আয়ত্তে আসে আমেরিকাতে। রন্ধনবিষয়ক ইতিহাসবিদ হিদার আর্ন্ডট অ্যান্ডারসন তার 'চিলিজ-আ গ্লোবাল হিস্ট্রি' বইয়ে (পৃষ্ঠা ২২) লেখেন, 'For early Americans, the Three Sisters– beans, maize (corn) and squash– were more or less the top items on the menu, but chillies were the cherry on top that no one would cook without.' এখনো মেক্সিকো, মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকায় বন্য মরিচ চাষ করা হয়। এদের সংখ্যাগরিষ্ঠই পাঁচ ধরনের মরিচের জাত থেকে এসেছে, যেগুলোর উৎপত্তি আজ থেকে প্রায় সাত কি আট সহস্রাব্দ আগেই। তবে মরিচের বিশ্বপরিচিতি ঘটে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের হাত ধরে। ভারতবর্ষ ছিল শস্য-সম্পদে ভরপুর। ভারতবর্ষের মশলার বাজার তখন ইউরোপিয়ানদের নজরে। ফলে সাগরপাড়ি দিয়ে এই মশলা গিয়ে পৌঁছাত অটোমানদের হাতে। ক্রিস্টোফার কলম্বাসও এই মশলার খোঁজে ভারতবর্ষের উদ্দেশ্যে বের হন। ভারতবর্ষ খুঁজতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করেন আমেরিকা। আর সেখানেই সর্বপ্রথম মরিচের দেখা পান তিনি। সেখানকার আদিবাসীদের মধ্যে এই মরিচের ব্যাপক ব্যবহারও প্রত্যক্ষ করেন তিনি। যদিও গোলমরিচের গাছের সাথে মরিচ গাছের সম্পর্ক নেই। তবু, ভারতবর্ষে উৎপন্ন গোল মরিচের মতো ঝাল বলে তিনি এগুলোকে 'পিপার' নাম দেন। (চিলিজ-আ গ্লোবাল হিস্ট্রি, ৮২) জাহাজভর্তি মরিচ নিয়ে কলম্বাস ফিরে আসেন স্পেনে। স্পেনীয় ব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে এশিয়ার বিভিন্ন স্থানে মরিচ নিয়ে যায়। উদ্ভিদপুরাতাত্ত্বিক নথি অনুযায়ী, উত্তর-পশ্চিম মেক্সিকো এবং দক্ষিণপশ্চিম আমেরিকায় মরিচের চাষ ব্যাপকভাবে ছড়ায়নি যতক্ষণ পর্যন্ত স্প্যানিশরা এ অঞ্চলে মরিচ নিয়ে আসে। আমেরিকাতেও মরিচের চাহিদা সবচেয়ে বেশি ছিল স্প্যানিশ প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে। (চিলিজ-আ গ্লোবাল হিস্ট্রি, ২২) বিশ্বকে মরিচের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে কলম্বাসের নামই সবার আগে আসে। তবে পর্তুগিজরাও কম যাননি। কলম্বাসের হাত ধরে এই মরিচ যখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে, তখন পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-ডা-গামা মরিচের সন্ধান পান ব্রাজিলে। *উপমহাদেশে এলো যেভাবে* ভারতে মরিচ আসে নিয়ে আসে এই পর্তুগিজরাই। এদেশের মানুষের সঙ্গে নানারকম খাবার ও ফলমূলের পরিচয় করিয়ে দেয় পর্তুগিজরা। তারমধ্যে অন্যতম মরিচ। উপমহাদেশের মরিচ ব্যবসায় পর্তুগিজদের প্রথমে একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। কিন্তু সে আধিপত্য বেশিদিন টেকেনি। অন্যান্য প্রতিযোগী ও মরিচ চাষীদের বিরোধিতার কারণে মরিচ ব্যবসায় পর্তুগিজদের ক্ষমতা কমে আসে। তবে, পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কো-ডা-গামার রেখে যাওয়া চালান বিপুল লাভে রপ্তানি শুরু হয়। এতে করে, স্থানীয়ভাবে এসব মসলা চাষ করার গুরুত্বও বুঝতে পারেন অনেকে। সেই সাথে ডাচ ও ইংরেজরাও পরিচিত হয় এর সাথে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে মরিচের চাষ। বিশেষ করে, দাক্ষিণাত্য অঞ্চলে মরিচকে সাদরে গ্রহণ করা হয়। সেখানকার আর্দ্র আবহাওয়া ছিল মরিচ, গোলমরিচসহ অন্যান্য মসলা চাষের জন্য খুবই উপযোগী। গোলমরিচের চেয়ে কাঁচামরিচ উৎপাদন করার খরচ কম হওয়ায় চাষিদের কাছে এটি জনপ্রিয় ফসল হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। চাষাবাদ বিস্তারের সাথে সাথে কমে যায় দামও। ফলে মরিচ হয়ে ওঠে সকল স্তরের মানুষের খাদ্যদ্রব্য। *ভারতীয় খাবারে মরিচের নানা রকম ব্যবহার* মরিচের এই সহজলভ্যতা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে ভারতীয়দের খাদ্যাভ্যাসে অপরিহার্য এক উপাদান। মিষ্টান্ন বাদে এমন কোনো ভারতীয় খাবারের পদ খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে মরিচের কোনো ছোঁয়া নেই। চাল, মাংস ও সবজি, চাটনি, ভাজাপোড়া, দেশীয় বা বিদেশীয়– সব পদ রান্নায় মরিচ আনে স্বাদে অনন্যতা। কখনো বা শিলনোড়ায় বাঁটা মরিচ পেস্ট, কখনো বা লাল মরিচের গুঁড়ো, কখনো শুকনো মরিচ টালা। পছন্দ অনুযায়ী ও স্বাদে ভিন্নতা আনতে মরিচ ছাড়া আমাদের চলেই না। মসলার প্রথম এবং প্রধান উপাদানই মরিচ। ভারতে মরিচের আগমন হয়েছে ইউরোপীয়দের হাত ধরে ঠিকই। কিন্তু আমাদের জীবনের সাথে তা এমন ওতপ্রোতভাবেই জড়িত, এই মরিচ যে আমাদের স্থানীয় কোনো উদ্ভিদ নয়, তা ভাবাও অকল্পনীয় মনে হয়। ১৫৯০ সালে জেসুইট যাজক ফাদার হোসে ডি অ্যাকোস্টাস তার 'নেচারাল অ্যান্ড মোরাল হিস্ট্রি অব দ্য ইন্ডিজ' বইয়ে সেখানকার মরিচের ব্যবহার সম্পর্কে লিখেছেন। মরিচের নানাবিধ ব্যবহার এবং সে অনুসারে প্রস্তুত প্রণালী উঠে আসে তার লেখায়। তিনি জানান, সেখানকার বাসিন্দারা এটি দিয়ে ঝাঁঝালো পানীয় প্রস্তুত করত, স্বাদ বাড়াতে সাথে দিত লবণ (স্লার্প ডটকম অবলম্বনে)। তবে অ্যাকোস্টাস যখন লিখে গেছেন তখন উপমহাদেশ কেবলমাত্র পরিচিত হচ্ছে মরিচের সঙ্গে এবং তারা মরিচের নানাবিধ ব্যবহার আস্তে আস্তে আবিষ্কার করছে। কিন্তু বর্তমানে, প্রায় ৪৩৩ বছর পর শুধু উপমহাদেশ নয়, গোটা বিশ্বই মরিচের সব রকম ব্যবহার আয়ত্ত করে ফেলেছে। *মরিচের যত গুণ* মরিচের গন্ডি কেবল খাদ্যদ্রব্যে নয়, সৌন্দর্যবর্ধন এবং শরীরচর্চায়ও মরিচ তার নাম লিখিয়েছে। যেমন, ভারতের কর্ণাটকের বিয়াদগি মরিচ উজ্জ্বল রঙ হিসেবে লিপস্টিক ও নেইল পলিশের মতো প্রসাধণী পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। আবার মরিচের নির্যাস গোসলের সময় পানিতে মিশিয়ে ব্যবহার করলে ত্বক, জয়েন্ট এবং তা পেশীতে এনে দেয় উষ্ণতা।  শীতের দিনে সারাদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি শেষে এই উষ্ণতা শরীরে এনে দেয় প্রশান্তি। সেই সাথে মরিচের নির্যাস দিয়ে তৈরি তেল যেমন চুলকে রাখে সুরক্ষিত তেমনি, শরীর ও ত্বকের জন্যও কার্যকরী। এছাড়া ব্যথা প্রশমনের পাশাপাশি রক্ত সঞ্চালন, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এবং রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। বিশ্বে বর্তমানে এর ব্যবহারকারীও অনেক। এছাড়াও মরিচের রয়েছে অনেক ঔষধি গুণ। সামান্য পরিমাণে মরিচ খাওয়া স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো। মরিচের গুঁড়োয় আরও রয়েছে শক্তিশালী প্রদাহরোধী উপাদান। 'চিলিজ-আ গ্লোবাল হিস্ট্রি' বইয়ের চার নাম্বার অধ্যায়ে একটি ভারতীয় ওষুধি বইয়ের উল্লেখ আছে। সেখানে বলা হয়েছে, পৃথিবীর শুরুর দিকে মায়া সভ্যতার সময় মরিচ ব্যবহার হতো ঠান্ডা, শ্বাসপ্রশ্বাসের কষ্টের নিরামায়ক হিসেবে। চোখের সংক্রমণ এবং পেটের আলসারের মতো রোগের চিকিৎসার জন্য মরিচ ব্যবহার করা হতো। এছাড়া বদহজম মোকাবেলায় এবং শরীরের ব্যথা এবং প্রসব বেদনা প্রশমনে মরিচের ব্যবহার ছিল (চিলিজ-আ গ্লোবাল হিস্ট্রি, ৮২) সুতরাং প্রায় সাড়ে সাত হাজার বছর আগে মরিচের যে ব্যবহার ছিল বলে বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ আছে, তা অমূলক নয়। দিয়েগো আলভারেজ চানকা নামের একজন চিকিৎসক কলম্বাসের দ্বিতীয় অভিযানের সময়ে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ হতে মরিচ স্পেনে নিয়ে আসেন। তিনি ১৪৯৪ সালে মরিচের ঔষধি গুণাগুণ নিয়ে প্রবন্ধ লিখেন। বর্তমানে পৃথিবীর সর্বত্র রান্না ও ঔষধি হিসাবে এটি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। *কত রকমের মরিচ…* ঝাল ও স্বাদের জন্য অচিরেই এটি এশিয়ার বিভিন্ন এলাকার স্থানীয় খাবারের অপরিহার্য উপকরণে পরিণত হয়। ঝাল মশলার উপকরণ হলেও, মরিচ কিন্তু ক্যাপসিকাম গণের সোলানেসি (Solaneceae) পরিবারের এক উদ্ভিদ। মরিচের ফলকে মসলা হিসাবে ব্যবহার করা হয়। মরিচের বহুল প্রজাতি রয়েছে পুরো বিশ্বজুড়েই। তবে ভারতবর্ষে বর্তমানে তুমুল জনপ্রিয় মরিচের মধ্যে রয়েছে নাগা মরিচ, কর্ণাটকে বিয়াদগি মরিচ, ঘ্রাণের জন্য অন্যতম বিখ্যাত কাঁচামরিচ জোয়ালা। এছাড়া রোপা ঝাল মরিচ, বোনা ঝাল মরিচ এবং মিষ্টি মরিচ- এই তিনটি জাতের মধ্যেও রয়েছে আরো অসংখ্য জাতের মরিচ। যেমন কামরাঙ্গা, বোম্বাই, কৃষ্ণকলি, ঘৃতকুমারী, সূর্যমুখী, সিটিন, বালিজুরী, জারলা, বারোমাসী, উবধা, পুষা জাওলা, বাইন, সাইটা, শিকারপুরী, ক্যালিফোর্নিয়া ওয়ান্ডার, ম্লিমপিম, ওয়ান্ডার বেল, ফুসিমি লংগ্রিন প্রভৃতি। শুধুমাত্র ভারতেই আজ শতাধিকের বেশি মরিচের স্থানীয় জাত রয়েছে। এরমধ্যে জনপ্রিয় জাতগুলো হচ্ছে– ভূত জোলোকিয়া, নাগা, বিয়াদগি, গুনতুর, কাশ্মিরী মরিচ ইত্যাদি। দেশটির সবচেয়ে বড় উৎপাদক অঞ্চল হলো- অন্ধ্র প্রদেশ। ভারতের স্থানীয় মরিচ উৎপাদনের ৫০-৭০ শতাংশ হয় এখানেই। বাংলাদেশের সব অঞ্চলেই মরিচের চাষ হয়। তবে অঞ্চলভেদে এদের আঞ্চলিক নামও প্রচলিত আছে। উত্তরাঞ্চলে কাঁচামরিচ 'আকালি' নামে পরিচিত। টাঙ্গাইল জেলাতেও কাঁচামরিচ ভালো জন্মে, তবে সেগুলো ছোট আকৃতির এবং সুগন্ধযুক্ত তীব্র ঝাল মরিচ। যার নাম 'ধাইন্যা মরিচ'। *সৌভাগ্যের প্রতীক মরিচ* বিদেশিনীদের কাছে এই উপমহাদেশীয় খাবার মানেই ঝাল আর মশলার সমারোহ। হেঁশেল সামলাতে যেমন এই মরিচের ছোঁয়া দরকার, তেমনি ঘর সামলাতেও দ্বারস্থ হতে হয় তার। প্রাচীন সময় থেকেই মরিচপোড়া ধোঁয়া ব্যবহার করা হতো নেকড়ে এবং ভ্যাম্পায়ারের হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য। এখনও কোথাও কোথাও অশুভ শক্তি এবং রোগ-বালাই থেকে মুক্তি পাবে এই আশায় বাড়িতে বা গাড়িতে ঝুলিয়ে রাখা হয় মরিচ। সঙ্গে থাকে লেবুও। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা হলো, লেবু ও মরিচ, দু'টোই পোকামাকড় তাড়াতে সমানভাবে কাজে দেয়। কেন না লেবু স্বভাবগুণে টক এবং মরিচ ঝাল। লেবুর টক এবং মরিচের ঝাঁঝ মিশ্রিত গন্ধই মাছি বা অন্যান্য কীটপতঙ্গ প্রতিরোধে সহায়তা করে। তাই দরজার বাইরে 'লেবু-লঙ্কা' টাঙিয়ে রাখলে তা মশা এবং অনেক পতঙ্গকেই ঘরে প্রবেশ করতে না দিয়ে অসুস্থতা থেকে রক্ষা করে এবং সুস্বাস্থ্য বজায় রাখে বলে কারো কারো বিশ্বাস। প্রতি শনিবার সকালে ভারতীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকে তাদের প্রার্থনা শেষে সাতটা সবুজ মরিচ এবং একটি লেবু সুতোয় বেঁধে ঝুলিয়ে রাখে। ভারতীয় রীতিতে এর নাম 'নিম্বু-মরিচ'। যানবাহনে বা বাড়ি-দোকানের মতো দরজায় সুতোয় বেঁধে লেবু এবং মরিচ ঝোলানো শুধু উপমহাদেশেই নয়, চীন এবং ইতালিতেও দেখা যায়। তবে চায়নিজরা লালকে সৌভাগ্যের প্রতীক মনে করে বলে, অনেকে দোকানের বাইরে লাল মরিচ ঝুলিয়ে রাখে, এতে কুনজর থেকে রক্ষা পাওয়া যায় বলে মনে করেন তারা। আবার ইতালিতে এই লাল মরিচ পরচর্চা থামাবে বলে ধারণা করা হয়। পরচর্চা বা হিংসাত্মক কথাবার্তা দূর করে সৌভাগ্য এনে দেবে বলে বিশ্বাস তাদের। এ কারণে লাল মরিচের বদলে অনেক সময় তারা লাল প্লাস্টিকের শিংও ঝুলিয়ে রাখে। সিঙ্গাপুরের স্থানীয়রা বিশ্বাস করে, গাছের নিচে মরিচ এবং পেঁয়াজ একসঙ্গে কাঠিতে বেঁধে সেই মাটিতে রোপণ করলে বৃষ্টি আসা থামানো যাবে। বারবিকিউয়ের মতো রাতের বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা জাতীয় দিবসের মতো কোনো প্যারেডের অনুষ্ঠান সামনে থাকলে, বৃষ্টি আটকাবার জন্য তারা এই রীতি মেনে চলে। মরিচের গুঁড়ো কিন্তু বন্ধুত্বে ফাটল ধরাতে পারে। খাবার টেবিলে কেউ যদি মরিচ গুঁড়ো চায় আর আপনি তাকে সরাসরি তা দিয়ে থাকেন, তবে আপনার বন্ধুত্ব ভেঙ্গে যাবে এমন বিশ্বাসও আছে পৃথিবীর কোথাও কোথাও। আমেরিকান ফোক মেডিসিনেও মরিচকে ব্যবহার করা হতো অন্যতম কার্যকরী রক্ষাকবচ হিসেবে। মরিচ নিয়ে উপদেশ দিতে ভুলে যাননি বাঙালির খনাও। যেমন, ধেনো জমিতে ঝাল বাড়ে। অর্থাৎ, ধানের জমিতে মরিচ চাষ করলে প্রচুর ফলন হয়। ছাইয়ে লাউ, উঠোনে ঝাল, অর্থাৎ উঠোনে মরিচের চাষ করলে ভালো হয়। ভাদ্র আশ্বিনে না রুয়ে ঝাল, যে চাষা ঘুমিয় কাটায় কাল পরেতে কার্তিক অগ্রান মাসে, যদি বুড়ো গাছ, ক্ষেতে পুতে আসে, যে গাছ মরিবে ধরিবে ওলা পাবেনা ঝাল চাষার পোলা অর্থাৎ, ভাদ্র আশ্বিন মাসে মরিচ রোপণ করলে ফলন ভালো হয়। তা না করে যদি আলস্যে সময় কাটিয়ে কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে রোপণ করা হয় তবে, ধসা রোগে গাছ নষ্ট হয়। মরিচ পাবার কোনো আশাই নেই। জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী খনার এসব বাণী আজও বুঝে বা না বুঝে বাংলার গ্রামগঞ্জে পালিত হয়ে আসছে। *বর্তমান বাজারও চড়া* বিশ্ব-বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদার তিনটি পণ্য হচ্ছে: মরিচ, ভ্যানিলা ও আদা এবং বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি মরিচ উৎপাদিত হয় ভারত ও চীনে। ২০১৫ সালে মোট আমদানির এক-পঞ্চমাংশই মরিচ, ২০১৬ সালের আমদানিকৃত মরিচের মূল্য ৪.৬৯ বিলিয়ন ডলার। ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে মরিচের মূল্য বেড়েছে শতকরা ৯ ভাগ আর চাহিদা বেড়েছে শতকরা ৪ ভাগ–তার মানে মরিচের দাম বেড়েই চলবে (আন্দালিব রাশদী, মশলা কাব্য, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড)। লক্ষ্মীপুরের কয়েকটি বাজারে ব্যবসায়ী এবং ক্রেতাদের সাথে কথা বলে টিবিএস প্রতিবেদক সানা উল্লাহ সানু জানান, গত ছয় মাসের ব্যবধানে মরিচ কেজিতে বেড়েছে ৩০০ টাকার বেশি। এখনো বাড়ছে প্রতিদিন। লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন হাটবাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি শুকনো মরিচ বিক্রি হচ্ছে সর্বনিম্ন ৪০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭০০ টাকা। অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে তৈরিকৃত শুকনো মরিচের গুঁড়ো বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৯০০ টাকায়। ভারতীয় আমদানিকৃত কম ঝালের মোটা মরিচের দাম ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। তাই সাধারণ মানুষ শুকনো মরিচ কেনা কমিয়ে দিয়ে কাঁচা মরিচে ঝুকঁছেন। একই চিত্র দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রামেও। গত কয়েক মাস যাবত চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে ভারতীয় মোটা শুকনা মরিচের (ঝাল কম) দাম কেজিতে দ্বিগুণ বেড়েছে। চট্টগ্রামে দাম বাড়ায় তারাও বেশি দামে বিক্রি করছেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানান সানা উল্লাহ। লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মতে, ভারতীয় শুকনো মরিচের সরবরাহ ঘাটতি ও মূল্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দেশে উৎপাদিত মরিচের দামে। জেলায় উৎপাদিত শুকনো মরিচের দামও মানভেদে কেজিপ্রতি ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা বেড়েছে। তবে বাজারে সবচেয়ে বেশি দাম মোটা মরিচের। এই আকাশচুম্বী দামের কারণ হিসেবে লক্ষ্মীপুর জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মোঃ মনির হোসেন টিবিএস প্রতিবেদককে জানান, গত মৌসুমে দেশে মরিচের ফলন কিছুটা কম হয়েছে। তাই বাজারে দেশীয় শুকনো মরিচের সরবরাহ তুলনামূলক কম। এছাড়া ভারত থেকে যারা মরিচ আমদানি করে তারা নিজেরাও একটা শক্ত সিন্ডিকেট তৈরি করে দেশে এ রকম অবস্থার সৃষ্টি করেছে। তিনি স্থানীয়ভাবে মরিচ উৎপাদন বৃদ্ধি করে সিন্ডিকেট বলয়ের বিরুদ্ধে কৃষকদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার অনুরোধ করেন। তবে আগামী মৌসুম না আসা পর্যন্ত দামে বড় কোনো পরিবর্তন নাও আসতে পারে বলে জানান তিনি। *মরিচ ছাড়া চলেই না* দাম কমুক বা বাড়ুক মরিচ ছাড়া আমাদের চলবে না। কারণ, ঝালের প্রতি এ অঞ্চলের মানুষের এক অন্যরকম রোমাঞ্চকর ভালোলাগা মিশে আছে। বাঙালি মানেই তার ভাতের থালায় থাকবে আস্ত একটি মরিচ। তাতে ঝাল সইতে না পেরে চোখ-নাক দিয়ে পানি গড়াক আর কান দিয়ে বেরোক ধোঁয়া, তবু কমবে না ঝালের প্রতি এই অনুরাগ। সুগন্ধি, স্বাদ, সৌন্দর্যচর্চা, গৃহস্থালি বিভিন্ন প্রয়োজন এবং ওষুধি গুণাগুণ প্রায় সর্বত্র মরিচ তার গুরুত্ব বুঝিয়ে দিয়েছে। আর তা-ই তো, দক্ষিণ আমেরিকার আদি উদ্ভিদ হয়েও- আজ বিশ্বের সর্বত্র তার জয়জয়কার।
Published on: 2023-03-12 11:30:49.270394 +0100 CET