The Business Standard বাংলা
হাই-ভ্যালু পোশাকের জন্য বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে বিলাসবহুল ব্র‍্যান্ডগুলো

হাই-ভ্যালু পোশাকের জন্য বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে বিলাসবহুল ব্র‍্যান্ডগুলো

নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো। কোভিড মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার পর ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে সোর্সিংয়ের পরিমাণ বাড়াচ্ছে। হিউগো বস এজি-র মতো হাই-এন্ড ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশে ব্যবসার সুযোগ খুঁজছে। ব্র্যান্ডটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ব্যবসার সম্ভাবনা দেখতে বাংলাদেশ সফর করছেন। বিশ্বের মনোযোগ যে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের দিকে ঝুঁকছে, এ ঘটনা তারই ইঙ্গিত দেয়। নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় নিটওয়্যার কারখানা ফকির ফ্যাশন লিমিটেডের সিওও আতিক মনির দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'হিউগো বসের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্টসহ (বায়িং) চার সদস্যের একটা দল আমাদের সঙ্গে ব্যবসার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে আমাদের কারখানা পরিদর্শন করেছে।' জার্মানিভিত্তিক বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ডটি আগামী দিনে তার কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা শুরু করবে, এ আশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, 'অনেককিছুই ব্র্যান্ডটির চাহিদার সঙ্গে মিলে গেছে। ওদের বিশেষ চাহিদা ছিল ট্রেসেবিলিটি।' বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি ফারুক হাসান টিবিএসকে বলেন, বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল ফ্যাশন ব্র্যান্ড তাদের অর্ডার চীন ও ভিয়েতনাম থেকে বাংলাদেশে সরিয়ে আনছে। তিনি আরও বলেন, 'রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মহামারির কারণে সরবরাহ চেইন ব্যাহত হওয়ার পর বাংলাদেশি সরবরাহকারীরা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করেছে। এ কারণে আমরা কিছু হাই-ভ্যালু অর্ডার পাচ্ছি।' বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, মার্কিন ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো ভূ-রাজনৈতিক সমস্যার কারণে তাদের অর্ডার চীন থেকে বাংলাদেশে সরিয়ে আনছে। বাংলাদেশকে তারা নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী মনে করছে। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশি কারখানাগুলো আগে প্রতি পিস ২৫ ডলার মূল্যের চেয়ে দামি জ্যাকেটের অর্ডার নিতে পারত না। কিন্তু এখন তারা প্রতি পিস ১০০ ডলার ফ্রি অন বোর্ড মূল্যের (এফওবি) জ্যাকেট তৈরি করছে। ডিবিএল গ্রুপের ভাইস-চেয়ারম্যান এমএ রহিমও অনেকটা ফারুক হাসানের সুরেই বলেন, আমেরিকান হাই-ভ্যালু পোশাকের বেশ কিছু রিটেইলার গত কয়েক মাস ধরে চীন থেকে অর্ডার সরিয়ে তাদের কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা করছে। তিনি আরও জানান, রালফ লরেন ও হিউগো বসের মতো কিছু বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করছেন তারা। এই ব্র্যান্ডগুলো তাদের সোর্সিং চীন থেকে সরিয়ে এনেছে। এমএ রহিম জানান, এই পণ্যগুলোর দাম প্রচলিত পণ্যের তুলনায় পাঁচ-ছয়গুণ বেশি, কারণ এস পণ্যের কাঁচামালের দামও বেশি। তিনি আরও জানান, খুচরা পর্যায়ে এসব পোশাক আইটেমের প্রতি ইউনিটের দাম হবে ২০০ থেকে ২৫০ ডলার। জি-স্টার র, পুমা, টিম্বারল্যান্ড ইত্যাদির মতো কিছু প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের সঙ্গেও ডিবিএল গ্রুপ ব্যবসা করছে বলে জানান তিনি। ডিবিএলের মতো স্কয়ার গ্রুপও রালফ লরেন, হিউগো বস ও পুমার সঙ্গে ব্যবসা করছে বলে কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে। ভিয়েলাটেক্স গ্রুপও হিউগো বসের অন্যতম সরবরাহকারী। এদিকে বিটপি গ্রুপ রালফ লরেনের জন্য ফরমাল প্যান্ট ও ডেনিম প্যান্ট তৈরি করছে। কোম্পানিটির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে টিবিএসকে জানান, হিউগো বসের সঙ্গে ব্যবসা শুরু করার জন্যও আলোচনা করছে বিটপি। *হাই-ভ্যালু কাপড় উৎপাদন করছে টেক্সটাইল মিলগুলো* আমদানিনির্ভরতা ও লিড টাইম কমানোর লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি বাংলাদেশি টেক্সটাইল মিল এখন কিছু বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের জন্য হাই-ভ্যালু কাপড় তৈরি করছে। বিশ্বের প্রথম লিড প্লাটিনাম সনদ পাওয়া কারখানাগুলোর একটি এনভয় টেক্সটাইল লিমিটেড। এই প্রতিষ্ঠানও কিছু বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের জন্য হাই-ভ্যালু ফ্যাব্রিক তৈরি করছে। এনভয়ের প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী কুতুবউদ্দিন আহমেদ বলেন, 'বর্তমানে আমরা তিনটি বাংলাদেশি পোশাক কারখানায় রালফ লরেনের সরবরাহকারীদের জন্য ডেনিম কাপড় তৈরি করছি। 'রালফ লরেনের জন্য কাপড় উৎপাদনের অর্থ হলো, কারখানাগুলো এমন কয়েকটি ব্র্যান্ডের সঙ্গে ব্যবসা করছে যেগুলো একটা নির্দিষ্ট মান বজায় রাখে।' শাশা ডেনিমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ বলেন, তার কারখানাও রালফ লরেনের বাছাই করা কারখানাগুলোতে কাপড় সরবরাহ করছে। এসব কাপড় আগে তুরস্ক থেকে আমদানি করা হতো। জাবের অ্যান্ড জুবায়ের ফ্যাব্রিকস ফ্যাশনও র‍্যালফ লরেনের জন্য পোশাক প্রস্তুতকারী কিছু কারখানায় ওভেন কাপড় সরবরাহ করেছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির ডেপুটি ম্যানেজার (ব্যবসা উন্নয়ন) মো. মোসলা উদ্দিন টিপু। মার্কিন ফ্যাশন কোম্পানি রালফ লরেন কর্পোরেশন হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ফ্যাশন ব্র্যান্ড। ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ভবন ধসের সেই কুখ্যাত ঘটনার পর বাংলাদেশ থেকে গার্মেন্টস আইটেম সোর্সিং বন্ধ করে দিয়েছিল কোম্পানিটি। ২০১৯ সালের নভেম্বরে ফ্যাশন ব্র্যান্ডটি নিজেদের ঢাকা অফিস ফের চালু করার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে পুনরায় সোর্সিং শুরু করে। রালফ লরেন চার ক্যাটাগরির পণ্যের সুপরিচিত—পোশাক, গৃহস্থালি, অ্যাকসেসরিজ ও সুগন্ধি। মাঝারি দাম থেকে বিলাসবহুল পণ্য বিক্রি করে ব্র্যান্ডটি। *বাংলাদেশ থেকে সোর্স করছে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলো* ডাচ ফ্যাশন ব্র্যান্ড জি-স্টার র-এর বাংলাদেশের স্নোটেক্স আউটারওয়্যার লিমিটেড থেকে ১ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের প্রায় দুই লাখ আউটারওয়্যার সোর্সিংয়ের কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন জি-স্টারের রিজিয়নাল অপারেশনস ম্যানেজার শফিউর রহমান। 'এটি হবে আমাদের সঙ্গে তাদের (স্নোটেক্স) তৃতীয় মৌসুম। এ যাত্রা শুরু হয়েছিল ১ লাখ ৩৩ হাজার পোশাকের একটি অর্ডারের মাধ্যমে,' শফিউর বলেন। তিনি আরও বলেন, 'আমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারি স্নোটেক্স তাদের কাজের জন্য ন্যায্য রিটার্ন পাচ্ছে। 'আমরা দেখেছি, আমাদের চাহিদামতো পণ্য তৈরি করার সক্ষমতা তাদের আছে। এবং আমাদের সঙ্গে দুই মৌসুম ব্যবসা করার পর এ বছর তারা বিস্ময়করভাবে ৩০ দিনের মধ্যে আমাদের সিল স্যাম্পলের বড় অংশই তৈরি করে ফেলেছে, আগে যার জন্য ৫৫ দিন সময় লাগত।' জি-স্টার র বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ২০ মিলিয়ন ডলার মূল্যের ১০ লাখ পিস জিনস আমদানি করে। গত ১০ বছর ধরে একমাত্র বাংলাদেশি ডেনিম রপ্তানিকারক হিসেবে ডাচ ফ্যাশন ব্র্যান্ডটির সঙ্গে কাজ করছে জেনেসিস ডেনিম। জেনেসিস ডেনিমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনির আহমেদ টিবিএসকে হাই-ভ্যালু পণ্য উৎপাদনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। 'স্টাইল, ওয়াশ, রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডের চাহিদা বেশি জটিল থাকায় আমাদের শুরুটা বেশ কঠিন ছিল,' বলেন তিনি। ক্রেতার চাহিদার জোগান দিতে তারা কিছু জটিল প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়েছেন বলেও জানান মুনির আহমেদ। 'একদম শুরুতে একজোড়া প্যান্ট তৈরি করতে আমরা সাতদিন সময় নিতাম। এখন আমরা ব্র্যান্ডটির রুচি ও ফ্যাশনের নান্দনিকতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।' মুনির আহমেদ বলেন, জি-স্টার র একজোড়া ডেনিম প্যান্টের জন্য ৩৫ ডলার পর্যন্ত দাম দেয়। অন্যদিকে কমমূল্যের ডেনিম রপ্তানিকারকেরা একজোড়া প্যান্টে গড়ে ৬ ডলার করে পান। খেলাধুলার পোশাকের ব্র্যান্ড পুমা তাদের মান, টেকসইতা ও স্টাইলের জন্য প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি। ম্যাস-মার্কেটে বিক্রি হওয়া ক্রীড়াসংশ্লিষ্ট পোশাকের তুলনায় পুমার পণ্যের দাম সাধারণত অনেক বেশি হয়। তবে এগুলো বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর মতো অত দামি নয়। পুমার অন্যতম বৃহৎ সরবরাহকারী হলো ঊর্মি গ্রুপ। ঊর্মি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আসিফ আশরাফ বলেন, তারা গত ১০ বছর ধরে পুমার সঙ্গে ব্যবসা করছেন এবং তাদের বার্ষিক বাণিজ্য ৩০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ঊর্মি গ্রুপের পোশাকের মধ্যে আছে সিমলেস অ্যাক্টিভওয়্যার, টি-শার্ট ও পোলো শার্ট।
Published on: 2023-03-12 18:10:01.947965 +0100 CET