The Business Standard বাংলা
বাংলার মিষ্টির বিবর্তনের ইতিহাস ধরে রেখেছে দেড়শ বছরের পুরোনো যে বাজার

বাংলার মিষ্টির বিবর্তনের ইতিহাস ধরে রেখেছে দেড়শ বছরের পুরোনো যে বাজার

হুট করে বাইরের কেউ কলকাতার নতুন বাজার গেলে মুগ্ধ হওয়ার বদলে আশাহতই বেশি হবে। এখানকার অলিগলি, অস্থায়ী দোকানগুলোতে আকর্ষণের কিছু নেই। কিন্তু নতুন বাজারের মাহাত্ম্য এসবে নয়, এ বাজারের সবচেয়ে বিখ্যাত বস্তুটি হলো এর মিষ্টি তার বিবর্তনের ইতিহাস। ১৮৭১ সালে কলকাতার অন্যতম বড় ব্যবসায়ী রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক নতুন বাজার তৈরি করেছিলেন। কলকাতা শহরের সবচেয়ে আদি মিষ্টির দোকানগুলোর কয়েকটির অবস্থান এখানেই। এসব দোকানে প্রধানত বিক্রি হয় সন্দেশ। বিভিন্ন রং, আকৃতি আর স্বাদের সন্দেশ নতুন বাজারে বছরের তিনশ পঁয়ষট্টি দিনই দিব্যি পাওয়া যায়। 'কলকাতার আর কোনো জায়গায় নতুন বাজারের মতো পুরোনো দিনের ধাঁচ পাওয়া যাবে না। এখানে এলে বোঝা যায় এ শহরের মিষ্টির দোকানগুলো কীভাবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছে,' বলেন স্থানীয় সাংবাদিক শিবেন্দু দাস। চিৎপুর রোডে নতুন বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাজা মল্লিক। হাল আমলে এ রাস্তার নাম হয়েছে রবীন্দ্র সরণি। তখনকার কলকাতায় দুটি ভাগ ছিল: হোয়াইট টাউন ও ব্ল্যাক টাউন। হোয়াইট টাউনে থাকতেন মূলত ব্রিটিশরা। আর ব্ল্যাক টাউন ছিল ভারতীয়দের আবাসস্থল। তখন শহরের অবস্থাও দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছিল। শিল্পকারখানা গড়ে উঠছিল, নতুন নতুন বাড়ি বানানোরও হিড়িক পড়ে যায়। ওই সময় মানুষজনকে আকৃষ্ট করার একটি বড় উপায় ছিল বাজার বসানো। খুব সম্ভবত মল্লিকও এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে নতুন বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আপার চিৎপুর রোডের আশেপাশে তখন অনেক বনেদি পরিবারের বসবাস ছিল। বাজার থেকে কয়েক রাস্তা দূরেই ছিল ট্যাগোর কাসল। উইন্ডসর দুর্গের মতো করে ১৮২০-এর দশকে এ বাড়িটি তৈরি করেছিল পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবার। নতুন বাজার বর্ধিষ্ণু হয়ে ওঠার সঙ্গে এখানে পিতল-তামার দোকান, বিভিন্ন ডাক্তারের অফিস, ফার্মেসি ইত্যাদির সংখ্যাও ক্রমশ বাড়তে লাগল। এসবের মাঝে মাঝে ছিল বইয়ের দোকান, ছাপাখানা, মুদি দোকান, ওয়্যারহাউজ ইত্যাদিও। এভাবে রমরমা হয়ে ওঠায় এ বাজারে ব্যবসার উদ্দেশ্যে ছুটে আসতে শুরু করেন বিভিন্ন কারিগর ও হাতের কাজ জানা মানুষেরা। এদের মধ্যে ছিলেন অনেক ময়রাও। ময়রাদের জন্য নতুন বাজার ছিল উপযুক্ত একটা সুযোগ। মল্লিক মহাশয় নতুন বাজার প্রতিষ্ঠার অনেক আগে থেকেই এ অঞ্চলে মন্ডা বিক্রি করার জন্য সপ্তাহে দুইবার স্থানীয় হাটে আসতেন ময়রারা। কিন্তু বাজার তৈরি হওয়ার পর তাদের অনেকে এখানে স্থায়ী দোকান দিয়ে বসলেন। বর্ধমানের দুবরাজহাট ছেড়ে নতুন বাজারে এসে থিতু হয়েছিলেন তপন দাসের পূর্বপুরুষেরা। নলিন চন্দ্র দাস অ্যান্ড সন্স-এর পঞ্চম প্রজন্মের মালিক তপন দাস। নতুন বাজারের সবচেয়ে পুরোনো দুটো মিষ্টির দোকানের মধ্যে তাদের দোকান একটি। অন্যটি হলো মাখনলাল দাস অ্যান্ড সন্স। দুটো দোকানেরই অবস্থান পাশাপাশি। দু'দোকানেরই বাঁধা খরিদ্দার আছে এখনো। মাখনলাল আর নলিন দুটোরই সারা কলকাতাজুড়ে আরও অনেক শাখা আছে, কিন্তু নতুন বাজারের দোকানকেই মূল দোকান বলা চলে। কলকাতার অন্য মিষ্টির দোকানগুলোর মতো আদিকালের স্বাক্ষ্য বহনকারী এ দুই দোকানে কাচের শোকেসের বালাই নেই। এখানে মিষ্টি রাখা হয় পিতল ও কাঠের বড় বারকোশে। প্রায় সব ধরনের সন্দেশই এসব দোকানে পাওয়া যায়। একদম টাটকা মিষ্টিগুলো অনেক সময় ক্রেতার সামনেই তৈরি করা হয়। তপন দাসের ভাষ্যে, সন্দেশের জন্ম হয়েছিল নতুন বাজারেই। আর এখান থেকেই ক্রমশ জনপ্রিয়তা পায় এ খাবারটি। 'এখানকার ময়রাদের বিক্রি করা মন্ডাই একসময় বদলে গিয়ে সন্দেশ হয়ে গিয়েছে,' তপন দাস বলেন। তার দাবিটি নিয়ে বিতর্ক তোলা যায়, তবে সাংবাদিক শিবেন্দু দাসের মতে, নতুন বাজারেই প্রথমবারের মতো নলিন চন্দ্র দাস সন্দেশে ফ্লেভার যোগ করেছিলেন, 'সেই ১৯০০ সালেই তারা চকোলেট স্বাদের সন্দেশ তৈরি করেছিলেন।' লেখক আশিষ সান্যাল তার লেখায় একটি প্রচলিত গল্পের কথা উল্লেখ করেছেন। নতুন বাজার এলাকার এক অভিজাত পরিবারের তরুণ বংশধর ও বিলেতি ডিগ্রিধারী উকিল বিশ্বজিৎ ঘোষ ভূতনাথ দাসকে রাজি করিয়েছিলেন বিলেত থেকে আনা কোকো পাউডার দিয়ে নতুন জাতের একটা সন্দেশ তৈরি করতে। প্রথমে রাজি না হলেও ভূতনাথের হাত ধরেই বাদামি সন্দেশ তৈরি হয়। বাজারে আনার পরপরই সাফল্য পেয়েছিল সেটি। মাখনলাল ও নলিনের দোকানে এ জমানায়ও মানুষ এক-দু রুপিতে সন্দেশ খেতে পারেন। দামে কম হলেও মানের দিক থেকে এসব সন্দেশের কোনো খামতি নেই। শোনা যায়, পর্তুগিজেরা নাকি বাঙালিকে ছানা বানাতে শিখিয়েছিল। তার আগে বাংলাদেশের মিষ্টিতে তৈরি হতো নারিকেল, ডাল, খোয়া (শুকনো ক্ষীর) ইত্যাদি দিয়ে। নতুন বাজারে এখনো খোয়া বিক্রির জন্য আলাদা জায়গা আছে। এ খোয়া আসে বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদসহ পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য জেলা থেকে। অবশ্য শম্ভুনাথ হালদারের ক্ষীরের দোকানে বাইরের খোয়া পাওয়া যায় না। প্রায় ৮০ বছর পুরোনো এ দোকান পার্শ্ববর্তী শতবর্ষী জোড়াসাঁকোর দুধের বাজার থেকে দুধ সংগ্রহ করে নিজেরাই খোয়া তৈরি করে। তত্ত্বের মিষ্টির মূল উপাদান এ খোয়া। নতুন বাজারের অনেক দোকানেই বিয়ের তত্ত্বের মিষ্টি তৈরি হয়। বিয়েতে এ মিষ্টি উপহার দেওয়া হয়। এসব মিষ্টি আজকাল পাওয়া যায় নানা নকশা, আকৃতি আর রংয়ে। নতুন বাজারের বয়স দেড়শ ছাড়িয়ে গেছে। এতদিনে গঙ্গায় অনেক জল গড়িয়েছে: মিষ্টির উপাদানের পরিবর্তন হয়েছে, মিষ্টি দেখতে বদলে গেছে, হয়তো মিষ্টি নিয়ে বাঙালির ঝোঁকও আর আগের মতো নেই। কিন্তু সেই ১৯ শতকে যে স্বাদ নিয়ে এ যাত্রা শুরু করেছিল কলকাতার মিষ্টি, নতুন বাজারের ময়রারা আজও সে স্বাদকে কী দারুণভাবেই না অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। স্ক্রল ডটইন থেকে সংক্ষেপে অনূদিত
Published on: 2023-03-19 16:37:48.945578 +0100 CET