The Business Standard বাংলা
যুদ্ধের কারণে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে

যুদ্ধের কারণে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাত-সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির প্রভাবে চলতি অর্থবছরে বিভিন্ন খাতে সরকারের দেওয়া ভর্তুকির পরিমাণও বেড়েছে। বিদ্যুৎ, সার, জ্বালানি তেল, গ্যাস ও খাদ্যপণ্য সরবরাহে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অতিরিক্ত ১১০,১০৫ কোটি টাকা ভর্তুকির চাহিদা সৃষ্টি হলেও – ২০২২-২৩ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে অর্থ মন্ত্রণালয় মাত্র ১৬,৮১২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানিয়েছে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘায়িত যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য ও সেবার দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে এই বিপুল ভর্তুকির চাপ সৃষ্টি হয়েছে। রাজস্ব আহরণে ঘাটতির কারণেও অতিরিক্ত চাহিদার মাত্র ১৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা। নাম না প্রকাশের শর্তে অর্থ বিভাগের এক কর্মকর্তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেছেন, এবছর রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা হবে। তার ওপর আবার বিশ্ববাজারে চড়া দামের প্রভাবে সরকারের আমদানি ব্যয়ও বেড়েছে। এ কারণেই ভর্তুকির চাহিদা এবং তা মেটানোর সক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয় ভর্তুকি বাবদ অতিরিক্ত ৪০,২৪৭ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে পেয়েছে মাত্র ১০,০০০ কোটি টাকা। একইভাবে বিদ্যুতে ভর্তুকি বাবদ অতিরিক্ত ৩২,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হলেও অর্থবিভাগ বরাদ্দ দিয়েছে মাত্র ৬,০০০ কোটি টাকা। খাদ্য সহায়তা বাবদ অতিরিক্ত ৪,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছিল খাদ্য অধিদপ্তর, কিন্তু পেয়েছে ৮১২ কোটি টাকা। এর বাইরে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানিতে অতিরিক্ত ২৪,৩৫৮ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছিল, কিন্তু এসবখাতে এক টাকাও বরাদ্দ বাড়ায়নি অর্থবিভাগ। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশসহ সরকারের অন্যান্য সংস্থা ভর্তুকি বাবদ অতিরিক্ত ৯,০০০ কোটি টাকা দাবি করলেও তাতে কোন সাড়া দেয়নি অর্থ মন্ত্রণালয়। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সরকার বিদ্যুৎ ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু, মূল্যস্ফীতি আরও উস্কে যাওয়ার আশঙ্কায় সরকার একসঙ্গে ভর্তুকি প্রত্যাহার না করে ধাপে ধাপে সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। তারা জানান, গত পাঁচ বছর ধরে সারে ৯০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এবং কৃষি মন্ত্রণালয় কোন বছরই তার পুরোটা খরচ করতে পারেনি। ২০১৩ সালের পর থেকে জ্বালানি তেলে কোন ভর্তুকি দিতে হয়নি সরকারকে, বরং দেশের বাজারে দাম না কমানোর কারণে এ খাত থেকে সরকার মুনাফা করেছে। কিন্তু, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই বিশ্ববাজার থেকে উচ্চ দরে জ্বালানি ও পণ্য আমদানিতে বাড়তি ডলার খরচ করতে হয়। ফলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে সংকট দেখা দিয়েছে, যা মোকাবিলায় টাকার অবমূল্যায়ন করতে হয়েছে। এতে টাকার অংকে ভর্তুকি আরও বেড়ে গেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এবছর যে পরিমাণ ভর্তুকির চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে তা বাজেট থেকে মেটানো সম্ভব নয়। ফলে সংস্থাগুলো তাদের লোকসানকে দেশি-বিদেশি ঋণে রূপান্তর করে আগামী বছরগুলোতে পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করবে। সংস্থাগুলো নিজস্ব আয় থেকে দেনা পরিশোধ করতে না পারলে সরকারের ঋণ হিসেবে বাজেট থেকে তার দায় মেটানো হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ বিভাগের আরেক কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, "আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য কমতে শুরু করেছে। আইএমএফ- এর পরামর্শে সরকার জ্বালানি তেলের অটো প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট শিগগিরই শুরু করবে। গ্যাস ও বিদ্যুতের ভর্তুকিও পর্যায়ক্রমে সমন্বয় করা হবে। এ অবস্থায়  মুদ্রা বিনিময় হারে স্থিতিশীলতা ফিরলে আগামী অর্থবছর ভর্তুকি অনেক কমে যাবে।" তবে চাহিদা অনুযায়ী ভর্তুকির যোগান দিতে না পারায় সরকারের এক সংস্থার লোকসানের ভার অন্য সংস্থাকে বহন করতে হবে এবং ভর্তুকিকে ঋণে রূপান্তর করে পরিশোধ করতে হবে। এতে ভর্তুকিতে 'গ্রিড লক' পরিস্থিতি সৃষ্টির আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও গ্যাসসহ পণ্যমূল্য কমতির দিকে থাকায়- আগামী অর্থবছর ভর্তুকির পরিমাণ কমে যাবে। তবে এবছর মন্ত্রণালয়গুলো যে ভর্তুকিকে ঋণে রূপান্তর করবে, তার দায় আগামী অর্থবছর থেকে পরিশোধ করতে হবে। ফলে পুরনো লোকসান মেটাতে নতুন অর্থবছরে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হবে।" তিনি বলেন, সরকার চলমান অর্থবছরের শেষ দিকে এসে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। বছরের প্রথম দিকে এই উদ্যোগ নিলে ভর্তুকির চাপ অনেক কমে যেতো। গত বছরের ফ্রেবুয়ারিতে যখন রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হয়- তখন সরকার অনুমান করে এই যুদ্ধ তিন-চার মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। এমন পূর্বানুমান ধরে চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের সময় ভর্তুকি বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চিন্তা করে সরকার। এ কারণে চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে জ্বালানি তেল বাদে সার, বিদ্যুৎসহ খাদ্য সহায়তায় আগের অর্থবছরের তুলনায় ভর্তুকিতে বাড়তি বরাদ্দ রাখে সরকার। আগের সাত বছর ধরে জ্বালানি তেলে প্রায় ৪২,০০০ কোটি টাকা মুনাফা করায় এখাতে ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে, তা ভাবতে পারেনি অর্থ মন্ত্রণালয়। কিন্তু, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সাথেসাথে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, সার, গ্যাসসহ খাদ্যপণ্যের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার রেকর্ড পরিমাণে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। কয়েক দফা গ্যাস ও বিদ্যুতের দামও বাড়ানো হয়েছে। অভ্যন্তরীণ খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো সরকারের অগ্রাধিকার হলেও ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণে গত বছরের আগস্টে সারের দামও বাড়ায় সরকার। তবে এসব উদ্যোগের কোনোটাই ভর্তুকির চাহিদা কমাতে পারেনি; নভেম্বরের আগেই মন্ত্রণালয়গুলো বিভিন্ন খাতে অর্থ বিভাগের কাছে অতিরিক্ত ১,১০,১০৫ কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দের দাবি করে। ভর্তুকির চাপ মোকাবেলায় করণীয় নির্ধারণে নভেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে এক আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়। সেখানে বিভিন্ন সেবার মূল্য বাড়িয়ে ভর্তুকি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া, ডলার সংকটের প্রেক্ষাপটে আইএমএফ থেকে ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণ নেওয়ার শর্ত হিসেবেও গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলে ভর্তুকি কমানোর চাপ আসে। একারণে গত কয়েকমাসে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে কৃষিখাতে ভর্তুকিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৯,৫০০ কোটি টাকা। সারের দাম বাড়ার কারণে অর্থবছর শেষে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ২৮,০০০ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এখাতে ভর্তুকি বাড়িয়ে ১৫,১৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অর্থাৎ, গত অর্থবছর সারের ভর্তুকির ১২,৮২৭ কোটি টাকা কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঋণ হিসেবে রয়ে গেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে টিবিএসকে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এবছর ২৬,০০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে। ফলে বাকিটা কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঋণ হিসেবে থেকে যাবে। তিনি আরো বলেন, বাজেট থেকে অর্থ পাওয়া না গেলে দেশি ব্যাংক বা বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নিয়ে তা আমদানি করা হয়। ঋণ নেওয়া অংশ পরবর্তী বছরগুলোতে সমন্বয় করা হবে। বাজেট থেকে পাওয়া অর্থে বর্তমানে ২০২০-২১ অর্থবছরের ঋণ সমন্বয় করা হচ্ছে বলে জানান কৃষি মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা। আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে কোন খাতে কতো টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দেওয়া হবে, তা এখনও ঠিক হয়নি। আগামী মে মাসের প্রথম দিকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক সভায় নতুন অর্থবছরে খাতভিত্তিক ভর্তুকির পরিমাণ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হবে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, তবে জ্বালানি তেলে কোন ভর্তুকি দেবে না সরকার। এজন্য আইএমএফ এর পরামর্শ অনুসারে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দাম সমন্বয়ের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। একইসঙ্গে বিদ্যুত ও গ্যাসে ভর্তুকি পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা হবে বলে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, অর্থবছরের শেষ দিকে সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এতে ভর্তুকির পরিমাণ খুব বেশি কমবে না। সর্বশেষ দফায় দাম বাড়ানোর কারণে বিদ্যুতে ভর্তুকি কমবে মাত্র ৫,০০০ কোটি টাকা। লোকসান কমাতে বিদ্যুতের দাম আরও বাড়ানো হলে তা মূল্যস্ফীতিতে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। তাই স্থানীয় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকির পরিমাণ ৬,০০০ কোটি টাকা বাড়িয়ে ২৩,০০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বাড়তি দামে গ্যাস কেনার আগ্রহ প্রকাশ করার পর সরকার গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে এবং স্পট থেকে এলএনজি আমদানি শুরু হয়েছে। ফলে চলতি অর্থবছর এখাতে বাড়তি ভর্তুকির দরকার হবে না বলে মনে করছেন অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা। সোমবার অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে প্রাক-বাজেট আলোচনায় মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ- এর সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, সরকার কোন পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্য সমন্বয় করবে, তা ব্যবসায়ীদের জানানো উচিত। এতে ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারবেন। 'আমরা গ্যাস ও জ্বালানি তেলে ভর্তুকি চাই না। তবে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ চাই'- জানান তিনি।
Published on: 2023-03-22 18:54:08.253189 +0100 CET