The Business Standard বাংলা
‘ভূমিকম্পের ঝুঁকি থেকে ঢাকাসহ বাংলাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চল অনেকাংশেই নিরাপদ’

‘ভূমিকম্পের ঝুঁকি থেকে ঢাকাসহ বাংলাদেশের বেশিরভাগ অঞ্চল অনেকাংশেই নিরাপদ’

*সম্প্রতি তুরস্ক-সিরিয়া অঞ্চলে ঘটে যাওয়া মারাত্মক ভূমিকম্পসহ গেল মঙ্গলবার (২১ মার্চ) আফগানিস্তানে আঘাত হানা সর্বশেষ ভূমিকম্পের পর, বাংলাদেশজুড়েও একই দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে এক অবিচ্ছিন্ন সতর্কবার্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।* বেশ কয়েকজন ভূতাত্ত্বিক ও বিশেষজ্ঞের আশঙ্কা, ভয়াবহ ভূমিকম্পের ঘটনা ঘটতে পারে বাংলাদেশও। তবে এর বিপরীতে, ভিন্ন কথা বলছেন বাংলাদেশের ভূতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের সাবেক পরিচালক ও ম্যাসাচুসেটস-ভিত্তিক প্রকৌশল ভূতত্ত্ববিদ মীর ফজলুল করিম। সিলেটসহ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের কিছু অংশ ভূমিকম্পপ্রবণ বলে চিহ্নিত; অন্যদিকে, দেশের বাকি দুই-তৃতীয়াংশ তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঝুঁকি ও বাস্তবতা নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ করেছেন ভূতত্ত্ববিদ মীর ফজলুল করিম। *বাংলাদেশের টেকটোনিক ভূতত্ত্ব সম্পর্কে কিছু বলুন।* বাংলাদেশের টেকটোনিক কনফিগারেশন এবং ভূতাত্ত্বিক গঠন অনেক জটিল। বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও, এই বঙ্গ অববাহিকা (বেঙ্গল বেসিন) একটি সক্রিয় ও জটিল ভূতাত্ত্বিক সত্তার জীবন্ত উদাহরণ। এটি শক্তি সঞ্চিত জমাটবদ্ধ পললের সন্নিবেশ ও তিনটি টেকটোনিক শিলাস্তর থেকে উৎপন্ন ভিন্ন ভিন্ন, বহুমাত্রিক ও পরিবর্তনশীল শিলাস্তরের বিন্যাস নিয়ে গঠিত। এমনও হতে পারে যে, ছোট এই দেশে প্রায় ৫০ ধরনের গ্রাউন্ড কন্ডিশন বা ভূ-পরিস্থিতি তৈরি হয়ে আছে। এই ভূ-প্রাকৃতিক গঠনের প্রতিটি একক আলাদা আলাদা উপকরণ ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে একটি ভূমিকম্প থেকে কতটা, শক্তি যেমন- গ্যাস অথবা তরল, সঞ্চারিত হবে তা নির্ধারণ করে দেয়। বৈজ্ঞানিকভাবে ভূ-প্রকৃতি ব্যাখ্যা করতে গেলে আমরা দেখতে পাই, ভূপৃষ্ঠ অনেকগুলো টেকটোনিক বা শিলাস্তরে বিভক্ত।। প্রতিটি প্লেটের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা ভারতীয় প্লেটের কথা বলতে পারি। এই প্লেটের ওপর আমাদের বসবাস। এরপাশে রয়েছে ইউরেশিয়ান প্লেটের মতো অন্যান্য আরও কিছু প্লেট। তবে একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ এবং এর প্রতিবেশী অঞ্চলের ভূমিকম্পের ইতিহাসে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এই ভূখণ্ড একটি সক্রিয় ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল। বাংলাদেশের ভূপৃষ্ঠ বা এই বঙ্গ অববাহিকা বিশ্বের সর্বকনিষ্ঠ সক্রিয় ব-দ্বীপ, যা উল্লেখযোগ্যভাবে আঞ্চলিক বা দূরবর্তী কোনো শিলাস্তরের পরিবর্তনজনিত সঞ্চারিত শক্তি দ্বারা প্রভাবিত। বেঙ্গল বেসিনে ভূমিকম্পের উৎস হিসেবে তিন ধরনের ভূ-আভ্যন্তরীণ এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়; এগুলো হচ্ছে- ইন্ট্রা-প্লেট, ট্রানজিশনাল এবং ইন্টার-প্লেট। এই উৎস এলাকার ভূমিকম্পের ধরন বেঙ্গল বেসিনের টেকটোনিক কাঠামো এবং ভূতল বা ক্রাস্টাল কনফিগারেশনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। তবে স্বস্তির কথা হলো, এই উৎস এলাকাগুলো ৩০ কিলোমিটারেরও বেশি ঘনত্বের পলি মাটির স্তরের নীচে চাপা পড়ে আছে; ফলে ভূমিকম্প তৈরিতে এলাকাগুলো তেমন সক্রিয় নয়। আমাদের গবেষণা বলে, উল্লম্ব এবং বহুপার্শ্বীয়-উভয় রকম চাপের কারণে বঙ্গ অববাহিকার উপরিতল পূর্বোক্ত তিন টেকটোনিক শিলাস্তর থেকে বিভক্ত। অনুমান করা হয়, এই বিভাজন ভূমিকম্পের উত্স কাঠামোকে দুর্বল করে রেখেছে। এছাড়া, আমরা বাংলাদেশে এমন কোনো সক্রিয় উৎস কাঠামো খুঁজে পাইনি, যা ৭.৫ মাত্রার চেয়ে বড় ভূমিকম্প ঘটাতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের ভূখণ্ডের বাইরে শক্তিশালী ভূমিকম্প সংঘঠিত হওয়ার মতো উৎস অঞ্চল রয়েছে, যা এদেশের জন্যেও হুমকিস্বরূপ। যদি উত্তর-পূর্ব ভারত, মায়ানমার এমনকি দূরবর্তী সুমাত্রাতেও শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়, তা থেকে বাংলাদেশেও কিছুটা ক্ষয়ক্ষতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি হতে পারে। *তুরস্ক ও সিরিয়ায় ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর অনেক বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, বাংলাদেশও যেকোনো সময় একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে দুই দেশের দুর্বলতাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?* আনাতোলিয়া, আরব এবং আফ্রিকান প্লেটগুলোর সঙ্গে টেকটোনিকভাবে সক্রিয় প্লেটগুলোর সংযোগ থাকায় তুরস্ক-সিরিয়া অঞ্চলে বড় মাত্রার ভূমিকম্পের ঘটনা খুবই সাধারণ ব্যাপার। সেখানে উত্তর আনাতোলিয়ান ফল্ট ক্যালিফোর্নিয়ার সান আন্দ্রেয়াস ফল্টের মতো এবং আফ্রিকান প্লেট ভারতীয় প্লেটের মতো। এই কাঠামোর কারণেই এ অঞ্চলে মারাত্মক ভূমিকম্প ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। তবে মারাত্মক ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকলেও এ দুর্যোগের ক্ষেত্রে তুরস্কের আগাম সতর্ক ব্যবস্থা ইউরোপীয় দেশগুলোর চেয়ে উন্নত নয়। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে ব্যাপক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও সিরিয়াসহ দেশটি সম্প্রতি মারাত্মক ভূমিকম্পের কবলে পড়েছে। তবে এই মারাত্মক অবস্থা কেবল ভূমিকম্পের পূর্বাভাস বা প্রস্তুতির ত্রুটির কারণে নয়, বরং আমি মনে করি, ঘটনাটি প্রকৌশলগত (যেমন- নির্মাণ সামগ্রী নির্বাচন, ভূমি উন্নয়ন, ভবনের নকশা এবং বয়স) ব্যর্থতার একটি অন্যতম উদাহরণ। তুরস্কের সাম্প্রতিক ভূমিকম্প এটিই ইঙ্গিত দেয়, সেখানে টেকসই ভবন নির্মাণের জন্য উপযুক্ত নকশা অনুসরণ করা হয়নি। এটি ইচ্ছাকৃত না-কি অনিচ্ছাকৃত, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশেও এ ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ঘটতে পারে, যদি আমরা নির্মাণাধীন অবকাঠামোগুলোর ভূমির অবস্থা এবং এর ভূ-প্রকৌশল বিবেচনায় না নেই। বাংলাদেশের প্রকৌশলীরা সাধারণত ভবনগুলোকে শক্তিশালী করতে কংক্রিট রিইনফোর্সমেন্ট, কলাম এবং ফ্রেম স্ট্রাকচার প্রয়োগ করেন। অন্যদিকে, তুরস্ক ও সিরিয়ায় ধসে পড়া ভবনগুলোর মধ্যে ফ্রেম স্ট্রাকচার তেমন বেশি ছিল না, যা বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত। এছাড়া, ভূমিকম্পে ব্যাপক ধ্বংসের কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বিল্ডিং কোড না মেনে চলার প্রবণতাকে অনেকাংশেই দায়ী করে থাকেন। তুরস্ক-সিরিয়ার টেকটোনিক প্লেটের অংশ এবং সংযোগস্থলের জ্যামিতিক গঠনের সন্নিবেশ বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশের ভূমি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র নদী বাহিত পলির জমাটবদ্ধ শিলা দিয়ে গঠিত। অন্যদিকে, তুরস্ক-সিরিয়া অঞ্চলের ভূমি খুবই প্রাচীন (প্রিক্যামব্রিয়ান) এবং ঘন আগ্নেয় ও রূপান্তরিত শিলা দ্বারা গঠিত। এরকম শিলাতে ভূমিকম্পের শক্তি (তরঙ্গ শক্তি) খুব দ্রুত সঞ্চারিত হতে পারে। ফলে, ওই অঞ্চলে ভূমিকম্প হলেই সেটি মারাত্মক রূপ নেয় এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেশি হয়। ভূতাত্ত্বিকভাবে তুরস্ক-সিরিয়া অঞ্চলের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক নিরাপদ। অনেক বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ দেশে ভূমিকম্পের কারণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পূর্বাভাস দিয়েছেন, এ বিষয়ে আপনার অভিমত কী? *অনেক বিজ্ঞানীর অনুমান, দেশে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। আমি মনে করি, এই ভবিষ্যদ্বাণীটি অতিরঞ্জিত; কারণ ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশে এমন কোনো উৎস কাঠামো নেই যা একক কোনো ঘটনায় এত বড় কম্পন তৈরি করার মতো শক্তি সঞ্চার করতে পারে।* প্রকৃতপক্ষে, ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঠিক কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে, এখনো তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়; কারণ আমরা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিয়ে তেমন গবেষণাই করিনি। বিভিন্ন মডেলের ওপর ভিত্তি করে যেই অনুসন্ধানগুলো বেরিয়ে এসেছে, তা ভূমিকম্পের উত্স কাঠামোর ত্রি-মাত্রিক জ্যামিতিক উপস্থাপনা দ্বারা সমর্থিত নয়; এবং এই মডেলগুলো যাচাইকৃতও নয়। আমি মনে করি, এই অনিশ্চিত এবং অপ্রমাণিত ভবিষ্যদ্বাণী ভূমিকম্প দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি গুরুতর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া, এটি দেশের চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়াকেও বাধাগ্রস্ত করবে। বিদ্যমান ভূতাত্ত্বিক মানচিত্র, রেকর্ড এবং আমাদের ঐতিহাসিক ভূতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতা অনুসারে, বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকির মাত্রা সত্যিই কম। গ্লোবাল সিসমিক রেসপন্স ম্যাপ অনুযায়ী, ঢাকাসহ বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে কম ঝুঁকিপূর্ণ বলেই বিবেচিত। এমনকি, ভূমিকম্পের ঝুঁকির দিক থেকে ঢাকা শহর বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ শহর হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। তবে দেশের অধিকাংশ এলাকা হালকা থেকে মাঝারি ধরনের ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকলেও দেশের উত্তর-পূর্ব এবং পূর্বের ভঙ্গিল পাহাড় অঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মাঝারি থেকে শক্তিশালী পর্যায়ের। বাংলাদেশে সর্বশেষ শক্তিশালী ভূমিকম্পটি হয়েছিল ১৯১৮ সালে। শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্প নামে পরিচিত এই কম্পনের রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৭.৫। ঢাকা শহরের গ্রাউন্ড কন্ডিশন বা ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থা খুব ভালো হওয়ায় শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্পেও লালবাগ কেল্লাসহ অনেক মোগল ও প্রাচীন স্থাপনা টিকে ছিল। বর্তমান সময়ের প্রকৌশল ব্যবস্থা ও অনুশীলন লালবাগ কেল্লার সময়ের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত এবং আমি বিশ্বাস করি, শ্রীমঙ্গল ভূমিকম্পের মতো আরেকটি কম্পনে টিকে থাকার জন্য দেশের এখনকার অবকাঠামোগুলোও যথেষ্ট ভালভাবে তৈরি করা হয়েছে। এক্ষেত্রে নির্মাতাদের অবশ্যই বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হবে এবং মালিক ও জেলা প্রশাসনকে বিষয়টি যথাযথভাবে এবং নিয়মিত যাচাই করতে হবে। ভূমিকম্প একটি বৈশ্বিক ঘটনা। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ। কিন্তু ভূতাত্ত্বিকভাবে বাংলাদেশে ভয়াবহ ভূমিকম্প সৃষ্টিকারী বড় ধরনের কোনো ফল্ট লাইন বা উৎস কাঠামো নেই। সুতরাং, ভূগর্ভস্থ টানেলসহ চলমান উন্নয়ন প্রক্রিয়া বাংলাদেশ অব্যাহত রাখতে পারে।
Published on: 2023-03-25 10:06:45.017499 +0100 CET