The Business Standard বাংলা
১৯ বছর বয়সী মানবশিশু এবং একটি অবিশ্বাস্য কাহিনি

১৯ বছর বয়সী মানবশিশু এবং একটি অবিশ্বাস্য কাহিনি

উনিশ বছর বয়সী প্রাণহীন এক সদ্যোজাত শিশুর কথা লিখতে বসেছি আজ। তার কথা লিখতে গেলে অবশ্য আরেকজনের কথা না লিখে উপায় নেই। তিনি প্রয়াত ডা. ফজলুল করিম পাঠান, ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম ব্যাচের এক মেধাবী ছাত্র। এমবিবিএস পাস করার পর এক বছরের ইন্টার্নশিপ শেষে তাঁর সহপাঠীদের কেউ চলে যান বিলেতে, কেউ যোগ দেন সরকারি চাকরিতে, আবার কেউ ঢাকা শহরেই চেম্বার খুলে রোগী দেখা শুরু করেন। কিন্তু এই মানুষটি ফিরে আসেন তাঁর নিজের গ্রামে। গ্রাম তখন অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর কুসংস্কারের এক নরকভূমি। রোগাক্রান্ত অসহায় লোকজন ছুটে যেত কবিরাজ, পীর-ফকির আর মৌলানাদের কাছে। তাদের একটি বিরাট অংশ মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে পয়সা কামিয়ে নিত। তাবিজ, পানিপড়া, তেলপড়া আর ঝাড়ফুঁকের মধ্যেই সীমিত ছিল গ্রামীণ চিকিৎসাপদ্ধতি। তখন প্যারালাইসিস রোগীকে কোমর পর্যন্ত মাটিতে পুঁতে ঝাড়ু দিয়ে পেটানো হতো, হিস্টিরিয়ায় আক্রান্ত কিশোরীর নাকে চেপে ধরা হতো জ্বলন্ত বাইন মরিচ, সিজোফ্রানিয়ায় আক্রান্ত মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পুকুরে চুবানো হতো। সেই অন্ধকার সময়ে শারীরিক কিংবা মানসিক অসুখের কারণ হিসাবে দায়ী করা হতো ভূতপ্রেত আর জিনের অস্তিত্বকে। ঠিক সেই সময়, ডাক্তার পাঠান যখন গ্রামে চেম্বার খুলে বসলেন, আশ্চর্যের বিষয়, তিনি কোনো রোগীর দেখা পেলেন না। গ্রামের আব্দুল আজিজ নামের এক যুবককে কম্পাউন্ডার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন তিনি। অবশেষে আজিজকে সঙ্গে নিয়ে নিজেই বেরিয়ে পড়লেন রোগীর সন্ধানে। গ্রামের আনাচে-কানাচে ঘুরে টাইফয়েড, ম্যালেরিয়া, কালা জ্বর আর অন্যান্য রোগে আক্রান্ত মানুষদের খুঁজে বের করে তাদের ওপর অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ প্রয়োগ করলেন। প্রথমে অনেকেই চিকিৎসা নিতে অপারগতা প্রকাশ করত। কিন্তু কয়েকজন অসুস্থ মানুষ তাঁর ওষুধে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি গ্রামের মানুষের বিশ্বাস অর্জন করতে শুরু করেন। কিন্তু দ্বন্দ্ব বাধে পীর-ফকির, কবিরাজ আর মৌলানাদের সঙ্গে। বলতে গেলে তাদের বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে দিয়েছিলেন তিনি। তবে অচিরেই আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রের উপকারিতার কাছে তাদের পরাজয় বরণ করতে হয়। পরপর দুটো ভয়াবহ মহামারির সময় ডাক্তার পাঠান অতন্দ্র প্রহরীর মতো গ্রামের মানুষের পাশে ছিলেন। কলেরার সময় অনেকের জীবন বাঁচাতে পারলেও গুটিবসন্তে তাঁর করার কিছুই ছিল না। কারণ, এর কোনো ওষুধ ছিল না। বরং গুটিবসন্তে আক্রান্ত রোগীদের সেবা করতে গিয়ে নিজেই আক্রান্ত হয়ে মরতে বসেছিলেন। এভাবেই একসময় তিনি সুলতানপুর গ্রামের মানুষের প্রাণপুরুষ হয়ে ওঠেন। এরপর কিংবদন্তি হয়ে উঠতে খুব বেশি সময় লাগেনি। নরসিংদী, গাজীপুর আর ময়মনসিংহের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে রোগী আসত তাঁর চেম্বারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন তিনি শহরের আরাম-আয়েশের জীবন ত্যাগ করে নিতান্ত এই পল্লিসমাজের জীবন কাটিয়ে গেলেন। এ বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে জানা যায়, তাঁর পিতা ছিলেন ব্রিটিশ পুলিশের একজন ডাকসাইটে অফিসার। একবার তাঁকে অখণ্ড ভারতের দুর্গম পান্ডুয়া থানায় বদলি করা হয়। সেখানে সাধারণ এক অসুখে প্রায় বিনা চিকিৎসায় তাঁর স্ত্রীর মৃত্যু ঘটে। পুলিশ অফিসারের ছোট্ট ছেলেটির মনে সেই ঘটনা ভীষণভাবে দাগ কাটে, তখনই সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয়, বড় হয়ে সে ডাক্তার হবে, ডাক্তার হয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সেবায় জীবন উৎসর্গ করবে। একটি জীবনও যেন চিকিৎসার অভাবে ঝরে না পড়ে; এটাই তাঁর জীবনের মূল মন্ত্র। তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানতাপস, চিকিৎসাবিদ্যার পাশাপাশি জ্ঞানের নানা শাখায় বিচরণ ছিল। তাঁর চেম্বারে ছোট্ট একটি ল্যাবরেটরি ছিল। সেখানে নানা ধরনের গবেষণার কাজ চালাতেন। তবে তাঁর সেই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল মানবকল্যাণ, যার মাধ্যমে মরণাপন্ন মানুষ জীবন ফিরে পেত। কিছু নতুন ওষুধও আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। সিজোফ্রেনিয়া একটি জটিল মানসিক ব্যাধি। ডা. পাঠান নিজস্ব গবেষণায় এ রোগের একটি ইনজেকশন তৈরি করেছিলেন। সেটা সিজোফ্রেনিয়া আক্রান্ত রোগীর ঊরুতে পুশ করা হতো। এতে বেশির ভাগ রোগী ভালো হয়ে যেত। এ ছাড়া পেটের আলসার সারাতে, 'শেফালী পাউডার' নামে একটি মিকচার ওষুধও তৈরি করেছিলেন। সেটাও ছিল বেশ ফলদায়ক। তবে তিনি এসব ওষুধের ফর্মুলা কাউকে বলে যাননি। ডা. পাঠানের ওই ল্যাবরেটরিতে কাচের জারে ফরমালিনে ডুবানো অবস্থায় ছিল মানবদেহ থেকে অপসারিত বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, টিউমার। তবে এসবের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল ১২ ফুট লম্বা এক ফিতা কৃমি, যা তিনি এক রোগীর পেট থেকে অপসারণ করেছিলেন। পাকিস্তান আমলে ফলাও করে সেই খবর ছাপা হয়েছিল বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়। নিতান্ত গণ্ডগ্রামে বাস করলেও ডাক্তার পাঠানের চলাফেরা এবং পোশাক-পরিচ্ছদ ছিল অনেকটাই ওয়েস্টার্ন ঘরানার। জুতা আর প্যান্টের সাথে গরমের দিনে পরতেন হাওয়াই শার্ট, আর শীতে ওভারকোট। মাথায় সব সময় থাকত কাউবয় ক্যাপ। দুর্দান্ত এক বন্দুকবাজ ছিলেন, ভালোবাসতেন শিকার করতে। সেই আদি গ্রামে তিনিই প্রথম মোটরবাইক নিয়ে আসেন। টু স্ট্রোক ইঞ্জিনের ভটভট শব্দ তুলে গ্রামীণ মেঠোপথে ধুলো উড়িয়ে দূরদূরান্তে ছুটে যেতেন রোগী দেখতে; লোকজন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত যান্ত্রিক দ্বিচক্রযানের দিকে। চরসিন্দুর ইউনিয়নের লোকজন ভালোবেসে তাঁকে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করেন। আর কিছু দিনের মধ্যেই তিনি জনসেবার পুরস্কার হিসেবে সরকার থেকে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত হন। তখনই এলাকার কিছু প্রভাবশালী মানুষ তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বুনতে শুরু করে। একের পর এক তাকে হত্যাপ্রচেষ্টা চালানো হয়, এমনকি একবার হ্যান্ড গ্রেনেডও চার্জ করা হয় তাঁর ওপর। প্রতিবারই অলৌকিকভাবে রক্ষা পেয়ে যান তিনি। হত্যা করতে ব্যর্থ হয়ে তাঁকে ফাঁসিয়ে দেয়া হয় অ্যান্টি করাপশনের মিথ্যে মামলায়। সে মামলা থেকেও বেকসুর খালাস পান তিনি। আশির দশকে সর্বহারা পার্টির লোকজন তাঁকে হত্যার হুমকি দিয়ে চিঠি লেখে, দাবি করে মোটা অঙ্কের চাঁদা। তখন তিনি বলতেন, 'জীবনে আমি একটি হারাম পয়সাও রোজগার করিনি, তবে চাঁদা দেব কেন? আর যদি মরতে হয়, এই গ্রামেই মরব।' এভাবেই তাঁর জীবনের শেষ অংশটি নানা ঘাত-প্রতিঘাতে জটিল আকার ধারণ করেছিল। ১৯৮৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ডাক্তার পাঠান লোহারকান্দা গ্রামের একলাম্পশিয়ায় আক্রান্ত এক প্রসূতির পেট থেকে একটি বাচ্চা অপসারণ করেন। তারপর বাচ্চার বাবা কামাল মাস্টারের অনুমতিক্রমে মৃত বাচ্চাটি চেম্বারে নিয়ে আসেন। এরপর বিশেষ অপারেশনের মাধ্যমে বাচ্চার মাথার মগজ এবং পেটের নাড়িভুঁড়ি বের করে ক্ষতস্থান নিখুঁতভাবে সেলাই করে দেন। তারপর বাচ্চাটিকে ভালোমতো গোসল করিয়ে তাকে তরল ফরমালিনভর্তি একটি কাচের জারে রাখা হয়। এরপর জারটিকে তুলে রাখেন নিজের রোগী দেখার টেবিলের একপাশে। কয়েক মাস পর পর বাচ্চাটিকে কাচের জার থেকে বের করে গোসল করিয়ে আবার নতুন ফরমালিনে ডুবিয়ে রাখতেন। প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ তাঁর চেম্বারে ছুটে আসত বাচ্চাটিকে একনজর দেখার জন্য। ১৯৯৩ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ৬৮ বছর বয়সে ডাক্তার ফজলুল করিম পাঠানের রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। ৮ বছর পরের কথা, সময় ২০০২। প্রয়াত ডাক্তার পাঠানের চেম্বার আর ফার্মেসি তখন দেখাশোনা করেন তাঁর সর্বশেষ কম্পাউন্ডার আমজাদ কাজী। বাচ্চাটি তখনো কাচের জারে টেবিলের ওপর সাজানো। আহা, কী বিচিত্র বিষয়! বাচ্চাটি মেয়ে। সে যদি জীবিত থাকত, তাহলে আজ ১৯ বছরের লাস্যময়ী এক তরুণী পৃথিবীর আলো-বাতাসে ঘুরে বেড়াত। অথচ আজও সে বন্দী হয়ে আছে বোতলের অভ্যন্তরে। আচ্ছা এভাবে কোনো মানবশিশুকে বছরের পর বছর বোতলবন্দী করে রাখা কি ঠিক কাজ? তবে ডাক্তার পাঠানোর কথা আলাদা, তিনি ছিলেন একজন গবেষক, আত্মাবিহীন মানবদেহ তাঁর কাছে ছিল গবেষণার বস্তুমাত্র। আমার মধ্যে একটা নতুন চিন্তার উদয় হলো। এখন তো তিনি নেই। তাই বাচ্চাটাকে মনে হয় আর এভাবে রাখা উচিত হবে না। মন কেন জানি না কেবলই বলছিল, বাচ্চাটিকে কবর দেয়া প্রয়োজন। তখন আমার যাযাবর জীবন। নিয়মিত ঘুরে বেড়াই জঙ্গলে, পাহাড়ে, শহরে, গ্রামে। ছবি তুলি, পত্রিকায় লিখি। ছবি বিক্রি আর পত্রিকার লেখার টাকায় জীবন চলে। সে সময় সিলেটের শিকারি বন্ধু শামীম আহমেদের বনবাংলোয় কিছু নিশিদিন কাটিয়ে সোজা গ্রামে ফিরে আসি। তখন এক সন্ধ্যায় ফার্মেসির দায়িত্বে থাকা কম্পাউন্ডার আমজাদ কাজী এসে বললেন, 'আপনারে একটা কথা কমু কমু কইরাও কওয়া হইয়া উঠে না। কয়েক বছর ধইরা ওই বোতলে রাখা বাচ্চাটার মা কিছুদিন পরপর ফার্মেসিতে আইস্যা কান্নাকাটি করে। মহিলা নাকি স্বপ্ন দেখছে বাচ্চার রুহ ৫ আসমানের মধ্যে ঝুইল্যা আছে। আল্লাহর দরবার পর্যন্ত যাইতে না পারায় তা বারবার ফিরে আইতাছে দুনিয়ার বুকে। সে কাউরে শান্তিতে থাকতে দিব না। মহিলা শরীরের নানান জায়গায় ঘায়ের মত ক্ষত দেখা দিছে, বাচ্চার বাবার অসুখ লাইগ্যাই আছে, অন্য সন্তানেরা একটার পর একটা বিপদে পড়তাছে। মোদ্দা কথা হইল, মহিলা বাচ্চাটারে নিয়া যাইতে চাইতাছে। কিন্তু আমি তো তারে এ ব্যাপারে কিছু কইতে পারি না।' আমজাদ কাজীর কথা শুনে আমার সমস্ত পৃথিবী যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান কিংবা যুক্তিবিদ্যা সবকিছু কেমন যেন ধোঁয়াশায় পরিণত হলো, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলায় দুলে উঠল মন। বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে গিয়ে আবারও মনে হলো, বাচ্চাটি মুসলমানের সন্তান, মুসলিম রীতি অনুযায়ী তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করে ফেলা দরকার। তাই নিজের মোবাইল নম্বরটা আমজাদ কাজীকে দিয়ে বললাম, আপনি ওই মহিলার বাড়িতে যাবেন, ওখানে গিয়ে আমাকে ফোন করতে বলবেন। মহিলার বক্তব্য জানার পরদিন, সকালেই আমি ছুটে গেলাম স্থানীয় মসজিদের পেশ ইমাম মাওলানা আবুল বাশারের কাছে। সদ্যোজাত মৃত বাচ্চার অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলাম। তিনি খুব বিনয়ের সঙ্গে বললেন, 'বাচ্চা যদি জন্মের পর একটি নিশ্বাসও গ্রহণ করে অথবা একটি চিৎকার দেওয়ার পরও তার মৃত্যু ঘটে, তবে জানাজা ফরজ।' মৌলানা সাহেবের কথা শুনে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলাম—কী হবে এই বাচ্চার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রক্রিয়া? বাচ্চাটার জন্মমুহূর্তের খবর জানতেন ডাক্তার ও তাঁর সহকারী এবং বাচ্চার মা। সে সময় ডাক্তার পাঠানোর সহকারী ছিলেন খিলাডি গ্রামের রমিজ উদ্দিন ভূঁইয়া। খবর নিয়ে জানা গেল, তিনি গত হয়েছেন পাঁচ বছর আগে। সেদিন বিকেলে বেজে উঠল মোবাইল। অপরিচিত নম্বর। রিসিভ বাটন চেপে যন্ত্রটি কানের কাছে তুলে আনতেই ভেসে এল নারীকন্ঠের বিচলিত আওয়াজ, 'আমি ওই বোতলের বাচ্চার মা। অনেক দিন ধইরা আপনার লগে যোগাযোগ করার চেষ্টা করতাছি।' এটুকু শোনার পর বললাম, 'আপনি রাখুন আমি ফোন করছি।' আসলে আমি একটু সময় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাচ্ছিলাম। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের কথোপকথন পর্ব শুরু হলো: —'আচ্ছা যতটুকু জানি ডাক্তার পাঠান আপনাদের অনুমতি নিয়ে এই বাচ্চাটাকে নিজের চেম্বারে নিয়ে এসেছিলেন। পাঠান সাহেব জীবিত থাকা অবস্থায় আপনি মাঝেমধ্যে এসে বাচ্চাটাকে দেখেও যেতেন। হঠাৎ আপনাদের কী হলো?' —'হঠাৎ না, বাবা। ঘটনা শুরু হয়েছে পাঠান সাহেবের মৃত্যুর পরে। একটা রাইতও আমি আর আমার পরিবার শান্তিতে ঘুমাইতে পারি নাই।' —'আচ্ছা, একটা কথা বলুন তো, বাচ্চাটা মৃত অবস্থায় জন্মেছিল, নাকি জন্মের পর মারা গিয়েছিল।' —'এটা ডাক্তার সাহেব কইতে পারত, আমি তখন অজ্ঞান আছিলাম।' —'আপনি এখন কী চান? যদি বলেন, তবে আমি তার দাফনের ব্যবস্থা করব।' আমার এই কথায় মহিলা তীব্র স্বরে বলে উঠলেন, 'আমি কিছু চাই না, আমার বাচ্চা আমারে ফিরাইয়া দেন।' আমি তখন তাঁকে শুধু বললাম, 'কবে আসবেন বাচ্চা নিতে?' তিনি রুদ্ধশ্বাসে বলে উঠলেন, 'কাইল সকালেই আইতাছি আমি বাচ্চা নিতে।' পরদিন খুব ভোরে বাচ্চাভর্তি কাচের জারটি নিজের ঘরে এনে রাখলাম। সকাল আটটার দিকে কালো বোরকা পরিহিতা দুজন মহিলাকে আমার কাছে নিয়ে এলেন কম্পাউন্ডার আমজাদ কাজী। নেকাব খুলতেই দেখা গেল, একজন মধ্যবয়সী আর একজন তরুণী। দুজনেরই চোখে বিস্ময়। মাঝবয়সী মহিলাটি আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে হাতের কাপড় সরালেন, সেখানে ভেসে উঠল দগদগে ঘা। তিনি বললেন, 'আমার ঘাড় আর পিঠের অবস্থাও খারাপ। কোনো ওষুধে কাজ করে না। সব ওই আত্মার কাম। মনে হয় মনের মইধ্যেও ঘাও হইয়া গেছে। প্রতিদিন স্বপ্নে দেখি, বাচ্চা মাটি না দেওয়া পর্যন্ত কারও শান্তি নাই।' মহিলার এইসব কথাবার্তায় আমি যেন হারিয়ে গেলাম এক কুহেলিকার অন্তরালে। এসব কী শুনছি আমি! মহিলার সঙ্গে যে মেয়েটি এসেছে সে-ও তার এক কন্যা। মা-মেয়ে দুজনেই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেঝেতে রাখা কাচের জারের দিকে। যেখানে রাসায়নিক তরলে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে দশ মাস দশ দিনের ছোট্ট দেহটি। তার চোখ বন্ধ, যেন পরম চিন্তায় ধ্যানমগ্ন এক খুদে সন্ন্যাসিনী। আমি দেরি না করে কাজ শুরু করলাম। গ্লাভস পরা হাতে জারের ঢাকনা খুলে বাচ্চাটাকে ওপরে তুলে আনলাম। বাচ্চার উন্মুক্ত শরীর দেখার সঙ্গে সঙ্গে মহিলা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সেই অসাধারণ ভালোবাসার দৃশ্যে নিজেকে ঠিক রাখা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। এই না হলে মা, ১৯ বছর আগে মারা যাওয়া বাচ্চার জন্য তাঁর মমতা আজও কতটা সতেজ! সঙ্গে তরুণীটি পরম বিস্ময়ে তাকিয়ে ছিল ছোট্ট দেহটির দিকে। সে হয়তো ভাবছে, বড় বোনটি বেঁচে থাকলে সে-ও আজ লাস্যময়ী এক তরুণী হয়ে পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াত। পরক্ষণেই তরুণীর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল জলের ধারা। সেই অমোঘ ক্ষণে নিজেকে যেন প্রায় হারিয়ে ফেলেছিলাম। পরক্ষণেই সংবিৎ ফিরে এলে নিজের কাজে মন দিলাম, বাচ্চাটিকে পলিথিনের ব্যাগে মুড়ে, সেটাকে একটা টিস্যুর বাক্সে ভরে ফেললাম। তারপর বাক্সটি সুতলি দিয়ে বেঁধে সযত্নে তুলে দিলাম মহিলার হাতে। তিনি পরম মমতায় সেটিকে বুকে আকড়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শতবর্ষের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না আমার।
Published on: 2023-03-25 14:08:16.184629 +0100 CET