The Business Standard বাংলা
বৈদেশিক মুদ্রা আনতে নির্ধারিত রেটের বেশি দাম দিচ্ছে ব্যাংকগুলো

বৈদেশিক মুদ্রা আনতে নির্ধারিত রেটের বেশি দাম দিচ্ছে ব্যাংকগুলো

অস্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রার বাজার থেকে লাভবান হচ্ছেন রেমিট্যান্স প্রেরকরা, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে আমদানিকারক ও ভোক্তারা। ব্যাংকারদের তথ্যানুসারে, রেমিট্যান্স প্রেরকরা ১৪৪ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন প্রতি ডলারের জন্য। পাশাপাশি সরকারের কাছ থেকে ২.৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনাও পাচ্ছেন তারা। এই রেট গত বছরের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশন (বাফেদা) এবং অ্যাসোসিয়েশন অভ ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ-এর (এবিবি) নির্ধারণ করা ১০৭ টাকার চেয়ে অনেক বেশি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন শীর্ষ ব্যাংকার ও ট্রেজারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে। চড়া চাহিদা মেটানোর জন্য দেশে কার্যরত ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে অন্তত ২০টি ব্যাংক রেমিট্যান্সে ডলারের দাম বেশি দিচ্ছে। কিন্তু সেটি তারা তাদের ব্যালান্স শিটে দেখাচ্ছে না। যেসব ব্যাংক ডলারের রেট বেশি দিচ্ছে না, তারা রেমিট্যান্স পাচ্ছে কম। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের প্রধান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড কে বলেন, 'প্রতিটা ব্যাংকের মাসভিত্তিক ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স দেখলেই বিষয়টি আরও ভালোভাবে বোঝা যাবে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে যে ব্যাংক ২ মিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্সও পায়নি, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সেই ব্যাংকই ৪৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পেয়েছে। মূলত রেট বেশি দেওয়ার কারণেই কিছু কিছু ব্যাংকের রেমিট্যান্স আয় অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। 'গত এক বছরে এসব ব্যাংকে এমন কোনো পরিবর্তন আসেনি, যাতে রেমিট্যান্স ২০ গুণের বেশি বেড়ে যাবে। বেশি রেট দেওয়ার কারণে ডলারের বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।' বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশের সব ব্যাংক মিলে ফেব্রুয়ারি মাসে রেমিট্যান্স এনেছে ১.৫৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছর একই সময়ের তুলনায় ৪.৪৭ শতাংশ বেশি। তবে ব্যাংকভিত্তিক চিত্রটি কিছুটা ভিন্ন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যানুসারে, কিছু কিছু ব্যাংকের আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে, আবার দু-একটি এমনও ব্যাংক আছে যাদের প্রবৃদ্ধি ১,০০০ শতাংশেরও বেশি। অন্যদিকে এমন ব্যাংকও আছে যাদের রেমিট্যান্স আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অনেক কমে গেছে। তাদের আয় কমার কারণ ডলারের বেশি দাম দিতে রাজি না হওয়া। এর আগে গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর বাফেদা ও এবিবি এক সভায় রেমিট্যান্সের জন্য ডলারের দাম ১০৮ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তার আগে রেমিট্যান্সের ডলারের রেট ১১৪-১১৫ টাকায় উঠে গিয়েছিল, একেক ব্যাংক একেক রেট দিত। সেটি নিয়ন্ত্রণ করতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একটি রেট স্থির করা হয়। পরে দুই দফায় সেটিকে কমিয়ে ১০৭ টাকা করা হয়। এর ফলে রেমিট্যান্স আয় প্রতি মাসে প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলারের মতো কমে যায়। এভাবে কয়েক মাস চলার পর গত জানুয়ারি থেকে রেমিট্যান্সের ডলারের রেট বাড়াতে শুরু করে কিছু ব্যাংক। ১৮ জানুয়ারি বাফেদা ও এবিবির এক যৌথ সভায় ব্যাংকগুলোকে বেশি রেট দিয়ে রেমিট্যান্স না আনতে সতর্ক করা হয়। সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চিঠিও পাঠানো হয়। ফলশ্রুতিতে কয়েকটি ব্যাংক বেশি রেটে রেমিট্যান্স আনা বন্ধ করে, কিন্তু বাকিরা বেশি রেট দেওয়া অব্যাহত রাখে। চলতি মার্চ মাসে বেশি রেট দেওয়া ব্যাংকের সংখ্যা বেড়েছে। সেইসঙ্গে বাকি ব্যাংকগুলোও বেশি রেটে রেমিট্যান্স কীভাবে আনা যায়, সে চিন্তা করছে। এ সমস্যা সমাধানে গত শুক্রবার বাফেদার নির্বাহী কমিটির একটি সভা হয়। *ব্যাংকগুলো রেমিট্যান্সে বেশি রেট কীভাবে দিচ্ছে* ডলারের রেট বেশি দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো নানা কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন অন্ত সাতটি ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তারা। 'যেমন ধরুন, ১০৭ টাকা রেটের বেশি অ্যামাউন্ট অনেকসময় আলাদাভাবে এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোর কাছে পৌঁছে দেয় ব্যাংকগুলো,' নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি বেসরকারি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক টিবিএসকে বলেন। তিনি জানান, এই কৌশল অনুযায়ী প্রথমে গ্রাহককে নির্ধারিত রেটের চেয়ে বেশি রেটে ডলার কেনার জন্য রাজি করানো হয়। গ্রাহক রাজি হলে এক্সচেঞ্জ হাউজে চাহিদা অনুযায়ী ডলারের অর্ডার দেওয়া হয়। ১১২-১১৪ টাকা রেটে ডলার কেনা হলেও এক্সচেঞ্জ হাউজ ব্যাংককে ডলার দেওয়ার ক্ষেত্রে খাতা-কলমে ১০৭ টাকা রেটই রাখে। বাকি টাকা (১১২-১১৪ টাকা থেকে ১০৭ টাকা বাদ দিয়ে যে টাকা থাকে) গ্রাহক ওই এক্সচেঞ্জ হাউজকে নগদে অথবা ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ করে। বর্তমানে বেশি রেটে যারা রেমিট্যান্স কিনছে, একটা বড় অংশ এ পদ্ধতি অনুসরণ করছে বলে জানান ওই ব্যাংক কর্মকর্তা। অনেক ব্যাংক এই অতিরিক্ত খরচকে ব্যালান্স শিটে 'অন্যান্য খরচ' হিসেবে দেখাচ্ছে, কিন্তু আসলে তারা অতিরিক্ত দাম দিয়ে রেমিট্যান্স আনছে। ফলে ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রিপোর্টিং করার ক্ষেত্রে রেমিট্যান্সের ডলারে ১০৭ টাকা রেটই দেখাতে পারছে। বেশি দামে রেমিট্যান্স আনছে, এমন একটি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের একজন কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, এখনকার বাজারে ১০৭ টাকা করে রেমিট্যান্স আনা সম্ভব নয়। জোর করে একটা রেট চাপিয়ে দিলে বাজারের ভারসাম্য নষ্ট হয়। তিনি আরও বলেন, গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত চার মাসে কম রেট দেওয়ার কারণে মাসিক রেমিট্যান্স প্রবাহ ছিল প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার। অথচ এর আগের মাসগুলোতে প্রতি মাসে ২ বিলিয়ন ডলার করে রেমিট্যান্স এসেছিল। কিছুটা বাড়তি রেট দেওয়ার কারণে জানুয়ারিতে রেমিট্যান্স বেড়ে আবার প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার হয়। ওই ট্রেজারি কর্মকর্তা বলেন, 'এছাড়া আইএমএফের ৪.৭ বিলিয়ন ডলার ঋণের কিস্তি পাওয়ার শর্ত অনুযায়ী, আগামী জুনের মধ্যে আমাদের দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বাড়াতে হবে। সবদিক বিবেচনা করে রেমিট্যান্সের ডলারের রেট ১০৭ টাকায় আটকে রাখাটা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমাবে।' *এলসি নিষ্পত্তিতে যেভাবে ডলারের রেট ১১৫ টাকা নেওয়া হচ্ছে* আমদানি ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তিতে ডলারের রেট ১১৩-১১৫ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে বলে টিবিএসকে জানিয়েছেন বেশ কয়েকজন আমদানিকারক। যদিও নিয়ম অনুসারে, ডলারের রেট ১০৮ টাকার বেশি রাখার সুযোগ নেই। অন্যদিকে ব্যাংকগুলো বলছে, বেশি দামে ডলার কেনায় বিক্রি করার ক্ষেত্রেও তাদের বেশি দাম নিতে হচ্ছে। গ্রাহকদের কাছ থেকে বেশি রেট নিলেও সব ব্যাংক সেটি সরাসরি তাদের লগবুকে দেখাচ্ছে না। এটি লুকাতেও নানা কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে। অনেকসময় গ্রাহকদের বিপরীতে ভুয়া ঋণ তৈরি করেও এলসির ডলারের রেটের অতিরিক্ত টাকা সমন্বয় করা হচ্ছে উল্লেখ করে ওই ট্রেজারি কর্মকর্তা বলেন, এই পদ্ধতিতে এলসি নিষ্পত্তি করা গ্রাহকের বিপরীতে ভুয়া ঋণ তৈরি করে ৯ শতাংশ সুদহার ধরা হয়। এই ঋণের টাকা ব্যাংকের চলতি হিসাবেই জমা রাখা হয়। *যেভাবে কৌশলে ডলারের রেট কৌশলে নিচ্ছে রপ্তানিকারকরাও* সিটি গ্রুপের কর্পোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর বিশ্বজিৎ সাহা টিবিএসকে বলেন, 'আমরা ১১৩-১১৪ টাকাতেও ডলার পাচ্ছি না। প্রায় সব ব্যাংকই ১১৫-১১৬ টাকা রেটে দিচ্ছে। 'আমাদের তো পেমেন্ট করতে হবে, তাই বাধ্য হয়ে বেশি দামে ডলার কিনছি।' ভুটান থেকে আপেল, আঙুর, কমলাসহ নানা ফল আনার জন্য এলসি খুলতে চাচ্ছিলেন এক ব্যবসায়ী। সাইট এলসি হওয়ায় এলসি খোলার ১৫ দিনের মধ্যে এসব পণ্যের দাম পরিশোধ করতে হতো। তবে বাফেদা-নির্ধারিত রেটে ব্যাংকগুলোতে ডলার পাচ্ছিলেন না ওই ব্যবসায়ী। পরে 'অন্য একজন পোশাক রপ্তানিকারকের কাছে থেকে পেমেন্টের সমপরিমাণ ডলার আনা হবে' এমন নিশ্চয়তা পাওয়ায় ওই ব্যবসায়ীর এলসি খোলে একটি বেসরকারি ব্যাংক। পেমেন্টের এই পুরো প্রক্রিয়াটিই সম্পন্ন হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা ভিন্নভাবে মেনে। প্রক্রিয়াটির সঙ্গে জড়িত ওই ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, 'এ প্রক্রিয়ায় আমদানিকারক ফল ব্যবসায়ী নিজে থেকে এক রপ্তানিকারককে ডলারের রেট ১১৪ টাকা দেবেন বলে ম্যানেজ করেন। পরে রপ্তানিকারক তার প্রসিড নিয়ে আসা ব্যাংকের কাছে সেটি এনক্যাশ করেন এই শর্তে যে, ওই ডলার অন্য একটি ব্যাংকের কাছে বিক্রি করা হবে। বড় রপ্তানিকারক হওয়ায় ব্যাংক সেটি মেনেও নেয়। পরে ব্যাংক বাফেদা-নির্ধারিত ১০৪ টাকা রেটে ১ মিলিয়ন ডলার ভাঙিয়ে ১০৫ টাকা রেটে আমদানিকারকের ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে। আমদানিকারক ফল ব্যবসায়ীর কাছে ওই ব্যাংক ডলার বিক্রি করে ১০৬ টাকা রেটে। 'শর্তমতো ডলারপ্রতি ৮ টাকা হিসাবে ৮০ লাখ টাকা রপ্তানিকারককে আলাদাভাবে দিয়ে দেন ওই আমদানিকারক।' এই প্রক্রিয়ায় রপ্তানি প্রসিডের ডলারের রেট বাড়িয়ে নিচ্ছে বেশকিছু বড় রপ্তানিকারক। কিন্তু ছোট রপ্তানিকারকরা এ সুবিধা নিতে পারছে না। তারা বাফেদা-নির্ধারিত ১০৪ টাকা রেটেই ডলার এনক্যাশ করতে বাধ্য হচ্ছে। *ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কে?* বেশি দামে রেমিট্যান্স আনলে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কার, এ নিয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। এবিবি ও বাফেদার সরাসরি কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকের এমডিদের কাছে পাঠানো চিঠিতে সংগঠনটি বলেছে, সব অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোকে বাফেদা ও এবিবির যৌথ সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে। কোনো ব্যাংক উপরোক্ত সিদ্ধান্ত লঙ্ঘন করলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কঠোর পদক্ষেপ নেবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাফেদার একাধিক কর্মকর্তা টিবিএসকে বলেন, কোনো ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা বাফেদার নেই। এ বিষয়ে যেকোনো ব্যবস্থা একমাত্র বাংলাদেশ ব্যাংকই নিতে পারে। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলছে, ডলারের নির্ধারিত রেট না মানলে এবিবি ও বাফেদা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. মেজবাউল হক টিবিএসকে বলেন, মঙ্গলবার (২১ মার্চ) দিনশেষে ব্যাংকগুলোর কাছে ৩.৬ বিলিয়ন ডলারের মতো ছিল। 'ডলারের যথেষ্ট জোগান থাকলে ব্যাংক কেন বেশি রেট দিয়ে ডলার কিনবে? কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই রেট ঠিক করেনি, করেছে এবিবি ও বাফেদা। তাই এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নিলে তাদেরই নিতে হবে,' মেজবাউল হক বলেন।
Published on: 2023-03-26 19:07:04.220567 +0200 CEST