The Business Standard বাংলা
শুধু আলুই কেন! গরমের জন্য শীতকালীন অন্যান্য সবজি কেন সংরক্ষণ করা হয় না?

শুধু আলুই কেন! গরমের জন্য শীতকালীন অন্যান্য সবজি কেন সংরক্ষণ করা হয় না?

শীতে বাংলাদেশের কৃষক যে পরিমাণ সবজি উৎপাদন করে, গরমের সময় সবজির উৎপাদন তার চেয়ে আট গুণ কম হওয়ায় বাজারে সরবরাহও কম থাকে, বেড়ে যায় দাম। আলু কোল্ড স্টোরেজে রেখে বছর জুড়ে সরবরাহ হলেও শীতে উৎপাদিত অন্য সবজি গরমের সময় বাজারে পাওয়া যায় না। স্টোরেজ সিস্টেম ডেভেলপ করে এই সবজির একটা অংশ সংরক্ষণ করা গেলেও শীতের পরের কিছু সময় বাড়তি সরবরাহের ধারাবাহিকতা রাখা সম্ভব বলে সেক্টর সংশ্লিষ্টরা জানান। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) শীতকালীন অন্তত ২৯ জাতের শাকসবজির উৎপাদনের তথ্য প্রকাশ করে। শীতকালীন এই সবজিগুলোর মোট উৎপাদন এক কোটি ৩৬ লাখ টন, যা গরমে নেমে আসে মাত্র ১৫ লাখ টনে। যদিও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, গরমে সবজির উৎপাদন ৮৫ লাখ টন। অধিদপ্তরের হিসেবেও গ্রীষ্মকালে সবজির উৎপাদন শীতের চেয়ে ৫০ লাখ টন কম। এর ফলে শীতে একেবারেই সস্তায় সবজি কিনতে পারলেও গ্রীষ্মে উৎপাদিত সবজির দাম বেড়ে যায় তিনগুণ পর্যন্ত। সবজি বিক্রেতা ও ক্রেতাদের তথ্য বলছে, শীতের শেষভাগেও বেগুন ৩৫-৪০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। গরম পড়ার মাসখানেক ধরে এই বেগুন কিনতে হচ্ছে মানভেদে ৬০-৮০ টাকা দিয়ে। টমেটোর দাম শীতে ২০-২৫ টাকায় নামলেও গ্রীষ্মে আমদানি হয়ে আসা টমেটো কিনতে হয় ৮০-১০০ টাকায়। ইতোমধ্যেই টমেটোর দাম বাড়তে শুরু করেছে, এখন বাজারভেদে বিক্রি হচ্ছে ৩০-৩৫ টাকায়। অথচ শীতকালে বাড়তি উৎপাদনে দাম না পেয়ে কৃষকের বেগুন, টমেটো, ফুলকপি, বাধাকপি রাস্তায় ফেলে দেওয়ার ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটে। বিবিএসের তথ্য বলছে, শীতে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত সবজি হলো আলু। দেশে আলুর উৎপাদন ১ কোটি টনের বেশি। এই এক কোটি টন কিন্তু শীতেই খাওয়া হয় না। এটা কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করে বছরজুড়ে বিক্রি করা হয়। যে কারণে উৎপাদন শীতে হলেও সারাবছরই বাজারে আলুর দেখা পাওয়া যায়। কোল্ড স্টোরেজ ব্যবসায়ীরা বলছেন, এদেশে ১৯৫০ সালের দিকে অল্প পরিসরে কোল্ড স্টোরেজ সিস্টেম ডেভেলপ হলেও এটা ব্যাপকতা পায় নব্বইয়ের দশকে এসে। সাপ্লাই চেইনে কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থাপনা গড়ে ওঠায় সারা বছর আলুর সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে। আলুর মত করে অন্য শীতকালীন সবজির একটা অংশ সংরক্ষণ করা গেলেও শীত পরবর্তী তিন-চার মাসে বাড়তি সরবরাহ তৈরি হয়, যা খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সবজি সংরক্ষণ বেশি ব্যয়বহুল এবং মানুষের মধ্যে শীতের সবজি গরমে খাওয়ার প্রবণতা কম থাকায় এখনো এটাকে লাভজনক মনে করেন না কোল্ড স্টোরেজ ব্যবসায়ীরা। এ নিয়ে আদতে কোন গবেষণাও নেই, সরকারিভাবেও দৃশ্যমান কোন উদ্যোগ নেই। তবে বই পুস্তকে কিছু সবজি কিভাবে এক থেকে দেড় মাস সংরক্ষণ করা যায় সে বিষয়ে কিছু কৌশলগত তথ্য পাওয়া যায়। জানা যায়, শীত শেষ হলেই ভারত থেকে আমদানি শুরু হয় টমেটোর, যা ৮০-১০০ টাকায় বিক্রি হয়। কখনো কখনো এটা ১৫০ টাকাতেও ওঠে। কোল্ড স্টোরেজ ব্যবসায়ীরা বলছেন, টমেটোতে পানির পরিমাণ বেশি থাকায় এটা সংরক্ষণ করা হলে তার গুণগত মান ঠিক রাখা যায় না। যে কারণে কেউ সংরক্ষণ করে না। তবে ভারতে কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফলমূল, গাজর, টমেটো, পেঁয়াজ, আনারস, কলা, ঢেঁড়স, কুমড়া সহ বিভিন্ন সবজি স্টোর করা হয়ে থাকে। ভারতে স্টোরেজ সিস্টেম ডেভেলপ করার জন্য বিনিয়োগকারীদের বিভিন্নভাবে প্রণোদনা প্রদান করে সরকার। দেশটির গবেষণা বলছে, তাদের সবজি কাটা পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি বা পোস্ট হার্ভেস্ট লস ২০-৩০ শতাংশ, যা কমিয়ে আনার জন্যই প্রণোদনা দিচ্ছে কোল্ড স্টোরেজ তৈরিতে। এদিকে বিবিএস এবং এফএও এর বিভিন্ন গবেষণা বলছে, কৃষিপণ্যের পোস্ট হার্ভেস্ট লস ২০-৪০ শতাংশ। এই লোকসান কমাতে পারলে আমাদের পণ্যের পরিমাণ বাড়তো। লোকসান হ্রাসের সবচেয়ে বড় উপায় হলো কোল্ড চেইন তৈরি করা। কিন্তু সেটা আমাদের দেশ হয়নি। তবে বিভিন্ন দেশে নানা পদের সবজি প্যাকেট করে, প্রক্রিয়াজাত করে কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা হয় বলে জানান উদ্যোক্তারা। আমাদের দেশে কোল্ড স্টোরেজ হয়েছে, তবে সেটা শুধু আলুর জন্যই। বিবিএসের তথ্য বলছে, শীতকালের প্রধান সবজিগুলোর মধ্যে, শিম, ফুলকপি, বাধাকপি, টমেটো, গাজর, বেগুন, কাঁচা কলা, কচুর লতি, কচু, বরবটি, শালগম, মূলা, লাউ উল্লেখযোগ্য। বেগুন অল্প পরিসরে সারা বছরই উৎপাদন হয়, গ্রীষ্মকালে টমেটোর সামান্য উৎপাদন থাকলেও সারা বছর বিক্রি হয় আমদানি করা টমেটো। বাকিগুলো শীতেই শেষ হয়ে যায়। শীতকালে বেগুনের উৎপাদন ৪ লাখ টনের বেশি, যেখানে গরমের সময় উৎপাদন ২ লাখ টন। গরমের ১২টি সবজি উৎপাদনের তথ্য প্রকাশ করে বিবিএস। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- কাঁকরোল, বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, পটল, ঢেঁড়স, ঝিঙা, করলা, চালকুমড়া, শসা, চিচিঙ্গা উল্লেখযোগ্য। তখন উৎপাদন কম হওয়ার বিষয়ে কৃষিবিদরা বলেন, শীতের শেষেই মূলত সারাদেশে শুরু হয় বোরো মৌসুম, যেটা চালের সবচেয়ে বড় উৎপাদন মৌসুম। শুষ্ক মৌসুম হওয়ায় জলাশয় থেকে শুরু করে সমতলের সব স্থানেই ধানের আবাদ করা হয়। যেসব স্থানে নিতান্তই ধান আবাদ করা যায় না এবং যারা সবজির উৎপাদনে বেশি গুরুত্ব প্রদান করে তাদের কাছ থেকেই গরমের সময় সবজির সরবরাহটা আসে। এ কারণেই এ সময়ে সবজির উৎপাদন কমে যায়। সবজি সংরক্ষণে কোল্ড স্টোরেজ ব্যবস্থাপনা গড়ে না ওঠার বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি মোশারফ হোসেন বলেন, '৭-১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় আলুর স্টোরেজ ব্যবস্থাপনা করা হয়ে থাকে। কিন্তু সবজি রাখতে গেলে স্টোরেজ চেম্বারের তাপমাত্রা মাইনাসে নামিয়ে আনতে হবে। এতে ২০ শতাংশ বা তারও বেশি খরচ বাড়িয়ে দেবে। আবার এর ব্যবস্থাপনাটাও হতে হবে ভিন্ন।' তিনি বলেন, 'সবকিছু করে আমরা যদি রাখিও দেখা যাবে, শীতের সবজি গরমে লোকজন কিনতে চাচ্ছে না। কারণ গরমেও আমাদের অনেকগুলো সবজি আছে। ভোক্তাদের মধ্যে এক ধরনের ধারণা রয়েছে, শীতের সবজি গরমে খেতে ভালো লাগে না।' কৃষি মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, দেশে এখন ৪১৪টি কোল্ড স্টোরেজ রয়েছে। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশের বেশি ব্যবহার হয় আলু সংরক্ষণের জন্য। বাকিগুলোতে আমদানি করা মাল্টা, কিছু স্টোরেজে মাছ-মাংস, শুকনো মরিচ, হলুদ, আদা সংরক্ষণ করা হয়। বিশেষভাবে সবজি ও ফলমূল তৈরির জন্য ২০০৪ সালে রহমান স্পেশালাইজড স্টোরেজ তৈরি করেন ফজলুর রহমান। তিনি বিশেষভাবে ৩ হাজার মেট্রিক টন ধারণ ক্ষমতার এই স্টোরেজ করেছিলেন পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য। পেঁয়াজ রেখে ভালো দাম না পাওয়ায় তিনি সেটাকে এখন আলুর স্টোরেজ হিসেবে ব্যবহার করছেন। এই স্টোরেজটি গাজর, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ, ফলমূল সহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্যই তৈরি করা হয়েছিল। তিনি বলেন, 'বিশেষভাবে কোল্ড স্টোরেজ তৈরি করা হলে সবজির প্রকারভেদে ৩০-৪৫ দিন পর্যন্ত স্টোরেজ করা সম্ভব। কিন্তু যেহেতু পণ্য রাখার কস্টিং বেশি পড়বে এবং দ্রুত বাজারজাত করার বিষয় থাকবে সেহেতু এটা বাজারে বিক্রি করা যাবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা আছে। এ কারণেই হয়তো এখানে বিনিয়োগ নেই।' তবে এই উদ্যোক্তা বলেন, 'সরকার যদি বিশেষভাবে পরিকল্পনা করে তাজা ও প্রক্রিয়াজাত সবজি সংরক্ষণের জন্য এবং একটা গাইডলাইন করে উদ্যোক্তাদের সহযোগিতা করে তাহলে হয়তো এই ধরনের সাপ্লাই চেইন তৈরি করা সম্ভব হবে।' কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বাদল চন্দ্র বিশ্বাস টিবিএসকে বলেন, 'এটা ঠিক যে গরমে শীতের চেয়ে সবজির সরবরাহ বা উৎপাদন কম। যে কারণে একটা প্রভাব তো থাকে।' তিনি বলেন, 'আমাদের দুটো পরিকল্পনা রয়েছে। এর একটি সবজির রপ্তানি বাড়ানো এবং অন্যটি হলো একটা কোল্ড চেইন ডেভেলপ করে তাজা ও প্রক্রিয়াজাত সবজি সংরক্ষণ করা। আমাদের আলোচনা চলছে, দ্রুতই আমরা হয়তো ফরমাল মিটিং করে কী করা যায়, সে বিষয়ে একটা কর্মপরিকল্পনা ঠিক করবো।'
Published on: 2023-03-26 09:06:43.890521 +0200 CEST