The Business Standard বাংলা
রকেট উৎক্ষেপণের শব্দ কতটা জোরালো?

রকেট উৎক্ষেপণের শব্দ কতটা জোরালো?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশে রকেট উৎক্ষেপণের ভিডিওগুলোতে আমরা অনেক সময়ই দর্শকদেরও দেখতে পাই। তারা দূরবীক্ষণ যন্ত্র নিয়ে বা খালি চোখেই উৎক্ষেপণ দেখার জন্য অপেক্ষা করেন। তবে এ মুহূর্তটি উপভোগ করার জন্য তাদেরকে অনেক দূরেই অপেক্ষা করতে হয়। বিভিন্ন কারণে দর্শকদের অবস্থানের জায়গাটি এত দূরে নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো রকেট উৎক্ষেপণের শব্দ। ১৯৬০ ও '৭০-এর দশকে নাসা'র অ্যাপোলো প্রোগ্রামের আওতায় উৎক্ষেপণ করা স্যাটার্ন ৫ রকেটের শব্দ এতই উচ্চমাত্রার ছিল যে, এটির কারণে মানুষের মৃত্যুও হতে পারত। এক প্রতিবেদনে রকেট উৎক্ষেপণের সময় তৈরি শব্দ নিয়ে বিস্তারিত জানিয়েছে বিবিসি । স্টাটার্ন ৫-এ অ্যাপোলোর নভোচারীরা চাঁদের পথে যখন যাত্রা শুরু করেছিলেন, তখন তাদের থেকে দর্শকদের মধ্যে দূরত্ব ছিল ৫.১ কিলোমিটার। দূরত্ব এত থাকার পরও শব্দের মাত্রা বেশি বই কম ছিল না। তখন একটি সাধারণ মিথ তৈরি হয়েছিল। অনেক মানুষ বিশ্বাস করেছিলেন স্যাটার্ন ৫-এর ইঞ্জিনের শব্দতরঙ্গ এতই শক্তিশালী ছিল যে এটি লঞ্চপ্যাডের কংক্রিট গলিয়ে ফেলেছিল এবং ১.৬ কিলোমিটার দূরে থাকা ঘাসও পুড়িয়ে ফেলেছিল। তবে দুটোর কোনোটিই বাস্তবে ঘটেনি। তখনকার সময় নাসার পরীক্ষায় উৎক্ষেপণের শব্দ ২০৪ ডেসিবল বলে ধরা পড়েছিল। তুলনামূলকভাবে দেখতে গেলে, একটি জেট এয়ারলাইনার আকাশে ওড়ার সময় ১২০ থেকে ১৬০ ডেসিবল শব্দ উৎপন্ন করে এবং ৩০ সেকেন্ডের বেশি তা শোনাকে বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এমনকি ২.৪ কিলোমিটার দূর থেকেও স্যাটার্ন ৫-এর শব্দ ১২০ ডেসিবল মাত্রায় শোনা গিয়েছিল। স্যাটার্ন ৫-এর সময় থেকে রকেট উৎক্ষেপণ দেখছেন ও ছবি তুলছেন ফ্লোরিডার একটি ক্যাফে'র মালিক অ্যান্থনি রু। রকেট উৎক্ষেপণের মুহূর্তের বর্ণনা শোনা গেল তার কাছ থেকে। 'আপনি প্রথমে একটি মৃদু কম্পন অনুভব করবেন। এরপর বুকের ভেতর গুড়গুড়ে অনুভূতি। তারপরই কোনো আওয়াজ কানে আসবে। সাবসনিক বেজ কম্পাঙ্ক আপনার কানে চড়চড় অনুভূতি দেবে। কয়েক সেকেন্ড পর শব্দটা গর্জনে পরিণত হবে।' গতবছর যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিগহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানী স্যাটার্ন ৫-এর শব্দের মাত্রা পুনরায় হিসেব করে দেখেছেন। তাদের হিসাবে এ মাত্রা ২০৩ ডেসিবল পাওয়া যায়। অর্থাৎ এত বছর আগে করা নাসার পরিমাপের এটি দারুণভাবে মিলে গেছে। তবে সাদা চোখে মনে হবে ১৬০ ডেসিবল আর ২০০ ডেসিবলের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য নেই। '১৭০ ডেসিবল শব্দ ১০টি বিমানের ইঞ্জিনের সমতুল্য। ২০০ ডেসিবলের ক্ষেত্রে ইঞ্জিনের সংখ্যা হবে ১০,০০০,' ব্রিগহাম ইয়ং ইউনিভার্সিটির গবেষণাটির প্রধান লেখক ও পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক কেন্ট জি ব্যাখ্যা করেন। 'প্রতি ১০ ডেসিবল মানেই বিশাল পরিমাণে বৃদ্ধি।' তাহলে এখন পর্যন্ত উৎক্ষিপ্ত সবচেয়ে বেশি শব্দের রকেট কি স্যাটার্ন ৫ ছিল? থ্রাস্টের দিক থেকে চিন্তা করলে, খুব সম্ভবত না। স্যাটার্ন ৫ রকেট ৩৫ মেগানিউটন বল উৎপন্ন করেছিল। অন্যদিকে ১৯৬০-এর দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের এন১ রকেট ৪৫ মেগানিউটন বল তৈরি করেছিল। স্যাটার্ন ৫-এর মতো শক্তিশালী রকেট এত উচ্চশব্দ তৈরি করে যে, এ শব্দতরঙ্গ খোদ রকেটকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এটি প্রতিরোধ করতে অ্যাপোলো প্রোগ্রামের আগে থেকেই কাজ করছিলেন নাসার রকেট বিজ্ঞানীরা। এক্ষেত্রে একটি সমাধান হচ্ছে রকেট উৎক্ষেপণের সময় লঞ্চ প্যাডের ফ্লেম ট্রেঞ্চ পানি দিয়ে পূর্ণ করা। ফ্লেম ট্রেঞ্চ লঞ্চ প্যাডের নিচে থাকা শূন্যস্থান যা রকেট থেকে বের হওয়া আগুনকে প্রাথমিকভাবে অন্যদিকে সরিয়ে দেয় যাতে রকেট ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। এ পানি উৎক্ষেপণের সময় সৃষ্ট উচ্চশব্দ কিছুটা কমাতে সহায়তা করে। স্পেস শাটল উৎক্ষেপণের সময়ও পানিপূর্ণ ফ্লেম ট্রেঞ্চ ব্যবহার করা হয়েছিল। নাসা'র অতীতের বিভিন্ন উৎক্ষেপণের ঘটনায় সৃষ্ট জলীয়বাষ্পের মেঘ আদতে কোনো ধোঁয়া নয়, বরং তীব্র তাপে বাষ্পীভূত হওয়া ফ্লেম ট্রেঞ্চের পানি। আর্টেমিস প্রোগ্রামে ব্যবহার করা নাসা'র নতুন রকেটটি হলো স্পেস লঞ্চ সিস্টেম (এলএলএস)। স্যাটার্ন ৫-এর চেয়েও এলএলএস-এর থ্রাস্ট ১৩ শতাংশ বেশি ছিল। নকশা করার সময় এ রকেটের পাঁচটি ইঞ্জিনকে গ্রাউন্ড টেস্ট করানো হয়েছিল। এটির প্রধান প্রকৌশলী জন ব্লেভিসের ভাষ্যে, 'আমি মোটামুটি আধা মাইল দূরে, কানে ইয়ারপ্লাগ লাগানো। ৬০০ সেকেন্ড ধরে ইঞ্জিন থেকে অকল্পনীয় পরিমাণে বাষ্প বের হচ্ছে। মোট চারটা ইঞ্জিনের মধ্যে কেবল একটই এত ধোঁয়া বের হচ্ছে। এ থেকে আপনি ধারণা করতে পারেন এ রকেটগুলো কতটা শক্তিশালী।' ব্লেভিনস জানান, স্যাটার্ন ৫-এর চেয়ে এসএলএস একটু কম শব্দ তৈরি করে। তবে শব্দের মাত্রা ইঞ্জিনের থ্রাস্ট ছাড়াও আরও অনেক কিছুর ওপর নির্ভর করে। তবে উচ্চশব্দ উৎপন্ন করার রকেটের খেল এখানেই খতম নয়। স্পেসএক্স-এর মঙ্গল মিশনের জন্য তৈরি স্টারশিপ সুপার হেভি রকেটে চড়ে আকাশে উড়বে। স্পেসএক্স-এর মতে সুপার হেভি বুস্টারগুলো প্রায় ৭৬ মেগানিউটন থ্রাস্ট উৎপন্ন করবে। এ বল স্যাটার্ন ৫-এর চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি। তাই কেউ যদি এটির উৎক্ষেপণ দেখার পরিকল্পনা করেন, তাহলে ইয়ারপ্লাগ নিয়ে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
Published on: 2023-03-29 16:43:04.908126 +0200 CEST