The Business Standard বাংলা
নতুন আইনে পরিচালক, প্রধান নির্বাহীর অপকর্মের ক্ষতিপূরণ আদায়ে মামলা করতে পারবে ব্যাংক

নতুন আইনে পরিচালক, প্রধান নির্বাহীর অপকর্মের ক্ষতিপূরণ আদায়ে মামলা করতে পারবে ব্যাংক

চেয়ারম্যান, পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীর অনিয়মের কারণে ব্যাংক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ে মামলা করতে পারবে ব্যাংক। মঙ্গলবার (২৮ মার্চ) মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়া ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন ২০২৩ এর খসড়া পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে। খসড়ায় আরো বলা হয়েছে, কোন শিল্প গ্রুপ যাতে ব্যাংক কুক্ষিগত করতে না পারে, সেজন্য একটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের বিপরীতে একাধিক প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগে লাগাম টানার সুযোগ রাখা হয়েছে। ব্যাংকের পরিচালক বা প্রধান নির্বাহীর অনিয়মের কারণে তাদেরকে পদ থেকে অপসারণ করার সুযোগ থাকলেও, তাদের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংকের যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তা পূরণের কোন বিধান বিদ্যমান আইনে নেই। ফলে হলমার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন এমডির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা করলেও ব্যাংকের ক্ষতিপূরণের জন্য কোন মামলা হয়নি। মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া আইনের খসড়ায় নতুন ধারা যুক্ত করে বলা হয়েছে, ব্যাংকের পরিচালক বা নির্বাহী কর্মকর্তাদের অনিয়মের কারণে আর্থিক ক্ষতি পূরণের জন্য দায়ী পরিচালক ও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডার কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানি হলে তাদের ব্যক্তিস্বত্বা থাকে না। তাই কোম্পানি নিজে ব্যাংকের পরিচালক হতে পারে না। ফলে তাদের পক্ষে কোম্পানি আইনে প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগের বিধান রয়েছে। এই নিয়োগের বিষয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনে কোন বিধান না থাকায় এর অপব্যবহার হচ্ছে। কোনো কোনো ব্যাংকে একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে দুজন বা তার বেশি এবং একজন শেয়ারহোল্ডার ব্যক্তির পক্ষে দুজন ব্যক্তিকে প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগ করছে। এতে ব্যাংকগুলোর কর্তৃত্ব বড় বড় শিল্প গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে, যা বন্ধে চূড়ান্ত খসড়ায় নতুন ধারা সংযোজন করা হয়েছে। কোনো পরিবারের মালিকানাধীন কোনো প্রতিষ্ঠান একটি ব্যাংকের শেয়ারের মালিক হলে কোম্পানি আইন অনুযায়ী ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ আছে। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কতজন প্রতিনিধি পরিচালক নিয়োগ দেওয়া যাবে বা একটি শিল্প গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সর্বোচ্চ কতজন প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে ব্যাংকে নিয়োগ পাবে- সে বিষয়ে ব্যাংক কোম্পানি আইনে কিছু উল্লেখ নেই। মন্ত্রিসভায় অনুমোদন পাওয়া খসড়া আইনে এসব বিষয় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একটি একক পরিবারের সদস্যের বাইরে তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বা নিয়ন্ত্রণাধীন সর্বোচ্চ দু'টি প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির পক্ষে প্রতিনিধি পরিচালক থাকতে পারবে। তবে কোনো ব্যাংকের পর্ষদে কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির পক্ষে একজনের অধিক ব্যক্তি প্রতিনিধি পরিচালক নিযুক্ত হতে পারবে না। কোনো ব্যাংকে একক কোনো শিল্প গ্রুপের কর্তৃত্ব খর্ব করতে এমন বিধান প্রয়োজন বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যাংকের পর্ষদে প্রাকৃতিক ব্যক্তিস্বত্বা বিশিষ্ট ব্যক্তি শেয়ারহোল্ডারের পক্ষে অপর কোনো ব্যক্তি প্রতিনিধি পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হতে পারবে না। অর্থাৎ, কোনো ব্যক্তি ব্যাংকের শেয়ারের মালিক হলে তার প্রতিনিধি হিসেবে অন্য কোনো ব্যক্তিকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। এমন বিধান যুক্ত করার পেছনে যুক্তি তুলে ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক মন্ত্রিসভাকে বলেছে, আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চা ও নীতি এবং ব্যাসেল প্রিন্সিপাল অনুযায়ী পরস্পর প্রতিযোগী কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে স্বার্থের সংঘাত পরিহার, আর্থিকখাতের সম্পদ যেন কারও কাছে কুক্ষিগত না হয় তা প্রতিরোধ করা এবং ব্যাংকিংখাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে এমন ধারা সংযোজন প্রয়োজন। বিদ্যমান আইনে কোনো ব্যাংক পরিচালক একইসময়ে অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক থাকতে পারবেন না। তবে এই আইন কার্যকর হবার পর সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে বীমা কোম্পানির পরিচালক হওয়ার সুযোগ রয়েছে। যদিও ২০১০ সালে প্রণীত বীমা আইন অনুযায়ী কোনো বীমা কোম্পানির পরিচালক ব্যাংক কোম্পানির পরিচালক হতে পারেন না। মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনী খসড়ায় কোনো ব্যাংক পরিচালকের একইসঙ্গে বীমা কোম্পানির পরিচালক পদে থাকার সুযোগ বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া, কোনো পরিচালক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানির পরিচালক হতে পারবেন কি-না, সে বিষয়ে বিদ্যমান আইনে কিছু বলা নেই। কিন্তু একজন পরিচালক আরও কোন কোন কোম্পানিতে পরিচালক থাকতে পারবেন না, মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত খসড়া আইনে তা স্পষ্ট করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি ব্যাংকের পরিচালক হলে একই সময়ে তিনি অন্য কোন ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা কোম্পানি বা এসব কোম্পানির কোন সাবসিডিয়ারি কোম্পানির পরিচালক থাকতে পারবেন না। এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংকের বিবেচনায় এমন কোন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান যা ওই ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা বীমা কোম্পানির উপর নিয়ন্ত্রণ বা যৌথ নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তার করে- এমন কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক থাকবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে বিকল্প পরিচালক নিয়োগের সুযোগ থাকলেও তার মেয়াদকাল এবং বিকল্প পরিচালকদের যোগ্যতা সম্পর্কে কিছু বলা নেই। নতুন আইনে এসব বিষয় সুনির্দিষ্ট করা হচ্ছে। মন্ত্রিসভাকে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, বিকল্প পরিচালকের মেয়াদের বিষয়ে আইনে কিছু না থাকায় অনেকসময় মূল পরিচালক কখনই দেশে আসেন না, বা তার মেয়াদের বেশিরভাগ সময় দেশের বাইরে থাকেন। তাছাড়া, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পর্ষদ সভা করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কয়েকটি ব্যাংক অনুমতিও নিয়েছে। এসব বন্ধ করতে খসড়া আইনে বলা হয়েছে, কোন পরিচালক কমপক্ষে নিরবচ্ছিন্নভাবে তিন মাস বিদেশে অবস্থান করলে তার অনুপস্থিতির কারণে পর্ষদ চাইলে মূল পরিচালকের বিপরীতে বছরে সর্বোচ্চ একবার একজন বিকল্প পরিচালক নিযুক্ত করতে পারবে। পরিচালক নিয়োগের যেসব শর্ত রয়েছে, সেগুলো বিকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, অনেক দেশে ব্যাংক অন্য হোল্ডিং কোম্পানির সাবসিডিয়ারি হিসেবে থাকে। ম্যানেজমেন্ট বোর্ড ও সুপারভাইজারি বোর্ড নামে ব্যাংকে দুই ধরনের বোর্ড থাকে। এসব বোর্ডে পরিচালকরা সাধারণত ইউনিক হয় এবং নির্ধারিত বেতনের বিনিময়ে কাজ করেন। কিন্তু বাংলাদেশের লিগ্যাল স্ট্রাকচার এরকম নয়। বাংলাদেশে ব্যাংক পরিচালকরা তাদের ধারণকৃত শেয়ারের বিপরীতে মুনাফা নেন এবং পর্ষদ সভায় অংশগ্রহণের জন্য সম্মানী নেন। এমন প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের জারি করা 'করপোরেট গভর্নেন্স কোড' এর নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকের পর্ষদ ও উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের যোগ্যতা, উপযুক্ততা, বেতন, সম্মানী, ইত্যাদি বিষয়ে নীতিমালা প্রণয়নের জন্য পর্ষদ সদস্যদের সমন্বয়ে পর্ষদের সহায়ক কমিটি হিসেবে এনআরসি কমিটি গঠন ও তাদের দায়িত্ব পালনে জটিলতা তৈরি পারে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পর্ষদ সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটিগুলো কর্তৃক তাদের অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য কর্মপরিধি নির্ধারণ করে দেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যাতে সার্কুলার জারি করতে পারে, সেজন্যই খসড়া আইনে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, "কোনো ব্যাংক-কোম্পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার স্বার্থে উহার পর্ষদ এবং পর্ষদ কমিটি সমূহের কর্মপরিধি বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সময় সময় নির্দেশনা জারি করতে পারবে।" ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী ব্যাংকের পরিচালকরা সভায় অংশগ্রহণের জন্য সম্মানী ছাড়া আর কোন ভাতা নিতে পারেন না। অন্যদিকে, ২০১৩ সালের বিআরপিডির এক সার্কুলার অনুযায়ী কোনো পর্ষদ সদস্য প্রধান নির্বাহীর দুই স্তর পরের কর্মকর্তাদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় সংশ্লিষ্ট হতে পারবে না। নতুন আইনে ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোর উপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা পাবে। এতে নতুন ধারা যোগ করে বলা হয়েছে, যে উদ্দেশ্যেই ব্যাংক কোন সাবসিডিয়ারি কোম্পানি গঠন করুক না কেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত হার বা পরিমাণের বেশি সাবসিডিয়ারি কোম্পানির মূলধন হিসেবে বিনিয়োগ করতে পারবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তি হলো- সাবসিডিয়ারি কোম্পানিগুলোতে প্যারেন্ট কোম্পানি ব্যাংকের ১০০% বা ৫০% এর বেশি শেয়ার বা ফান্ড থাকে। এক্ষেত্রে ব্যাংকের সাবসিডিয়ারিগুলোর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো নির্দেশনা না থাকায় সেখানে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ঘটছে। নতুন আইনের আওতায় সাবসিডিয়ারি কোম্পানির পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার যোগ্যতা ও উপযুক্ততার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলার জারি করবে।
Published on: 2023-03-30 10:40:06.890934 +0200 CEST