The Business Standard বাংলা
কৃষির জন্য এক বড় উদ্যোগ...

কৃষির জন্য এক বড় উদ্যোগ...

কৃষিখাতের আধুনিকায়ন ও উন্নতির লক্ষ্যে একটি বৃহৎ পরিসরের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যা ফসল উৎপাদন বাড়িয়ে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, বাড়াবে কর্মসংস্থান। বিভিন্ন সেবা ও ঋণ সহায়তার জন্য এক কোটি ৮০ লাখ কৃষককে প্রকল্পের আওতায় স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে। ধান ও ধান-ভিন্ন অন্যান্য ফসলের আবাদ সম্প্রসারণে প্রকল্পের আওতায় যথাযথ প্রযুক্তিগত ও দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। খাদ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপনের মাধ্যমে খাদ্যের মান নিশ্চিত করা হবে। আগামী অর্থবছর থেকেই শুরু হবে কৃষি খাতের সুবৃহৎ এ প্রকল্প। কৃষি মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, ৭,২১৪.৪৬ কোটি টাকার পঞ্চবার্ষিক এ প্রকল্প সম্পন্ন হলে দেশের কৃষিখাতে যান্ত্রিকায়ন, বৈচিত্র্যকরণ ও সমন্বিত মূল্যচক্র যোগ হওয়ার মাধ্যমে 'বৈপ্লবিক' পরিবর্তন আসবে। যা পরিবেশগতভাবে টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে বড় অবদান রাখবে। 'প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফর্মেশন ফর নিউট্রিশন এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (সংক্ষেপে- পার্টনার)' শীর্ষক এই প্রকল্পে অর্থায়ন করবে বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ)। আর সরকারি অর্থায়ন থাকবে ১,৪৫৪.৬৫ কোটি টাকা। দুই উন্নয়ন সহযোগী- বিশ্বব্যাংক ও ইফাদ যথাক্রমে ৫০০ ও ৪৩ মিলিয়ন ডলার দেবে। তহবিল ছাড়ের শর্ত থাকবে ১০টি ফলভিত্তিক লক্ষ্য অর্জন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ওয়াহিদা আক্তার দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিচ্ছে। 'এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হলে, দেশের কৃষিখাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে'। আগে এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হলেও, বিভিন্ন কারণে তা আর সম্ভব হয়নি। তবে নতুন এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে দেরি হলেও তাতে কৃষি উৎপাদনের ক্ষেত্রে ব্যাপক সুফল আনবে। প্রকল্পের বাস্তবায়ন আগামী অর্থবছর থেকেই শুরু হবে'- বলছিলেন ওয়াহিদা। তিনি আরো বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় দেশব্যাপী কৃষকদের একটি ডেটাবেজ তৈরি করা হবে। 'তাদের মধ্যে স্মার্ট কার্ড বিতরণ করা হবে, ফলে প্রকৃত কৃষকরাই সরকারের দেওয়া বিভিন্ন সুযোগসুবিধা নিতে পারবেন'। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনা শেষে অনুমোদন দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের মূল্যায়ন কমিটি। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সামনে প্রকল্পের প্রেজেন্টেশন দেবে কমিটি। সরকার সারাদেশের এক কোটি ৮০ লাখ কৃষককে 'কৃষাণ স্মার্ট কার্ড' দেবে; এর মাধ্যমে তারা কৃষি সম্প্রসারণ সহায়তা, কৃষি উপকরণে ভর্তুকি ও ঋণ সহায়তার মতো সেবা নিতে পারবেন। এছাড়া সরকার গুড এগ্রিকালচারাল প্র্যাকটিসেস (গ্যাপ) সার্টিফিকেশনের মাধ্যমে ফল ও সবজির আওতাধীন এলাকা তিন লাখ হেক্টর এবং উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত দুই লাখ হেক্টরে উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এক লাখ হেক্টর নতুন জমিতে উন্নত এবং দক্ষ সেচ প্রযুক্তির প্রচলন এ প্রকল্পের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি, তরুণদের মধ্যে কৃষি উদ্যোগকে জনপ্রিয় করতে ২০ হাজার নারী-পুরুষকে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন বিভাগ আগামী পাঁচ বছর এসব লক্ষ্য অর্জন এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্পৃক্ত থাকবে। পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রধান (অতিরিক্ত সচিব) মো. ছায়েদুজ্জামান বলেন, কৃষিক্ষেত্রে এটা একটা বৈপ্লবিক প্রকল্প। বাস্তবায়ন হলে এটি জিডিপিতে কৃষির অবদান বাড়াবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। তিনি জানান, ছাড়-সম্পর্কিত সূচক বা ডিএলআই এর মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থায়ন করা হবে। এর আওতায় প্রতিবছরে প্রকল্পের অর্জনের সাথে সঙ্গতি রেখে তহবিল ছাড় করার আর্থিক মোডালিটি থাকবে, যা নির্ধারিত বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার সাথে সম্পর্কিত হবে। অগ্রগতিগুলো নিশ্চিত করবে তৃতীয় কোনো পক্ষ। এভাবে প্রকল্পের সাফল্য নিরুপণের ১০টি ডিএলআই থাকবে। *পাঁচ বছরে ১০ লক্ষ্য* ডিএলআই-গুলোর অধীনে ১০টি লক্ষ্য অর্জনের অভিষ্ট রয়েছে প্রকল্পে। যেমন ডিএলআই-১ এর আওতায় ফল ও সবজি উৎপাদনে উত্তম কৃষি চর্চা (গ্যাপ) মান অর্জনের লক্ষ্য থাকবে, যাতে করে সার, কীটনাশক ও পানির অতিরিক্ত ব্যবহার বা অপচয় রোধ করা যায়। এসব কারণে উৎপাদিত খাদ্য অনিরাপদ হয়ে ওঠে এবং কৃষিকাজে গ্রিন হাউজ গ্যাস নিঃসরণ বাড়ে, ফলে রপ্তানি সম্ভাবনাও হ্রাস পায়। বাংলাদেশ উত্তম কৃষি চর্চা নীতিমালা- ২০২০ এর অনুসরণ করে এটি বাস্তবায়িত করা হবে। গ্যাপ অনুসারে চাষবাসে কৃষক ও কৃষি কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এর আওতায়। প্রকল্পটির সমাপ্তি নাগাদ এভাবে ৩ লাখ হেক্টর ফল ও সবজি চাষের জমিকে গ্যাপ সার্টিফিকেশনের আওতায় আনা হবে। এদিকে গত এক দশকে দেশে ধানের উৎপাদনশীলতাও গতি হারিয়েছে। বর্তমানের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফলনের ঘাটতি পূরণে উচ্চ ফলনশীল ধানের জাত কৃষকরা গ্রহণে উৎসাহ দেওয়া হবে ডিএলআই-২ এর আওতায়। এর আরো লক্ষ্য উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানো। এটি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-র সাথে সম্পৃক্ত হয়ে উন্নত জাতের বীজ উৎপাদন প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে এবং কৃষক পর্যায়ে কমিউনিটি সিড ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করবে। কোন কৃষক কোন ধরনের উন্নত জাতের ধানের বীজ ব্যবহার করছে তার ওপর ভিত্তি করে প্রযুক্তিগত প্যাকেজ সহায়তাকে উৎসাহ দেবে এই প্রকল্প। প্রকল্পের সমাপ্তিকাল নাগাদ ২ লাখ হেক্টর জমিতে উন্নত জাতের প্রচলন চালুর লক্ষ্য রয়েছে। ডিএলআই-৩ এর অধীনে ধান ছাড়া অন্যান্য দানাদার শস্য, ডাল, তেলবীজ ও উদ্যান কৃষির মাধ্যমে ফসল বৈচিত্র্যকরণের লক্ষ্য থাকবে। রাষ্ট্রায়ত বিএডিসি উচ্চমূল্যের শাকসবজি, ডাল, তৈল শস্য, আলু, গম, ভুট্টার এবং অপ্রধান দানাদার শস্যের বীজ উৎপাদন করবে। বীজ কৃষক পর্যায়ে পৌঁছানোর জন্য পরিবহন সম্পর্কিত সুবিধা দেওয়া হবে। প্রকল্পের সমাপ্তিকাল নাগাদ দুই লাখ হেক্টর অ-ধানী জমিকে এর আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। ডিএলআই-৪ বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে বিএডিসি'র। এতে গুরুত্ব পাবে, কৃষকদের মাটিতে পোতা পাইপ, হোস পাইপ, স্প্রিংকলার ও ড্রিপ ইরিগেশনের মতো কার্যকর ও সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি রপ্তকরণ। এর আওতায় ১ লাখ হেক্টর আবাদি জমিকে আনার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। পার্টনার প্রকল্পের ডিএলআই-৫ 'কৃষাণ স্মার্ট কার্ড' বিতরণের মাধ্যমে বাংলাদেশে ডিজিটাল কৃষি পরিষেবা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ করতে চায়। যাতে 'লিফ ডিভাইস' নামক একটি স্মার্ট কার্ড ব্যবস্থার অধীনে বীজ, সার, উদ্ভিদ সুরক্ষা উপাদান এবং সেচের মতো গুণগত উৎপাদন উপকরণ সময়মতো সরবরাহ করা যায়। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, ২০২২ সালেও পরীক্ষামূলকভাবে কৃষকদের মাঝে স্মার্ট কার্ড বিতরণের একটি প্রকল্প নেয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। তবে ওই প্রকল্পের মূল কাজ এখনও শুরু হয়নি। চলমান এই প্রকল্প প্রস্তাবিত পার্টনার প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হবে। ডিএলআই-৬ এর আওতায় ১০টি মানসম্মত পরীক্ষাগারে ২০ ধরনের পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। এতে বাংলাদেশের উদ্যান কৃষি ফসলের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে যেসব শঙ্কা রয়েছে তা নিরসনের লক্ষ্য থাকবে। বর্তমানে দেশে কৃষি খাতের জন্য দরকারি পরীক্ষাগার, দক্ষ বিজ্ঞানী ও ল্যাব সহকারীর অভাব আছে। বাংলাদেশ বর্তমানে লেবু, চিচিঙ্গা, করলা, কাঁচামরিচ, সুপারি, কলা ও লাউ ইত্যাদি সবজি ও ফল কিছুদেশে রপ্তানি করে। কিন্তু, বিভিন্ন সময় রপ্তানি করা পণ্যে ব্যাকটেরিয়া বা ক্ষতিকর কেমিক্যালের উপস্থিতি ধরা পড়ায় রপ্তানি স্থগিত করা হয়েছে। এই অবস্থায় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পরীক্ষাগারে ফলন পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকলে তা ফল ও সবজি রপ্তানি বৃদ্ধিতে অবদান রাখবে। বাণিজ্যিক কৃষি, কৃষি ব্যবসা, কৃষি উদ্ভাবনমূলক কোম্পানি ও কৃষি সেবামূলক উদ্যোগ প্রতিষ্ঠার জন্য ২০ হাজার নারী-পুরুষকে কৃষি উদ্যোক্তামূলক প্রশিক্ষণ দেবে এ প্রকল্প। প্রকল্পটি কৃষি গবেষণা কার্যক্রম এবং অবকাঠামোকে সমর্থন করবে এবং সেইসাথে নির্বাচিত পণ্যগুলির জন্য মূল্য শৃঙ্খল প্রচারমূলক সংস্থাগুলিকে কার্যকর করবে। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম টিবিএসকে বলেন, 'প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত হলে তা কৃষি ব্যবস্থায় ব্যাপক রুপান্তর আনবে এবং বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক করবে। তখন প্রধান শস্য ধান ছাড়াও অন্যান্য ফসলের গুরুত্ব আরো বাড়বে'। বর্তমানে দেশের ৭৩ শতাংশ আবাদি জমিতে ধান চাষ হচ্ছে, এই প্রকল্পে ধানের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া আছে। তাই একদিকে ধান উৎপাদন যেমন বাড়বে, তেমনি কিছু এলাকায় ধানের সম্পূরক হিসেবে অন্যান্য উচ্চ ফলনশীল শস্য চাষ করা হবে' বলছিলেন তিনি। জাহাঙ্গীর আলমের মতে, যেহেতু এই প্রকল্পের লক্ষ্যে কৃষি বাজার ও মূল্য চক্র ব্যবস্থাও রয়েছে, তাই কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি হবে। এতে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
Published on: 2023-03-04 19:31:27.940137 +0100 CET