The Business Standard বাংলা
ঘরের অবস্থানের কৌশলী ডিজাইন যেভাবে সুরক্ষা দিচ্ছে বাংলাদেশের চরবাসীদেরকে

ঘরের অবস্থানের কৌশলী ডিজাইন যেভাবে সুরক্ষা দিচ্ছে বাংলাদেশের চরবাসীদেরকে

শুষ্ক মৌসুমের শেষদিকে উত্তরবঙ্গের জেলা গাইবান্ধায় এক বিশাল কর্মযজ্ঞ চোখে পড়ে। মাঠের পর মাঠজুড়ে কৃষকদেরকে উৎপাদিত শীতকালীন সবজি তুলতে দেখা যায়। রোপণের জন্য ধানের বীজও প্রস্তুত করা হয় তখন। দুয়েক মাস পর বৃষ্টির মৌসুম আসলেই মাঠগুলো ছেয়ে যাবে সবুজ রঙের ধানে। মাঠগুলো পেরোলেই দেখা যাবে যমুনা নদী, প্রতাপশালী ব্রহ্মপুত্র নদ যে নামে পরিচিত বাংলাদেশ ভূখণ্ডে। হাজার হাজার বছর ধরে নদীটি যে পলিমাটি বয়ে এনেছে, তার ওপরেই গড়ে উঠেছে গাইবান্ধার উর্বর সমৃদ্ধ কৃষিজমি। তাছাড়া খরার সময়ে যমুনার পানি কৃষকের কপালের চিন্তার বলিরেখা কিছুটা কমাতেও সাহায্য করে। তারপরেও নদীর পাড়ে গেলে চোখে পড়বে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক অবস্থার। প্রায় এক কিলোমিটার চওড়া নদীর ওই অংশের তীরে গেলে চোখে পড়বে একদল গ্রামবাসীকে। তাদেরকে দেখলেই বোঝা যায় বাকি কৃষকদের তুলনায় তাদের অবস্থা বেশ খারাপ। তাদের জমি সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা পাড়ের পাশে থাকা নদীর অংশের দিকে আঙুল তুললেন। ২০২১ সালের বন্যার আগপর্যন্ত তাদের কুঁড়েঘর, জমিসহ সবকিছু ওখানেই ছিল। প্রতিবছর বন্যায় প্রচুর সংখ্যক কৃষকের জমি হারিয়ে যায় নদীর গর্ভে। এমনকি শুষ্ক মৌসুমেও নদীপাড়ের ভঙ্গুর মাটি আলাদা হয়ে পড়ে যায় নদীর গভীরে। বাংলাদেশে নদীই জীবন, নদীই মরণ। পানিই তৈরি করে, আবার পানিই গড়ে তোলে সবকিছু। দেশের তিন প্রধান নদী যমুনা, পদ্মা আর মেঘনার মাধ্যমে প্রবাহিত হওয়া পলিমাটি জমে তৈরি হয়েছে পৃথিবীর এই বৃহত্তম ব-দ্বীপ। এখন গ্রীষ্মের শুরুর দিকে গলতে থাকা তিব্বতের হিমবাহ থেকে ভেসে আসা পানি চাপ সৃষ্টি করছে যমুনার নদীপ্রবাহের ওপর। এদিকে দূর বঙ্গোপসাগরে ঘন হয়ে উঠছে দক্ষিণ এশীয় মৌসুমী বাতাস। গ্রীষ্মকাল এগিয়ে আসতেই দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চল এর পার্শ্ববর্তী অন্যান্য সাগরের তুলনায় গরম হয়ে ওঠে। গরম, শুষ্ক বাতাস ওপরে উঠতে থাকে, ভেসে গিয়ে জমা হতে থাকে বঙ্গোপসাগরের ওপর। এই গরম বাতাস এরপর ঠান্ডা হতে হতে রূপ নেয় বৃষ্টিতে, বর্ষাকালে ভেসে যায় বাংলাদেশের মাঠ-ঘাট, যে প্রক্রিয়াকে আরো প্রকট রূপ ধারণে সাহায্য করে উত্তরে থাকা হিমালয়। জুন থেকে অক্টোবর মাসে নদীগুলো ফুলেফেঁপে ওঠে, দেশের অনেক জায়গাই চলে যায় পানির নিচে। সময়ে সময়ে নদীর স্রোতের গতি দশ নটও ছাড়িয়ে যায় (১৮.৫ কিলোমিটার/ঘণ্টা)। নদীর পলিমাটি আর বালি দিয়ে গড়ে ওঠা চরগুলো গড়ে ওঠে, ভাঙে এবং পুনর্গঠিত হয় এই পুরো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। জলবায়ু পরিবর্তন এই আবহাওয়াকে আরো অপ্রত্যাশিত করে তুলেছে, সাথে বর্ষার নির্মম রূপকেও করে তুলেছে আরো শক্তিশালী। সারা বাংলাদেশজুড়ে থাকা চরগুলোতে প্রায় ৭০ লক্ষ মানুষ বসবাস করেন। পানি আর নরম ভূমির মাঝখানে বাস করা এই লোকগুলো অনেকটা যাযাবরের মতোই। এর আগে সরকার এবং আন্তর্জাতিক দাতব্য সংস্থাগুলো চরের পাশে কংক্রিটের ব্লক ফেলে চর ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিয়েছিল। চরের মধ্যে বাঁশের পাটাতনের ওপর তৈরি বাড়ি একটি বিকল্প হলেও এর একটি বড় অসুবিধা রয়েছে। পরিবারের ছোট ছোট বাচ্চাদের পানির মধ্যে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। এদিকে বন্যার তোড়ে যেন বাড়ি ভেঙে না পড়ে, সেজন্য গভীরভাবে পাইলিং করা কংক্রিটের ভবন নির্মাণ প্রয়োজন। কিন্তু নদীর মাঝখানে থাকা চরে ভবন নির্মাণের কাঁচামাল কিংবা লোকবল, কোনোটিই পাওয়া সম্ভব নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে চরের কেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরে জমা শক্ত পলিমাটির ওপরেই থাকার ঘর-বাড়ি নির্মাণ করা উচিত। বেশ কিছু সংস্থা নদীর গতিপ্রবাহের সমান্তরালে বাড়ি নির্মাণের পরামর্শ দেয়। কিন্তু এর সমস্যা হলো নদীর গতিপ্রবাহ প্রায়ই পরিবর্তিত হয়। এর ফলে পানির ধাক্কায় চরের পাশের অংশ ভেঙে পড়ে, ঢুকে পড়ে পানি। বিশেষ করে আয়ত বা বর্গাকার ব্লক ব্লক আকারে ঘরের অবস্থান খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। আয়তাকারের কারণে কোণগুলোতে পানির প্রচণ্ড চাপ পড়ে, যার ফলে সে অংশগুলো পানির চাপের সাথে পেরে ওঠে না। ফলে সহজেই চরের বাড়িগুলো নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। এই সমস্যা সমাধানের জন্যই ফ্রেন্ডশিপ নামের একটি অলাভজনক সংস্থা গড়ে তোলেন কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা রুনা খান, সাথে ছিলেন স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরী। দেশের প্রান্তিক অংশের চরগুলোকে বিমান থেকে পর্যবেক্ষণের সময় হঠাৎ করেই এই সমস্যা সমাধানের আইডিয়া মাথায় আসে তাদের। বিমান থেকে পর্যবেক্ষণের সময় তিনি আবিষ্কার করেন, ওপর থেকে চরগুলো অনেকটা ধূমকেতুর মতো দেখতে, সামনে মোটা মাথা, পেছন চিকন হতে থাকা লেজ। এখান থেকেই তিনি বের করেন, চরে বাড়ি নির্মাণের জন্য সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হবে 'চোখের পানির মতো আকারের দ্বীপ', যার সামনে বৃত্তাকার মূল অংশ থাকবে। যদি দ্বীপের আকার এরকম হয়, তবে পানির ধাক্কা সরাসরি দ্বীপে লাগবে না, বড় চাপ না দিয়েই পানি পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে চলে যাবে। কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর চরের মূল অংশের ডিজাইন অনেকটা নৌকার আকারের মতো, যার দৈর্ঘ্য ১১৩ মিটার  এবং প্রস্থ ৭৩ মিটার। চরবাসীরা এই নৌকা আকারের বাইরের অংশে ঘর-বাড়ি বানাবেন। যেহেতু বন্যার পানি খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত নয়, তাই ঘরগুলোর ভেতরের সীমানায় তৈরি পুকুরে জমা বৃষ্টির পানি ব্যবহার করা হবে। শুষ্ক মৌসুমে পুকুরের পানি কমে গেলে পুকুরের উঁচু শুকিয়ে যাওয়া অংশে লাউসহ অন্যান্য সবজির চাষ করতে পারবে তারা। ল্যাট্রিনগুলো তৈরি করা হবে ঘর-বাড়ি থেকে দূরে, যাতে খাবার পানি দূষিত না হয়ে পড়ে। চরের সমস্যা দূর করার জন্য এক অতি-সাধারণ কিন্তু অতি-চমৎকার এক ডিজাইন এটি। বাংলাদেশের চরগুলোতে এখন এই ডিজাইনকে কেন্দ্র করে বিশটিরও বেশি গ্রাম নির্মাণ করা হয়েছে, যেগুলোর প্রতিটি নির্মাণে খরচ হয়েছে ৫০ লক্ষ টাকা। প্রথম দুটো চরবসতি নদীতে হারিয়ে গেলেও পরেরগুলো খুব ভালোভাবে টিকে রয়েছে। এই বসতিগুলোতে সবার আগে বাস করার সুযোগ পান সবচেয়ে দরিদ্র নিঃস্ব পরিবারগুলো। প্রথম বন্যার পানিতে চরটি টিকে গেলে বাকি পরিবারগুলো তাদের গৃহপালিত পশু-পাখি নিয়ে যোগ দেন চরটিতে। শুরু করেন বাড়ি নির্মাণ। গাইবান্ধার এরকমই এক চরে বাঁশের বেড়া আর ঢেউতোলা টিন দিয়ে বাড়ি বানিয়েছেন সাদাফ। পরিবারের সদস্য হিসেবে তার সাথে রয়েছেন তার বৃদ্ধ মা এবং চার বছর বয়সী মেয়ে, সাথে একটি গরু আর চারটি ছাগল। গত কয়েক বছরে বন্যা আর নদী ভাঙনের শিকার হয়ে বহুবার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পাড়ি দিয়ে অবশেষে কোথাও থিতু হওয়ার জায়গা পেয়েছেন তিনি। সাদাফ জানান, এর আগে এরকম থাকার নিশ্চয়তা অন্য কোথাও পাননি তিনি। অদ্ভুত শোনালেও প্রায় সময়ই থাকার জায়গার নিরাপত্তা নির্ধারিত হয় মোবিলিটির মাধ্যমে। চরে সবজি উৎপাদন তেমন লাভজনক কিছু হবে না, যদি না এগুলোকে বাজারে বিক্রি না করা যায়। ফ্রেন্ডশিপের রুনা খান জানান, দুই দশক আগে যখন তিনি তার প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন, তার প্রতিষ্ঠানের প্রথম ধাপ ছিল চরের গ্রামগুলোর জন্য নৌকার ব্যবস্থা করা। যদি সেই ব্যবস্থা না থাকে, তবে চরে আসা অন্য ব্যবসায়ীদের বলা কম দামেই সবজি বিক্রি করতে হয় তাদেরকে। একটি ছোট নৌকাই দরিদ্র চরবাসীদের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। এছাড়াও আরো বেশ কিছু নৌযানের দেখা পাওয়া যাবে চর এলাকায়। নদীর প্রতিকূলে তিন ঘণ্টা এগিয়ে নদীর ওপারে গেলেই চোখে পড়বে ফ্রেন্ডশিপের দুটো হাসপাতাল জাহাজের একটি। স্টিলের বার্জকে রূপান্তর করে এই হাসপাতাল জাহাজ বানানো হয়েছে। চরের অধিবাসীরা যখন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বাইরে থাকেন, তখন এই জাহাজগুলোই তাদের কাছে চলে যায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য। নদীর তীরে পূর্বনির্ধারিত জায়গায় বছরজুড়ে সপ্তাহের পর সপ্তাহ জাহাজগুলো অবস্থান করে। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য অপেক্ষমান রোগীদের জন্য টিনের অস্থায়ী ঘর তৈরি করা হয়। প্রতিবছর জাহাজগুলোতে কাজ করা ৭২ জন ডাক্তার, নার্স এবং ফার্মাসিস্ট ১ লক্ষ ৫ হাজার রোগীকে স্বাস্থ্যসেবা দেন, যার মধ্যে রয়েছে চর্মরোগ থেকে শুরু করে রান্নার পোড়াসহ অনেককিছু, এমনকি ভ্যাকসিনও দিয়ে থাকেন তারা। ফ্রেন্ডশিপের দেখাদেখি অন্যান্য অলাভজনক সংস্থাগুলোও এই আইডিয়াকে আরেকটু রূপান্তর করে ভাসমান বিদ্যালয় স্থাপন করেছেন। বন্যার সময় যখন চরের বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারে না, তখন বাঁশ আর কাঠ দিয়ে বানানো নৌকাকেই রূপান্তর করা হয় ক্লাসরুমে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চরবাসীরা সংগ্রাম করছেন তাদের বাসস্থান নিয়ে, যেগুলো থাকার জায়গা দেয়, আবার সবকিছু কেড়েও নেয়। এই সমস্যার জন্য সৃজনশীল, আধুনিক ও কার্যকর সমাধানই পারে তাদের পরবর্তী প্রজন্মগুলোর জন্য একটি স্বাভাবিক জীবন প্রদান করতে। *সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট*
Published on: 2023-04-13 12:04:19.450482 +0200 CEST