The Business Standard বাংলা
কেন কেউ কেউ ‘মিরর রাইটিং’-এ লেখেন?

কেন কেউ কেউ ‘মিরর রাইটিং’-এ লেখেন?

অনেকেই মনে করেন সব বাঁ-হাতি ব্যক্তিরাই মিরর রাইটিংয়ে লিখতে পারেন। অনেক বাঁ-হাতিই এই মিরর রাইটিংয়ের কথা শুনে ছোটবেলা থেকেই চেষ্টা করেন পৃষ্ঠার ডানদিক থেকে শুরু করে বাম দিকে লেখার। আবার অনেকে এটা লেখেন বিশেষ অনুভূতি পাওয়ার জন্য, যেহেতু লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরা এভাবে লিখতেন। তবে বাঁ-হাতি মাত্রই যে মিরর রাইটিংয়ে সহজাত দক্ষতা রয়েছে এমন নয়। এই দক্ষতার সাথে আমাদের শরীর ও মনের জটিল সম্পর্ক রয়েছে। লেখার সময় আমাদের মস্তিষ্কে কী কী পরিবর্তন ঘটে তা বোঝা গেলে আমরা এ বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারবো, এমনকি লেখার সময়ের অভিজ্ঞতাও আরও উপভোগ্য করে তুলতে পারে এই জ্ঞান। মিরর রাইটিংয়ের সবচেয়ে সাধারণ রূপটি দেখা যায় শৈশবে। যেকোন শিশুর প্রথম লেখা শেখার খাতাগুলো ঘাঁটলে উলটো অক্ষর দেখার সম্ভাবনা অনেক বেশি, এমনকি কখনো কখনো তার পুরো নামও উলটো দেখা যেতে পারে। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক্সপেরিমেন্টাল নিউরোসাইকোলজির অধ্যাপক রবার্ট ম্যাকিনটশ জানান, "শৈশবে আপনি যে মিরর-রাইটিংয়ে লেখেন তা শিশুর মানসিক বিকাশের সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অংশ। প্রায় সব শিশুই তাদের বেড়ে ওঠার সময় এই কাজ করে থাকে। ডান-হাতি শিশুদের তুলনায় বাঁ-হাতি শিশুদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায় এমন নয়, সব শিশুর মধ্যেই এটি একটি সাধারণ ঘটনা।" এই উল্টো লেখার পেছনে একটা বিবর্তনীয় কারণ আছে। আমাদের মস্তিস্ক 'মিরর জেনারেলাইজ'-এ বিবর্তিত হয়েছে। এর অর্থ, আমরা যখন কোনো বস্তুর দিকে তাকাই, তখন আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার মিরর ইমেজকেও চিনতে শিখি। এটি আমাদেরকে বাস্তব পৃথিবীতে চলতে সাহায্য করে, কারণ যদি আমরা এই বস্তুটিকে ভিন্ন কোণ থেকে দেখি, আমরা বুঝতে পারি যে এটি একই বস্তু, কিন্তু অন্য দিকে মুখ করে রয়েছে। "আমাদের মস্তিষ্ক যথেষ্ট দক্ষ হওয়ার কারণে এটি স্বাভাবিকভাবেই মিরর-জেনারেলাইজ করে ফেলতে পারে। আপনি যদি এই বৈশিষ্ট্যকে একটি বিবর্তনীয় প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করতে চান, তাহলে কল্পনা করুন যে আপনার মা একটি সিংহকে নির্দেশ করে আপনাকে জানাচ্ছে: 'এটি থেকে দূরে থাকো, এটা বিপজ্জনক প্রাণী'। তাই আপনি এই বিপজ্জনক প্রাণীকে অন্য দিক থেকে দেখলেও যেন চিনতে পারেন, সেজন্য আপনার মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার মস্তিষ্কে সিংহের একটি মিরর ইমেজ তৈরি করে ফেলে।" এই দক্ষতা যদিও দরকারি, তারপরও আমরা যখন পড়তে এবং লিখতে শিখি, তখন এটি সমস্যা তৈরি করে। একটি সিংহের উল্টো ছবি হয়তো আমাদের জন্য সমস্যা তৈরি করবে না, কিন্তু 'd' এবং 'b' এর মতো অক্ষরগুলো কোন দিকে মুখ করে আছে, তার উপর নির্ভর করে এগুলোর পরিচয়। পড়তে এবং লিখতে শেখার সময় আমাদের মস্তিষ্ক ধীরে ধীরে বুঝতে পারে যে, মিরর জেনারেলাইজ করা কেবল প্রাকৃতিক বস্তুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, শব্দ এবং অক্ষরের ক্ষেত্রে নয়। আমাদের মস্তিষ্কে ভিজ্যুয়াল ওয়ার্ড ফর্ম এরিয়া বলে একটি জায়গা আছে, যেটি আমরা পড়া এবং লেখার সময় ব্যবহার করি। এটি কাজ করার সময় আমাদের মিরর জেনারেলাইজ প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়, বলে জানান ম্যাকিনটশ। এই কারণেই আমরা বুঝতে পারি কেন প্রাপ্তবয়স্ক হলে আমরা সাধারণত মিরর-রাইটিং পড়তে না পারলেও প্রাকৃতিক বস্তু বা প্রাণীর মিরর ইমেজগুলো চিনতে পারি। যতক্ষণ না শিশুরা এই ক্ষমতার পরিবর্তন না ঘটায়, ততক্ষণ তারা মিরর রাইটিংয়ে লেখা অক্ষর পড়তে ও বুঝতে পারে। তবে তারা এলোমেলোভাবে এটি করে না। এর পরিবর্তে, তারা এমন অক্ষরগুলোকে বিপরীতভাবে চিনতে পারে, যেটি লেখার মূল দিকের বিপরীতে থাকে না। একে আরও সহজে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। যেমন: আমরা ইংরেজি লেখার জন্য রোমান বর্ণমালা ব্যবহার করি, যার বেশিরভাগই অক্ষরই ডানদিকে মুখ করে থাকে। অর্থাৎ, এর মূল অংশ পতাকার মতো বাম দিকে থাকা এবং শেষ হয় ডানদিকে। E, B, C এবং K এর ভালো উদাহরণ। এই অভিযোজন সম্ভবত আমাদের বাম থেকে ডানদিকে লেখার সময় আমাদের হাত এবং চোখের নড়াচড়ার স্বাভাবিক মুভমেন্টের কারণেই এভাবে বিবর্তিত হয়েছে। তবে এর কিছু ব্যতিক্রমও রয়েছে। যেমন: J বা 3-এর মতো অক্ষরগুলো বিপরীত দিকে প্রবাহিত হয়। অন্যান্য হরফের ক্ষেত্রেও এই নিয়ম কার্যকর। যেমন: প্রাচীন ইতালির একটি পরিচিত বর্ণমালা অস্কান লেখা হয় ডান থেকে বাম দিকে। E, B এবং K-এর মতো একই ধরনের বর্ণ তাদের বর্ণমালাতেও দেখা যায়, তবে উল্টোদিকে। অনেকটা লেখার দিকের সাথে সামঞ্জস্য করার জন্য। ফ্রান্সের লোরেন বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই মনোবিজ্ঞানী জাঁ-পল ফিশার এবং অ্যান-মারি কোচের গবেষণা অনুযায়ী, শিশুরা লেখার দিকে মুখ করে থাকা অক্ষরের এই নিয়মটি স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে। তাই তারা প্রথমে সে শব্দগুলো সঠিকভাবে লিখতে থাকে। এরপর তারা J এবং 3-এর মতো অক্ষরগুলো উল্টোভাবে লেখা শুরু করে। অবচেতনভাবেই তারা লেখার দিকের বিষয়টি প্রয়োগ শুরু করে। ম্যাকিনটশ এবং তার দল তাদের আরবি ভাষার ওপর করা তাদের অপ্রকাশিত গবেষণায় একই ধরনের ফলাফল খুঁজে পেয়েছেন। এক্ষেত্রে শিশুরা ডানদিক থেকে বাম দিকে লেখার সময়, যে অক্ষরটি বাম থেকে ডানে লেখা হয়, সেটি উল্টোভাবে তিনগুণ বেশি লেখে। বাচ্চাদের মধ্যে ভুল করে মিরর রাইটিংয়ে লেখা মানসিক বিকাশের একটি পর্যায়। কিন্তু যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও ইচ্ছাকৃতভাবে মিরর-রাইটিংয়ে লেখেন, তাদের বিষয়টি কী? 'মিরর রাইটিং' দক্ষতাকে আসলে যতটুকু বিশেষ ভাবা হয়, তত বিশেষ কিছু নয়। ম্যাকিনটশের মতে, ডানহাতি এবং ডান হাতে লিখতে বাধ্য করা বাঁ-হাতিদের ক্ষেত্রে লেখার সময় আমাদের হাতের মুভমেন্টের ফলাফল হতে পারে এটা। যখন আমরা ইংরেজিতে লিখি, তখন আমাদের ডান হাত শরীরের বাইরের দিকে যেতে শুরু করে এবং আমাদের শরীর ডানদিক ঘুরে যেতে থাকে। এদিকে এই ডানহাতিরাই যখন বাম হাতে লেখা শুরু করে, তখন আমাদের এই স্বাভাবিক প্রবণতার কারণে আমরা বাইরের দিকে লেখা শুরু করি, যে কারণে দিকে লেখা বিপরীত দিকে অর্থাৎ, ডান দিক থেকে বামে বা মিরর রাইটিংয়ের মতো হতে শুরু করে। ম্যাকিনটশের মতে, "আমাদের বাম এবং ডান হাত একে অপরের মিরর-ইমেজ, তাই তারা নড়াচড়াও করে মিরর-ইমেজের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে। তাই একজন ডান-হাতির জন্য বাম হাত দিয়ে লেখার সবচেয়ে স্বাভাবিক উপায় হল মিরর-রাইটিংয়ে লেখা।" এ কারণেই বাঁহাতি শিশুরা সাধারণত মিরর রাইটিংয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, কারণ এর ফলে শরীরের মুভমেন্ট বাইরের দিকে যেতে শুরু করে, কবজি সোজা করে লেখা যায়, যেটা স্বাভাবিক লেখার ক্ষেত্রে উলটো হয়। বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলোতে বাঁ-হাতিদেরকে ভিন্ন উপায়ে লেখা শেখানো হয়। এর ফলে খাতা কোণাকুণি করে কবজি সোজা করে লেখা যায়। যদি সর্বত্রই এই উপায় শেখানো হয়, তবে বাঁ-হাতিদের অনেক পরিশ্রম এবং কষ্ট বেঁচে যাবে। *সূত্র: বিবিসি ফিউচার*
Published on: 2023-04-14 15:40:36.452978 +0200 CEST