The Business Standard বাংলা
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কমিয়েছে স্মার্ট প্রযুক্তি, এ অর্থবছরে সাশ্রয় হবে ১০ হাজার কোটি টাকা

বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কমিয়েছে স্মার্ট প্রযুক্তি, এ অর্থবছরে সাশ্রয় হবে ১০ হাজার কোটি টাকা

ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের কল্যাণে বহুল আলোচিত বন্ড সুবিধা অপব্যবহারের প্রবণতা নিম্নমুখী হয়েছে। ফলে রপ্তানি খাতের কাঁচামাল আমদানির শুল্কছাড়ের ক্ষেত্রে ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কাঁচামাল আমদানি এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে তার প্রকৃত ব্যবহারকে সতর্ক নজরদারির সুযোগ করে দিয়েছে ডিজিটালাইজেশন। ফলে রাজস্ব কর্মকর্তারা আমদানি, রপ্তানি এবং কী পরিমাণ কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছে– সেসব তথ্য ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংস্থার কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারছেন বলে জানান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে স্থানীয় বাজার-নির্ভর শিল্পগুলো। তাদের অভিযোগ, কিছু রপ্তানিমুখী শিল্প নিজস্ব চাহিদা অনুসারে কাঁচামাল আমদানির পর সেগুলো স্থানীয় বাজারে বিক্রি করছে। এতে স্থানীয় বাজার-নির্ভর ব্যবসাগুলো যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি করফাঁকিও দেওয়া হচ্ছে। কর্মকর্তারা বলেছেন, অতীতের বছরগুলোতে বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত কাঁচামাল ও তা দিয়ে তৈরি করা পণ্য রপ্তানির মধ্যে ব্যবধান থাকত প্রায় ২৬ শতাংশ। কাস্টমস বিভাগের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে আমদানি ও রপ্তানির এই ফারাক ১৭ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, আলোচ্য সময়ে ব্যবধান কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ, যা বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কমার ইঙ্গিত বহন করছে। রাজস্ব বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বন্ড সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানিতে সরকার শুল্ককর ছাড় দিয়েছিল ১ লাখ ১১ হাজার কোটি টাকার সামান্য বেশি। আর বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কমে আসায় চলতি অর্থবছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে আশা করছে কাস্টমস বিভাগ। তারা আশাবাদী এই আগামী বছরগুলোতেও এ প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। এনবিআরের সূত্রগুলো জানায়, এতে রাজস্ব আহরণ বাড়বে। *এনবিআরের পদক্ষেপ* রাজস্ব বোর্ডের সদস্য হোসেন আহমেদ (কাস্টমস, রপ্তানি, বন্ড ও আইটি) দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিচ্ছিন্নভাবে ফিজিক্যালি পণ্য চালান খুঁজে বেড়ানোর পরিবর্তে – তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মিনিমাম ইনট্রুসিভ পদ্ধতিতে উৎপাদকদের তদারকি করা হচ্ছে। ফলে অনিয়মের সুযোগ কমে গেছে'। এসব নজরদারির প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, 'এসাইকোডা ওয়ার্ল্ড (ASYCUDA world) সফটওয়্যার ব্যবহারের মাধ্যমে সন্দেহভাজন প্রস্তুতকারকদের কাঁচামালের সঠিক ব্যবহারের বিষয়টি সরাসরি মনিটর করা সম্ভব হয়েছে'। ইন্টারনেট প্রোটোকল (আইপি) ক্যামেরার মাধ্যমে কাস্টমস কর্মকর্তারা আমদানিকৃত কাপড়ের কাটিং প্রক্রিয়া মনিটর করেন। বন্ড কমিশনারের ওয়েবসাইটে সন্দেহভাজন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিস্তারিত প্রোফাইল আপলোড করা হচ্ছে, যা সহজেই অডিটের জন্য ব্যবহার করা যায়, যোগ করেন তিনি। ২০২২ সালের শুরু থেকে ধাপে ধাপে এসব কার্যক্রম শুরু করেছে এনবিআর। এনবিআর কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি অনলাইনে রপ্তানি সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। তাছাড়া, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারকদের সমিতি (বিজিএমইএ)-র ওয়েবসাইট থেকে ইউটিলিটি ঘোষণার (ইউডি) তথ্য ব্যবহার করে অডিট করার ব্যবস্থা নিয়েছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেপজা) ওয়েবসাইট থেকে সহজে তথ্য বিশ্লেষণ করে আমদানিকৃত কাঁচামালের মূল্যায়ন দ্রুত করা হচ্ছে। কাস্টমস কর্মকর্তারা এসাইকোডা (ASYCUDA) সিস্টেমের মাধ্যমে বেপজা কর্তৃক প্রদত্ত আমদানি পারমিট মনিটর করতে পারেন। তৈরি পোশাক খাত ছাড়াও – প্যাকেজিং ও পলি পণ্য উৎপাদনকারী গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ শিল্পের বিরুদ্ধে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্ট এক্সেসরিজ অ্যান্ড প্যাকেজিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএপিএমইএ) সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন মতি মনে করেন, এ খাতে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কমেছে। তিনি টিবিএসকে বলেন, 'এনবিআরের সাম্প্রতিক উদ্যোগগুলো কার্যকরী হচ্ছে। ফলে ভুয়া আমদানি-রপ্তানিকারকরা নিরুৎসাহিত হচ্ছে।' তবে তিনি মনে করেন, এখনো কিছু প্রতিষ্ঠান অনিয়ম করছে। বিশেষত রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) কারখানাগুলোতে এ অনিয়ম বেশি। মতি উল্লেখ করেন যে, 'আমাদের সংগঠনের সদস্যভুক্ত প্রতিষ্ঠানকে মেশিন ক্যাপাসিটির ৩০ শতাংশ আমদানি প্রাপ্যতা অনুমোদন (ইউটিলিটি পারমিট) দেওয়া হলেও ইপিজেড- এ অবস্থিত ইন্ডাস্ট্রির ক্ষেত্রে এ নিয়ম প্রযোজ্য নয়'। 'ইপিজেডের কারখানাগুলো ইমপোর্ট পারমিট (আইপি) এর অধীনে বেপজা থেকে অনুমোদন পায়। সেখানে অনিয়মের সুযোগ বেশি থেকে যায়। এসব কারখানায় অনিয়ম বন্ধ করা গেলে- আমদানি-রপ্তানির এই ব্যবধান ৪-৫ শতাংশে নেমে আসবে'- যোগ করেন তিনি। বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী দেশের তৈরি পোশাক খাত। এ খাতের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) এর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম টিবিএসকে বলেন, 'কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ'র তৎপরতার কারণে বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কমেছে'। তবে কিছু 'দুর্বৃত্ত' গার্মেন্টস ব্যবসার সাইনবোর্ড ব্যবহার করে অনিয়ম করছে। তারা সব পক্ষকে হাত করেই একাজ করছে এবং তারা এখনো তৎপর রয়েছে বলে মনে করেন তিনি। *চেষ্টায় ফল দিচ্ছে* এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, গত জুলাইয়ের পর থেকে আমদানিকৃত কাঁচামাল ও রপ্তানির পরিমাণে যে ব্যবধান ছিলো, তা কমতির দিকে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বন্ড সুবিধার আওতায় ৫৪ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন কাঁচামাল ও এক্সেসরিজ দেশে এসেছে, আর তা দিয়ে পণ্য তৈরি করে রপ্তানি হয়েছে ৪৫ লাখ ১৬ হাজার মেট্রিক টনের কিছু বেশি। তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ মাসে বাংলাদেশের রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ১১ শতাংশের উপরে আর পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১৬ শতাংশ। কিন্তু, এসময়ে পোশাকের কাঁচামালের বাইরে এক্সেসরিজ ও কেমিক্যাল পণ্য আমদানি না বেড়ে উল্টো কমেছে। *বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের প্রভাব* প্রস্তুতকারকরা যখন বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে – কাঁচামাল আমদানির পর তা দিয়ে তৈরি পণ্য রপ্তানি করেন না- তখন সরকার এসব ক্ষেত্রে আদায় করা যেত এমন শুল্ক ও কর থেকে বঞ্চিত হয়। এছাড়া, আরো অভিযোগ আছে যে, শুল্কছাড়ের সুবিধা নিয়ে আমদানিকৃত পণ্য বা কাঁচামাল অবৈধভাবে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। এতে স্থানীয় বাজার-নির্ভর উৎপাদকদের প্রতিযোগী সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এবিষয়ে সংশ্লিষ্ট এনবিআর কর্মকর্তারা বলেন, বন্ড সুবিধার অপব্যবহার কমানো গেলে তা সরকারের রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। বন্ড সুবিধার উদ্দেশ্য হলো- কাঁচামাল আমদানি সহজ করে রপ্তানিকে উৎসাহিত করা। যখন সুবিধাটির অপব্যবহার হয়, তখন এই লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হয়। তাই এর অপব্যবহার কমানো গেলে, তা রপ্তানি বাড়তে পারে – কারণ তখন তৈরিকৃত পণ্য রপ্তানির সম্ভাবনাই বেশি থাকবে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার আইন অমান্যকারী প্রস্তুতকারকদের অন্যায্য সুবিধা দেয়। তাই এটা কমানো গেলে সব উৎপাদকের জন্য 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড' তৈরি হবে। *বন্ড সুবিধা যারা পায়* দেশের রপ্তানিকারকদের বড় অংশ বন্ড সুবিধা পেয়ে থাকে। শতভাগ রপ্তানিমুখী কোম্পানিগুলো পণ্যের কাঁচামাল ও এক্সেসরিজ শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করার সুযোগ পায়। তবে এই সুবিধাপ্রাপ্তির শর্ত হলো– ওই কাঁচামাল কাস্টমস অনুমোদিত নির্দিষ্ট গুদামে রেখে, তা দিয়ে পণ্য তৈরির পর রপ্তানি করতে হবে। এই ব্যবস্থা 'বন্ডেড ওয়্যারহাউজ সুবিধা' নামে পরিচিত। বন্ড সুবিধার আওতায় আমদানিকৃত কাঁচামাল কিংবা কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্য স্থানীয় বাজারে বিক্রি করা যাবে না। বিক্রি করতে হলে প্রযোজ্য কর পরিশোধ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ দেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের স্থানীয়ভাবে বিক্রির ক্ষেত্রে করহার ৫০ থেকে ৮৯ শতাংশ। *অপব্যবহারের আর্থিক মূল্য* বন্ডেড সুবিধার অপব্যবহার থেকে কত টাকার ক্ষতি হয় তা নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো গবেষণা নেই। তবে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমান প্রায় ছয় বছর আগে তার মেয়াদে এই অপব্যবহারের আর্থিক মূল্য বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন।
Published on: 2023-04-19 20:06:42.602141 +0200 CEST