The Business Standard বাংলা
কলাগাছের তন্তু থেকে শাড়ি, দেশের তাঁত শিল্পে নতুন দিগন্তের উন্মোচন

কলাগাছের তন্তু থেকে শাড়ি, দেশের তাঁত শিল্পে নতুন দিগন্তের উন্মোচন

কলাগাছের বাকল দিয়ে এতোদিন বাহারি হস্তশিল্প তৈরি হয়ে আসছিল দেশের বিভিন্ন জায়গায়। এবার বান্দরবানে প্রথমবারের মতো কলাগাছের তন্তু থেকে সুতা তৈরী করে সেই সুতায় বানানো হয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ শাড়ি। শাড়িটি লম্বায় সাড়ে তের হাত এবং এর প্রস্থ রয়েছে আড়াই হাত। কলাগাছের সুতা থেকে তৈরি করা বিভিন্ন হস্তশিল্পের পাইলট প্রকল্প ধরে এই সাফল্য এসেছে বলে জানিয়েছেন বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি। এদিকে শাড়িটি বানিয়ে প্রশংসায় ভাসছেন রাধাবতী দেবী। বান্দরবনের জেলা প্রশাসকের অনুরোধে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার মনিপুরী অধ্যুষিত মাঝেরগাও গ্রামের এই নারী মাত্র ৮ দিনে কলাগাছের তন্তু থেকে সুতা বের করে তা দিয়ে শাড়ি বানিয়ে দেখিয়েছেন, যা ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশে এর আগে কলাগাছের সুতা দিয়ে তৈরি শাড়ির তথ্য পাওয়া যায়নি। শাড়িটি বানাতে পেরে উচ্ছ্বসিত রাধাবতী দেবী। রাধাবতী দেবী বলেন, "আটদিনে এই শাড়িটি তৈরী করেছি। প্রথম যখন এই চ্যালেঞ্জ নেই তখন আমার প্রতিবেশি বা সহকর্মীরা বলেছিল, কঠিন কাজ। সফল না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি কিন্তু আমার আত্মবিশ্বাস ছিল যে পারব। তবুও প্রথমে কিছু দ্বিধা ছিল। এখন সবাই এত প্রশংসা করছে যে, খুব ভাল লাগছে। আমিই প্রথম কলা গাছের সুতা দিয়ে শাড়ি তৈরী করেছি। সুতা লেগেছে পৌনে এক কেজি। কলা গাছ দিয়ে এমন একটি শাড়ি তৈরীতে খরচ পড়বে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকার মতো। তবে প্রযুক্তির সাহায্য এবং বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করতে পারলে খরচ আরো কমে আসবে।" জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি সাংবাদিকদের জানান, বান্দরবান জেলায় অসংখ্য কলাগাছ রয়েছে। ফল দেওয়ার পর কলাগাছটি কেটে ফেলে দেওয়া হয়। সেই ফেলে দেওয়া কলাগাছ থেকেই সুতা তৈরি করা হয়। কেউ যদি আর দাবি না করে, তা হলে প্রথমবারের মত কলাগাছের সুতা থেকে তৈরি শাড়ি বান্দরবানেরই ব্র্যান্ডিং হবে। "তবে কলাগাছের বাকল (তন্তু) থেকে শাড়ি তৈরি করা এত সহজ ছিল না। এক বছর আগে থেকেই কলাগাছের বাকল থেকে সুতা তৈরির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বান্দরবানে জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদান করার পর থেকেই এখানকার মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থা উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। সেই চিন্তা থেকেই কলাগাছের তন্তু থেকে সুতা তৈরি করা হয়। সেই সুতা থেকে পর্দার কাপড়, পাপোষ, ব্যাগ, কলমদানি ও বিভিন্ন হস্তশিল্প বানানোর পর সিদ্ধান্ত হয় কলাগাছের সুতা থেকে শাড়ি তৈরির।" এই প্রকল্পে সহায়ক হিসেবে বেসরকারি সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন, গ্রাউস ও উদ্দীপন ছিলো বলে উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক। ঢাকা থেকে প্রশিক্ষক এনেও কলা গাছের সুতা দিয়ে হস্তশিল্পজাত পণ্য তৈরির উপর নারীদের ভাল করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। তাদের উৎপাদিত শতরঞ্জি, ব্যাগ, জুতা, শোপিস, টেবিল ম্যাট, প্লান্টার বক্স, কলমদানি, ফাইল ফোল্ডার প্রভৃতি হস্তশিল্পজাত পণ্য বান্দরবানের নীলাচল পর্যটন কেন্দ্রের শপসহ স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দোকান ও বাজারে বিক্রি হচ্ছে। জানা যায়, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থেকে রাধাবতী দেবীকে বান্দরবান নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি সেখানে স্থানীয় নারীদের ১৫ দিনের প্রশিক্ষণ দেন। মনিপুরীরা যে তাঁতের শাড়ী বুনন করেন ওখানেও সেই তাঁত বসানো হয়। পরে চলতি মার্চ মাসে রাধাবতী দেবী সেই তাঁতে কলা গাছের সুতা দিয়ে শাড়ী বুনন করেন। জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি জানান, মৌলভীবাজার থেকে তাঁত শিল্পী রাধাবতী দেবীকে বান্দরবানে নিয়ে আসার পর তিনি মত দিলেন এই সুতা থেকে শাড়ি তৈরী করা সম্ভব। প্রথমে একটি ছোট কাপড় তৈরি করার দায়িত্ব দেওয়া হলে তিনি সফল হন। তখন চিন্তা করা গেল যেহেতু কাপড় তৈরী করা গেছে তাহলে শাড়িও তৈরী করা সম্ভব। তারপর সুতা প্রস্তুত করে বুনন পর্যন্ত দশ দিনে একটি পূর্ণাঙ্গ শাড়ি তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। তবে কলাগাছের সুতাটি মসৃণ নয়। স্থানীয়ভাবে যতটুকু সম্ভব সুতা মসৃণ ও নরম করার চেষ্টা করা হয়েছে। এই সুতাকে কিভাবে আরও মসৃণ ও নরম করা যায় তার জন্য গবেষণা করা দরকার। এ ব্যাপারে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন বলে জানান ইয়াছমিন পারভীন তিবরীজি। তিনি বলেন, "এখন আমরা আরো বড় তাঁত বসিয়ে এটাকে চলমান রাখবো। আরেকটি কাজ হলো সুতা তৈরি ও কাপড় বানানোটা মূল ধারায় বস্ত্র শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেওয়া। বর্তমানে স্থানীয় পদ্ধতিতে সুতাকে নরম করার চেষ্টা করা হচ্ছে। মন্ত্রণালয় ও বুয়েটেক্সের সাথে যোগাযোগ করে এ সুতাকে কিভাবে আরো মানসম্মত করা যায় তা নিয়ে কাজ করছি।" সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কলা গাছের সুতা থেকে শাড়ি তৈরী হওয়ায় তাঁত শিল্পে নতুন দিগন্তের উন্মোচন হয়েছে। এখন এটিকে বাণিজ্যিক হিসেবে গড়ে তুলতে গবেষণা ও পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপশি পিছিয়ে পড়া বান্দরবান জেলায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আবার জেগে উঠবে জেলার তাঁত শিল্প। বান্দরবান বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের প্রভাষক ও স্থানীয় পিস মহিলা কল্যাণ সমিতির সভানেত্রী সান সান উ বলেন, 'বান্দরবানের তাঁত শিল্প এখন মৃত। কলা গাছের তন্তু দিয়ে সুতা তৈরীর মাধ্যমে শাড়ি বানানো সম্ভব হওয়ায় এখানে নতুন ধরনের শিল্প বিপ্লবের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। এখন এর প্রসার ঘটাতে পারলে জেলার কর্মক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবে। ইতিমধ্য ওয়ার্ল্ড ভিশন এই শিল্পের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।" বান্দরবান জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতিয়া চৌধুরী  বলেন,  "একটি কলা গাছ থেকে ২০০ গ্রাম সুতা হয়। সেই হিসাবে ৫টি কলা গাছ থেকে ১ কেজি সুতা হয়। কলা গাছের সুতা দিয়ে শাড়ি বানাতে পারলে আমরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবো। এখন আমাদের টেক্সটাইল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা অনান্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে এই সুতা নিয়ে গবেষণা করা প্রয়োজন। তাহলে আমরা জানতে পারবো কিভাবে সুতাটাকে আরো মোলায়েম করা যাবে।"
Published on: 2023-04-02 10:01:39.177484 +0200 CEST