The Business Standard বাংলা
দুই টাকার টাইগার বাম থেকে রাঙাপরী মেহেদি! রাজশাহীর মুসলিম কসমেটিকসের উত্থান

দুই টাকার টাইগার বাম থেকে রাঙাপরী মেহেদি! রাজশাহীর মুসলিম কসমেটিকসের উত্থান

একসময় মাথাব্যথার কার্যকর ওষুধ হিসেবে পরিচিত ছিল মুসলিম টাইগার বাম। গ্রাম-গঞ্জে, হাট-বাজারে এমনকি শহরের দোকানগুলোতেও বিক্রি হতো এটি। দুই টাকা দামের এ বাম লাল গোল চাকতির মতো কৌটাতে করে বিক্রি হতো। সেই মুসলিম টাইগার বাম থেকে শুরু করে আজ রাঙাপরী মেহেদির উৎপাদক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে মুসলিম কসমেটিকস। এছাড়া ফার্মাসিউটিক্যালস ও কসমেটিকস খাতের প্রায় দুই শতাধিক পণ্য উৎপাদন হয় এখন মুসলিম কসমেটিকস অ্যান্ড হারবাল কেয়ারে। প্রতি মাসে বিক্রি হয় কোটি কোটি টাকার পণ্য। আশির দশকের গোড়ার দিকে রাজশাহীসহ প্রায় সারাদেশে চিকিৎসাব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না। তখন শহর থেকে গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসায় টোটকা জাতীয় ওষুধ বেশি বিক্রি হতো। এমনকি কিছুদিন আগেও গ্রামে মাথাব্যথা সারানোর টাইগার বাম, কালো নিমের মাজন, টুথ পাউডার, দাদ রোগের মলম বিক্রি হতে দেখা গেছে। এখনো হয়তো হাট-বাজারে তা বিক্রি হয়, কিন্তু আগের মতো আর তেমন ব্যবসা নেই। সেই সময়টায় ঢাকায় মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য ছিলেন মুসলিম সরকার। ঢাকা থেকে ফিরে রাজশাহীর শিরোইল কলোনী এলাকায় টিনের একটা ভাড়া ঘরে বাম তৈরি শুরু করেন তিনি; নাম দেন মুসলিম টাইগার বাম। ছাইয়ের সাথে ওষুধ মিশিয়ে কালো দাঁতের মাজন, টুথ পাউডার ও মলম তৈরি করতে শুরু করেন। এরপর তা ফেরি করে নিজেই বিক্রি করতে শুরু করেন বিভিন্ন হাট-বাজারে। রাজশাহী অঞ্চলের এমন কোনো হাট-বাজার নেই যেখানে তিনি ফেরি করে টাইগার বাম, মাজন ও টুথ পাউডার বিক্রি করেন নি। হাটে নিয়ে গিয়ে গান বাজিয়ে ক্যানভাস করে তিনি তার পণ্য বিক্রি করতে শুরু করেন। এভাবেই তিনি নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ ও জয়পুরহাট ও বগুড়া বিভিন্ন উপজেলা চষে বেড়িয়েছেন। মুসলিম সরকারকে ব্যবসায় সাফল্য এনে দেয় তার 'মুসলিম শক্তিবর্ধক হালুয়া' নামের পণ্যটি। এই পণ্যটি কেনার জন্য হাটে মানুষ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে যায়। তখন ১০০ গ্রামের দাম ছিলো ২০ টাকা। এখন সেই জিনিসই কস্তুরী নামে ৫০০ গ্রাম বিক্রি হয় ১০০০ টাকায়। মুসলিম কসমেটিকস অ্যান্ড হারবাল কেয়ারের এখন বড় দুটি কারখানা। মুসলিম ফার্মাসিউক্যালসের পাঁচতলা ভবন বিশিষ্ট কারখানাটি শিরোইল কলোনীতে। তার কয়েকশো গজ দূরে কসমেটিকসের কারখানা। সব মিলে এসব কারখানায় ৫০০ জনের মতো শ্রমিক রয়েছে। এছাড়া রাঙাপরী রাজশাহীতে আবাসন ব্যবসায়ও নেমেছে। রাঙাপরী মেহেদি, ফেয়ারনেস স্ক্রীম, স্পট আউট স্ক্রীন ক্রীম, ফেসিয়াল স্কীন ক্রীম, ফেয়ারনেস ফেসওয়াশ, নীম ফেসওয়াশ, হেয়ার অয়েল, হারবাল হেয়ার অয়েল, নারিকেল তেল, কুলিং হেয়ার অয়েল, হেয়ার রিমুভাল ক্রীম, হেয়ার কালার, শ্যাম্পু, গ্লিসারিন, পেট্রোলিয়াম জেলী, বডি লোশন, ট্যালকম পাউডার, বডি লোশন, ফেসিয়াল স্ক্রীম ও স্ক্র্যাব, শেভিং ফোম, লিকুইড ডিটারজেন্টসহ নানা পণ্য তৈরি করা হয়। শিরোইল কলোনীর বাসিন্দা মোহন (৪৭) জানান, "আমরা খুব ছোটবেলা থেকে মুসলিম সরকারকে চিনি। বাজারে ফেরি করে তিনি দুই টাকা দামের টাইগার বাম, পাঁচ টাকা দামের মাজন ও দশ টাকার টুথ পাউডার বিক্রি করতেন। শিরোইল আসামী কলোনী জায়গাটা তখন ফাঁকা ছিলো, সেখানেই বিক্রি করতেন এসব।" শুরুতে নিজেই ছাই চেলে মাজন তৈরি করে বিক্রি করলেও পরে বস্তাপ্রতি ১২০ টাকার বিনিময়ে নারী শ্রমিকদের দিয়ে ছাই চেলে নিতেন মুসলিম সরকার। আর সেই ছাইয়ের মধ্যে বিভিন্ন মেডিসিন যুক্ত করে বাজারজাত করা হতো। মোহন বলেন, "প্রথমে টিনের ছাপড়া ঘরে তিনি একাই ওষুধ তৈরি করে নিজেই ফেরি করে বিক্রি করতেন। তারপর দুইজন লোক নিয়ে ফেরি করে বাজারে ক্যানভাস করে ওষুধ বিক্রি করতেন।" "প্রথমে সাইকেল চালিয়ে ফেরি করে মালামাল বিক্রি করলেও পরে তিনি একটি ভাঙাচোড়া মাইক্রোবাস কিনেন। গানের লোকদের টাকার বিনিময়ে ভাড়া করে বাজারে গিয়ে ক্যানভাস করে পণ্য বিক্রি করতেন। ভ্যান গাড়ি কিনেন। সেখানে গানের লোক হাটে গান গাইতো আর মাঝে মাঝে মুসলিম সরকার তার ওষুধের গুণাগুণ কী তা বর্ণনা করতেন। এভাবেই কাস্টমারদের কাছে ওষুধ বিক্রি করা হতো," বলেন তিনি। নওগাঁর পত্মীতলার রুবি বিয়ের পর ২২ বছর ধরে রাজশাহীতে বসবাস করছেন। রুবি জানান, "এই মেহেদি তৈরির কারখানায় আমি চার বছর কাজ করেছি। আমি নিজেই মুসলিম চাচাকে নজিপুরের মধুইল হাটে ক্যানভাস করে দাঁতের মাজন, টুথ পাউডার, টাইগার বাম, মলম ও মদক বিক্রি করতে দেখেছি। এখন রাজশাহীর শিরোইল কলোনীর অর্ধেক জায়গায় তাদের।" তবে তিনি অভিযোগ করে বলেন, মেহেদির মধ্যে রাসায়নিকের পরিমাণই অনেক বেশি। অন্যদিকে মুসলিম কসমেটিকস অ্যান্ড হারবাল কেয়ারে কর্মরত মিজানুর রহমান জানান, ঢাকার চকবাজার থেকে শুকানো মেহেদি কিনে আনা হয়। তারপর মেডিসিন ও রঙ মিশিয়ে মেহেদি তৈরি করা হয়। মুসলিম সরকার মারা গেছেন ২০১৩ সালে। তার ছোট ভাই ডা. আব্দুস সালাম সরকার এখনো বেঁচে আছেন। একটি ওষুধের দোকান রয়েছে তার। মুসলিম সরকারের সাথে তার চেহারার অনেক মিল। "এখনো অনেকে আমাকে মুসলিম সরকার ভেবে ভুল করেন। আমাদের চেহারা প্রায় কাছাকাছি দেখতে," বলেন তিনি। "আমার বাপ-দাদার ব্যবসা হচ্ছে চিকিৎসা করা। তখন তারা গাছ-গাছড়া দিয়ে মানুষের চিকিৎসা করতেন। দাদার পরে আমার বাবাও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা করতেন। সেখান থেকেই আমরা পাঁচ ভাই শিক্ষা পেয়েছি," বলেন আব্দুস সালাম। তিনি বলেন, "একবার চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরে হাট করতে যাবে মুসলিম ভাই। তিনি আমাকে সাথে নিলেন। তখন তো যোগাযোগের কোনো মাধ্যম ছিলো না। একমাত্র ট্রেন ছিলো সম্বল। সেই ট্রেন আবার রাত ১০টায় রাজশাহী থেকে রহনপুরে যাবে। আমরা রাতে ট্রেনে রহনপুরে পৌঁছে হাটের দোচালা ঘরে মশারী টানিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। সকালে উঠে তারপর গোসল করে আমরা সারাদিনের জন্য ব্যবসা শুরু করি। তখন আমি ক্যানভাস করে পণ্য বিক্রি করেছি।" "মুসলিম ভাই খুব পরিশ্রম করতেন। যে কাজে হাত দিতেন সেটায় সফল হতেন। তার হাত যশ খুব ভালো ছিলো। "হাটভর্তি মানুষের সামনে অনর্গল কথা বলে তাদেরকে কনভিন্স করে পণ্য বিক্রি করা খুব সহজ একটা ব্যাপার না। এটা অনেক মেধার কাজ," ফলে হাটে যারা ক্যানভাসার করে পণ্য বিক্রি করেন তাদের অবজ্ঞা করা ঠিক না বলে মনে করেন তিনি। "১৯৮৫ সালে তার সাথে একবার তাহেরপুর বাজারে যাই। একদিনে সেই তাহেরপুর বাজার থেকেই তিনি ৬৫ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করেন। তাহেরপুরের মতো একটা ছোট্ট জায়গা থেকে একদিনে ৬৫ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করা কম সহজ কাজ না। এমনি তার জনপ্রিয়তা ছিলো। মুসলিম ভাই বেঁচে থাকতেই একটা অনন্য উচ্চতায় ব্যবসাকে নিয়ে গেছেন। এখন তার ছেলে মাসুম সরকার সেই ব্যবসাকে সাজিয়ে গুছিয়ে আরও এগিয়ে নিচ্ছেন," বলেন আব্দুস সালাম। তবে মুসলিম কসমেটিকস অ্যান্ড হারবাল কেয়ারের চেয়ারম্যান মাসুম সরকার (মুসলিম সরকারের ছেলে) বর্তমান ব্যবসার পরিস্থিতি নিয়ে হতাশ। টিবিএসকে তিনি বলেন, "২০০৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ছিলো আমার ব্যবসার সবচেয়ে গৌরবময় ও সাফল্যজনক অধ্যায়। সেইসময় আমরা প্রচুর পরিশ্রম করেছি আবার প্রচুর আয়ও করেছি। কিন্তু ২০১৯ সালে করোনার থাবা এবং ইউক্রেন যুদ্ধ আমাদেরকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে।" "সমাজে এত বেশি অস্থিরতা। মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নেই। আগে পেট বাঁচাবে না অন্য পণ্য কিনবে! এইসব কারণে ২০২৫ সালের মধ্যে এ ব্যবসা আমি যেখানে নিয়ে যেতে চেয়েছি ঠিক সেই জায়গায় নিতে পারিনি। "আমাদের বিসিকে একটা জায়গা কেনা আছে। সেখানে ট্রয়লেট্রিজ প্রোডাক্ট থেকে টিস্যু, ফেসিয়াল টিস্যু, হ্যান্ড টাওয়েল থেকে শুরু করে স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরির কারখানা দেওয়ার ইচ্ছা ছিলো। আরো অনেক দিকে ব্যবসা সম্প্রসারিত করার ইচ্ছা ছিলো কিন্তু এই বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে তা সম্ভব হয়নি," বলেন তিনি।
Published on: 2023-04-21 14:07:20.253304 +0200 CEST