The Business Standard বাংলা
ফিরে আসছে কলের গানের দিন!

ফিরে আসছে কলের গানের দিন!

শশীমুখী না গওহরজান? কে প্রথম? প্রশ্নটা দীর্ঘদিন ধরে মাথা ধরিয়ে রেখেছে সংগীত অনুরাগীদের। গ্রামোফোন রেকর্ড সংগ্রাহক হারুন আল রশীদ বললেন, এক অর্থে দুজনেই প্রথম। ব্যাপারটি খোলাসা করা যায় এভাবে- প্রথম রেকর্ড করা হয়েছিল শশীমুখীর গান কিন্তু প্রথম প্রকাশ হয়েছিল গওহরজানের। আসলে তখন গওহরজানের এতো নামডাক যে শশীমুখী তার ধারে কাছে ছিল না। গওহর দরও হেঁকেছিলেন অনেক বেশি। ব্রিটিশ গ্রামোফোন কোম্পানীর রেকর্ডিং ইঞ্জিনিয়ার গেইসবার্গ তখন কলকাতা ও ভারতের আরো সব জায়গা ঘুরে গান রেকর্ড করার কাজ করছিলেন। গওহরের জনপ্রিয়তার কথা ভেবেই সম্ভবত তাঁর রেকর্ড প্রথম পাবলিশ করা হয়েছিল। এটা বিশ শতকের একেবারে গোড়ার কথা, ১৯০২ বা ১৯০৩ সাল। তারপর সত্তর বছরের টানা রাজত্ব গ্রামোফোন রেকর্ড বা কলের গানের বা লং প্লের। এর বিকল্প সেরকম কিছুই ছিল না। বিশ শতকের প্রথম দশকেই ব্রিটিশ এইচএমভি, আমেরিকান কলাম্বিয়া এবং ফ্রান্সের পঠে নামের তিনটি গ্রামোফোন কোম্পানী প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতায়। তখন গান রেকর্ড হতো সাত ও দশ ইঞ্চি ব্যাসের রেকর্ডে। প্রতি পিঠে একটি করে গান রেকর্ড হতো। আধুনিক রেকর্ড প্লেয়ার, স্টেরিও এবং সিডির আগের রূপ হলো গ্রামোফোন যন্ত্র। এটি চালাতে বৈদ্যুতিক সংযোগের প্রয়োজন পড়ত না। অনেকটা চাবি দেওয়া ঘড়ির মতো হাতল ঘুরিয়ে এটিকে চালানো হতো। এখানে শব্দ ধারণের মাধ্যমটি ছিল চোঙ্গাকৃতির। ধারণ পদ্ধতিটি ছিল রেকর্ডের ওপর দাগ কেটে বা খোদাই করে শব্দের কম্পাঙ্ককে নির্দিষ্ট রেখায় অনুসরণ করা। বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনকেই ধরা হয় শব্দ সংরক্ষণের জনক। তিনি ১৮৭৮ সালে আবিস্কার করেছিলেন এমন যন্ত্র যার মধ্যে গোলাকৃতি এক বস্তুর ওপর চাকতির মধ্যে পিন লাগিয়ে ঘোরালে শব্দ সৃষ্টি হয়। তারপর বিভিন্ন দৈর্ঘ্য, উপকরণ ও ঘূর্ণন গতির রেকর্ড বিভিন্ন সময়ে উদ্ভাবিত হয়ে গান শোনাকে আনন্দময় ও শুদ্ধতর করে তুলেছে। মাটির ডিস্কের কথাও যেমন অনেকের শোনা আছে। যদিও এটি মাটি দিয়ে নয় বরং গালা বা লাক্ষা দিয়ে তৈরি হতো। তবে এটি হাত পড়ে গেলে ভেঙে যেত বলে এর বিকল্প কিছুর অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছিলেন রেকর্ড ব্যবসায়ীরা। ফলাফলে ভিনাইল বোর্ডের মতো দারুণ একটি উপকরণ পাওয়া গিয়েছিল। আর ঘূর্ণন গতি ৭৮ আরপিএম (রোটেশন পার মিনিট) থেকে কমিয়ে ১৯৫৬ সালে যখন ৩৩ আরপিএমে আনা গেল তখন সত্যি এক বিপ্লব ঘটে গেল। এক রেকর্ডের এক পিঠেই তখন ৬-৭টি করে গান রেকর্ড করা গেল। লতা মঙ্গেশকর, মহম্মদ রফি, আশা ভোসলে, কিশোর কুমার প্রমুখ শিল্পীর মহাকাব্যিক উত্থানের পিছনে এই ৩৩ আরপিএম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ১৮৯৫ সালে স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর বন্ধুর কাছ থেকে একটি গ্রামোফোন উপহার পান, এর আগে আর কেউ বঙ্গে গ্রামোফোন এনে থাকলে তার কোনো হদিস করা যায় না। এশিয়ার প্রথম রেকর্ড কারখানা স্থাপিত হয় ১৯০৮ সালে কলকাতার বেলিয়াঘাটায়। এখানে গ্রামোফোন যন্ত্র আর খুচরা পার্টসও তৈরি হতো। গানের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহাসিক পালা যেমন সিরাজউদ্দৌলা, চাঁদ সওদাগর ইত্যাদির রেকর্ডও পাওয়া যেতে থাকে। গত শতকের ষাট দশকের মধ্যভাগ পর্যন্ত দেশের বেশিরভাগ বনেদী পরিবারেই গ্রামোফোন বাজত। তখন বেতারে গান প্রচারের সময় ঘোষক বলতেন, এখন শুনবেন গ্রামোফোন রেকর্ডের গান। সত্তর দশকের আগে গ্রামোফোন রেকর্ড কোনো প্রতিযোগিতার মুখে পড়েনি বরং শ্রুতি বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হিসাবে দারুণ প্রতাপ বজায় রেখে চলেছিল। সত্তরের দশকে আসে ক্যাসেট আর তার পরের দশকে সিডি আসে বাজারে। তাই রেকর্ড উৎপাদন ও বিক্রি কমতে থাকে। হারুন আল রশীদ জানালেন, 'সারা বিশ্বে সত্তরের দশকে ভিনাইল রেকর্ড উৎপাদন হয়েছে ৪০০ মিলিয়ন, ২০০৬ সালে সেটা নেমে এসেছিল মাত্র ১ মিলিয়নে।' একের পর এক ক্যাসেট, সিডি, এমপিথ্রি, স্ট্রিমিংয়ের প্রবল ধাক্কায় বিনোদন জগৎটাই বদলে যেতে থাকে এবং স্থিতি হারায়। কিন্তু ভোক্তারা কিছুকালের মধ্যে এটাও বুঝল যে নতুন নতুন প্রযুক্তি অস্থায়ী এবং তাতে গান বা ভাষণ বা নাটিকা তথা বিনোদন উপকরণ শুদ্ধতা হারায়। হারুন আল রশীদ বলছিলেন, 'গ্রামোফোন রেকর্ড ব্যাপারটি অর্গানিক বা ইকো ফ্রেন্ডলি বলতে পারেন। এটি আদি ও অকৃত্রিম, ভেজালমুক্ত। অন্যদিকে সিডিতে ধারণকৃত গানকে আপনি ইচ্ছেমতো ম্যানিপুলেট করতে পারেন, পুরনো রেকর্ডের ওপর নতুন রেকর্ড চাপাতে পারেন। সিডি বেশিদিন টিকেও থাকে না। আবার সিডির চেয়ে এমপিথ্রির দৈর্ঘ্য হয় কয়েকগুণ বেশি। এর উদাহরণ এক লিটার খাটি দুধের সঙ্গে চার লিটার পানি মেশালে যা হয় তার মতো। গান শোনার উপকরণও গানের শুদ্ধতায় হেরফের আনে। শুধু উপকরণের তারতম্যের কারণেই বজ্রকণ্ঠ মিহি-মোলায়েম শোনাতে পারে, ঘটতে পারে উল্টোটাও।' ২০০৬ সালে যখন ভিনাইল রেকর্ড উৎপাদিত হলো মোটে ১ মিলিয়ন তখন আমেরিকার কয়েকটি রেকর্ডিং কোম্পানী খুব কষ্ট পেল। ভিনটেজ গাড়ির যেমন প্রদর্শনী হয় তেমনভাবেই তারা ২০০৭ সালে ভিনাইল রেকর্ড প্রদর্শনীর আয়োজন করল আর এপ্রিল মাসের তৃতীয় শনিবারকে চিহ্নিত করল রেকর্ড স্টোর ডে হিসাবে। মূলত বুল মুজ মিউজিকের ক্রিস ব্রাউন এবং ক্রিমিনাল রেকর্ডসের এরিক লেভিনই ছিলেন উদ্যোক্তা। তবে ওই প্রদর্শনীর ফল পাওয়া গিয়েছিল দারুণ ভালো। এতো বেশি উৎসাহ সঞ্চারিত হয়েছিল যে ২০০৮ সালেই গ্রামোফোন রেকর্ড উৎপাদন বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে প্রতিবছরই যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড বিক্রি লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। ২০১১ সালে রেকর্ড বিক্রির পরিমাণ ৫ মিলিয়ন, ২০১৪ সালে ১০ মিলিয়ন। ২০২০ সালে ২২ মিলিয়ন ছাড়িয়ে যায় আর ২০২২ সালে সংখ্যাটি ছিল ৪১ মিলিয়ন। যেখানে সিডি বিক্রি হয়েছে ৩৩ মিলিয়ন। এখন ইউকে, নেদারল্যান্ড, জাপান, জার্মানিসহ আরো সব দেশে রেকর্ড বের হচ্ছে। ভারতেও গানের রেকর্ড প্রকাশ করা হচ্ছে আর তা প্রেস করিয়ে আনা হচ্ছে জার্মানি থেকে। হারুন আল রশীদ বাংলাদেশে রেকর্ড স্টোর ডে আয়োজনের অন্যতম উদ্যোক্তাও। ২০১৯ সালে প্রথম এ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু করোনা অতিমারি সে চেষ্টায় বাদ সেধেছে। পরের বছরও আয়োজন ভেস্তে যাওয়ার কারণ ওই একই। এবার দিবসটি পড়েছে ২২ এপ্রিল কিন্তু রমজান ও ঈদের কারণে তা বাংলাদেশে পালিত হবে ২৯ এপ্রিল। রশীদ বলছিলেন, 'অ্যানালগ আর ডিজিটাল অডিও মোডের ফারাক হলো অকৃত্রিম আর কৃত্রিমে যেমন তফাত। ডিজিটাল পদ্ধতিতে গান সংরক্ষণের অসুবিধা হলো মাধ্যমগুলোর ক্ষণস্থায়িত্ব কিংবা স্পিড বেড়ে বা কমে যাওয়া। অ্যানালগ বা রেকর্ডের বেলায় এমনটা ১০০ বছরেও ঘটে না। একশো বা পঞ্চাশ বছর আগে যেসব গান রেকর্ড করা হয়েছে তা আমরা এখনো শুনতে পাচ্ছি গ্রামোফোন রেকর্ডের কল্যাণেই। মানুষ এখন বারবারই প্রকৃতির কাছে, অকৃত্রিম উৎসের কাছে ফিরতে চাইছে। নইলে সংকটে পড়ছে তার অস্তিত্ব। গ্রামোফোন রেকর্ডের কাছে ফিরে আসাটাও অনেকটা সেরকম ব্যাপার।' 'হেডফোন দিয়ে গান শুনলে কেবল কান নষ্ট হয় তা নয়, মগজও নষ্ট হয়। আমার মনে হয় বাংলাদেশে এখনো কয়েক হাজার লোক পাওয়া যাবে যারা গ্রামোফোন রেকর্ডে গান শোনেন। আমার নিজের নেটওয়ার্কেই আছেন দেড় হাজার লোক। কেরানীগঞ্জের কলাতিয়ায় ১২/১৪ জনকে পেয়েছি যারা গ্রামোফোনেই গান শোনেন। সংখ্যাটা বাড়বে দিনে দিনে।' হারুন আল রশীদ আশির দশক থেকে গান শোনেন, রেকর্ড সংগ্রহ শুরু করেছেন নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় আর প্লেয়ার কিনেছেন ২০০৩ সালে। তার সংগ্রহে আড়াই হাজারের মতো রেকর্ড আছে। তিনি উচ্চাঙ্গ এবং আধুনিক গান শোনেন। ভীমসেন যোশি, কিশোরি আমনকর, শিব কুমার শর্মা, লতা মুঙ্গেশকর, মহম্মদ রফি তাঁর পছন্দের শিল্পী। তিনি আশাবাদী, গ্রামোফোন রেকর্ডের দিন আবার ফিরবে; আবার গানের সুন্দর দিনগুলো ফিরে আসবে।
Published on: 2023-04-22 11:26:34.928134 +0200 CEST