The Business Standard বাংলা
খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, কম আদায় নিয়ে উদ্বিগ্ন আইএমএফ

খেলাপি ঋণের বৃদ্ধি, কম আদায় নিয়ে উদ্বিগ্ন আইএমএফ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত পূরণের জন্য যখন ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ কমার কথা, তখন উল্টো খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে প্রথম রিভিউ করতে আসা সংস্থাটির কর্মকর্তারা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা এ তথ্য জানিয়েছেন। সভায় উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডক বলেন, প্রতি বছর যে পরিমাণ খেলাপি ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাংকগুলো নির্ধারণ করছে, প্রকৃত আদায়ের পরিমাণ তার চেয়ে অনেক কম হওয়ায় বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহর সঙ্গে বৈঠকে হতাশা প্রকাশ করেছে আইএমএফ। এমন প্রেক্ষাপটে আগামীতে খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আরও বাড়িয়ে দেওয়া এবং অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি গঠনে সরকারের উদ্যোগের কথা আইএমএফকে জানিয়েছেন সচিব। অন্যদিকে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সঙ্গে অনুষ্ঠিত পৃথক সভায় রাজস্ব আদায় বাড়াতে সব ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আরোপের প্রস্তাব করেছে আইএমএফ। বর্তমানে ইউনিফাইড ১৫ শতাংশ ভ্যাট বাস্তবায়নে এনবিআরের সক্ষমতা নেই বলে তা এড়িয়ে গেছেন এনবিআর কর্মকর্তারা। তবে আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী আগামী অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে ০.৫ শতাংশ রাজস্ব আয় বাড়াতে বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেছে সংস্থাটি। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবের সঙ্গে অনুষ্ঠিত সভায় গত তিন বছরের খেলাপি ঋণ এবং মূলধন পর্যাপ্ততার অনুপাতের তুলনামূলক চিত্র গ্রাফিক্যাল প্রেজেন্টেশনে তুলে ধরেন কর্মকর্তারা। তাতে ২০২০ সালে ৭.৬৬ শতাংশ, পরের বছর ৭.৯৩ শতাংশ এবং গত বছর শেষে ৮.১৬ শতাংশ খেলাপি ঋণের হার দেখানো হয়। প্রেজেন্টেশনে ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততার তথ্যও তুলে ধরা হয়। সভায় উপস্থিত ছিলেন, অর্থ বিভাগের এমন একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, 'প্রেজেন্টেশনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের চিত্র পৃথকভাবে দেখানো হয়নি। কারণ এসব ব্যাংকের খেলাপি ঋণের হার অনেক বেশি।' গত ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক, বিডিবিএল—এই ছয় ব্যাংকের খেলাপি ঋণের গড় হার ২৮.৬৬ শতাংশ। সভায় উপস্থিত থাকা ওই কর্মকর্তা জানান, ২০২০ সাল থেকে খেলাপি ঋণের হার বাড়ার চিত্র দেখে আইএমএফ কর্মকর্তারা জানতে চান, এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে খেলাপি ঋণ কমবে কীভাবে। আইএমএফ কর্মকর্তাদের এ প্রশ্নের জবাবে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বলেছে, 'টার্গেট অর্জন করা যাতে কঠিন হয়, সেজন্যই সবসময় টার্গেট বেশি রাখা হয়। এটা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। আগামীতে টার্গেট আরও বাড়ানো হবে এবং আদায় বাড়িয়ে খেলাপির পরিমাণ কমানো হবে।' অবশ্য আইএমএফ টিমের সঙ্গে বৈঠকে খেলাপি ঋণ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে টিবিএসকে জানান সচিব শেখ মোহাম্মদ সলীম উল্লাহ। তিনি বলেন, 'আইএমএফের এটা রুটিন মিটিং।' আইএমএফকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে বাংলাদেশ বলেছে, ২০২৬ সালের মধ্যে সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের নন-পারফর্মিং লোন (এনপিএল) ঋণ ১০ শতাংশের মধ্যে ও বেসরকারি খাতের ব্যাংকের নন-পারফর্মিং লোন ৫ শতাংশের মধ্যে নামিয়ে আনা হবে। এজন্য ব্যাংকগুলোর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করা হচ্ছে, যেখানে মূলধন পর্যাপ্ততার হার ও খেলাপি ঋণের বিপরীতে শতভাগ নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য আগামী জুনের মধ্যে একটি পলিসি নোট তৈরি করবে বাংলাদেশ। আইএমএফ ব্যাংকগুলোর মূলধন পর্যাপ্ততা বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছে। আইএমএফকে বাংলাদেশ আরও বলেছে, ব্যাংকের পুনঃতফসিল করা ঋণকে খেলাপি ঋণের হিসাবের আওতায় আনা হচ্ছে, যা আগামী জুনের মধ্যে কার্যকর হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদনে এই তথ্য থাকবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের আর্থিক প্রতিবেদনে ঝুঁকি ও খেলাপি ঋণের তথ্য সঠিকভাবে প্রতিফলিত হবে। প্রতিবেদনে পুনঃতফসিল করা ঋণের তথ্য থাকবে, যার বিপরীতে যথানিয়মে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখা হবে। খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে অ্যানুয়াল পারফর্ম্যান্স অ্যাগ্রিমেন্ট (এপিএ) স্বাক্ষর করার কথা বলেছে আইএমএফ। তবে তাতে সম্মতি দেয়নি মন্ত্রণালয়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আগে থেকেই এ ধরনের চুক্তি করতে আগ্রহী হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক তাতে রাজি হয়নি। *এনবিআরের পরিকল্পনা* আইএমএফের সঙ্গে বৈঠকে ঋণের শর্ত পূরণে আগামী অর্থবছরে কর-জিডিপি অনুপাত ০.৫ শতাংশ বাড়াতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে এনবিআর বলেছে, রাজস্ব আদায় বাড়াতে মিডিয়াম টার্ম রিভিনিউ স্ট্রেটেজি (এমটিআরএস) প্রণয়ন করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক এমটিআরএসের ওপর একটি কনসেপ্ট নোট জমা দিয়েছে এবং এনবিআর প্রথম খসড়া প্রতিবেদন নিয়ে কাজ করছে। এনবিআর বলেছে, তারা কিছু খাত থেকে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার করেছে এবং আগামী বছরগুলোতে অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার করার পরিকল্পনা করেছে। এতে কর ব্যয় কমবে এবং কর-জিডিপি অনুপাতের অবস্থা ভালো হবে। রাজস্ব বোর্ড ২ বছরের মধ্যে বিদ্যমান ১২টির সঙ্গে আরও পাঁচটি কার্যকরী ভ্যাট কমিশনারেট গঠন করবে। এনবিআর আইএমএফকে জানিয়েছে, রাজস্ব আয় বাড়াতে তারা অনেক ব্যবস্থা নিচ্ছে, যেমন— অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ে শুল্ক অব্যাহতি কমিয়ে আনা, শুল্কহার পুনর্বিন্যাস, বকেয়া শুল্ক আদায় কার্যক্রম জোরদার করা, দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া, নতুন শুল্ক আইন প্রণয়ন, শুল্ক আদায় প্রক্রিয়া অটোমেশন এবং কাস্টমস রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইউনিটকে তিন বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ রূপে চালু করার পরিকল্পনা করেছে এনবিআর, যা আইএমএফকে জানানো হবে। গত কয়েক বছরের ভ্যাট, আয়কর ও শুল্ক থেকে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির তথ্য পর্যালোচনা করার পরে সংস্থাটি দেখেছে, আইএমএসের শর্ত পূরণ করতে হলে বিদ্যমান প্রবৃদ্ধির হারের সঙ্গে আরও প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার বাড়তি রাজস্ব আদায় করতে হবে। এনবিআরের হিসাব অনুযাযী, আইএমএফকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুসারে কর-জিডিপি অনুপার বাড়াতে হলে রাজস্ব কর্তৃপক্ষকে শুল্ক খাতে বাড়তি ৪ হাজার ৮২৮ কোটি টাকা, আয়কর খাতে বাড়তি ৫ হাজার ৫৪৭ কোটি, ভ্যাট থেকে অতিরিক্ত ৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণ করতে হবে। রাজস্ব বৃদ্ধির শর্ত পূরণে আগামী বাজেটে কর অব্যাহতি কমিয়ে দেবে এনবিআর। আশা করা হচ্ছে, সঠিক ও কার্যকর অডিট রাজস্ব বাড়াবে। এনবিআর আইএমএফকে জানিয়েছে, ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া তারা তাদের পূর্ব-প্রতিশ্রুতির বাইরে কোনো করছাড় দেবে না।
Published on: 2023-04-26 19:14:05.074512 +0200 CEST