The Business Standard বাংলা
ফ্রাইডে ফিচার | রানু খালামনি: যাকে ছেড়ে শিশুরা যেতে চায় না

ফ্রাইডে ফিচার | রানু খালামনি: যাকে ছেড়ে শিশুরা যেতে চায় না

সাত ভাই বোনের মধ্যে সবার বড় রানু। পুরো নাম জুবলী বেগম রানু। খুব হাসিখুশি প্রাণচঞ্চল। রানুর জন্ম ১৯৬৬ সালে। চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গায়। বিরাট পরিবারের মেয়ে। তাঁর বাবা-চাচারাও ৭ ভাই-বোন। বাবা আইয়ুব হোসেন একটু মেজাজি মানুষ। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন স্কুলবেলাতেই। স্কুলটি ছিল বাড়ির দুই-তিন গ্রাম পরে। রানুর দাদা ও নানাবাড়ি বেশি দূরে নয়। তাঁর বাবা ও মামারা ছিলেন সহপাঠি। বড় পরিবারটির এক পূর্বপুরুষ, সম্পর্কে রানুর দাদা, ব্যারিস্টার বাদল রশীদ, কৃষক লীগ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রানু ও তাঁর পিঠাপিঠি ভাইটি গ্রামীণ পরিবেশেই বেড়ে উঠেছে। তাদের নানা ও দাদাবাড়ির মাঝখানে ছিল বিল, সেখানে তারা মাছ ধরত ছিপ ফেলে। তাদের পুকুর ছিল বেশ কয়েকটি, রানু ভালো সাঁতার জানত। ঘুড়িও ওড়াতে পারত টুকটাক। গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা খেলত, গাছে চড়ত। দুরন্ত ছিল রানু, চঞ্চলা ছিল, সেসঙ্গে পুরো পরিবারেরই খুব আদরের ছিল, বিশেষ করে বাবার ছায়া ছিল সে। জোত-জমির দলিলপত্র নিয়েও বাবা রানুর সঙ্গে বসেছেন, তাকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন উত্তরের ভিটির কতটা তাদের কিংবা দক্ষিণের পুকুরের কতটা। তিরাশি সালে রানু এসএসসি পাশ করেন আলমডাঙ্গা গার্লস স্কুল থেকে। এর মধ্যেই ঘটে অনাকাঙিক্ষত ঘটনাটা। রানুদের স্কুলের এক শিক্ষক তাঁর জন্য এক পাত্র বাছাই করে। ছেলেটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র তবে কিছুটা অভাবী। রানুর বাবা সাত-পাঁচ নানা কিছু ভেবে রাজি হয়ে যান। কাবিন হয়ে যাওয়ার সময়ই খটকা লাগে বাবার মনে, পাত্র নির্বাচন বুঝি ঠিক হয়নি। বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শে ছেলেটি একেবারে ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করে। ধর্মভিত্তিক এক গোড়া সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত সে, নিজের ভাবনার সঙ্গে কোনোরকম আপোষ করতে রাজি হয় না। রানুদের বাড়িতে তাঁর আগমন মানেই ঝগড়াঝাটি, বিবাদ। এভাবে দুই বছর চলে সম্পর্ক এতোটাই তিক্ত হলো যে তা ভেঙেই দিতে হলো। এই বিবাহবিচ্ছেদ যে ক্ষত তৈরি করল, তার বেদনা যে তাঁকে বয়ে বেড়াতে হবে জীবনভর- তা তখনো বোঝা বাকি ছিল রানুর। তবে মনে বিষাদ তৈরি হয়েছিল। তারপর আলমডাঙ্গা গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি শেষ করে রানু গেল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। সুযোগ পেয়েছিল অর্থনীতি নিয়ে পড়ারও; তবে বাংলা পড়াই স্থির করল। রানু সবসময়ই বন্ধুবৎসল। বিশ্ববিদ্যালয়েও তৈরি হলো বড় একটা বন্ধুর দল। ভালোই লাগছিল নতুন এ জগৎটাকে। এরমধ্যে বাড়ি থেকে বার্তা এলো- নতুন পাত্র পাওয়া গেছে, চিঠি পাওয়ামাত্র হাজির হও। রানু ঠিক প্রস্তুত ছিল না। প্রথম বিয়েটা ভেঙে যাওয়ায় বাবা একটু দিশেহারাই হয়ে গিয়েছিলেন। সম্ভবত ভাবছিলেন, মেয়ের জীবনে এতবড় একটা ভুল চাপিয়ে দিয়েছেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ক্ষতিপূরণ করবেন। তাই তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাকে পাত্র নির্বাচন করেছেন এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিয়ে শেষ করতে চান। কিন্তু রানুর প্রশ্ন, না দেখে কিভাবে পাত্র আমাকে পছন্দ করে ফেলল? রানু অনুসন্ধান করে জানতে পারল, ১৫ লাখ টাকা সহায়তাদান সাপেক্ষে রাজি করানো হয়েছে পাত্রকে। জানতে পেরে খুব রাগ হলো রানুর। কাউকে কিছু না জানিয়ে সে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেল। বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করলো বিষয়টি। কোনো কোনো বন্ধু বিয়ের পক্ষে, কেউ কেউ আবার বিপক্ষে অবস্থান নিল। প্রথম দু চার দিনের পরামর্শ সভা কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই মূলতবী হয়ে গেল। পরের কয়েকদিনে বিয়েতে রাজি হওয়ার পক্ষেই মত দিল বেশিরভাগ বন্ধু। রানুও তাদের সঙ্গে একমত হয়ে পরের দিন সম্মতি জানিয়ে চিঠি লিখবেন বলে ঘুমাতে গেলেন। সকালে উঠে আর চিঠি লিখতে ইচ্ছে করে না। এমন গেল কয়েকদিনই। ওদিকে বাবা এতো রাগ করলেন যে সকল যোগাযোগ ছিন্ন করলেন। তিন মাস রানুকে রুমমেটদের টাকাতেই চলতে হয়েছে। শেষে একদিন বাবার চিঠি এলো, ভিতরে ১২টি ১০০ টাকার নোট ও এক টুকরো ছোট্ট চিঠি। রানু বুঝতে পারলেন, তিনি জিতেছেন। আপাতত বিয়ে-শাদী শিকেয় তোলা হয়ে গেল, এখন তিনি পড়াশোনায় মন দেবেন। রানুর পড়তে ভালো লাগত। বিষয় তাঁর বাংলা সাহিত্য। বঙ্কিমচন্দ্রের বই পড়তে পড়তে রাতও পার করেছেন অনেক। কিন্তু বঙ্কিম তাঁকে রাগিয়ে তুলতেন। তিনি বিধবাদের বিয়ে দেওয়া নিয়ে বইয়ের আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত লড়ে যেতেন কিন্তু শেষে আর সফল হতেন না। তাই রাগ না করে আর উপায় কি ছিল রানুর! '৮৬-'৮৭ সালে রানু যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে শুরু করেন তখন এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। রাজনৈতিক আবহে বেড়ে ওঠা রানু অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ছাত্র সংগঠনে যুক্ত হননি। তিনি পড়াশোনা আর বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করেই সময় কাটাতেন। তবে সময় লেগে গিয়েছিল অনেক, ৭ বছর লেগেছিল অনার্স করতে, মাস্টার্স করতে গেল আরো এক বছর। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করে এসে রানু এলাকার একটি বেসরকারি কলেজে পড়ানোর কাজ নিলেন। সে সঙ্গে সরকারি চাকরি পাওয়ারও চেষ্টা করছিলেন। মাঝে কিছুদিন একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে গবেষণা সহকারী হিসেবেও কাজ করেছেন। উপজেলা সমাজসেবা অফিসার হিসাবে কাজ পেয়ে তিনি প্রথম পোস্টেড হন মেহেরপুরে। রানু আনন্দের সঙ্গে বলছিলেন, 'আমি চাকরি পাওয়ার পর পরই ১০০ টাকা করে বয়স্ক ভাতা দেওয়ার চল শুরু হয়। সেটা ছিল একটা দারুন আনন্দের ব্যাপার। আমি যত্নবান থাকতাম ঠিক মানুষটি যেন ভাতা পান এবং যাদের পাওয়া উচিত তাদের কেউ যেন বাদ না যান। উপজেলা অফিসার হওয়ার সুবিধা ছিল গোটা এলাকা চষে বেড়াতাম। এসব কষ্টের ফল পেয়েছি ভালোবাসায়। অনেক অশীতিপর বৃদ্ধ নিজের পালা মুরগীর দুটি ডিম আমার জন্য যত্ন করে নিয়ে আসত বা অল্প একটু পায়েস করে আনত। আমার কাছে এসবের প্রাপ্তি ছিল অমূল্য।' 'একবার একটা মজার অভিজ্ঞতা হয়েছিল, ডা. রামগোপাল (ছদ্মনাম) এলাকার সম্মানী মানুষ। সকাল সকাল খবর পাঠালেন। গিয়ে শুনলাম তিনি এখনো মুক্তিযোদ্ধা ভাত পাননি। অথচ তিনি এ ভাতা না পেলে তার সংসার অচল হয় তা কিন্তু নয়। কিন্তু তিনি ব্যাপারটিকে সম্মানের প্রতীক হিসাবে দেখেন। আমি শুধু বললাম, সবই ঠিক আছে কিন্তু যেসব রিকশাওয়ালা বা সবজিবিক্রেতার এ ভাতা পেলে সংসার চালাতে সুবিধা হয় তাদের আগে দেওয়াই কি ভালো নয়? ডাক্তার সাহেব সমঝদার মানুষ ছিলেন, তিনি সম্মতি দিয়ে বলেছিলেন, নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।' 'মাঠের কাজেই আনন্দ পেতাম বেশি। এতিমখানা, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, দলিত-হরিজন জনগোষ্ঠির সঙ্গেও কাজ করেছি। আমার কর্মজীবনের প্রথম আড়াই বছর ছিলাম মেহেরপুরে, পরের সাড়ে সাত বছর কুষ্টিয়ায়। অনেক মানুষ দেখেছি, সে সঙ্গে পেয়েছি মানুষের ভালোবাসা। ঢাকায় আসি ২০০৯ সালে। ঢাকাতে কাজ বেড়ে যায় কয়েকগুণ, মানুষও এখানে বেশি। সবরকম মানুষই বেশি- বৃদ্ধ, এতিম, বিধবা, দলিত- মানে পিছিয়ে পড়া মানুষ। আমার কাজের ক্ষেত্র হলো লালবাগ, হাজারিবাগ, চকবাজার ইত্যাদি জায়গা। অনেক বেশি মানুষের উপকারে আসতে পারলে ভালোও লাগে বেশি। আমি হাত-পা ঝাড়া মানুষ। সংসার তো হলোই না।' এবার আর প্রশ্নটি না করে পারলাম না, আপনি নিজে কারো প্রেমে পড়েননি, মানে কাউকে আপনার ভালো লাগেনি? রানু আপা অদ্ভুত উত্তর দিলেন, 'একটা বিয়ে ভেঙেছে মানে যেন আপনার গায়ে একটা সিল পড়ে গেছে, একটা ব্ল্যাক স্পট। একটা বৃত্তের ভিতর বন্দিদশা। যেখানে যেখানে পোস্টিং হয়েছে সেখানে গিয়ে প্রথমেই বলেছি, আমার একটা ব্যাকগ্রাউন্ড আছে। সবারই শুনে রাখা ভালো। পরে যেন ব্যাপারটি নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতি না তৈরি হয়।' তখনো পরিস্কার উত্তর না পেয়ে আরেকবার তুললাম কথাটা, রানু আপা আপনার কাউকে ভালো লাগেনি? মানে আপনার কারো প্রতি অনুরাগ তৈরি হয়নি? রানু আপা বললেন, 'ভয়টা তো আমাকেই তাড়িয়ে বেড়িয়েছে বেশি। আমার বিয়ে ভেঙেছে- এ কথাটা সবচেয়ে বেশি তো আমারই মনে থাকে। তাই আমি নিজে থেকে কিছুই করতে যাইনি।' রানু আপা প্রথম ছোটমণি নিবাসের দায়িত্ব নিয়েছিলেন ২০১৬ সালে। মাঝখানে কিছুকাল ছিলেন ডে কেয়ার সেন্টারে। তারপর আবার তাঁকে নিবাসের দায়িত্বে দেওয়া হয়। তিনি এ পর্যন্ত নিবাসের প্রায় ২০০ শিশুকে দত্তকে দিয়েছেন। রানু আপা বলছিলেন, 'এই শিশুরাই আমার পরিবার। প্রতিটি শিশুরই আমি মা আর ওরা সবাই আমার সন্তান। কারো অ্যালার্জি বেশি, কেউ বেশি রোগী, কেউ অটিস্টিক- যে যেমনই হোক আমারই শিশু। এরা যখন অ্যাডপ্টেড হয় তখন বিচ্ছিন্ন হওয়ার কষ্টে কেউ কান্না ধরে রাখতে পারি না। আমাদের দুটি বাচ্চা দিনকয় আগেই আমেরিকায় গেল। যেদিন ফ্লাইট তার আগের রাত ওরা কান্নায় ভাসিয়েছে। অ্যাডপ্ট হওয়ার পর ওদের দেখতে যাওয়াটাও কল্যাণকর হয় না কারণ ওরা আমাকে ছাড়তে চায় না। অবশ্য যারা বেশি ছোট তাদের ভুলে যেতেও সময় বেশি লাগে না।' আনওয়ান্টেড বা পরিত্যক্ত শিশুদের আশ্রয়কেন্দ্র ছোটমণি নিবাস। এটি সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে। মাঝখানে কিছু সময় বাদ দিলে প্রায় সাত বছর ধরে এর উপতত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব পালন করছেন জুবলি বেগম রানু। ১ দিন বয়সী শিশু থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুও থাকতে পারে ছোটমণি নিবাসে। তখন নিবাস হয় তাদের ঘরবাড়ি। নিবাসের কর্মীরাই তাদের মা অথবা খালা কিংবা মামা। তাদেরকে বলা হয়, বাবা-মা তোমাদেরকে এখানে রেখে গেছে সময় হলেই এসে নিয়ে যাবে। রানু আপা বললেন, '৫০ বছর বয়স হয়ে গেছে এমন কাউকে আমরা বাচ্চা দিই না কারণ বাচ্চা প্রতিপালনের সামর্থ্য হয়তো তাঁর বেশিদিন থাকবে না। আবার জয়েন্ট ফ্যামিলিতেও বাচ্চা দিতে চাই না কারণ আক্রোশের শিকার হতে পারে। অ্যাডপ্ট করা বাচ্চা সাধারণত সম্পত্তির মালিক হয় না তাই বুঝে নিতে চাই তাদের ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ।' রানু আপা কবিতা শুনতে ভালোবাসেন। সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন তাঁর একটি প্রিয় বই। বেড়াতে খুব ভালোবাসেন। তাঁর এক বান্ধবী আছেন। গত বছর দুজনে মিলে আগ্রা, দিল্লী, কাশ্মিরতক ঘুরে এসেছেন। দিনকয় আগে গিয়েছিলেন সেন্টমার্টিন। আরেকবার দীর্ঘ ট্যুর দিয়েছিলেন উত্তরবঙ্গে। অবসর নেওয়ার আরো তিনবছর বাকি আছে তাঁর কিন্তু এরমধ্যেই একটা বেদনা তৈরি হচ্ছে। শিশুদের ছাড়া তিনি থাকবেন কী করে, কেমন করে? আশা করছেন 'শিশুদের জন্য সুন্দর বিশ্ব গড়ুন' স্লোগান নিয়ে বেড়িয়ে পড়বেন দেশে দেশে।
Published on: 2023-04-28 09:16:22.88474 +0200 CEST