The Business Standard বাংলা
সাশ্রয়ী অফশোর বায়ু বিদ্যুতে জ্বলবে বাতি, চলছে সম্ভাব্যতা যাচাই

সাশ্রয়ী অফশোর বায়ু বিদ্যুতে জ্বলবে বাতি, চলছে সম্ভাব্যতা যাচাই

জল-বিদ্যুতের নিম্ন সম্ভাবনা এবং সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভূমির সংকট থাকায় – শক্তি উৎপাদনের বিকল্প উৎস হিসেবে, বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে সরকার। বঙ্গোপসাগরে অফশোর উইন্ড ফার্ম গড়ে তোলার প্রাক-সম্ভাব্যতা এবং পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা অধ্যয়নে, নেদারল্যান্ডস-ভিত্তিক বিএলআইএক্স কনসালটেন্সি এবং তাদের যৌথ উদ্যোগ অংশীদারদের সাথে একটি চুক্তি করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি শুরু হয়েছে সম্ভাব্যতা যাচাই কাজ, এতে অর্থায়ন করছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। এর আওতায়, অফশোর বা সাগরে বায়ু বিদ্যুৎ উন্নয়নের সম্ভাব্য স্থানগুলোকে চিহ্নিত করার লক্ষ্য আছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব মো. হাবিবুর রহমান বিষয়টি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে নিশ্চিত করে বলেছেন, পরিবেশ-বান্ধব শক্তি উৎপাদনে সরকারের প্রচেষ্টার অংশ এই প্রকল্প। যৌথ উদ্যোগ-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক পরামর্শক দলের ডেপুটি টিম লিডার মো. শাহরিয়ার আহমেদ চৌধুরী জানান, তারা বঙ্গোপসাগরের অফশোর এলাকাগুলোয় বায়ু বিদ্যুতের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখবেন। সাগরে উইন্ড ফার্ম স্থাপনের উপযুক্ত স্থানও চিহ্নিত করবেন তারা। তিনি আরো ব্যাখ্যা করে বলেন, সাগরে জাহাজ চলাচল এবং চলমান বিভিন্ন খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের কাজ যেন অফশোর বিদ্যুত প্রকল্পে ব্যাহত নাহয়– সেদিকটাও তারা খতিয়ে দেখবেন। শাহরিয়ার ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর রিনিউয়েবল এনার্জি সার্ভিসেস লিমিটেড (সিআরইএসএল) এরও চেয়ারম্যান। তিনি জানান, বিদ্যমান সাগরতলের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত মডেলের বায়ুকল চিহ্নিতও করবেন তারা। ২০১৬ সালের বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা অনুসারে, ২০৩০ সাল নাগাদ মোট বিদ্যুতের ১০ শতাংশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ ৪০ শতাংশ – নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। আলোচিত সময়ে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা হবে যথাক্রমে ৪০ ও ৬০ গিগাওয়াট। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট সক্ষমতার মাত্র ৩.৬১ শতাংশ হলো নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা, যার প্রধান উৎসই হলো সৌর বিদ্যুৎ। তবে জমি সংকটের কারণে সৌর বিদ্যুতের প্রসার ব্যাহত হচ্ছে। এর আগে কক্সবাজার ও ফেনী জেলায় উপকূলীয় দুটি উইন্ড মিলের সাহায্যে বায়ু শক্তি ব্যবহারের চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ। তবে নিম্ন উচ্চতার মতোন কারিগরি ত্রুটির কারণে এসব স্থাপনা অলস পড়ে রয়েছে। ফলে বিকল্প উৎস হিসেবে সরকার এখন অফশোর বিদ্যুতের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে বলে জানান কর্মকর্তারা। সম্ভাব্যতা যাচাই বিষয়ে গত ১ মার্চ প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কনসোর্টিয়ামটি জানায়, স্বল্প ও মধ্য-মেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির দামের সমান বা তার চেয়ে সস্তা বিকল্প হবে নবায়নযোগ্য উৎস। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীনসহ বিশ্বের ১৯টি দেশে অফশোর বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের অবকাঠামো রয়েছে। এই বাস্তবতায়- কনসোর্টিয়ামটি সতর্ক করে বলেছে, এখন কয়লা বা গ্যাস-ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিনিয়োগ করা হলে ভবিষ্যতে তা আটকে থাকা সম্পদে পরিণত হতে পারে। ইংল্যান্ডের ইয়র্কশায়ারের উপকূল থেকে প্রায় ৮৯ কিলোমিটার দূরে সাগরে অবস্থিত হর্নসি-২ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উইন্ড ফার্ম। এর বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ১.৩ গিগাওয়াটের বেশি। এর আগে ২০১৭ সালে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরীক্ষাগারের এক গবেষণায় বলা হয়, বাংলাদেশে বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেণ্ডে ৫.৭৫ থেকে ৭.৭৫ মিটার, যা কাজে লাগিয়ে দিনে ৩০ হাজার মেগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা আছে। বর্তমানে বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে আটটি বায়ুকল প্রকল্প; তাদের মোট উৎপাদন সক্ষমতা ৩৫৭ মেগাওয়াট। এরমধ্যে কক্সবাজারে ৬০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প চলতি বছরের জুন নাগাদ চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া, টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় দেশের চারটি স্থানে বায়ু সম্পদ যাচাইয়ের একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। *বিশ্বব্যাপী নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনে গুরুত্ব পাচ্ছে বায়ুবিদ্যুৎ* ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেট জিরো নিঃসরণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের যাত্রায় বায়ুশক্তিকে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর অন্যতম উপায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সৌর বিদ্যুতের চেয়ে বায়ু বিদ্যুতের একটি বাড়তি সুবিধা হলো, বাতাসের গতি থাকলে- দিনরাত সবসময়েই এটি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। ২০২০ সালে বিশ্বে বৃহৎ পরিসরের উইন্ড ফার্মগুলোর মোট সক্ষমতা ছিল প্রায় ৩৪ গিগাওয়াট, ২০২৩ সাল নাগাদ যা ৩৩০ মেগাওয়াট হবে বলে তাদের প্রতিবেদনে প্রক্ষেপণ করেছে উড ম্যাকেঞ্জি। বাল্টিক সাগর তীরের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ৮ সদস্যসহ বেশকিছু দেশ তাদের অফশোর বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির অঙ্গীকার করেছে। ২০৩০ সাল নাগাদ বাল্টিক দেশগুলো তাদের বর্তমান ২.৮ গিগাওয়াট সক্ষমতাকে সাতগুণ বাড়াতে চায়। বর্তমানে এ অঞ্চলের সিংহভাগ উইন্ড ফার্ম রয়েছে জার্মানি ও ডেনমার্কের জলসীমায়। যুক্তরাষ্ট্রের বাইডেন প্রশাসনও তাদের 'ফ্লোটিং অফশোর উইন্ড শট' কৌশলপত্র প্রকাশ করেছে। এর আওতায়, প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদনে ফ্লোটিং প্রযুক্তির ব্যয় ৭০ শতাংশের বেশি কমিয়ে ৪৫ ডলারে নামিয়ে আনা, এবং ২০৩৫ সাল নাগাদ বায়ুবিদ্যুৎ সক্ষমতা ১৫ গিগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিবেদন অনুসারে, এর মাধ্যমে ৫০ লাখ বাড়িতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাবে।
Published on: 2023-04-29 19:47:39.787459 +0200 CEST