The Business Standard বাংলা
অর্থঋণ আদালতের দীর্ঘসূত্রিতায় যেভাবে উপকৃত হচ্ছে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা

অর্থঋণ আদালতের দীর্ঘসূত্রিতায় যেভাবে উপকৃত হচ্ছে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা

শীর্ষ ব্যাংকাররা ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের উপর প্রস্তাবিত কঠোর আইনকে স্বাগত জানিয়ে খেলাপি ঋণের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির আহ্বান জানিয়েছেন শীর্ষ ব্যাংকাররা। অর্থঋণ আদালতে করা মামলা নিষ্পত্তিতে অনেক বেশি সময় নেওয়ার কারণে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা সেখান থেকে সময়ক্ষেপণ করার সুযোগ নিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন ব্যাংকাররা। ব্যাংকারদের মতে, অর্থঋণ আদালতে এমন মামলাও আছে যেগুলো ৮ থেকে ১০ বছর ধরে ঝুলে থাকলেও সুরাহা হয় না। এছাড়া শুধু সময়ক্ষেপণই নয়, ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা আইনের নানা ফাঁকফোকর দিয়ে বের হয়ে যান। অনেকে আবার কোর্ট বা থেকে স্টে অর্ডার নিয়ে আসার কারণে মামলার চূড়ান্ত ফলাফল পেতে দীর্ঘসূত্রিতা বাড়ে। এসব কারণে ইচ্ছাকৃত খেলাপীদের থেকে পাওনা টাকা আদায়ে অর্থঋণ আদালতের সংস্কার দাবি করেছেন তারা। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন-২০২৩। নতুন এই সংশোধিত আইনের খসড়ায় ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের ডেফিনেশন দেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পারিবারিক কর্তৃত্ব কমাতে এক পরিবার থেকে পর্ষদের সদস্যসংখ্যা ৪ জন থেকে কমিয়ে ৩ জন করা হয়েছে। এছাড়াও ইচ্ছাকৃত ঋণ খেলাপিদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা, ব্যাংকের পরিচালক হওয়ায় বাধাসহ বেশ কয়েকটি সংশোধনী আনা হয়েছে নতুন আইনে। অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এর চেয়ারম্যান ও ব্র্যাক ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর সেলিম আর এফ হোসেন টিবিএসকে বলেন, "ব্যাংক কোম্পানি আইনের নতুন সংশোধনীতে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের নিয়ে যেসব কথা বলা হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে এটি ভালো একটি উদ্যোগ হবে।" এসব খেলাপিদের চিহ্নিত কি ব্যাংকগুলো করবে নাকি কেন্দ্রীয় ব্যাংক করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "এটি এখনো আমরা জানি না। তবে যারা টাকা থাকলেও ইচ্ছা করে শোধ করেন না অথবা ঋণ নেওয়ার পর থেকেই খারাপ উদ্দেশ্য থাকে, এটা ব্যাংক বুঝতে পারে।" ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের ক্ষেত্রে অন্য খেলাপিদের মতো আইনের ওপরই নির্ভর করতে হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমাদের দেশের সমস্যা এটাই যে, লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক খুব দূর্বল। অনেক বড় বড় ঋণখেলাপীরা কোর্ট থেকে স্টে অর্ডার নিয়ে আসেন, ফলে আমাদের করার কিছুই থাকে না। বিশ্বের অন্যান্য দেশে এটি করা যায় না।" "অর্থঋণ আদালতকে কীভাবে আরো কার্যকর করা যায় তা নিয়ে অনেকরকম সুপারিশ আছে। বছরখানেক আগে আমরা ল মিনিস্টার মহোদয়কে একটা ফোরামে বিষয়গুলো বলেছিলাম। বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টার (বিআইএসি) থেকেও একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ বলেছিলেন, বিষয়গুলো তারা দেখবেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছু করা হয়নি।" এসব বিষয় সংস্কার না করে যতকিছুই করা হোক না কেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে খুব বেশি উন্নতি হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। নতুন বিধান আসার সঙ্গেসঙ্গে সেগুলো কাজে লাগানোর বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন মন্তব্য করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি ব্যাংকের এমডি বলেন, "যাদের এগুলো বাস্তবায়ন করার কথা, তারা বিভিন্ন কারণে সেগুলো করতে পারেন না। অনেকরকম প্রভাবশালী পাওয়ারফুল পার্টি তাদের প্রভাব খাটানোর কারণে খেলাপি হওয়া বড় ঋণগুলো আটকে যায়।" প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের উদ্দেশ্য ঠিক থাকলে নতুন সংশোধনীর মাধ্যমেই ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঋণ কমিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব বলে মনে করেন মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। তিনি টিবিএসকে বলেন, "নতুন এ সংশোধনী একটি গুড মুভ টুয়ার্ডস দ্য রাইট ডিরেকশন। তবে চ্যালেঞ্জটা হয়ে দাঁড়ায় এসব নীতির বাস্তবায়ন নিয়ে। আমরা অর্থঋণ আদালতে যাওয়ার পর খেলাপিরা কোর্ট থেকে স্টে অর্ডার নিয়ে আসলে আমাদের কী করার আছে?" আদালতে একটা মামলার চূড়ান্ত ফল আসতে অনেকসময় ৮-১০ বছরের মতো সময় লাগে উল্লেখ করে তিনি বলেন, "আমাদের নেওয়া ডিপোজিটের মধ্যে একটি বড় অংশের ম্যাচুরিটি ২ বছরের কম। এক্ষেত্রে বড় ঋণগুলোর মামলা নিষ্পত্তিতে যদি এত সময় লেগে যায় তাহলে ব্যাংকেরও লিকুইডিটি ঠিক থাকেনা।" এ সমস্যাগুলো কীভাবে কাটানো যায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, "অর্থঋণ আদালতে কোনো রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার ক্ষেত্রে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে মার্জিন রাখা যেতে পারে। অর্থঋণ আদালতে মামলার ক্ষেত্রেও সেটি চালু করলে ঢালাওভাবে আপিল করাটা কমবে।" "সেইসঙ্গে বিচারক ও আদালতের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি হাইকোর্টে অর্থঋণ আদালতের জন্য আলাদা বেঞ্চ রাখতে হবে। প্রতি জেলায় সম্ভব না হলেও কাছাকাছি জেলাগুলো মিলিয়ে আলাদা আদালত করা যেতে পারে। এছাড়া বিচারকদের ট্রান্সফার হওয়ার কারণে নতুন বিচারক এসে মামলা স্টাডি করতেই অনেক সময় চলে যায়," যোগ করেন তিনি। ঋণগ্রহীতার আর্থিক সামর্থ সঠিকভাবে নিরুপণ করা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে ঢাকা ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং সিইও ইমরানুল হক বলেন, "এটা করা একটু কঠিন হবে, তবে সবাই চাইলে তাদের আর্থিক সামর্থ আছে কিনা, সেটি যাচাই করা সম্ভব। নতুন সংশোধনীতে যেসব পরিবর্তন আনা হচ্ছে সেগুলো বাস্তবায়ন করা গেলে খেলাপি ঋণ কমানো যেতে পারে।" এদের মধ্যে ইচ্ছাকৃত খেলাপি যারা আছেন, তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে খেলাপি ঋণ কমবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে এক পরিবারের ৪ জন সদস্য থেকে কমিয়ে ৩ জন করাতে তেমন কোনো পরিবর্তন হবে না উল্লেখ করে একটি ব্যাংকের এমডি বলেন, "আসল কথা হলো গভর্নেন্স। মালিকরা চাইলেই তাদের অনুগতদের পরিচালনা পর্ষদের বোর্ডে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন। সেখানে পরিবার থেকে সদস্যসংখ্যা কমিয়ে কী হবে?" "ব্যাংকগুলোর বোর্ডে ইন্ডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তবে বেশিরভাগ ব্যাংকেই এসব ডিরেক্টর আসলে ডিপেন্ডেন্ট। অনেক ডিরেক্টর ব্যাংক মালিক বা অন্য ডিরেক্টরদের আত্মীয়। এমনকি তারা যোগ্য হলেও কিছুক্ষেত্রে চক্ষুলজ্জার কারণে কোনোকিছু বলতে পারেন না," বলেন তিনি। তিনি আরো বলেন, "আবার এমনও ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর আছেন, যারা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের অফিসেই নিজের অফিস বানিয়েছেন। অধিকাংশ ব্যাংকেই তারা ব্যাংক মালিকের ইচ্ছাতেই এসব পদে আসেন।" কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থঋণ আদালত নিয়ে দেওয়া তথ্য বলছে, আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে খেলাপি ঋণ আদায়ে মামলা বাড়লেও নিষ্পত্তি হচ্ছে খুবই কম। ২০২২ সালের শেষে অর্থঋণ আদালতে ৭২ হাজার বিচারাধীন মামলার বিপরীতে আটকে আছে ১.৬৭ লাখ কোটি টাকা। গত বছরের জুন শেষে এটি ছিল ৬৯ হাজার মামলার বিপরীতে ১.৫৩ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে মামলা এবং আটকে থাকা টাকা, দুটোই বেড়েছে। অথচ এত টাকা দাবির বিপরীতে এই ছয় মাসে আদায় হয়েছে মাত্র ২১.০৮ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে বেসরকারি ব্যাংকের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এসব ব্যাংকের ৪৩ হাজার মামলার বিপরীতে ৮৮.৮৬ হাজার কোটি টাকা আটকে আছে। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বিচারাধীন ১৫ হাজার মামলার বিপরীতে পাওনার পরিমাণ ৭১.৭৬ হাজার কোটি টাকা।
Published on: 2023-04-03 08:16:33.062334 +0200 CEST