The Business Standard বাংলা
প্রযুক্তির ব্যবহারে চাষের আওতায় আসছে পতিত জমি

প্রযুক্তির ব্যবহারে চাষের আওতায় আসছে পতিত জমি

*খুলনার কয়রা উপজেলার হাতিয়াডাঙ্গার কৃষক সুভাষ মিস্ত্রি এবার সাড়ে ৭ কাঠা জমিতে বেগুন চাষ করতে পেরে সন্তুষ্ট। পানির অভাবে জমিটি প্রতি বছর এই সময়ে পতিত থাকলেও এবার পলিমালচ ও ড্রিপ ইরিগেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে চাষ উপযোগী করে তোলা হয়েছে।* কৃষক সুভাষ মিস্ত্রি টিবিএসকে জানান, "নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমেই এটি সম্ভব হয়েছে। ছোট পুকুর থেকে সোলার পাম্প দিয়ে পানি তুলে, তা আবার ড্রিপ ইরিগেশন প্রযুক্তির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে ও পরিমিত পরিমাণে প্রতিটি গাছের গোড়ায়  দিয়েছি। এই পদ্ধতিতে সেচ দেওয়ার পর দীর্ঘসময় পর্যন্ত মাটির রস বজায় থেকেছে। এতে সেচের খরচ কমেছে এবং গাছের বৃদ্ধিও ভালো হয়েছে।" জমিটিতে দেখা যায়, পানির ব্যবহার ও মাটির তাপমাত্রা ঠিক রাখতে জমির বেড (যে লাইনে চারা লাগানো হয়েছে) ঢাকতে ব্যবহার করা হয়েছে পলিমালচ (পলিথিনের ন্যয় বিশেষ কভার)। চারা গাছের গোড়ায় পলিমালচের কভারের অংশ কেটে সেখানে পাইপের মাধ্যমে সুইচিং করে পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। সুভাষ মিস্ত্রির মতো অনেক কৃষকই এখন খুলনা অঞ্চলে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের ফসল ও সবজি চাষ করছেন। এর আগে তারা জমিতে বছরে একবার ধান বা ফসল ফলাতে পারতেন। জমির একটি বড় অংশই তখন চাষের বাইরে থাকতো। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, খুলনা অঞ্চলের নিট ফসলি জমির পরিমাণ ৪.৭১ লাখ হেক্টর। এরমধ্যে ২.১৩ লাখ হেক্টর জমিতে শুধু আমনের চাষ হয়, অন্য সময় পানির অভাবে এই জমি ফাঁকা পড়ে থাকে। এছাড়া, ১.৮২ লাখ হেক্টর জমিতে দুই ফসল এবং ৭৩ হাজার হেক্টর জমিতে তিনটি ফসলের চাষ হয়। তবে এখন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের আওতায় খুলনার এক ফসলি জমি এবং পানির অভাবে যেসব জমিতে চাষ হয় না, সেগুলোকে চাষের আওতায় আনার জন্য 'অ্যাডাপটেশন টু ক্লাইমেট চেঞ্জ থ্রু ক্লাইমেট-স্মার্ট টেকনোলজিস ইন খুলনা অ্যাগ্রিকালচার রিজিওন প্রজেক্ট' বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সোলার পাম্পের মাধ্যমে ড্রিপ ইরিগেশন পদ্ধতি, পলিমালচ ব্যবহার, টাওয়ার ও বস্তা পদ্ধতিতে লবণাক্ততা কাটিয়ে চাষাবাদ, পতিত জমিতে মিনি পুকুর খনন করে পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এসব জমি চাষের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, এই প্রকল্পের মাধ্যমে ক্যাপসিকাম, শসা, টমেটো, বেগুন, মরিচসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ সম্প্রসারণ করা হয়েছে। সূর্যমুখী, ভুট্টা ও তরমুজের চাষও হচ্ছে এসব জমিতে। পাটনাখালি উপজেলার রঞ্জন সানা তিন বিঘা জমিতে এবার তরমুজ চাষ করেছেন। গত বছর ৩০ হাজার টাকা খরচ করে তরমুজ চাষ করলেও খরচের টাকাই তুলতে পারেননি তিনি। কারণ পানির অভাবে তখন সব গাছ মরে গিয়েছিল। "এবারও আমি একই জমিতে তরমুজের চাষ করেছি। নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিটি গাছের গোড়ায় পানি দিয়েছি। প্রতি বিঘা জমি থেকে এবার ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা করে তরমুজ বিক্রি হয়েছে," বলেন তিনি। ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে অ্যাডাপটেশন টু ক্লাইমেট চেঞ্জ থ্রু ক্লাইমেট-স্মার্ট টেকনোলজিস ইন খুলনা অ্যাগ্রিকালচার রিজিওন প্রকল্পটি ২০২১ সালের জুলাইয়ে বাস্তবায়ন শুরু হয়; এর মেয়াদ শেষ হবে ২০২৪ সালে। খুলনার ২৮টি উপজেলা ও ২টি মেট্রোতে বাস্তবায়িত হচ্ছে প্রকল্পটি। পানি ব্যবস্থাপনা, রিলে ও আন্তঃফসল চাষের মাধ্যমে একই জমিতে দুই ফসল, দুই ফসলি জমিতে তিন ফসল, স্থানীয় অভিঘাত সহনশীল ফল বাগান স্থাপন, লবণ সহিঞ্চু ফসলের আবাদ করে মোট ২৭,৫০০ হেক্টর জমিকে চাষের আওতায় আনা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক শেখ ফজলুল হক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "এই অঞ্চলের জমিকে চাষের আওতায় আনার উপযোগী কৃষি প্রযুক্তিগুলোকে কৃষকের মাঝে সম্প্রসারণের কাজ করা হচ্ছে। এই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো পানির অভাব, এজন্য পানির ব্যবস্থাপনাটাই এখানে বড় চ্যালেঞ্জ।" "আমরা যদি বর্ষার পানি ধরে রেখে তা প্রযুক্তির মাধ্যমে অন্য মৌসুমে ব্যবহার করতে পারি, তাহলে পতিত জমিগুলোকে আরও বেশি ফসল চাষের উপযোগী করে তোলা সম্ভব হবে," যোগ করেন তিনি। এদিকে কৃষকরাও বলছেন, জমিগুলোর পাশ দিয়ে সরকার যদি খাল খনন করে দেয়, তবে সেখানে বর্ষার পানি ধরে রাখা সম্ভব হবে এবং জমিগুলোতে নিয়মিত চাষাবাদ করাও সহজ হয়ে উঠবে।
Published on: 2023-04-30 15:46:54.488975 +0200 CEST