The Business Standard বাংলা
পাঞ্জাবের রত্নভান্ডার যেভাবে ইংরেজরা লুট করেছিল

পাঞ্জাবের রত্নভান্ডার যেভাবে ইংরেজরা লুট করেছিল

পাঁচ বছর আগে বাকিংহ্যাম প্রাসাদে প্রিন্স চার্লসের ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে রাজকীয় সংগ্রহে থাকা তার সবচেয়ে প্রিয় রত্নগুলোর প্রদর্শনী করা হয়। রয়্যাল কালেকশনের কিউরেটরের মতে, "রাজপুত্রের পছন্দ খুব চমৎকার।" ভাস্কর্য, চিত্রকর্মসহ অন্যান্য শিল্পের এই প্রদর্শনীতে ১৯টি সবুজ পান্না বসানো একটি লম্বা সোনার কোমরবন্ধও প্রদর্শনী করা হয়। কোমরবন্ধটি একসময় পাঞ্জাবের মহারাজা তার ঘোড়াকে পরাতেন। প্রদর্শনীটিতে এই রত্নটি রাখা কিছুটা অদ্ভুত, কারণ এর সাথে ভারতে ইংরেজদের শোষণের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। 'কস্ট অভ দ্য ক্রাউন' সিরিজের জন্য দ্য গার্ডিয়ান ঔপনিবেশিক ভারতের দায়িত্বে থাকা ইন্ডিয়া অফিস থেকে একটি ৪৬ পৃষ্ঠার নথি খুঁজে পেয়েছে। এই নথিটি মূলত একটি তদন্ত প্রতিবেদন। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের দাদী কুইন মেরি তার রত্নগুলোর উৎস কী সেটি খুঁজে বের করার জন্য এই তদন্ত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। ১৯১২ সালে এই রিপোর্ট থেকে জানা যায়, চার্লসের পান্নার বেল্টসহ আরও নানা মূল্যবান রত্ন কীভাবে ভারতের রাজাদের কাছ থেকে বলপূর্বক কেড়ে নিয়ে পরবর্তীতে রানী ভিক্টোরিয়াকে উপহার দেওয়া হয়। বর্তমানে এই সবগুলো রত্নই ইংরেজ রাজপরিবারের মালিকানাধীন বলে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। দুই ইংরেজ কর্মকর্তা ফ্যানি ইডেন ও তার ভাই জর্জের ডায়েরি থেকে জানা যায়, ১৮৩৭ সালে উত্তর ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যে ঘুরতে যান তৎকালীন গভর্নর জেনারেল। লাহোরের প্রাসাদে থাকা পাঞ্জাবের মহারাজা রণজিৎ সিংয়ের সাথে এর ছয় বছর আগে 'বন্ধুত্বের চুক্তি' করেছিল ইংরেজরা। ইডেন তার জার্নালে লেখেন, পাঞ্জাবের অর্ধেক অন্ধ রাজা তার গায়ে অসংখ্য মূল্যবান পাথর পরে ছিলেন। তার জার্নালের ভাষ্য অনুযায়ী, "মহারাজার রত্নের সংগ্রহ এতটাই বেশি যে তিনি তার সবচেয়ে মূল্যবান রত্নগুলো তার ঘোড়াকে পরিয়ে রেখেছেন। ঘোড়ার স্ট্র্যাপ আর আস্তাবল এতটাই জমকালো যে এগুলো কল্পনা করাও সম্ভব না।" জার্নালের পরে আরেক জায়গায় তিনি লেখেন, "আমাদের যদি এই রাজ্য লুটের সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে প্রথমেই আমি আস্তাবলের দিকে দৌড়াব।" ১২ বছর পর রণজিৎ সিংয়ের ছোট ছেলে এবং উত্তরাধিকারী দুলিপ সিং পাঞ্জাব ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিশাল বাহিনীর সামনে তার রাজ্য ইংরেজদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। অভিযানের অংশ হিসেবে কোম্পানি আস্তাবলের রত্নভান্ডার তো বটেই, রাজার সবচেয়ে মূল্যবান রত্নটিও কেড়ে নেয়। সেটি হলো কোহিনূর হীরা। কোহিনূর হীরা এখন আছে টাওয়ার অভ লন্ডনে প্রদর্শিত রানী এলিজাবেথের মুকুটে, যা হয়ে উঠেছে ঔপনিবেশিক ভারতে ইংরেজদের শোষণের প্রতীক। কোহিনূরের ওপর বই লেখা ইতিহাসবিদ এবং সাংবাদিক অনিতা আনন্দের মতে, "ঔপনিবেশিক আমলে ভারতের ওপর ইংরেজ মুকুটের একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রতীক এই হীরা।" ১৮৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত সরাসরি ইংরেজ রাজপরিবারের শাসনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন তিনি। কোহিনূরকে তিনি এক কিশোর রাজপুত্রের সাথে তুলনা করেন, যে ছোটবেলাতেই তার মায়ের কাছ থেকে আলাদা হয়ে পড়ে। আনন্দ বলেন, "হীরাটিকে নিজ দেশ থেকে বহুদূরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তারপর কেটে ছোট করে ফেলা হয়েছে। ভারত এখন নিজেকে এভাবে দেখে না।" বাকিংহ্যাম প্রাসাদও ঔপনিবেশিক সময়ে লুট করে নিয়ে যাওয়া রত্নগুলো নিয়ে ভারতের সংবেদনশীলতা নিয়ে সচেতন। তাই রাজা চার্লসের অভিষেকের সময় যখন কুইন কনসোর্ট কামিলা কোহিনূর পরার ঘোষণা দেন, তখন বাকিংহ্যাম প্রাসাদ কর্তৃপক্ষ জানায় তিনি অন্য হীরা পরে অনুষ্ঠানে আসবেন। তবে কুইন মেরি যেমনটা জানতে পেরেছিলেন, কোহিনূরই রণজিৎ সিংয়ের রত্নভাণ্ডার থেকে লুট করা একমাত্র রত্ন নয়, যেগুলো ইংরেজ রাজপরিবারের হাতে পৌঁছেছে। *রাজকীয় মুক্তার নেকলেস* গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান থেকে বের হয়ে আসা রত্নগুলোর মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অলঙ্কার হলো চারটি বিশালাকার লালরঙা চুনিপাথর বসানো ছোট একটি নেকলেস। এই নেকলেসের মধ্যে সবচেয়ে বড় পাথরটি ৩২৫.৫ ক্যারাটের একটি স্পিনেল পাথর। 'তিমুর রুবি' নামের এই পাথরটির পরিচয় পরে অনুসন্ধান করে জানা গিয়েছিল। তবে ১৯৯৬ সালে গবেষক সুসান স্ট্রংয়ের গবেষণা থেকে জানা যায়, এই রত্নটির সাথে বিখ্যাত মোঙ্গল তৈমুর লংয়ের কোনো যোগসূত্র নেই। এমনকি এটি একটি স্পিনেল পাথর, যা চুনি থেকে আলাদা। ১৯৬৯ সালের বিবিসি ডকুমেন্টারিতে রানী এলিজাবেথের হাতে এই রত্নটিকে দেখা যায়। সুসান জানান, "এর ইতিহাস খুবই চমকপ্রদ। বহু পারস্য আর মোগল সম্রাটের হাত ঘুরে শেষমেষ এটি ইংল্যান্ডে রানী ভিক্টোরিয়ার হাতে পৌঁছেছিল।" তবে রানী ভিক্টোরিয়ার কোনো ছবিতেই এই রত্নটিকে পরতে দেখা যায়নি। তবে তিনি লাহোর থেকে আসা আরেকটি গহনা পরেছিলেন। ইন্ডিয়া অফিসের প্রতিবেদন থেকে জানা যায় গহনাটি হলো '২২৪টি বড় আকারের মুক্তা বসানো নেকলেস'। লেসলি ফিল্ডের রাজকীয় গহনার ওপর গবেষণা থেকে জানা যায়, "কুইন মাদাদের অন্যতম আকর্ষণীয় গহনাটি হলো দুই সারিতে বাঁধানো একটি মুক্তার নেকলেস, যেটি '২২২টি মুক্তা আর দুটো চমৎকার রুবি' দিয়ে তৈরি, যা একসময় পাঞ্জাবের রাজার মালিকানাধীন ছিল।" ২০১২ সালে নিজের শাসনামলের হীরক জয়ন্তী উপলক্ষে রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ লন্ডনের রয়্যাল অপেরা হাউজের এক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে আসেন। ছবিতে দেখা যায়, তিনি একটি মুক্তার একটি নেকলেস পরে আছেন। এগুলোই কি রণজিৎ সিংয়ের নেকলেস? অনেকেই মনে করেন এটি সেই হারটিই, তবে বাকিংহ্যাম প্রাসাদ সেটি নিশ্চিত করতে পারেনি। নিজের গহনার রত্নগুলোর উৎপত্তি নিয়ে কুইন মেরির এই তদন্তের আদেশ কোনো নৈতিক কারণে আসেনি, তিনি এগুলো ফিরিয়ে দিতেও চাননি। তিনি এ কাজ করেছিলেন কেবল আগ্রহের বশবর্তী হয়ে। এ বিষয়ে জাতিসংঘের সাবেক কর্মকর্তা এবং বর্তমানে ভারতের সাংসদ শশী থারুর বলেন, "আমরা এমন এক যুগে পৌঁছেছি, যখন ঔপনিবেশিক আমলের লুটপাটকে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে যে, এগুলো আসলেই লুটপাট ছিল, কোনো 'দেশকে সভ্য করে তোলার অভিযান নয়'।" "আর তাই আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি, এসব লুটপাট করা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়ার পরিমাণ বাড়ছে। এবং এটা ভালো ব্যাপার। পরবর্তী প্রজন্ম ভাববে,  এই 'সভ্য দেশগুলো' এই সঠিক কাজ করতে কেন এত দেরি করল।" *সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান*
Published on: 2023-04-07 16:48:05.191793 +0200 CEST