The Business Standard বাংলা
ইডিএফ’র আকার ৭ বিলিয়ন ডলারে ফিরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ ব্যবসায়ীদের

ইডিএফ’র আকার ৭ বিলিয়ন ডলারে ফিরিয়ে নেওয়ার সুপারিশ ব্যবসায়ীদের

এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) এর আকার কমানোর পাশাপাশি এই তহবিল থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ কমিয়ে দেওয়াসহ সুদহার বাড়ানোর কারণে রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়ে ব্যবসায়ীরা এই তহবিলকে পূর্বাবস্থায় ফেরত নেওয়ার সুপারিশ করেছেন। রোববার (৩০ এপ্রিল) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত 'বাণিজ্য সহায়ক পরামর্শক কমিটি'র সভায় ব্যবসায়ীরা আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে কনজাম্পশন কমে গেছে। বাংলাদেশের রপ্তানিতেও তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাছাড়া সরকার কয়েক দফা গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর কারণে ব্যবসার খরচ বেড়েছে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা আরও কমে গেছে। ব্যবসায়ীরা বলেছেন, তৈরি পোশাকসহ সামগ্রিক রপ্তানিতে নেতিবাচক ট্রেন্ড দেখা দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইডিএফ এর আকার যেভাবে কমানো হচ্ছে এবং সুদহার বাড়ানো হচ্ছে, তাতে আগামী মাসগুলোতে রপ্তানি আরও কমে যেতে পারে। তারা ইডিএফ এর আকার বাড়িয়ে আগের মতো সাত বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করাসহ পূর্বের সুদহার পুনঃবহাল করার দাবি করেছেন। রপ্তানির উপর সোর্স ট্যাক্স ১% থেকে কমিয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য ০.২৫% নির্ধারণ করা ও রপ্তানির বিপরীতে দেওয়া নগদ প্রণোদনার উপর বিদ্যমান ১০% কর কমিয়ে ৩% নির্ধারণ করার প্রস্তাব করেছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া, নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা এবং প্রত্যাবাসিত রপ্তানি আয়ের ভিত্তিতে নগদ প্রণোদনা ছাড় করার সুপারিশ করেছেন তারা। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তা ছাড়াও ব্যবসায়ি সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আমদানি-রপ্তানি পরিস্থিতি পর্যালোচনাসহ করণীয় নির্ধারণ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আগামী বছরের মধ্যে ৮০ বিলিয়ন, ২০৩১ সালের মধ্যে ১৫০ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১৪ সালের মধ্যে ৩০০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি লক্ষমাত্রা নিয়ে ব্যবসায়ীদের কাজ করতে আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এই লক্ষমাত্রা অর্জনে প্রস্তুতি নিতে ব্যবসায়ীদের অনুরোধ করে তিনি বলেন, ইডিএফ নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের কথা লিখিতভাবে বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে জানাবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। সভায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন সদস্য ও বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ডিরেক্টর উপস্থিত ছিলেন। তারা ব্যবসায়ীদের উদ্বেগের কথা নিজ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীদের জানাবেন বলে উল্লেখ করেছেন। ইডিএফের আকার এতদিন ছিল ৭ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আইএমএফ'র শর্ত অনুযায়ী নিট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আগামী জুনের মধ্যে ২৪.৪৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে এ তহবিল থেকে ডলার নিয়ে রিজার্ভে যোগ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে ইডিএফ তহবিলের পরিমাণ ৫ বিলিয়ন ডলার। এছাড়া, তহবিল থেকে ঋণ নিতে ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহিত করতে কয়েক দফায় ইডিএফ ঋণের সুদহার বাড়ানোর পাশাপাশি ঋণের পরিমাণও কমানো হয়েছে। বাণিজ্য সহায়ক পরামর্শক কমিটির সভায় উপস্থিত ছিলেন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ এর সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন। সভা শেষে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে তিনি বলেন, "বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় ইতোমধ্যে আমাদের রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থার মধ্যে ইডিএফ কমানো, সুদের হার বাড়ানো এবং গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ার মতো ঘটনা ঘটছে। ফলে সামগ্রিকভাবে আগামীতে রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব থাকার আশঙ্কার কথা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।" "ব্যবসার খরচ বাড়ছে, ব্যবসায়ীরা কঠিন সময় পার করছে। এমন সময় এনবিআরসহ বিভিন্ন সংস্থা ইন্সপেকশনের নামে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করছে। পণ্যমান পরীক্ষার জন্য বিএসটিআই, বুয়েট, বাংলাদেশ কাউন্সিল অব সায়েন্টিফিট অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল রিসার্চ (বিসিএসআইআর) সহ বিভিন্ন জায়গায় পাঠিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। এ ধরনের হয়রানি বন্ধ করতে আমরা এনবিআরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে অনুরোধ করেছি," যোগ করেন তিনি। তিনি আরো বলেন, "সরকার ইকোনমিক জোনের বাইরে স্থাপিত শিল্প কারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ দিতে নিরুৎসাহিত করছে। সরকারের এমন সিদ্ধান্তের কারণে ইতোমধ্যে ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি কমছে। অথচ ইকোনমিক জোনগুলো বিনিয়োগের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হতে প্রায় পাঁচ বছর লাগবে। এ সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছেন ব্যবসায়ীরা।" বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স এন্ড এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন এর এক্সিকিউটিভ প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম টিবিএসকে বলেন, রপ্তানিকারকরা দীর্ঘদিন ধরে কাস্টমস সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন, যার সমাধান চেয়েছেন তারা। তিনি বলেন, "বস্ত্রখাতে নগদ সহায়তা দেওয়ার পদ্ধতি বেশ জটিল। ফলে অনেকে দুর্নীতির সুযোগ পাচ্ছে। অন্য খাতগুলোতে রপ্তানি আয় প্রত্যাবাসনের ভিত্তিতে নগদ সহায়তার অর্থ দেওয়া হয়, কিন্তু বস্ত্রখাতের নগদ সহায়তা দিতে অডিটসহ নানা জটিল প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়।" হাতেম বলেন, "এই সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কর্মকর্তাদের নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি হয়েছিল। ওই কমিটি প্রত্যাবাসিত রপ্তানি আয়ের বিপরীতে নগদ সহায়তা দেওয়ার সুপারিশসহ প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রণালয়ে জমা দিলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সভায় এটি বাস্তবায়ন করার পক্ষে সবাই একমত হয়েছে।" গতবছর নন-বন্ডেড রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা নিয়ে জটিলতা হয়েছিল। তা দূর করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে গঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের ব্যাক টু ব্যাক এলসি খোলা অব্যাহত রাখার জন্য আমদানি নীতি আদেশ, ভ্যাট পলিসি এবং ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসিতে কিছু বিষয় সংশোধনের সুপারিশ করে। তা এখনও কার্যকর হয়নি। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন না হওয়ায় ব্যবসায়ীরা হতাশা প্রকাশ করে দ্রুত কার্যকর করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন বলে জানান মোহাম্মদ হাতেম।
Published on: 2023-05-01 10:34:40.803305 +0200 CEST