The Business Standard বাংলা
গ্যাস নেটওয়ার্কের লিকেজ দূর করতে ১২,০০০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব তিতাসের

গ্যাস নেটওয়ার্কের লিকেজ দূর করতে ১২,০০০ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব তিতাসের

সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে গ্যাস পাইপলাইনে লিকেজের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। এই বাস্তবতায় এ দুই এলাকায় তাদের কয়েক দশক পুরোনো গ্যাস পাইপলাইন মেরামত ও বদলানোর একটি প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ করছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব অনুসারে, রাষ্ট্রায়ত্ত গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানিটি জুলাই থেকে ১২,৪১৬ কোটি টাকার প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু করবে। তবে এজন্য প্রথমে মোট ব্যয়ের ৩৮ শতাংশ বৈদেশিক ঋণ পেতে হবে তাদের। মাটির নিচে স্থাপিত সঞ্চালন পাইপলাইনের লিকেজ থেকে প্রায়ই গ্যাস নিঃসৃত হচ্ছে, মাঝেমধ্যেই যা ভয়াবহ বিস্ফোরণের কারণও হচ্ছে। এতে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। যেমন- গত ৫ মার্চ ভোরে রাজধানীর মিরপুর রোডের সায়েন্স ল্যাবে অবস্থিত প্রিয়াঙ্গন শপিং সেন্টারে এক গ্যাস বিস্ফোরণে তিন জনের প্রানহানি হয়, আহত হন ৫০ জন। প্রকল্পের বিষয়ে জানতে চাইলে তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ডিভিশন) রাজীব কুমার সাহা টিবিএসকে বলেন, "উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন পেতে প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাব ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) এবং পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে মূল প্রকল্প প্রস্তাবও অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।" প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুসারে, মোট ব্যয়ের ৭,৬৬৯ কোটি টাকা দেবে সরকার, আর ৪,৭৩৩ কোটি টাকা বিভিন্ন দাতা সংস্থার থেকে পাওয়া যাবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। কোম্পানিটি নিজস্ব তহবিল থেকেও ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। তিতাসের কর্মকর্তারা জানান, দেড় বছর সমীক্ষার পর এই প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিতাসের প্রায় ২,৭০০ কিলোমিটার পাইপলাইন পরিবর্তন করতে হবে। কোম্পানির পাইপলাইনের মোট দৈর্ঘ্য ১৩,২৩৮ কিলোমিটার এবং ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত মোট গ্রাহক সংখ্যা হলো- ২৮,৭৫,৮১৩। প্রকল্প প্রস্তাবে তিতাস গ্যাস জানায়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ১৯৭০ থেকে ৮০'র দশকের শেষদিকে তাদের গ্যাস সরবরাহ লাইনগুলো স্থাপন করা হয়। পরবর্তীকালে শহরের পরিধি বিস্তারের সাথে সাথে সঞ্চালন নেটওয়ার্কও বিস্তার করা হয়। কিন্তু, কালক্রমে এসব লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অন্যান্য পরিষেবার লাইন নির্মাণের সময় এখনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এসব কারণে, ধাতুর জং ধরা রোধে বহুল ব্যবহৃত – পাইপলাইনের ক্যাথডিক সুরক্ষা ব্যবস্থা নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে ছিদ্র হয়ে গ্যাস নিঃসৃত হচ্ছে। লিকেজের ফলে অগ্নি-দুর্ঘটনাসহ জন-নিরাপত্তা-জনিত অন্যান্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে। গ্যাস সরবরাহ পেতেও ব্যাপক সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে গ্রাহকদের। তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তাদের মতে, ভবিষ্যৎ চাহিদার কথা মাথায় রেখে প্রাথমিকভাবে ৩০ বছরের জন্য বিতরণ লাইনের নকশা করা হয়। কিন্তু, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরের ক্রমবর্ধমান পার্শ্বীয় ও ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের কারণে বিতরণ নেটওয়ার্কের গ্যাস প্রবাহ সক্ষমতা ক্রমে অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর গ্যাস প্রবাহে নিম্ন-চাপের সমস্যার উন্নতি হবে, গ্যাস লিকেজ-জনিত দুর্ঘটনাও অনেকাংশে কমবে। গ্যাস লিকেজ বন্ধের মাধ্যমে প্রকল্পটি মিথেন নিঃসরণ কমাবে বলেও জানান তারা। *বৈদেশিক তহবিল প্রাপ্তির চেষ্টায় প্রকল্প কাজে দেরি হতে পারে* সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি প্রথমে সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করে তিতাস। কিন্তু, সরকারি তহবিলের ওপর চাপ কমাতে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিতাসের এক কর্মকর্তা টিবিএসকে জানান, "সম্প্রতি সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নে উদ্দেশ্যে মূল প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তিতাসের পক্ষ থেকে পেট্রোবাংলার মাধ্যমে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠানো হয়। কিন্তু, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ বৈদেশিক ঋণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেয়। এ কারণে অনুমোদনের জন্য মূল ডিপিপি না পাঠিয়ে প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। কারণ, উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে ঋণ চাওয়ার আগে পিডিপিপি-তে পরিকল্পনা কমিশন থেকে নীতিগত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।" তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, বৈদেশিক ঋণ প্রস্তাবের কারণে প্রকল্পের বাস্তবায়নে বিলম্ব হতে পারে। কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)- এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, "বৈদেশিক ঋণ প্রস্তাবের কারণে জরুরি এই প্রকল্পটি ঝুলে যেতে পারে। প্রকল্প বাস্তবায়নের পুরো টাকা তিতাস তার নিজস্ব তহবিল থেকেই দিতে পারে। প্রয়োজনে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে বরাদ্দ নিতে পারে।" "উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অর্থায়ন পেলে ভালো, কিন্তু তাদের অর্থায়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি সময়-সাপেক্ষ । ফলে এই ধরনের জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প সংস্থার নিজস্ব তহবিল এবং সরকারি তহবিলের অর্থায়নে বাস্তবায়ন করাই ভালো"- যোগ করেন তিনি। *সেবার মান উন্নয়নে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার* প্রাথমিক প্রস্তাবনা অনুযায়ী, তিতাস গ্যাস তাদের পুরনো সরবরাহ নেটওয়ার্ক পরিবর্তন ও মেরামত; গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি; নিম্নচাপের বর্তমান অবস্থার উন্নতি এবং গ্যাস লিকেজ রোধের মাধ্যমে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এবং এই বিশাল নেটওয়ার্কের আরও ভাল পরিকল্পনা, উন্নতি, বিশ্লেষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনার সুবিধার্থে – এই প্রকল্পটির আওতায় ঢাকা শহর এবং নারায়ণগঞ্জ পৌরসভায় তিতাস গ্যাসের বিতরণ নেটওয়ার্ককে একটি সমন্বিত জিআইএস (জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সিস্টেম) এর আওতায় আনা হবে। সমগ্র গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্কের জন্য এলাকা এবং সুপারভাইজরি কন্ট্রোল অ্যান্ড ডেটা অ্যাকিউজেশন সিস্টেম (এসসিএডিএ বা স্কাডা) স্থাপন করা হবে। স্কাডা হচ্ছে – হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের এমন একটি সমন্বিত ব্যবস্থা যা সচল প্রযুক্তির রিয়েল-টাইম ডেটা সংগ্রহের মাধ্যমে শিল্প প্রক্রিয়াকে স্বয়ংক্রিয় করতে সাহায্য করে। ঢাকায় দুটি সিটি কর্পোরেশনের অধীন ৬০টি নির্বাচিত এলাকায় এবং নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২৭টি এলাকায় আধুনিক গ্যাস অবকাঠামো গড়ে তোলাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। *গ্যাস পাইপলাইন লিকেজের কারণে হওয়া বড়  দুর্ঘটনাগুলো* ২০২১ সালের জুন মাসে রাজধানীর মগবাজার এলাকার একটি ভবনে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটে। পরে তদন্তে জানা যায়, তিতাস গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন পাইপলাইন থেকে গ্যাস জমে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে এবং গুলিস্তানের সিদ্দিক বাজারের একটি ভবনে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের পেছনে একই রকম কারণ সন্দেহ করছে পুলিশ। মগবাজার, সায়েন্স ল্যাব ও সিদ্দিক বাজারে এসব বিস্ফোরণে মোট ৩৯ জনের অকালমৃত্যু হয়েছে। এছাড়া, প্রায় দেড় বছর আগে, নারায়ণগঞ্জের একটি মসজিদে বিস্ফোরণ ঘটে, যাতে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্যও গ্যাস পাইপলাইনের লিকেজকে দায়ী করা হয়েছে। ২০২১-২২অর্থবছরে তিতাস ১,৬৮২ কিলোমিটার পাইপলাইনের অবস্থা যাচাই করার জন্য একটি সমীক্ষা পরিচালনা করেছিল। সমীক্ষায় পাইপলাইন বরাবর ৯,৯২৬টি স্থানে মিথেনের উপস্থিতি চিহ্নিত করা হয়। এতে ৪৫৯টি ছিদ্র চিহ্নিত হওয়ার পর পরবর্তীতে সেগুলো মেরামত করা হয়। তবে কর্মকর্তারা উদ্বেগ তুলে ধরে জানিয়েছেন, ওই সমীক্ষা যদি তাদের পুরো পাইপলাইন নেটওয়ার্কের ওপর করা হতো, তাহলে অতিরিক্ত অনেক লিকেজ চিহ্নিত করা যেত। তাছাড়া, জরিপটি গৃহস্থালি গ্রাহক পর্যায়েও পরিচালিত হয়নি।
Published on: 2023-05-17 19:32:59.723137 +0200 CEST