The Business Standard বাংলা
ঝুঁকি কমাতে ঋণ গ্যারান্টি কমাবে সরকার

ঝুঁকি কমাতে ঋণ গ্যারান্টি কমাবে সরকার

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রের বৈদেশিক ঋণের বোঝা কমাতে তাদের ঋণ গ্যারান্টি দেওয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর পরিকল্পনা করছে সরকার। অর্থমন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানায়, নতুন এই ব্যবস্থার আওতায়, টিসিবির ভর্তুকি মূল্যে খোলাবাজারে নিত্যপণ্য বিক্রয় এবং সার আমদানির মতোন জনস্বার্থে একান্ত দরকারি বলে বিবেচিত এমন কর্মকাণ্ড ছাড়া সরকারি প্রকল্প বা প্রতিষ্ঠানের ঋণ গ্যারান্টি দেওয়া বন্ধ করবে সরকার। এই কৌশলগত পদক্ষেপটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি করবে বলে আশা করা হচ্ছে, বিশেষত সেইসব প্রতিষ্ঠানের - যারা দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে চলছে এবং সরকারি সহায়তার উপর অত্যধিক নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। *মুনাফা ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্য* ব্যালান্স শিট বা স্থিতিপত্র দুর্বল এমন প্রতিষ্ঠানের সরকারি গ্যারান্টিতে ঋণ পাওয়ার সুযোগ কমিয়ে মুনাফা ও আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সরকার তাদের উৎসাহ দিতে চায়। ২০১৯ সালের পর থেকে এপর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর দেশীয় ও বৈদেশিক উৎস থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে সরকারি গ্যারান্টির পরিমাণ প্রায় ৭০ শতাংশের মতো উচ্চ হারে বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৯২ হাজার ৬০২ কোটি টাকা ঋণের বিপরীতে সরকারের গ্যারান্টি ছিল। তিন বছর আগে যার পরিমাণ ছিল ৫৭ হাজার কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের ধারণা, চলতি অর্থবছর শেষে সরকারের গ্যারান্টির পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ৯৮ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার নেট গ্যারান্টি বাড়ছে। উচ্চ সুদহারের বৈদেশিক ঋণের বোঝা যেন আরো না বাড়ে- সেজন্য আগামীতে এ ধরনের গ্যারান্টি দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক থাকার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা। *গ্যারান্টির অনুরোধ প্রত্যাখ্যান* অর্থবিভাগের একজন কর্মকর্তা টিবিএসকে জানান, ইতোমধ্যেই কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের গ্যারান্টির প্রস্তাব ফেরত দেওয়া হয়েছে। কারণ সরকার চড়া সুদে বৈদেশিক ঋণ বাড়াতে চায় না। যেহেতু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক বা অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ সাধারণত বাজারভিত্তিক হারে হয়ে থাকে। নীতি ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আর্থিক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের নেওয়া ঋণে গ্যারান্টি বা কাউন্টার গ্যারান্টি দিয়ে থাকে সরকার। এসব ঋণের অর্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান সময়মত পরিশোধে ব্যর্থ হলে, তা পরিশোধের দায়-দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়। কাজেই সরকারের ভবিষ্যত আর্থিক অবস্থার ওপর এর প্রভাব রয়েছে। *আর্থিক অবস্থা উন্নতির জন্য আইএমএফের পরিকল্পনা* সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে ঋণ নিতে গিয়ে সংস্থাটির পরামর্শ অনুসারে ১০০ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ফাইন্যান্সিয়াল স্টেটমেন্ট উন্নয়ন এবং ঝুঁকি কমানোর ঘোষণা দিয়েছে। যেখানে গ্যারান্টি ঝুঁকিও রয়েছে। বৈশ্বিক ঋণদাতাটি সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বাড়ানোর জন্য নীতি কাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী ও আধুনিকীকরণের কথা বলেছে। আইএমএফের শর্ত অনুসারে, সরকারকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট ডকুমেন্টেশনের অংশ হিসাবে- রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, গ্যারান্টি, এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি)-গুলোর বড় ঝুঁকি উল্লেখ করে একটি 'আর্থিক ঝুঁকি বিবৃতি' প্রকাশ করতে হবে। মনিটরিং সেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠানকে নিয়ে এ প্রক্রিয়ার কাজ শুরু হয়েছে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে, মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির বিপরীতে বাংলাদেশের ঋণ অনুপাতকে সহনীয় বলেছে আইএমএফ। বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির ৩৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ ঋণ রয়েছে। আইএমএফ মনে করে, বড় কোনো সমস্যা ছাড়াই জিডিপির ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবে বাংলাদেশ। তবে ঋণভার কম হলেও সরকার উচ্চ সুদের ঋণ গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক। *রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি* সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ সরকারের এই উদ্যোগকে সমর্থন করে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার স্বার্থে এটা প্রয়োজন। এছাড়াও, বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রে বিশেষত বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে সতর্ক অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন। বেশিরভাগ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ব্যাপক অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা এবং দুর্নীতি কবলিত এমনটা উল্লেখ করে  বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন-ও গ্যারান্টি কমানোর পক্ষে সরকারের যুক্তি স্বীকার করেন। ব্যবস্থাপনার দক্ষতা উন্নয়ন, অনিয়ম বন্ধ করা,  লাভজনক করার প্রচেষ্টাসহ এসব প্রতিষ্ঠানের উন্নতি সাধনে ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। নতুবা বেসরকারিকরণ করা বা বন্ধ করে দেওয়া যেতে পারে বলেও পরামর্শ দেন। *বেশিরভাগ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান লোকসানে* অর্থবিভাগের কর্মকর্তারা বলেছেন, বেশিরভাগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান লোকসানী। কারণ তারা সম্পদের যথাযথ ব্যবহার করতে পারছে না। আবার অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতিও রয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে বাড়তি জনবল থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে কাজ থাকছে না। ফলে তাদের পক্ষে ঋণ পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। অর্থবিভাগের কাছে প্রায়ই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ঋণের অর্থ চেয়ে আবেদন করে। আবার অনেকে ঋণের সুদ অর্থ বিভাগ থেকে চায়। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংক এন্টারপ্রাইজ 'গ্রোথ অ্যান্ড ব্যাংক মর্ডানাইজেশন' প্রকল্পের ঋণের সুদ মওকুফ করার অনুরোধ করে অর্থ বিভাগে চিঠি দিয়েছে। অর্থাৎ, দিনশেষে সরকারকেই এ অর্থ পরিশোধ করতে হয় বলেও জানান তারা। জানা গেছে, কৃষি ব্যাংক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছে। কিন্তু, এসব ব্যাংকের আয় বাড়েনি। ঋণও সময়মত পরিশোধ করেনি। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সরকার গ্যারান্টির মেয়াদও বাড়িয়েছে। একইভাবে ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে পারছে না। বাজেট থেকে ভর্তূকির মাধ্যমে বরাদ্দ দিয়ে এই ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। সম্প্রতি টিসিবির রাইস ব্রান তেল কেনার একটি প্রস্তাবে গ্যারান্টি দেয়নি অর্থ বিভাগ। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-ও একই অবস্থার সম্মুখীন হয়েছে। বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষ যদিও দাবি করছে তারা ঋণ নিজেরাই পরিশোধ করছে। কিন্তু, বিপিসিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তাদের বকেয়া রয়েছে। বাংলাদেশ বিমান দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে উড়োজাহাজ, উড়োজাহাজের স্পেয়ার পার্টস কিনেছে। এই সংস্থার প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে সরকারের গ্যারান্টি রয়েছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শফিউল আজিম আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনা করে সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। এতে বিমান বাংলাদেশের সমস্যা হবে না। কারণ বিমান নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করছে। ( /bangla/%E0%A6%85%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%A4%E0%A6%BF/news-details-147898 ) ঋণ গ্যারান্টারদের জন্য আর সহজে গা বাঁচানোর পথ নেই ( /bangla/%E0%A6%85%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A5%E0%A6%A8%E0%A7%80%E0%A6%A4%E0%A6%BF/news-details-147898 ) *বিদ্যুৎকেন্দ্রের বৈদেশিক ঋণে সরকারের গ্যারান্টি* সরকারের গ্যারান্টির বড় অংশ বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের বিপরীতে দেওয়া। বিদেশি ব্যাংক থেকেই এসব ঋণ নেওয়া। এ খাতে সরকার ৪৯ হাজার ৫১৫ কোটি টাকার ঋণের বিপরীতে গ্যারান্টি দিয়েছে। ১৮টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিপরীতে এসব গ্যারান্টি রয়েছে। যদিও এরমধ্যে কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হয়নি। আবার কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র জ্বালানির অভাবে ঠিকমত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারছে না। এছাড়া, চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের দুটি প্রতিষ্ঠানের ঋণের বিপরীতে সরকারের গ্যারান্টি রয়েছে। চিনিকলগুলোর চলতি মূলধনের জন্য এ ঋণ নেওয়া হয়েছিল। যদিও চিনিকলগুলোর বেশিরভাগই লোকসানী। *বৈদেশিক তহবিল পেতে সমস্যার আশঙ্কা কর্মকর্তাদের* এ বিষয়ে চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান অপু  বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান সক্ষমতা অনুযায়ী সম্পদের ব্যবহার করতে পারছে না। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সক্ষমতা থাকা উচিত। সরকারের এ সিদ্ধান্তে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকলাপে পরিবর্তন আসবে। তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি সরকার কর্পোরেশনকে গ্যারান্টি দিতে চায়নি বলে বিদেশি প্রতিষ্ঠান ঋণ প্রদান বা যৌথ উদ্যোগের বিনিয়োগ থেকে সরে গেছে। বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন-ও ১৬টি মিলের জন্য চলতি মূলধন হিসেবে ৪৯১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা সময়মত পরিশোধ করতে পারছে না। লোকসানের দায়ে বেশ কয়েকটি পাটকল সরকার বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিয়েছে। এসব পাটকলের ঋণ সরকার পরিশোধ করছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাষ্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) ইউরিয়া সার আমদানির জন্য দেশের কয়েকটি ব্যাংক থেকে সরকারি গ্যারান্টিতে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এছাড়া, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) সার আমদানির জন্য সোনালী ও জনতা ব্যাংক থেকে ১০  হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছে। সরকারের পরিকল্পনার বিষয়ে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের কান্ট্রি চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার নাসের এজাজ বিজয় টিবিএসকে বলেন, গ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের পরিশোধ সক্ষমতা বিশ্লেষণ করেই ঋণ দেওয়া হয়। সরকার গ্যারান্টি দিলে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান নিরাপদবোধ করে, সুদহারও কম হয়ে থাকে। তিনি বলেন, গ্যারান্টি দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের কৌশল থাকতেই পারে। যেকোনো দেশের রাষ্ট্রীয় ঋণ কম থাকাটা ওই দেশের জন্য ভালো। তবে নতুন উদ্যোগ যেমন গ্রিন ফিল্ড প্রজেক্টসহ কম সুদহারের ঋণের ক্ষেত্রে সরকারের গ্যারান্টির প্রয়োজন আছে। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক বাংলাদেশের বিষয়ে এখনো পর্যন্ত স্বস্তিতেই আছে বলে জানান তিনি। কারণ বাংলাদেশের জিডিপির অনুপাতে বৈদেশিক ঋণ চিন্তিত হওয়ার মত পর্যায়ে যায়নি।
Published on: 2023-05-27 19:57:36.045571 +0200 CEST