The Business Standard বাংলা
সংসারের খরচ বাড়ছে, বাড়তি খরচ মিটবে কীভাবে?

সংসারের খরচ বাড়ছে, বাড়তি খরচ মিটবে কীভাবে?

সামনেই আগামী অর্থবছরের বাজেট আসতে চলেছে; এখনই সময় আপনার পরিবারের বাজেট পর্যালোচনার। জীবনযাত্রার খরচ কি সামনে আরও বাড়বে? অথবা আপনার আয় কি অতিরিক্ত খরচের চাপ সামলানোর মতো যথেষ্ট পরিমাণে বাড়বে? আসন্ন বাজেট কি আপনার খরচ বাড়াবে নাকি, নাকি আপনার ওপর থেকে চাপ কিছুটা কমবে? আগামী ১ জুন জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট পেশ করা হবে। পরবর্তী বাজেটে প্রত্যাশিত বেশকিছু কর ব্যবস্থা আদতে সরকারের আয় বাড়াতে রাজস্ব প্রশাসনের উঠেপড়ে লাগার দিকেই ইঙ্গিত দেয়। যেমন- শূন্য কর বন্ধের ইঙ্গিত, সকল টিআইএন ব্যবহারকারীর ওপর ২০০০ টাকার ন্যূনতম কর আরোপ। এসব পরিবর্তনের ফলে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ আরো বাড়তে পারে। প্লাস্টিক এবং অ্যালুমিনিয়াম টেবিলওয়্যার, মাইক্রোওয়েভ ওভেন, এলপিজি সিলিন্ডার, টিস্যু পেপার, বলপয়েন্ট কলম, হ্যান্ডমেইড কেক, বিস্কুট সহ সাধারণ গৃহস্থালি পণ্যের দাম ১ জুলাই থেকে বাড়তে পারে। *মিলবে কিছুটা স্বস্তি* কয়েকটি পদক্ষেপের কারণে কিছুটা স্বস্তি মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে। যেমন, জ্বালানি তেলের ওপর থেকে অগ্রিম শুল্ক প্রত্যাহার করা হলে তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে থাকবে। জ্বালানি তেলের দাম বিভিন্নভাবে মুদ্রাস্ফীতিকে প্রভাবিত করে; তাই তেলের দাম কমলে কিছুটা স্বস্তি মিলতে পারে। তবে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন একাই সুবিধা পাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় উৎপাদনের বেলায় শুল্ক মওকুফ বিবেচনা করা হচ্ছে বিধায় ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া, আইভি ক্যানুলার ওষুধের দামও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাছাড়া, চিনির দাম এখন বেশি হলেও, আগামী অর্থবছরে মিষ্টির দাম কমতে পারে। প্রত্যাশিত ট্যাক্স এবং শুল্ক ব্যবস্থা অনুসারে, ডায়াপার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, ফ্রিজার, কম্পিউটার ও ওয়াশিং মেশিনের দাম নতুনভাবে নাও বাড়তে পারে। *প্রভাব ফেলবে চরম আবহাওয়াও* পরিবারের খরচে যে কেবল দেশের বাজেটেরই প্রভাব রয়েছে তা নয়, বরং চরম আবহাওয়াও আপনার উদ্বেগ বাড়াতে যথেষ্ট। যেমন- বছরের এই সময়টায় বৃষ্টিপাত প্রত্যাশিত পরিমাণের তুলনায় অনেক কম। এর ফলে ইতোমধ্যেই মাছের পোনা উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। সারা বছরের মাছ উৎপাদনে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থাৎ এমনও হতে পারে যে, নিজের পাতে আপনি প্রায়ই প্রোটিনের চিরাচরিত উৎস মাছ নাও পেতে পারেন। বেশিরভাগ পরিবারের মেনুতেই গরুর মাংস ও খাসির মাংসের উপস্থিতি কম; তাছাড়া সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মুরগির দামও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। পোল্ট্রি ফিড ও ওষুধের উচ্চমূল্যকে বাণিজ্যিক খামারিরা মূল্যবৃদ্ধির জন্য দায়ী করেছেন। নতুন বাজেটে পশুখাদ্যের কাঁচামালের জন্য শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করা হতে পারে। শুল্ক কমালে সেটা খুচরা মুরগির দামে প্রতিফলিত হবে কিনা তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ভোক্তাদের। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব এবং যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একা নয়। 'গ্লোবাল ফুড বাস্কেট' হিসেবে বিবেচিত দেশগুলো সহ আরও অনেক দেশে খরা দেখা দেওয়ায় খাদ্য উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তাছাড়া, ইউক্রেনের গমকে বিশ্ববাজারে নিয়ে আসার পথ সুগম করা ব্ল্যাক সি গ্রেইন ডিল বর্তমানে রাশিয়ার সময়সীমা বাড়ানোর অনিশ্চয়তায় ঝুলে আছে। এই গেটওয়ে খোলা থাকলে বিশ্বব্যাপী খাদ্য সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কমবে। *দাম কমানোর উপায় নেই বললেই চলে* ডলারের দাম এখনও বেশি থাকায়, আমদানিকৃত পণ্যের দাম শীঘ্রই কমে আসার সম্ভাবনা কম। তাছাড়া, স্থানীয় বাজার মূল্যের লাগাম টেনে ধরার মতো তেমন উপায়ও নেই। একটি সাধারণ উপায় হলো- আমদানি শুল্ক কমানো। তবে এর ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় আমদানিকারকরাই লাভবান হচ্ছেন, দাম আর কমছে না। যেমন, ভোজ্যতেলের আমদানি শুল্ক কমানোর পরও লাভ হয়নি ভোক্তাদের। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ডলারের দাম বেশি থাকায় শুল্ক কমানো হলেও প্রত্যাশিত সুবিধা মিলেনি। এছাড়া, কাঁচাবাজার ও মুদি দোকানে পেঁয়াজ থেকে শুরু করে চিনি- সবকিছুর খুচরা মূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার ব্যবস্থার অন্তর্নির্মিত বিকৃতির কারণে কর কমানোর কোনো সুবিধাই পাননা ভোক্তারা। *শুধুমাত্র কর ব্যবস্থাই বাজারকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না* বাজার তদারকি ব্যর্থ হলে শুধু কর ব্যবস্থাই বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে পারবে না। বার্ষিক বাজেটের হস্তক্ষেপের বাইরেও বেশকিছু সমস্যা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় ব্যতীত আরো কিছু প্রতিষ্ঠান আছে যাদের কাজ হলো- ভোক্তারা যথার্থ মূল্যে বাজার থেকে পণ্য ও পরিষেবা কিনছেন কিনা তা নিশ্চিত করা। সংশ্লিষ্ট এসব প্রতিষ্ঠান যদি ঠিকঠাক কাজ না করে, তাহলে আমদানি শুল্ক কমানোর সুবিধা পাবে ভুল লোকজন। এর ফলস্বরূপ ভোজ্য ও জ্বালানী তেলের কর কমানো হলেও, দিনশেষে ভোক্তারা সয়াবিনের জন্য উচ্চ মূল্য কিংবা অতিরিক্ত বাস ভাড়া দিয়েই যাবে। বাজেট হোক বা আবহাওয়ার প্রভাব বা বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা, জীবনযাত্রার খরচ আরও বাড়বে বলেই মনে হচ্ছে। আপনি যদি সরকারি কর্মচারী না হন, তাহলে আপনার মাসিক বেতন বা আয়ও মুদ্রাস্ফীতির সাথে সমন্বয় করে বাড়বেনা। তাই, আয় অনুযায়ী ব্যয়ের চিন্তা করতে হবে আপনাকে। কিছু খরচ যদিও আপনার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর জন্য আপনাকে অনেকক্ষেত্রেই খরচের সাথে আপস করতে হবে। *পেনশন ও স্বাস্থ্যসেবা এখনও অধরা স্বপ্ন* ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণের জন্য আপনাকে কিছু পরিমাণ অর্থ (যদিও সামান্যই) জমাতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনি সার্বজনীন পেনশন স্কিম বা স্বাস্থ্য বীমার আওতায় নেই। যদিও পূর্ববর্তী বাজেটে এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। পেনশন স্কিম বা স্বাস্থ্য বীমা না থাকায় স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার জন্য বেশিরভাগ খরচ আপনাকেই বহন করতে হবে। চাকরি হারালে বেকারত্বের জন্য কোনো বিশেষ সুবিধা বা আনএমপ্লয়মেন্ট বেনেফিট আপনি পাবেন না। জমি বা ফ্ল্যাটের জন্য আপনার খরচ করতে হবে অতিরিক্ত অর্থ। ইউটিলিটি বিল বা রেজিস্ট্রেশন ফি-তে যেকোনো প্রকারের বর্ধিতকরণের ফলে আপনাকে স্বাধীনভাবেই অতিরিক্ত অর্থ চার্জ করতে পারবেন বাড়িওয়ালা, বাড়ির নির্মাতা এবং ডেভেলপাররা। ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অফ সান ফ্রান্সিসকোর প্রেসিডেন্ট মেরি ডালি বলেছেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি একটি 'ক্ষয়কারী রোগ, এটি এমন একটি বিষাক্ত পদার্থ' যা মানুষের প্রকৃত ক্রয় ক্ষমতাকে হ্রাস করে। এতদিনের রেকর্ড থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশ কখনোই এত দীর্ঘ মুদ্রাস্ফীতির চাপে পড়েনি। বর্তমানে পরিস্থিতি এতটাই জটিল এবং অনিশ্চিত যে মুদ্রাস্ফীতি কখন স্থিতিশীল হবে তা কেউ বলতে পারছে না। তবে অনেক প্রশ্নের উত্তরই অন্তর্নিহিত আছে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ঠিক কোনদিকে মোড় নেয় তার মধ্যে। এমন এক সময় যুদ্ধটা শুরু হয়েছে যখন বৈশ্বিক বাণিজ্য ও অর্থনীতি করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায় ছিল। এছাড়া, স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের মতো অনেক উন্নত অর্থনীতিই বর্তমানে নিজেদের প্রতিরক্ষার খরচ বাড়িয়ে অস্ত্র কেনার প্রতিযোগিতা শুরু করেছে। পশ্চিমারা রাশিয়াকে পরাজিত করতে ইউক্রেনকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করছে। স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের তিন দশক পর বিশ্ব বর্তমানে এক অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আইএমএফ প্রধান ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেছেন, "গত তিন দশক ধরে আমরা যে শান্তিপূর্ণ অবস্থায় ছিলাম তার জন্য ঝুঁকি হয়ে এসেছে ইউক্রেনে রাশিয়ার এই আক্রমণ।" *নির্বাচনী বছরের অস্থিতিশীলতায় আরো খারাপ হবে পরিস্থিতি* মহামারি ও যুদ্ধের আফটারশকের মধ্যেই বাংলাদেশ একটি নির্বাচনী বছরে প্রবেশ করেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনীতি বেশ উত্তেজনাকর অবস্থায় রয়েছে। নির্বাচনকালীন সরকারের বিতর্কিত ইস্যু অমীমাংসিত থাকায় আগামী মাসে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশের অর্থনীতি, আপনার জীবন ও জীবিকাকেও করতে পারে ব্যাহত। *সম্পদ বৈষম্য হ্রাস প্রয়োজন* সম্পদের বৈষম্য কমাতে কর ব্যবস্থাকে একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। যাদের টিআইএন রয়েছে তাদের উপর ন্যূনতম ২,০০০ টাকা কর আরোপ করলেও ১৬০ কোটি টাকা রাজস্ব পাওয়া যাবে না। কিন্তু সম্পত্তি থেকে সম্পদ কর সঠিকভাবে সংগ্রহ করা হলে অতিরিক্ত ৬,০০০ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় হতে পারে বলে বলে ধারণা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)'র। সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, আয় ও সম্পদের বৈষম্য বেড়েছে, কিন্তু করের ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। জমিতে ছয় ধরনের কর ও শুল্ক আরোপ করা সত্ত্বেও দেশে সম্পদ কর নামে কোনো নির্দিষ্ট কর নেই। "ফলে বাধ্যতামূলকভাবে সম্পদ কর প্রবর্তন অনিবার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে," বলেন তিনি। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, "জমি ও বাড়ি-ঘরে মানুষের বিনিয়োগ বাড়ছে, কারণ এসবের দাম দ্রুত বাড়ছে। মানুষ ট্যাক্স হেভেনের সুবিধা নিয়ে সম্পদ বাড়াচ্ছে।" জমি ও বাড়িসহ স্থাবর সম্পত্তির ওপর যথাযথ কর না বসানোর পেছনে তিনি 'রাজনৈতিক অর্থনীতি'কে দায়ী করেন। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কোঅপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ওইসিডি) দেশগুলো থেকে দেখা যায়, কীভাবে মূল কর ও নগদ স্থানান্তরের পুনর্বন্টনমূলক প্রভাব বৈষম্য কমাতে সাহায্য করে। তুলনামূলকভাবে কম কর ও ওয়েলফেয়ার ব্যবস্থা নিয়েও অস্ট্রেলিয়ার মতো কিছু দেশ জার্মানির তুলনায় উচ্চ পুনর্বন্টনমূলক সুবিধা ভোগ করতে পারে, যেখানের জার্মানিতে কর অনেক বেশি। অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো আয় করের চেয়ে নগদ স্থানান্তরের উপরই বেশি নির্ভর করে বিধায় এটি সম্ভব হয়েছে। আয় ও সম্পদের বৈষম্য কমানোর পদক্ষেপ হিসেবে বাংলাদেশও কি কর ন্যায্যতার সূচনা করতে পারে?
Published on: 2023-05-27 12:14:53.763604 +0200 CEST