The Business Standard বাংলা
শিঙাড়া-সমুচার ইতিহাস কি এক হাজার বছরের, না আরও পুরনো!

শিঙাড়া-সমুচার ইতিহাস কি এক হাজার বছরের, না আরও পুরনো!

দুনিয়ার অন্যত্র যেমন, বাংলাদেশে তেমন শিঙাড়া ও সমুচা এক নয়। এখানে শিঙাড়া চতুস্তলাকাকৃতি (tetrahedron) অনেকটা শিঙাড়া ফলের (water caltrop ev Trapa natans) মতো দেখতে কিন্তু সমুচা দেখতে কিছুটা চতুস্তলকের ফ্রাসটামের (frustum) মতো। দুটো খাবারের পুরেও (filling) হেরফের আছে। বাংলাদেশে শিঙাড়াতে পুর হিসেবে সাধারণত আলু, নানা রকমের সবজি, মাংস, কলিজা ইত্যাদি দেওয়া হলেও সমুচাতে পুর হিসেবে কী দেওয়া হয়, সেটা একটা প্রশ্ন। এখানে পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ দেওয়া হয় বটে, কিন্তু সেসব মুখ্য দ্রব্য নয়। কেউ কেউ মাংসের কিমা দেবার দাবি করলেও পাঁচ-দশ টাকা দামের সমুচায় মাংসের কিমা দেবার দাবির কোনো ভিত্তি নেই। তাহলে সেখানে মুখ্যদ্রব্য কী? দিনের কোনো এক সময়ে দেখা যায় সমুচার রেস্তোরাঁতে 'নাচোস'-এর (nachos) মতো কিছু একটা জিনিস বিপুল পরিমাণে ভাজা হচ্ছে, কিন্তু এই খাবার সেখানে বিক্রি করা হয় না। এই নাচোস বা মুচমুচে রুটির টুকরো ভেঙে গুঁড়ো করে তার সাথে সুজি, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, গরম মসলা ইত্যাদি মিশিয়ে সমুচার পুর তৈরি করা হয়। বস্তুত সমুচার পুরের এই কাহিনি জানলে আমাদের মধ্যে কতজন সমুচা খেতে আগ্রহী হবেন, সেটা চিন্তার বিষয়। আমরা শিঙাড়ার পুর নিয়ে প্রতিনিয়ত আলোচনা করি, নিজেদের পছন্দ-অপছন্দের কথা বলি, শিঙাড়াতে চীনাবাদাম দেওয়া ঠিক কি না, এটা নিয়ে রীতিমতো যুদ্ধ করি, কিন্তু সমুচার পুর নিয়ে আমাদের মধ্যে বিশেষ উচ্চবাচ্য নেই- বিষয়টি একটু অদ্ভুত বটে। এত হেরফের থাকলেও শিঙাড়া আর সমুচা মূলত একই ঘরানার খাবার- ময়দার পাতলা রুটি (flatbread) বানিয়ে তার ভেতরে পুর দিয়ে মুড়িয়ে ভাজা একটি খাবার। অবশ্য দুনিয়াজুড়ে এই খাবারের যে হাজারো প্রকরণ আছে, সেখানে তাওয়ায় অল্প তেলে ভাজা (shallow fried) অথবা কড়াইয়ে ডুবো তেলে ভাজা (deep fried), শুকনো তাওয়ায় সেঁকা (dry fry) বা তন্দুরে সেঁকা (baked), ভাঁপানো (steamed), সেদ্ধ (boiled) সব রকমে বানানোর কায়দাই কমবেশি প্রচলিত আছে। এখনকার স্বাস্থ্য সচেতন লোকজনের কেউ কেউ শিঙাড়া/সমুচা এয়ার ফ্রাই (air fried) করেও খান। দেশভেদে, অঞ্চলভেদে, প্রতিষ্ঠানভেদে, ব্যক্তিভেদে এই খাবারটির চেহারা, প্রস্তুতপ্রণালি, উপাদানে বিস্তর পার্থক্য আছে। তবু এই সকল খাবার মোটামুটি অভিন্ন নামে প্রায় সারা বিশ্বে প্রচলিত। সেই নামগুলোতে একবার চোখ বোলানো যাক। বাংলাদেশ: শিঙাড়া/সমোসা/সমুচা ভারত: শিঙাড়া/সমোসা আসাম (ভারত): সিংরা গোয়া (ভারত)/পর্তুগাল: শামুসা নেপাল: সিঙ্গাড়া/সামোসা ভুটান: সামোসা পাকিস্তান: সামোসা আফগানিস্তান: সাম্বোসা মালদ্বীপ: বাজিয়া ইরান: সাম্বুসেহ্ কাজাখস্তান: সামসা কিরগিজস্তান: সামসা উইঘুর/সিন জিয়াং (গণচীন): সামসা উজবেকিস্তান: সোমসা তুর্কমেনিস্তান: সোমসা তাজিকিস্তান: সাম্বুসা আরব দেশসমূহ: সাম্বৌসেক ইসরায়েল: সাম্বুসাক্ব ইথিওপিয়া: সামিবুসা তানজানিয়া/কেনিয়া/উগান্ডা/রুয়ান্ডা/বুরুন্ডি: সামোসা সোমালিয়া/জিবুতি: সম্বুসে দক্ষিণ আফ্রিকা: সামুসা পশ্চিম আফ্রিকা: সামোসা মরিশাস/রিইউনিয়ন: সামৌসা বার্মা/মিয়ানমার: সামুযা ইন্দোনেশিয়া: সামোসা অ্যাংলোফোন বিশ্ব: সামোসা ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব প্রান্ত থেকে মরক্কোর পশ্চিম প্রান্তের দূরত্ব প্রায় সাড়ে ষোলো হাজার কিলোমিটার; আবার কাজাখস্তানের উত্তর প্রান্ত থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত পর্যন্ত দূরত্ব প্রায় এগারো হাজার কিলোমিটার-তাহলে শিঙাড়া/সমুচার রাজত্ব কত বিশাল, সেটা বোধগম্য। গঠনে ও আকার-আকৃতিতে শিঙাড়া/সমুচার সাথে কিছু মিল আছে এমন কিছু খাবারের নামও দেশ দেখা যাক। হায়দরাবাদ (ভারত): লুখমি আসিয়ান: কারি পাফ মঙ্গোলিয়া: খুশুর উত্তর-পশ্চিম ককেশাস (রুশ ফেডারেশন-আজারবাইজান-আর্মেনিয়া-জর্জিয়া): হালিভা ক্রিমিয়ান তাতার (রুশ ফেডারেশন): চেবুরেকি তাতার ও বাশকির (রুশ ফেডারেশন): এচপোচমাহক (চেহারায় আমাদের শিঙাড়ার সাথে বেশ মিল আছে) ক্রিমিয়ান কারাইত (রুশ ফেডারেশন-লিথুয়ানিয়া): কিবিনাই লাতভিয়া: স্পেকরাওসি/স্পেকা পিরাদজিনি/পিরাগি/পিরাদজিনি ফিনল্যান্ড: লরৎসি স্পেন: এমপানাদা ক্রিট: কালিতসৌনিয়া স্পেন/পর্তুগাল/ব্রাজিল/মেক্সিকো/ইন্দোনেশিয়া/ফিলিপিনিস/পুয়ের্তো রিকো: পাস্তেল বলিভিয়া: সালতেনিয়া এই খাবারগুলোকেও যদি শিঙাড়া বা সমুচার হিসাবে ধরি, তাহলে পুরোনো দুনিয়ার (old world) বেশির ভাগটার সাথে নতুন দুনিয়াগুলোর (Americas, Australia and Oceania) কিছুটাও তার রাজত্বে চলে আসবে। যেহেতু নতুন দুনিয়াগুলো পুরোনো দুনিয়ার মানুষেরা দখল করে নিয়েছে, ফলে তাদের সাথে সাথে শিঙাড়া/সমুচাও নতুন দুনিয়াগুলোতে জায়গা করে নিয়েছে। এ তো গেল শিঙাড়া বা সমুচার ভৌগলিক রাজত্ব বিস্তারের কথা, কিন্তু সেই রাজত্বের শুরুটা কবে এবং কোথা থেকে? লিখিত ইতিহাস দিয়ে শুরু করা যাক। আব্বাসীয় আমলে পারস্যের কবি ইসহাক আল-মাওসিলির (৭৬৭-৭৭২) একটি কবিতায় 'সানবুসাজ' নামে যে খাবারটির কথা জানা যায়, সেটি আধুনিক সমুচার পূর্বপুরুষ। 'সানবুসাক', 'সানবুসাক', 'সানবুসাজ' ইত্যাদি যেসব নামের খাবারের কথা দশম থেকে ত্রয়োদশ শতকের আরবের লেখকদের নানা লেখায় উঠে এসেছে, সেগুলোর সবই ফারসি 'সানবোসাগ' থেকে উদ্ভূত কারণ খাবারটির উৎস পারস্য। (১) আবুল-কাসেম ফেরদৌসী তুসির লেখা 'শাহনামেহ্'-তে (৯৭৭-১০১০) 'সানবোসাগ' নামের মাংস, বাদাম আর মসলার পুর দেয়া যে ভাজা খাবারের উল্লেখ আছে, সেটা সমুচার প্রাচীন রূপ হতে পারে। শাহনামেহ্ দশম শতকে লেখা হলেও এর কাহিনি মূলত সাসানীয় আমলের, মানে তৃতীয় থেকে সপ্তম শতকে বিস্তৃত। সে ক্ষেত্রে সমুচার শুরুটা আজ থেকে আঠারো শতাব্দী আগেও হতে পারে। আবুল-ফযল বায়হাক্বীর লেখা 'ত্বারিখ-ই-বায়হাক্বী'-তে (১০৭৭-এর আগে) গযনভী সুলতান মাহমুদের আমলে মাংসের কিমা, বাদাম ও শুকনো ফলের পুর দিয়ে বানানো বিশেষ এক খাবারের কথা বলেছেন, যা ডুবো ঘিয়ে মুচমুচে করে ভাজা হতো। বর্ণনাদৃশ্যে এই খাবার সমুচার একটি রূপ বলে মনে হয়। (২) ইবনে বতুতার লেখা রিহলাহর ভারত পর্বে (১৩৩৩-১৩৪১) দিল্লির সুলতান মুহাম্মাদ বিন তুঘলকের আমলে 'সামুসাক' বা 'সাম্বুসাক' নামের মাংসের কিমা, কাঠবাদাম, পেস্তাবাদাম, আখরোট আর মসলার পুর দিয়ে ভাজা ছোট পুলি পিঠার কথা বলেছেন, যেটা পোলাওয়ের তৃতীয় পদের আগে পরিবেশন করা হতো। এটিকে সমুচা ভাবাটা যৌক্তিক হবে।(৩) চতুর্দশ শতকের গোড়ায় আমীর খসরুর (১২৫৩-১৩২৫) লেখা ধাঁধায় (দো সুখানে) সমুচার কথা উল্লেখ আছে- সমুচা কিঁউ না খায়া? জুতা কিঁউ ন প্যহনা? -তলা ন থা! ('সমুচা খাওনি কেন? জুতা পরোনি কেন?... তলা/ভাজা ছিল না বলে'। এখানে 'তলা' শব্দটি একই সাথে ভাজা এবং জুতার তলা উভয় অর্থ বোঝায়। এটি দো সুখানে নামক কাব্যের বৈশিষ্ট্য।) মধ্য ভারতের মালওয়া সালতানাতের সুলতান গিয়াস উদ-দীন শাহের আমলে (১৪৫৯-১৫০০) একটি রন্ধনপ্রণালির বই লেখা শুরু হয়েছিল, যা তাঁর পুত্র আবদ-আল মুযাফফর নাসির উদ-দীন শাহের আমলে (১৫০০-১৫১০) সমাপ্ত হয়। ফারসি ভাষায় নাসখ হরফ ব্যবহার করা এই বইয়ে চমৎকার অলংকরণও আছে। বইটির নাম 'নিমাত নামেহ্ নাসীর আল দিন শাহী' (নাসিরুদ্দিন শাহীর সুস্বাদু খাবার)। নোরাহ্ টিটলে এটির ইংলিশ অনুবাদ করেছেন। সেখানে সমুচার যে রন্ধনপ্রণালি দেওয়া আছে, তা নিম্নরূপ- 'ভালো করে রান্না করা মাংসের কিমার সাথে সমপরিমাণ কুঁচানো পেঁয়াজ, তার চার ভাগের এক ভাগ পরিমাণ কুঁচানো শুকনো আদা, আধা তোলা গুঁড়া রসুন, গোলাপজলে ভেজানো তিন তোলা জাফরান ভালো করে মিশিয়ে তার সাথে বেগুনের শাঁস মিশিয়ে পুর তৈরি করতে হবে। এই পুর দিয়ে সমুচা বানিয়ে ঘিয়ে ভাজতে হবে। মোটা দানা আটার পাতলা রুটি, মিহি ময়দার রুটি, অথবা কাঁচা কাঁই... এই তিনটির যেকোনোটি ব্যবহার করে সমুচা বানালে তা উপাদেয় হবে।' (৪) (৫) এই কায়দায় সমুচা সম্ভবত এখন আর কোথাও বানানো হয় না। তিন তোলা জাফরান দিয়ে বানানো সমুচার বাজারমূল্য কম করে হলেও পনেরো হাজার টাকা হবে। তাহলে লিখিত ইতিহাসের হিসাব অনুযায়ী শিঙাড়া বা সমুচার শুরুটা কমপক্ষে এক হাজার বছর আগে থেকে শুরু করে আঠারো শত বছর আগে হবার কিছু খোঁজ পাওয়া গেল, এবার এর উৎসের খোঁজ নেওয়া যাক। একটি অসমর্থিত দাবি হচ্ছে পারস্যের সাসানীয় সম্রাট প্রথম খসরুর (খসরু আনুশিরভান) আমলে (৫৩১-৫৭৯) ভারতের চালুক্য রাজত্বের কোনো এক রাজার (প্রথম পুলকেশিন অথবা প্রথম কীর্তিবর্মণ) কাছে উপহার হিসেবে সমুচা পাঠানো হয়েছিল। এই কাহিনি সত্য হোক বা না হোক, যেহেতু সাসানীয়দের সাম্রাজ্য বর্তমান ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, তাই তাদের আমলে পারস্য থেকে ভারতে সমুচা আসা খুবই সম্ভব। এতে সমুচার উৎস হিসেবে পারস্যের দাবি জোরদার হয়। সমস্যা হচ্ছে মধ্য এশিয়া এবং মিসর-উভয়ের দাবি হচ্ছে তাদের দেশ থেকে পারস্যের সমুচা গেছে এবং তাদের আরও দাবি সমুচার শুরুটা তেলে ভেজে নয়, বরং তন্দুরে সেঁকে।(৬) তাদের দাবিগুলোকে উড়িয়ে দেবার উপায় নেই; কারণ, এসব দেশে ময়দা ও তন্দুরের ব্যবহার অতি প্রাচীন, আর না ভাজলে সমুচা হবে না, এমন দাবি করাও সম্ভব নয়। যেসব দেশের ইতিহাসের লিখিত বর্ণনা নেই, তার মানে এই নয় যে তাদের ইতিহাস নেই। সপ্তম শতকের আগে তিব্বতিদের এবং ১৯২৫ সালের আগে সাঁওতালিদের ভাষার কোনো লিপি ছিল না, তার মানে এই না যে এর আগে ওই জাতির কোনো মানুষ ছিল না। সুতরাং শিঙাড়া বা সমুচার উৎসের সন্ধানে আমাদের ভিন্নভাবে ভাবতে হবে, অবস্থাগত প্রমাণের (circumstantial evidence) ওপর নির্ভর করতে হবে। কমপক্ষে ২৬ লাখ বছর আগে মানুষ বড় আকারের প্রাণীর মাংস ও মজ্জা খাওয়া শুরু করে, তবে সেটা শিকার করে নয়। শিকার করে মাংস খাওয়া শুরু হয়েছে প্রায় ২০ লাখ বছর আগে। আর রান্না করে (মানে পোড়ানো দিয়ে শুরু) মাংস খাবার ইতিহাস মোটামুটি ৮ লাখ বছরের পুরোনো। বলাই বাহুল্য এর সবই হোমো স্যাপিয়েন্সের আবির্ভাবের আগে। আমরা ধরে নিতে পারি, কাঁচা পাতলা রুটিতে সবজি বা মাংস বা বাদাম মুড়িয়ে ভেজে/সেঁকে/ভাঁপিয়ে/সেদ্ধ করে/পুড়িয়ে যে খাবারটি তৈরি করা হয়, সেটিই শিঙাড়া বা সমুচা। যেহেতু মাংস (মাছ ও মাংস উভয়ার্থে) রান্না শুরু হয়েছে সবজি বা বাদাম রান্না শুরুর অনেক আগে, তাই শিঙাড়া বা সমুচার শুরু মাংসের পুর দিয়ে হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যখন মানুষের খাবারের তালিকায় রান্না করা সবজি বা বাদাম এসেছে তখন সমুচাতে পুর হিসেবে সবজি বা বাদাম এসেছে। রুটি বানিয়ে খাওয়ার সবচেয়ে পুরোনো নিদর্শনটি পাওয়া গেছে জর্দানের সুবায়ক্বায়। এই নিদর্শনটির বয়স প্রায় ১৪,৪০০ বছর। তার মানে ফার্টাইল ক্রিসেন্ট (Fertile Crescent) অঞ্চলে প্রাগৈতিহাসিক আমলে কেবল শস্য চাষ হয়নি, রুটি বানিয়েও খাওয়া হয়েছে।(৭) (৮) কিন্তু রাশিয়া, ইতালি আর চেক দেশে শস্য গুঁড়ো করার জন্য ব্যবহৃত যেসব ছোট আকারের পাথরের যাঁতা (grindstone) পাওয়া গেছে, সেগুলোর বয়স প্রায় ৩০,০০০ বছর।(৯) তাহলে ধারণা করা যেতে পারে, ওই সময়ে মানুষ শস্য গুঁড়ো করে কেবল আটা বানিয়ে ক্ষান্ত হবার কথা নয়; বরং সেই আটা জলে গুলিয়ে পাতলা শরবত এবং জলে মাখিয়ে কাঁইও বানিয়ে খেয়েছে। এখন ওই পাতলা শরবতটিকে যদি আগুনে জ্বাল দেওয়া হয়, তাহলে সেটা লেই (lapsi) আর কাঁইটিকে আগুনে পোড়ালে বা সেঁকলে রুটি তৈরি হয়ে গেল। সে ক্ষেত্রে ফার্টাইল ক্রিসেন্টে হোক, ইউরোপে হোক আর দুনিয়ার অন্য কোথাও হোক রুটির ইতিহাস বোধ করি হাজার পনেরো বছর নয়, বরং হাজার ত্রিশেক বছরের পুরোনো। কথাগুলো যত সহজে বলা হলো বাস্তবে এগুলো ঘটতে শতাব্দীর পর শতাব্দী চলে গেছে। আজ থেকে প্রায় ৩১,০০০ বছর আগে মধ্য ইউরোপে চুলা আবিষ্কৃত হয়েছে।(১০) গোড়াতে এই চুলায় মাংস রান্না করা হতো। সে ক্ষেত্রে ত্রিশ হাজার বছর আগে ইউরোপে যখন শস্য গুঁড়ো করা হয়েছে, তখন ওই সময়ে চুলায় বানানো রুটির ধারণাটি অসম্ভব না-ও হতে পারে। মানুষ কবে রুটি দিয়ে মাংস খাওয়া শুরু করল, সেটা নির্ণয় করা একটু কঠিন বটে। শিকারি মানুষ লাখ লাখ বছরে ধীরে ধীরে কৃষিজীবী হয়েছে। কৃষিজীবী হবার পরে যে সে মাংস খাওয়া ছেড়ে দিয়েছে, তা নয়। তবে আলাদা করে রান্না করা শস্য ও মাংস একই পাতে মিলিয়ে তরিবৎ করে খাওয়ার সংস্কৃতি খুব পুরোনো হবার কথা নয়। একটা দৃশ্যকল্প চিন্তা করা যাক। আমাদের এক আদি মাতা চুলায় রান্না করছেন, আর তাঁর পরিবারের বাকি সদস্যরা খাবারের জন্য অপেক্ষা করছেন। মাতা বললাম এই কারণে যে কৃষির গোড়াপত্তন, শস্য ভানা (husking), গুঁড়ো করা, উন্নততর রান্না করার পদ্ধতি আবিষ্কার ইত্যাদিতে আদি পিতাদের চেয়ে আদি মাতাদের ভূমিকা বেশি। তো সেই আদি মাতা যদি কোনো একদিন এক বিশেষ ভাবনায় পোড়ানো বা রান্না করা মাংসকে শস্যের কাঁই দিয়ে মুড়িয়ে পুড়িয়ে বা সেঁকে থাকেন, তাহলে কিন্তু তিনি মানবসভ্যতার প্রথম শিঙাড়া বা সমুচাটি বানিয়ে ফেলেছেন। এই হিসাবে শিঙাড়া বা সমুচার উৎপত্তি ইউরোপে এবং হাজার ত্রিশেক বছর আগে হওয়াও অসম্ভব কিছু নয়। অন্য কোনো মহাদেশে এর চেয়ে পুরোনো নিদর্শন না পাওয়া পর্যন্ত অবস্থাগত প্রমাণের ভিত্তিতে এটাকে শিঙাড়া বা সমুচার আদি ইতিহাস বলে ধরা যেতে পারে। দুনিয়াতে ফ্ল্যাটব্রেড বা পাতলা রুটির কমপক্ষে ১৫০টির বেশি প্রকরণ আছে। তা দিয়ে মোড়ানো যাবে এমন পুরের সংখ্যা আসলে অগণিত। রান্না করার জনপ্রিয়, মৌলিক পদ্ধতির সংখ্যা ডজনখানেকের বেশি। এখন এই অগণিত পুরের সাথে ১৫০-এর বেশি প্রকারের রুটির এবং গোটা কুড়ি রন্ধনপ্রণালির বিন্যাস ও সমাবেশ (permutation and combination) করলে অসীমসংখ্যক প্রকারের শিঙাড়া বা সমুচা বানানো সম্ভব। শিঙাড়া-সমুচার এই অনন্ত ভুবনে ডুব দিয়ে মানুষ হাজার ত্রিশেক বছর বা তারও আগের প্রথম শিঙাড়া বা সমুচার কথা ভাবতে পারেন। শিঙাড়া বা সমুচার প্রকরণ যেমন অপরিমেয়, সেই ইতিহাসও তেমন অতল। *তথ্যসূত্র:* (1) Claudia Roden, Alta Ann Parkins (Illustrator); A Book of Middle Eastern Food; Vintage; 1974; ISBN 9780394719481 (2) Husayn Abu al-Fazl Bayhaqi, Ali Akbar Fayyaz (Editor); Tarikh-i Bayhaqi; Intisharat-i Danishgah-i Firduvsi, Mashhad, 1977 (3) Jiggs Kalra (Jaspal Inder Singh Kalra), Dr Pushpesh Pant; ÒRegal RepastsÓ, India Today Plus; March 1999 (4) Jonathan M. Bloom (Editor); The Grove Encyclopedia of Islamic Art & Architecture; Oxford University Press; USA; 2009; ISBN 9780195309911 (5) Norah M. Titley; The Ni'matnama Manuscript of the Sultans of Mandu: The Sultan's Book of Delights; Routledge; 2005; ISBN 9780415350594 (6) Jun Xing (Editor), Pak-Sheung Ng (Editor); Indigenous Culture, Education and Globalization: Critical Perspectives from Asia; Springer; 2015; ISBN 9783662481585 (7) Colin Barras; "Stone Age bakers made first bread thousands of years before farming"; New Scientist; 16 July 2018 (8) Amaia Arranz-Otaegui, Lara Gonzalez Carretero, Monica N. Ramsey, Dorian Q. Fuller, and Tobias Richtera; "Archaeobotanical evidence reveals the origins of bread 14,400 years ago in northeastern Jordan"; Proceedings of the National Academy of Sciences of the United States of America; 31 July 2018 (9) Brenda Goh; "Bread was around 30,000 years ago: studz"; Reuters; 19 October 2010 (10) Peter J. James, Nick Thorpe, I. J. Thorpe; Ancient Inventions; Ballantine Books; 1995; ISBN 9780345401021
Published on: 2023-05-06 12:02:35.386211 +0200 CEST