The Business Standard বাংলা
বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস: নেই কোনো জাতীয় ব্লাড ব্যাংক, রক্তের জন্য স্বজনদের আহাজারি

বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস: নেই কোনো জাতীয় ব্লাড ব্যাংক, রক্তের জন্য স্বজনদের আহাজারি

প্রয়োজনের সময় এক ব্যাগ রক্ত জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হয় এ দেশের রোগী ও তাদের স্বজনদের। আগের তুলনায় এ সংকট দিনদিন তীব্রই হচ্ছে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের জরুরি ভিত্তিতে একটি জাতীয় ব্লাড ব্যাংক প্রয়োজন। ১৫ বছর আগেই দেশে জাতীয় ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করা হলেও, জমি বরাদ্দ সংক্রান্ত জটিলতায় তা আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। এতবছরের রোগীদের ভোগান্তিও বেড়েছে। কিডনি রোগী জানে আলমের ডায়ালাইসিসের জন্য গত ২৫ মার্চ জরুরি ভিত্তিতে দুই ব্যাগ এ পজেটিভ রক্ত ম্যানেজ করে রাখতে বলে গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালের চিকিৎসকেরা। রোগীর স্বজনেরা ২৪ তারিখ রাত থেকে রক্ত জোগাড় করতে বেশকিছু সংস্থা ও ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে যোগাযোগ করে। কিন্তু পরদিন বিকেল পর্যন্ত কোথাও এ পজেটিভ রক্ত পাওয়া যায়নি। রমজান মাস হওয়ায় ডোনার পাওয়া যাচ্ছিলোনা। পরে বিকেলের দিকে পরিচিত একজন রক্ত দিতে আগ্রহী হয়। বারো বছর বয়সী থ্যালাসেমিয়া রোগী মো. সজীবকে মাসে দুবার রক্ত দিতে হয়। কিন্তু টানা দুই মাস ধরে তার বাবা-মা রক্ত জোগাড় করতে না পারায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে সজীব। তাকে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় এনে এক মাসের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। সজীবের বাবা সবুজ মিয়া দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, প্রতি মাসে ছেলের জন্য রক্ত জোগাড় করতে তাকে চরম কষ্ট করতে হয়। "স্কুল-কলেজের ছাত্ররা মাঝেমাঝে আমার ছেলেকে রক্ত দেয়।" জানে আলম বা সজীবের মত অবস্থা পুরো দেশের রোগীদেরই। তার ওপর কারো যদি বিরল গ্রুপের রক্ত প্রয়োজন হয়, তার ভোগান্তি বেড়ে যায় বহুগুণ। চিকিৎসকেরা বলছেন, অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও যদি ন্যাশনাল ট্রান্সফিউশন সেন্টার বা জাতীয় ব্লাড ব্যাংক থাকতো তাহলে রক্তের জন্য রোগীর স্বজনদের ভুগতে হতোনা। শেখ হাসিনা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারির সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন,  ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক থাকলে সহজে ন্যাশনাল একটি ডিরেক্টরি তৈরি করা যেতো। "ন্যাশনাল ডিরেক্টরি থাকলে এই মুহূর্তে কোথায় কতটুকু ব্লাডের ডিমান্ড আছে তার তালিকা পাওয়া যেতো, সেই অনুযায়ী ব্লাড সেখানে চলে যেতো," বলেন তিনি। তিনি আরো জানান, "কোন হাসপাতাল বা ইনস্টিটিউটে যতটুকু রক্তের প্রয়োজন তার থেকে বেশি রক্ত মজুদ থাকলে সাধারণত ২৫ দিন ধরে জমা থাকা ব্লাড ফেলে দেওয়া হয়। এতে ডোনারের ও রক্তের অপচয় হয়। ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক থাকলে এ অপচয় কমে আসতো।" বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুসারে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, শ্রীলংকা, নেপালসহ বিভিন্ন দেশে রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি ন্যাশনাল ব্লাড সেন্টার (এনবিসি) গড়ে তোলা হয়েছে। এনবিসি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অত্যাধুনিক কেন্দ্র, যার মাধ্যমে রক্তের বিভিন্ন পর্যায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষার কীটস/রিএজেন্ট এর ভ্যালিডেশন, জনবলের প্রশিক্ষণ, রক্ত পরিসঞ্চালন জনিত বিভিন্ন জটিলতা নিরসন সংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা কার্যক্রম, রক্তদাতাদের মধ্যে ট্রান্সফিউশন ট্রান্সমিসিবল ইনফেকশন্স (টিটিআই) এর পর্যবেক্ষণ ও কোয়ালিটি কন্ট্রোলের যাবতীয় ব্যবস্থা থাকে। এক দল প্রশিক্ষিত জনবল এই কেন্দ্র পরিচালনা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ব্লাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আসাদুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, "ন্যাশনাল ব্লাড সেন্টারের আন্ডারে ন্যাশনাল ব্লাড প্রোগ্রাম থাকবে এটি আমাদের ন্যাশনাল ব্লাড পলিসিতে আছে।" তিনি বলেন, "প্রোগ্রামের আওতায় ডাক্তার থাকবে, তারা হিসেব করবে সারা বছর কী পরিমাণ ব্লাড প্রয়োজন। স্কুল-কলেজে অ্যাওয়ারনেস প্রোগ্রাম করবে, ব্লাড স্ক্রিনিং করে ব্লাড কালেকশন করবে।" "আমাদের কাগজে কলমে সব আছে কিন্তু বাস্তবে নেই," বলেন তিনি। *বাংলাদেশে রক্তের বর্তমান অবস্থা* স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থা অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল ৯ লাখ ৬০ হাজার ব্যাগ ব্লাড সংগ্রহ করেছে। এরমধ্যে রোগীর স্বজন ৭৬% ও নিজ থেকে রক্ত দান করেছেন ২৪%। বাংলাদেশে হোল ব্লাড বেশি প্রয়োজন হয় অ্যাক্সিডেন্ট, একলামশিয়া ও প্রিএকলামশিয়ায় রোগীদের এবং সিজারিয়ান ডেলিভারিতে। এছাড়া ডায়ালাইসিস ও থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য ব্লাড লাগে। দেশে সংগৃহীত রক্তের ৩০% দিয়ে রক্তের বিভিন্ন উপাদান তৈরী করা হয়। বর্তমানে সারা দেশে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন ব্যবস্থা কেবল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে প্রতিটি হাসপাতালে ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অবস্থিত একটি অস্থায়ী প্রোগ্রাম অফিসের মাধ্যমে পরিচালনা করা হচ্ছে। *জাতীয় ব্লাড ব্যাংকের স্বপ্ন অধরাই রয়ে গেল* রক্তের গুরুত্ব উপলব্ধি করে দেশে একটি জাতীয় ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০০৭ সালে। তবে তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি। জাতীয় পর্যায়ে একটি ন্যাশনাল ব্লাড সেন্টার (এনবিসি) স্থাপনের গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০০৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত 'জাতীয় নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কাউন্সিল' এর দ্বিতীয় সভায় এনবিসি স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে মহাখালী এলাকায় প্রায় ০.৯৬ একর বা ৪১৮০০ বর্গফুট জায়গা মন্ত্রণালয় কর্তৃক এনবিসি স্থাপনের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। অপারেশন প্লানে এনবিসি এর ভবন নির্মাণের জন্য ৮ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। কিন্তু, ওই জায়গার বিষয়ে আদালতে মামলা থাকার কারণে সেখানে ভবন নির্মাণ করা হয়নি। পরে ২০১৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় ইন্সটিটিউট অব পাবলিক হেলথের মূল ভবনের একটি জায়গা এনবিসি স্থাপন করার জন্য বরাদ্দ দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সে জায়গায় বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ (বিএনএনসি) এর কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। জায়গার অভাবে এখনো স্থাপন করা হচ্ছেনা ন্যাশনাল ব্লাড সেন্টার। জাতীয় নিরাপদ রক্ত সঞ্চালন বিশেষজ্ঞ কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. আসাদুল ইসলাম বলেন, "সরকার মহাখালিতে যে হেলথ সিটি করতে যাচ্ছে সেখানে ন্যাশনাল ব্লাড সেন্টার স্থাপনের জায়গা দেওয়া উচিত। ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংকের বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এবিএম খুরশিদ আলম টিবিএসকে বলেন, ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক থাকলে ভালো হতো। "তবে সরকারিভাবে ন্যাশনাল ব্লাড ব্যাংক স্থাপনের বিষয়ে তেমন কোন তথ্য আমার কাছে নেই এ মুহূর্তে," বলেম তিনি। তিনি আরো বলেন, "চীনের একটি প্রতিষ্ঠান প্লাজমা নিয়ে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছিলো। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের একটা গ্রুপ এসেছিলো যারা ব্লাড ও ব্লাড প্রোডাকশন নিয়ে কাজ করতে চায়। তবে সেগুলো আর অগ্রসর হয়নি।"
Published on: 2023-05-08 10:49:34.684895 +0200 CEST