The Business Standard বাংলা
বাজেট ২০২৩-২৪ | এই বাজেট কি নির্বাচনের বছরের বাজেট?

বাজেট ২০২৩-২৪ | এই বাজেট কি নির্বাচনের বছরের বাজেট?

এ বাজেটকে কি নির্বাচনের বছরের বাজেট বলা যায়? হ্যাঁ — কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রে না। বৈশ্বিক মন্দার প্রবণতা এবং এ বছরের ব্যয় ২.৬ শতাংশ কমে যাওয়ার হিসাবকে মাথায় রেখে সরকার এর ব্যয় লক্ষ্যমাত্রা ১৫.৩ শতাংশ বাড়িয়েছে। মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কেবল ০.৭ শতাংশ বেশি এ বছরের সংশোধিত ব্যয়ের বিপরীতে আগামী অর্থবছরের উন্নয়ন ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রাও ১৪.৭ শতাংশ বেশি নির্ধারণ করা হয়েছে। রাজনৈতিক বাস্তবতার গুরুত্বের নিরিখে নির্বাচনের বছরের বাজেট এমনটাই হওয়া উচিত (তবে মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করলে এ বৃদ্ধি খুব বেশি নয়, এমন কথাও বলতে পারেন কেউ)। জনগণের (দলের লোকজনকেও) হাতে আরও বেশি অর্থ তুলে দিতে আপনি ব্যয় বাড়িয়ে দেন। আপনার কাছে টাকা থাকলে মানুষও খুশি হয় (দলীয় লোকজনও আনন্দিত বোধ করেন, কারণ তাদেরও তো নির্বাচনের খরচ আছে)। কিন্তু বাস্তবতার মুখোমুখি হলেও টাকার হিসাবনিকাশ সব উলটে যায়। এত এত খরচের জন্য টাকা কোত্থেকে আসবে? দেশের টালমাটাল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের জন্য বাজেট সহায়তার বিনিময়ে আইএমএফ যেমনটা চেয়েছে, মনে হচ্ছে অর্থমন্ত্রীও তা-ই করার চেষ্টায় আছেন — সবদিক থেকে যতটা সম্ভব অর্থ বের করার মরিয়া চেষ্টা। এ অর্থবছরের শূন্য প্রবৃদ্ধির সাপেক্ষে ১৫.৫ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাকে পুরোদস্তুর ভিন্ন মনে হচ্ছে। মধ্য ও নিম্নবিত্ত মানুষরা যেমন কষ্টের মুখে পড়বেন, তার সঙ্গে ভোক্তার ব্যয়ের ওপরও এটি অনিবার্য প্রভাব ফেলবে। এ কথা মনে রাখা দরকার যে বাংলাদেশের জিডিপি'র বেশিরভাগই (৭৪ শতাংশ) তৈরি হয় ভোগ থেকে। অর্থাৎ, প্রবৃদ্ধির ওপর সরাসরি আঘাত আসবে। তাই, এ ধরনের কোনো অপ্রয়োজনীয় প্রত্যাশাই একটা নির্বাচনের বছরের জন্য ভালো হয় না। আর কর আহরণ হোঁচট খেলে কী হবে — যেমনটা এ বছর হয়েছে, আগে আরও অনেকবার হয়েছে? সেটা হলে তবে অর্থের অভাবে ব্যয় কমাতে হবে, টাকাও বেশি মানুষের হাতে পৌঁছাবে না। ফলে তৈরি হবে একটা অখুশি ভোট ব্যাংক — ওরকম ব্যাংক বাস্তবে আদৌ থাকলে আরকি। অথবা ব্যাংকের কাছে হাত পাততে হবে। ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ব্যাংকঋণ নেওয়ার পরিমাণ বাড়বে। পরিণামে ট্রেজারি বিলের সুদহার বাড়বে, ফলে সুদ পরিশোধের ক্ষেত্রে দেনার পরিমাণ আরও বেশি হবে। আর সেটা নিশ্চিতভাবে বিনিয়োগকে আঘাত করবে এমন একটা সময়ে যখন আসন্ন নির্বাচন নিয়ে উদ্যোক্তারা হয়তো ইতোমধ্যেই শঙ্কার মধ্যে আছেন। বেসরকারি বিনিয়োগের ধারাও এখন খুব ভালো অবস্থায় নেই। আরও বেশি ব্যয় সংকোচন হলে তার ধাক্কা লাগবে নিয়োগ ও মজুরির ওপর। ভোটাররাও এতে মনঃক্ষুণ্ণ হবেন। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে দ্রব্যমূল্যের দাম এখন অনেক বেশি, আর এ সময়ই ব্যাংকঋণ নেওয়ার ফলে মুদ্রাস্ফীতি আরও বাড়বে। তাই, কম মজুরি ও কর্মসংস্থান সংকটের আভাস ফেলে সামাজিক অস্থিরতাও তৈরি হবে। অন্যদিকে দেশের কর্পোরেট সমাজও আইএমএফ-এর ঋণশর্ত এবং ক্রমশ নাজুক হওয়া সামষ্টিক অর্থনীতির দ্বৈত ধাক্কা টের পাবে। মুডিস ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ঋণমান কমিয়ে 'ঝুঁকি' ক্যাটাগরিতে রেখেছে। এতে ঋণপত্র খোলা যেমন আরও ব্যয়বহুল হবে, তেমনি বিদেশি ঋণের ক্ষেত্রেও খরচ বাড়বে। একই সময়ে, কর্পোরেট বাংলাদেশও উচ্চ করের নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়বে। সুদ পরিশোধের ওপর কর দেওয়া এসব প্রভাবের কেবল একটি — পাশাপাশি অনেক ছাড় তুলে নেওয়া হবে এবং সম্পূরক শুল্ক বাড়বে। তাই অর্থনৈতিক বাস্তবতা অর্থমন্ত্রীকে তার নির্বাচনের বছরের বাজেটের ইচ্ছায় কাঁচি চালাতে বাধ্য করবে।
Published on: 2023-06-01 16:00:03.261371 +0200 CEST