The Business Standard বাংলা
গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতে ওমানের সঙ্গে নতুন চুক্তি সই করবে সরকার

গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতে ওমানের সঙ্গে নতুন চুক্তি সই করবে সরকার

আগামীতে দেশে গ্যাসের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির জন্য ১৯ জুন ওমানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী 'সেল অ্যান্ড পারচেজ অ্যাগ্রিমেন্ট (এসপিএ) স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে সরকার। এর আগে, চলতি মাসের শুরুতে কাতারের সঙ্গে এ ধরনের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। নতুন চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশন (পেট্রোবাংলা) আগামী ২০২৬ সাল থেকে পরবর্তী ১৫ বছর ওমান থেকে বছরে অতিরিক্ত ০.৫-১.৫ মিলিয়ন টন পর্যন্ত এলএনজি আমদানি করতে পারবে। তবে অতিরিক্ত এই এলএনজি আমদানি সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে দেশের  ক্রয় ক্ষমতার ওপর। বর্তমানে বছরে ৪ থেকে সাড়ে ৪ মিলিয়ন টন (এমটিপিএ) এলএনজি আমদানির জন্য প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলারের বোঝা বইতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, নতুন চুক্তির আওতায় অতিরিক্ত গ্যাস আমদানি করা হলে বার্ষিক এলএনজি আমদানি বাবদ ব্যয় ৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। নতুন চুক্তির আওতায়, ২০২৬ সাল থেকে এলএনজি আমদানির জন্য দেশে তৃতীয় ভাসমান স্টোরেজ এবং রিগ্যাসিফিকেশন টার্মিনাল নির্মাণে সামিট গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে পেট্রোবাংলা। পেট্রোবাংলার সঙ্গে বিল্ড-ওন-অপারেট-ট্রান্সফার (বিওওটি) চুক্তির আওতায় প্রতিমাসে প্রায় সাড়ে ৬ মিলিয়ন ডলার আয় করবে সামিট গ্রুপ; আগামী মাসে এই চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, ২০২৬ সাল থেকে ওমান বাংলাদেশে ০.৫-১.৫  এমপিটিএ এলএনজি সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে। "২০২৬ সালে চারটি কার্গো এবং এরপরের বছরগুলোতে এই সংখ্যা ১২ এবং ১৬ তে উন্নীত হতে পারে," বলেন  তিনি। "আমরা ইতোমধ্যে কাতারের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছি এবং ওমানের সঙ্গে এ ধরনের আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছি; এর মাধ্যমে দেশে গ্যাস সরবরাহ বাড়াবে। আমরা তিন বছর পর এর ফলাফল দেখতে পাব," যোগ করেন জনেন্দ্র নাথ। এরকম দুটি দীর্ঘমেয়াদী এলএনজি চুক্তিতে রয়েছে বাংলাদেশ; একটি কাতারের  সঙ্গে ২.৫ এমটিপিএ'র, অন্যটি ওমানের ওকিউ ট্রেডিংয়ের সঙ্গে ১.৫ এমটিপিএ এলএনজির। এছাড়া, ২০২০ সাল থেকে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করছে বাংলাদেশ। গত বছর কাতার, ওমান এবং স্পট মার্কেট থেকে মোট প্রায় ৪.৪৩ মিলিয়ন টন এলএনজি আমদানি করেছে সরকার। ২০২১ সালে এই আমদানির পরিমাণ ছিল ৫.০৮ মিলিয়ন টন। নতুন চুক্তির মাধ্যমে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বার্ষিক ৭.৩ মিলিয়নে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে। ওমানের সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির আওতায়, পেট্রোবাংলা বর্তমানে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজি ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের তিন মাসের গড় মূল্যের প্রায় ১১.৯ শতাংশ প্লাস ৪০ সেন্ট দরে ক্রয় করছে। ২০১৬-২০১৭ সালে স্বাক্ষরিত কাতারগ্যাসের সঙ্গে পেট্রোবাংলার ১৫ বছরের একটি ক্রয় চুক্তি রয়েছে, যার আওতায় বছরে সর্বোচ্চ ২.৫ মিলিয়ন টন এলএনজি কিনতে পারে। এই চুক্তির অধীনে, পেট্রোবাংলা প্রতি এমএমবিটিইউ'র জন্য ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের তিন মাসের গড় মূল্যের প্রায় ১২.৬৫ শতাংশ প্লাস ৫০ সেন্ট দর প্রদান করে। বিশ্বব্যাপী, অতিরিক্ত প্রিমিয়ামসহ ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের মূল্যের একটি নির্দিষ্ট অংশের ওপর ভিত্তি করে প্রতি এমএমবিটিউ এলএনজি'র দাম নির্ধারিত হয়। ওমানের সঙ্গে নতুন চুক্তিতে দাম কেমন হবে জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা দৈনিক ৩,৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ); এর বিপরীতে সরবরাহ ৩,০০০ এমএমসিএফ। মোট সরবরাহের মধ্যে ৭৫০ থেকে ৮০০ এমএমসিএফ যোগান নিশ্চিত হয় এলএনজি আমদানি থেকে; স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে  পূরণ হয় বাকি চাহিদা। পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মধ্যে দৈনিক এই চাহিদা ৪,০০০ এমএমসিএফে পৌঁছাবে। আর এই চাহিদা পূরণে আমদানি করা এলএনজি'র অবদান ১,৫০০ এমএমসিএফ অতিক্রম করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই এক বা দুটি চুক্তির মাধ্যমে ঘাটতি মেটানো সম্ভব হবে না; আগামীতে এই সমস্যা আরও তীব্র হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম মনে করেন, এলএনজির দামের অস্থিরতার কারণে সরকার ভবিষ্যতে আরও সংকটে পড়বে। তিনি বলেন, "তিন থেকে চার বছরের মধ্যে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন আরও কমে যাবে এবং যতক্ষণ না আমরা আরও গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করতে পারবো, ততক্ষণ পর্যন্ত কমতে থাকা স্থানীয় উৎপাদন ঘাটতি মোকাবেলায় আরও বেশি এলএনজি আমদানির প্রয়োজন হবে।" সরকারকে স্থানীয় গ্যাস অনুসন্ধানে আরও বেশি মনযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। তথ্য অনুযায়ী, দেশীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ১.৫০ টাকা; অন্যদিকে, বিশ্ববাজার থেকে ৯.১৫ ডলার এমএমবিটিইউতে আমদানি করা হলে প্রতি ইউনিট এলএনজির জন্য খরচ দাঁড়ায় ৩৩ টাকা। *তৃতীয় এফএসআরইউ নির্মাণে সামিট গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি* সামিট গ্রুপ কক্সবাজারের মহেশখালীতে তৃতীয় ভাসমান স্টোরেজ এবং রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) নির্মাণ করতে যাচ্ছে। পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, এই টার্মিনালটির রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা হবে দৈনিক প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ২০২৬ সালের মধ্যে এটি কার্যকর হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে বিদ্যমান দুটি এলএনজি সরবরাহকারীর সক্ষমতা চার্জ হিসাবে সরকারের দৈনিক ব্যয় হচ্ছে ৪,৫৪,০০০ ডলার।
Published on: 2023-06-14 11:53:38.352887 +0200 CEST