The Business Standard বাংলা
বেকার, ঋণে জর্জর বাংলাদেশি তরুণ টুইটার ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে তুললেন নিজের কোম্পানি

বেকার, ঋণে জর্জর বাংলাদেশি তরুণ টুইটার ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে গড়ে তুললেন নিজের কোম্পানি

আব্দুল্লাহ আল-রেজওয়ান স্নাতক সম্পন্ন করেন ইনস্টিটিউট অভ বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে। বাংলাদেশি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে সাড়ে তিন বছর কাজ করার পর এমবিএ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ২০১৭ সালে। ২০১৯ সালে এমবিএ'র পাঠ চুকিয়ে ইক্যুইটি গবেষণা বিশ্লেষক হিসেবে যোগ দেন ম্যাডিসন ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানিতে। সবকিছু ঠিকঠাক মতই চলছিল। তবে কিছুদিনের মধ্যে ভাগ্য তীক্ষ্ণ মোড় নেয়। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ সংক্রমণ শুরু হয় এবং জুন মাসেই ওয়ার্ক পারমিটের মেয়াদ শেষ হওয়ায় তাকে ম্যাডিসন ইনভেস্টমেন্ট ছাড়তে হয়। পরবর্তীসময়ে কী করবেন তা নিয়ে ভাবনায় পড়ে যান আব্দুল্লাহ। এমবিএ করতে বিপুল অর্থ ঋণ নিতে হয়েছিল তাকে। কানাডায় স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করেছিলেন, তবে মহামারির কারণে এ প্রক্রিয়ায় অনেক সময় লাগছিল। এরপর তার জীবন বদলে দেওয়া ঘটনা ঘটে। টুইটারে জনপ্রিয়তা পেতে থাকেন তিনি। সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ওয়েবসাইট/নিউজলেটার পরিষেবা চালু করার চিন্তা করেন আব্দুল্লাহ — যেখানে প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি কোম্পানির কোনো আর্থিক অবস্থার গভীর বিশ্লেষণ দেওয়া হবে। কোভিডের সময় বেকারত্বের দিনগুলোতে তিনি টুইটারে অনেক বেশি সময় ব্যয় করতে থাকেন। মূলত নিজের টুইটার সার্কেলে শেয়ারবাজার নিয়ে আলোচনা করতেন তিনি। টুইটারেই তিনি বিশেষজ্ঞ থেকে অপেশাদার এমন অনেক লোক পেয়ে যান যারা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে চান। এদের বেশিরভাগই টুইটারে শেয়ারবাজার নিয়ে আলোচনা করে সময় কাটান। আব্দুল্লাহ আল-রেজওয়ান বলেন, 'আমি যখন টুইটারে সময় ব্যয় করতে শুরু করলাম, ভাবলাম ২০২০ সালের শেষে এক হাজার ফলোয়ার হলেই এই প্লাটফর্ম ব্যবহার করাটা আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। করোনা তখন দিন দিন আরও বাড়ছিল। মানুষের যাওয়ার মতো জায়গা নেই। সামাজিক মাধ্যমেই মানুষ বেশিরভাগ সময় ব্যয় করতে শুরু করেন। ওই সময় প্লাটফর্মটিতে সক্রিয় থাকাটা খুব কাজে দিয়েছে। মানুষের মাঝে তখন শেয়ারবাজার নিয়েও আগ্রহ বাড়তে থাকে।' তিনি আরও বলেন, 'সময়ের সাথে সাথে, ফিনটুইট তথা ফাইন্যান্স টুইট নামক একটি টুইটার গোষ্ঠীর সঙ্গে আমার সম্পৃক্ততা বাড়ে। এখানে সবাই সবসময় শেয়ারবাজার নিয়েই কথা বলেন।' আব্দুল্লাহ আরও বেশি সময় টুইটারে কাটাতে শুরু করেন। টুইট-রিটুইটে শেয়ারবাজার নিয়ে আলোচনা করা শুরু করেন। একদিন ওয়াই কম্বিনেটর নামক একটি কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা পল গ্রাহাম তার টুইট রিটুইট করলে জুনেই আব্দুল্লাহর ফলোয়ার ৩০০ থেকে বেড়ে হয়ে যায় দুই হাজার ৫০০। পল গ্রাহাম রিটুইট করার পর আব্দুল্লাহ শেয়ারবাজার নিয়ে তার ধারণা ও চিন্তাধারা জানিয়ে আরও ধারাবাহিকভাবে টুইট করতে থাকেন। সময়ের সাথে সাথে তার ফলোয়ার বাড়তে থাকে। আগস্টের মধ্যে ফলোয়ার সংখ্যা হয়ে যায় ১৫ হাজার। আব্দুল্লাহ বলেন, 'চাকরি হারানোর পর থেকে আমি কী করব তা নিয়ে ভাবছিলাম। এই আকস্মিক টুইটার খ্যাতির পরে এখান থেকেই আয়ের চিন্তা করলাম। আগের কর্মস্থলে আমাকে কোনো কোম্পানি বা ব্যবসা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য যোগাড় করতে দেওয়া হতো। তা জমা দেওয়া হতো পোর্টফোলিও ম্যানেজারের কাছে। এই কাজের জন্য সে কোম্পানি প্রচুর অর্থ প্রদান করত। 'আমি ভাবলাম, যদি আমি ইন্টারনেটে একই কাজ করি? কোনো একটি নির্দিষ্ট কোম্পানি থেকে অর্থ নেওয়ার পরিবর্তে অনেক মানুষই যদি সাবস্ক্রাইবের মাধ্যমের আমাকে অর্থ দেয়?' তখনো কোনো বড় লক্ষ্য সামনে রেখে আগাননি আব্দুল্লাহ। কোনো কিছু না করে বসে থাকার চেয়ে ১০ জন মানুষও সাবস্ক্রাইব করলে সেটাও ভালো বলে মনে হয় তার। আব্দুল্লাহ বলেন, 'আমি ভাবলাম, যদি ১৫ হাজার ফলোয়ারের মধ্যে ১০ জন সাবস্ক্রাইব করে আর আমি যদি তাদের থেকে ১০ ডলার করে নেই তাহলে মোট হবে ১০০ ডলার। ওই পরিমাণ অর্থও আমার কাছে নেই । আমার সর্বোচ্চ লক্ষ্য ছিল ৫০০-৬০০ সাবস্ক্রাইবার পাওয়া।' সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আব্দুল্লাহ তার ওয়েবসাইট চালু করেন। যার নাম দেন এমবিআই (মোস্টলি বরোড আইডিয়াজ) ডিপ ডাইভস। প্রথম দিনেই তিনি পেয়ে যান ১৫০ সাবস্ক্রাইবার। যা তার প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি ছিল। ২০২১ সালের জানুয়ারিতে আব্দুল্লাহ কানাডায় স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পান। ততদিনে তার সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যায়। আব্দুল্লাহর ইচ্ছে ছিল, যদি ওয়েবসাইট দিয়ে সফল হওয়া না যায় তাহলে সীমান্ত খুললেই কানাডা যাবেন আর সেখানে চাকরি খুঁজবেন। সেখানে তিনি গেলেন ঠিকই, তবে কোন চাকরি খোঁজেননি। নিজের পুরো সময় ব্যয় করতে লাগলেন এমবিআই ডিপ ডাইভসকে ঘিরে। শুরু থেকেই তার মডেল খুব সরল। প্রতি মাসে তিনি একটি কোম্পানি সম্পর্কে গভীর বিশ্লেষণ প্রকাশ করেন। কীভাবে সে কোম্পানি অর্থ উপার্জন করে, প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তার অবস্থান কেমন, পরবর্তী ৫-১০ বছরে কোম্পানির অবস্থা কেমন হতে পারে, শেয়ারের দাম কোনদিকে যেতে পারে এসব তুলে ধরেন। টুইটারে তার অনুসারীরাই সাবস্ক্রাইব করে এসব পড়েন। বর্তমানে, টুইটারে আব্দুল্লাহ আল-রেজওয়ানের ফলোয়ার সংখ্যা এক লাখ ২০ হাজার। ওয়েবসাইটে সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা এক হাজার ৬০০। মাসিক হিসেবে ১৫ ডলার অথবা বার্ষিক ১৫০ ডলার খরচ করতে হয় একজন গ্রাহককে। আব্দুল্লাহ জানান, তার ওয়েবসাইটে এখন পর্যন্ত ৩৫ কোম্পানির বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। সেগুলোর সাত/আটটিতে তিনি নিজেও বিনিয়োগ করেছেন। উবার, স্পটিফাই, রকু, বোয়িং, শপিফাই, পিনটারেস্ট, পেপ্যাল, অ্যাডোবি, ক্লাউডফ্লেয়ার, এয়ারবিএনবি, মেটা, আলফাবেট, অ্যামাজন ও মাইক্রোসফট-এর মতো প্রতিষ্ঠান নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। কোম্পানিগুলো সম্পর্কে অনুসন্ধান, গবেষণা এবং লেখার বিষয়ে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে এমন অনেকগুলো সংস্থা রয়েছে যেগুলো সম্পর্কে আপনি লিখতে পারেন। এমন শত শত সংস্থা রয়েছে যেগুলি সম্পর্কে আমি আরও জানতে চাই। বিশ্লেষণ করার মতো আর কোম্পানি বাকি থাকবে না, এমনটা কখনো হবে না। আমি আমার নিজের পছন্দ থেকে কোম্পানি বাছাই করে বিশ্লেষণ করা শুরু করি। আব্দুল্লাহ জানান, কোম্পানি সম্পর্কে গবেষণার জন্য ব্যাপকহারে ইন্টারনেট ব্যবহার করেন তিনি। প্রথমে তিনি কোম্পানিগুলো বার্ষিক বা ত্রিমাসিক প্রতিবেদন পড়া শুরু করেন। এরপর সে ব্যবসা, কোম্পানির প্রতিযোগী এবং আরও বিস্তারিত তথ্যের জন্য গবেষণা শুরু করেন। মাসব্যাপী বিশ্লেষণের পর তিনি সে কোম্পানির বিস্তারিত তুলে ধরেন। ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে তিনি প্রতি মাসে একটি কোম্পানি নিয়েই লেখেন। সম্ভব হলেও এর বেশি করেন না। তার মতে এতে কাজ নিয়ে নিজের আগ্রহ কমে যেতে পারে। এমবিআই ডিপ ডাইভসকে তিনি একাই চালিয়ে নিতে চান বলে জানান আব্দুল্লাহ। যদি আয় ১০ লাখ ডলারের ঘর ছাড়িয়ে যায় তাহলে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার কথা ভাবতে পারেন। তবে এমবিআইকে ছোট প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাখতে চান বলে জানান তিনি — অনেক আয় হলেও তিন চারজনের বেশি লোক নিয়ে কাজ করতে চান না। আব্দুল্লাহ বলেন, 'খুব কঠিন পরিস্থিতিতে আমি এমবিআই ডিপ ডাইভস শুরু করেছি। এমন পরিস্থিতিতে না পড়লে আমি নিজ থেকে কিছু শুরু করতাম না। সে কারণেই আমার মনে হয়, ভয়ানক পরিস্থিতিতে থাকলেও, বিশ্ব আপনাকে কি বলতে চায় শুনুন।' 'আমি একটি কোম্পানিতে কাজ করে প্রতি মাসে বেতন পেয়ে খুব খুশি হতাম। কর্নেলে ভর্তি হওয়ার আগে এটাই আমার স্বপ্ন ছিল। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে না পড়লে আমি এমবিআই ডিপ ডাইভস তৈরি করতে পারতাম না।'
Published on: 2023-06-14 17:56:47.777789 +0200 CEST