The Business Standard বাংলা
তারা ঢাকার নরসুন্দর!

তারা ঢাকার নরসুন্দর!

-চুল দাড়ি কাটমু, টাকা দিমু ৫০টা। -হবে না। যেহানে কম পাও, সেহানে যাও। -তাইলে আর আসলাম ক্যা! -যে কোন দোকানে যাবা ১২০ ট্যাকার নিচে কাটবো না। এহন ট্যাকার আর দাম নাই। কথাগুলো হচ্ছিলো জ্যোতি চন্দ্র শীল ও মোহাম্মদ হোসেনের মধ্যে। জ্যোতি পেশায় একজন নাপিত। আজিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পাশে ফুটপাতে তার দোকান। সেটিকে অবশ্য দোকান না বলে বলা ভালো খুপরি। দেয়ালে ঝোলানো একটি মাঝারি সাইজের আয়না। নিচে একটি কাঠ ঝুলিয়ে তার ওপর রাখা হয়েছে চুল-দাড়ি কাটার সরঞ্জাম। সামনে পেতে রাখা একটি চেয়ার। রোদ ঠেকাতে মাথার ওপরে দেয়া হয়েছে অস্থায়ী পলিথিনের ছাপড়া। সেই খুপরি দোকানেই সকাল সকাল এসে হাজির হয়েছেন দিনমজুর মোহাম্মদ হোসেন। জ্যোতি আর হোসেনের মধ্যে দরকষাকষি হচ্ছে চুল কাটানোর মজুরি নিয়ে। ৮০ টাকার নিচে চুল-দাড়ি কাটেন না জ্যোতি। অনেক আলাপের পর শেষমেশ 'ট্যাকার দাম না থাকা' সময়ে ৬০ টাকা দর ঠিক হলো। হোসেন চেয়ারে উঠে বসলেন। ঢাকার ফুটপাত ধরে হাঁটলে জ্যোতি শীলের মতই অসংখ্য নাপিতের দেখা পাওয়া যায়। এরা মূলত হিন্দুধর্মাবলম্বী। পদবিতে শীল। নিজেদের পরিচয় দেন 'নরসুন্দর' বলে। এ পেশা তারা পেয়েছেন পূর্বপুরুষদের কাজ থেকে, অর্থাৎ বংশপরম্পরায়। সবাই না হোক, অন্তত এ মানুষগুলো পূর্বপুরুষের পেশা ধরে রেখেছেন যুগের পর যুগ। নিউমার্কেট, আজিমপুর, চাঁনখারপুল কিংবা আরামবাগ, ঢাকার প্রায় সব অঞ্চলেই ফুটপাতে দেখা মেলে অস্থায়ী এসব নাপিতের দোকান। একখন্ড আয়না, একটি চেয়ার আর কিছু সরঞ্জাম, এ নিয়েই ফুটপাতে জমে ওঠে এদের পসার। কিন্তু সময় যে বদলাচ্ছে। অন্য ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষও গ্রহণ করছে নাপিতের পেশা। চারপাশে বসেছে নামী-দামি সব সেলুন। এ অসম যুদ্ধে টিকে থাকতে পারবেন তো ফুটপাতের নরসুন্দরেরা? একটি অংশ খরিদ্দার কি তাদের সবসময়ই থাকবে? নিজেদের নতুন প্রজন্মের এ পেশায় আসা নিয়েই বা কী ভাবছেন তারা? চলুন, নিম্নবর্গের মানুষের ভরসা, ফুটপাতের নরসুন্দরদের খুপরি দোকান থেকে ঘুরে আসা যাক। *কারা এই 'শীল' সম্প্রদায়* চুল-দাড়ি-গোঁফ বড় হলেই আমাদের ছুটতে হয় নাপিতের কাছে। শহর ও গ্রাম ভেদে নাপিতদের এই কাজের ধরন আবার বেশ আলাদা। আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে পুরুষ এবং নারী, দুইধরনের সেলুনের দেখা পাওয়া যায় শহরে। এ কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নেয়া মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্যও লক্ষ্য করা যায়। যদিও প্রাচীনকাল থেকে এটি ছিলো মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত একটি কাজ, বর্তমান সময়ে বাঙালি মুসলমান ও অন্যান্য ধর্মালম্বীদের অনেকে এখন এ পেশায় আসছেন। হিন্দু যে সম্প্রদায়টি এ কাজ করতো, তাদের বংশপদবি 'শীল'। এ সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের কাজ চালিয়ে যেতেন বংশপরম্পরায়। মূলত ঠাকুরদা থেকে বাবা, বাবার থেকে ছেলে, এভাবেই দেয়া হতো প্রশিক্ষণ। সনাতন হিন্দু বাঙালিদের নামে প্রধানত দুটি অংশ থাকে। প্রথমটি নাম, দ্বিতীয়টি হলো পদবি বা টাইটেল যা আবার তার গোত্রকে নির্দেশ করে। একে উপনামও বলা হয়। পূর্বপুরুষের পেশা থেকেই মূলত এ নামের উৎপত্তি। এছাড়া সরকার প্রদত্ত খেতাব কিংবা শিক্ষাগত যোগ্যতার উপাধি কখনো কখনো নামের শেষে পদবি হিসেবে যুক্ত হয়েছে। বর্তমান সময়ে পেশাগত এসব উপনাম থাকলেও বেশিরভাগ সময়ে দেখা যায়, ব্যক্তি আর পূর্বপুরুষের সে পেশায় নেই। তবে 'শীল' পদবিধারীদের একটি বড় অংশ তাদের বংশগত পেশা ধরে রেখেছেন দীর্ঘদিন। অন্যভাবে বললে, দেশের 'নরসুন্দর'দের বড় অংশ দখল করে আছেন শীলেরা। হিন্দু শাস্ত্র মতে, ক্ষত্রিয় পিতা ও শূদ্র মাতার পরিবার থেকে নাপিত সম্প্রদায়ের জন্ম। অনেকের ধারণা নাপিতের উৎপত্তি দেবতা শিব থেকে, যিনি তার স্ত্রীর নখ কেটেছিলেন। এরা কতিপয় অনুসম্প্রদায়ে বিভক্ত। এগুলো হলো- আনারপুরিয়া, বামানবেন, বরেন্দ্র, রাঢ়ী, মাহমুদাবাজ, সপ্তগ্রাম, সাতঘরিয়া, খোট্টা ইত্যাদি। শীল সম্প্রদায় অস্পৃশ্য নয়। এদের অধিকাংশই বৈষ্ণব মতাবলম্বী। ধর্মীয় কাজে তারা ব্রাহ্মণদের পুরোহিত হিসেবে নিয়োগ করতে পারে। হিন্দু সমাজের বিয়েতে শীলদের প্রয়োজন হয় 'মহাবাক্য' মন্ত্রপাঠে, যা দ্বিতীয় গায়ত্রী হিসাবে পরিচিত। এই মহাবাক্য ছাড়া বিয়ে সম্পন্ন হয় না। মহাবাক্যের তাৎপর্য হলো, এটি মহাদেব এবং মাতা পার্বতীর বিয়ে সংবাদ বা শ্লোক। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সকল অঞ্চলেই শীলদের বাস রয়েছে। আগের দিকে নাপিতদের কাজের বিনিময়ে অর্থ দেয়া হতো না। চুল-দাড়ি-নখ কাটার পারিশ্রমিক হিসেবে দেয়া হতো দ্রব্যসামগ্রী। সেবার সাথে দ্রব্যের এ বিনিময় ব্যস্থাকে বলা হয় 'যজমানি প্রথা'। বর্তমান সময়ে এ ধরণের বিনিময় প্রথা আর দেখা যায় না। তবে বাঙালি সমাজে এখনও নাপিত বলতে শীল সম্প্রদায়কেই বোঝানো হয়। *ফুটপাতের 'নরসুন্দর'* পলাশীর মোড় থেকে নীলক্ষেত যাওয়ার পথে ফুটপাতে সুশান্ত কুমার শীলের দোকান। আজ থেকে ২৪ বছর আগে বাবার হাত ধরে ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। তার বাবা বসতেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হলের সামনে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই তিনি ঢাকায় কাজ শুরু করেছিলেন। সুশান্তের ঠাকুরদাও একই কাজ করতেন গ্রামের বাড়িতে। তবে তার বাবাই প্রথম পেশাগত কাজে ঢাকা শহরে স্থায়ী হন। চার ভাইয়ের মধ্যে সুশান্ত সবার বড়। অন্য আট-দশটি শীল বাড়ির ছেলের মত ছোটবেলাতেই কাজ শিখে নিয়েছিলেন তিনি। ঢাকায় এসে প্রথমে কাজ নেন একটি দোকানে। সেখানে দিব্যি শুরু করেছিলেন। কিন্তু আয়ের অর্ধেকই দিয়ে দিতে হতো মালিককে। ফলে নিজের যা থাকতো, তা দিয়ে তেমন কিছু হতো না। এরপরই ফুটপাতে দোকান দেয়ার কথা মাথায় আসে তার। বাবার দেখানো পথে পলাশী এসে ঘাঁটি গাড়েন তিনি। তারপর থেকে আজ দুই যুগ হলো তিনি পলাশী মোড়ের 'নরসুন্দর'। ঢাকার বেশিরভাগ মানুষ যখন ঘুমোচ্ছে, সেসময় জেগে ওঠেন সুশান্ত। সকাল ৭টা নাগাদ দোকান খোলেন। দোকান খোলা মানে ওপরের কাগজ টাঙ্গানো, দেয়ালে আয়না ঝোলানো আর কাঠের ওপর সরঞ্জামাদি সাজিয়ে রাখা। বেলা গড়ায়, এক এক করে খরিদ্দার আসতে থাকে দোকানে। রোদ ওঠে, সূর্য ঢলে পড়ে পশ্চিমে, তবু কাজ চলতে থাকে সুশান্তর। সারাদিন অক্লান্ত কাজ করে যান। দোকানের পাশে রাখা আছে একখণ্ড পাথর। ভীড় থাকলে খরিদ্দারেরা ওখানে বসে অপেক্ষা করেন। যখন কেউ থাকে না, সুশান্ত নিজেই বসে একটু জিরিয়ে নেন। দোকান বন্ধ করেন সন্ধ্যা ৭টায়। এই ১২ ঘণ্টা ফুটপাতের সাথে, ফুটপাতের ধুলো, ময়লা আর কখনো প্রশাসনের সাথে যুদ্ধ করে কেটে যায় তার। খরিদ্দারের সাথে মজুরি নিয়ে বাকবিতন্ডায় মাঝে আবার কখনো চলে আসে বৃষ্টি। ওপরের অস্থায়ী ছাপড়া রোদ আটকালোও থামাতে পারে না বৃষ্টির ঝাপটা। কখনো হয়তো পুরো দিনটাই হয়তো অলস বসে থাকতে হয়। এভাবেই কেটে যায় সপ্তাহ, মাস এবং বছর। ফুটপাত ঘিরেই আবর্তিত হয় সুশান্তর জীবন। *মূল খরিদ্দার নিম্নবর্গের মানুষ* সমাজের নিম্ন আয়ের মানুষের, যারা শুধু চুল বড় হয় বলেই কাটতে চান, বেশি অর্থ খরচ করে চুলে বাহারি নকশা করা যাদের উদ্দেশ্য নয়, তাদেরই প্রিয় জায়গা ফুটপাতের এ দোকানগুলো। এর সবচেয়ে বড় কারণ, যেকোন দোকানের চেয়ে খরচ কম এখানে। ঢাকার একটি মাঝারি মানের সেলুনে যেখানে খরচ হয় ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, সেখানে কাজভেদে ফুটপাতের এসব দোকানে খরচ ৫০ থেকে ৮০ টাকা। কখনো আরও কম। রিকশাচালক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ, খেটে-খাওয়া দিনমজুর, সকলেরই ভরসা সুশান্ত। একসময় বড় সেলুনেই কাজ করতেন তিনি। কাজটা ভালোই জানেন। বোঝেন কে কী চায়। রিকশা চালককে কীভাবে চুল কেটে দিতে হবে, কীভাবে কাটতে হবে একজন তরুণের, সুশান্ত বোঝেন সব। তাই নিম্ন-আয়ের মানুষও খুশি সুশান্তর কাজে। রিকশাচালক গণি নীলক্ষেত-নিউমার্কেট এলাকায় রিকশা চালান। এসেছেন চুল কাটাতে। সুশান্ত আরেকটি কাজে ব্যস্ত থাকায় পাশে রাখা পত্রিকা পড়ছিলেন তিনি। কেন ফুটপাতের সেলুনে আসেন জিজ্ঞেস করাতে একবাক্যে জানালেন, 'ভালো কাটে, ট্যাহা কম'। এই একটি বাক্যের মধ্যেই যেন সুশান্তর কারিশমা লুকানো। চুল কাটেন ভালো, কিন্তু টাকার পরিমাণ সে তুলনায় অনেক কম। মানুষ কেন আসবে না? সুশান্তর মতই মিন্টু শীল কাজ করেন ইডেন কলেজের বিপরীত পাশের ফুটপাত। একসময় কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তার দোকানে চুল কাটাতে আসতো। এখন মূল খরিদ্দার রিকশাচালকেরা। আসেপাশে নির্মাণ শ্রমিকেরাও তার কাছে চুল কাটাতে আসে। তবে তারা নিয়মিত নয়। 'কলেজের ছাত্ররা আগে অনেক আসতো। এখনও কয়েকজন আসে। তাগো (টাকা) কম রাখার চেষ্টা করি', বললেন মিন্টু। খদ্দেরদের ধরন হয়তো পরিবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু দোকানের চেয়ারটি খালি পড়ে থাকছে না, এই ভরসার কথা জানালেন তিনি। *থাকতে চান ফুটপাতেই* সুশান্ত, মিন্টু কিংবা জ্যোতি, ফুটপাতের নরসুন্দর হয়েই থাকতে চান সকলে। প্রত্যেকে জানালেন ভিন্ন ভিন্ন কারণ। দিতে হবে না দোকান ভাড়া, দরকার নেই বড় কোন পুঁজির, এই ভেবে, বাবার দেখানো পথেই ফুটপাতেই দোলাম খুলেছিলেন সুশান্ত। ছোট হোক, বড় হোক, নিজের দোকান, নিজেই নিজের মালিক। তাই অন্য কোথাও কাজ করার ইচ্ছা নেই সুশান্তর। জিজ্ঞেস করাতে বললেন, 'স্বাধীন পেশা, তাই কোথাও যাই না। এখানেই কাজ করি। আমার এখন মন চাইলে এখনই চলে যামু। আমরা বড় বড় দোকানে কাজ করেই আসছি। আমি ৫ টাকা কম রাখতে পারি, দোকানে সেইটা করা যায় না'। যতদিন কাজ করবেন, এই ফুটপাতেই করতে চান তিনি। তারপর গ্রামে গিয়ে কৃষি কাজে মন দেবেন। তবে ঢাকায় থাকতে তিনি ফুটপাতের নরসুন্দর হয়েই থাকতে চান। একই ইচ্ছা জ্যোতি আর মিন্টু শীলের। ঢাকার কোথাও একটি দোকান ভাড়া নিতে গেলে যে পরিমাণ পুঁজি লাগে, তা দিতে পারবেন না তারা। তার চেয়ে এই খোলা প্রান্তরে, ধুলোবালি মাখা ফুটপাতকেই আপন লাগে তাদের। ফুটপাত ছেড়ে আপাতত কোথাও যেতে চান না তারা। *কাটিয়ে উঠেছেন করোনাকালীন ক্ষতি* অন্যান্য অনেক পেশার মতই কোভিড-১৯ ঝুঁকিতে ফেলেছিলো নরসুন্দরদের। প্রায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষই এসময় কর্মহীন হয়ে পড়েন তারা। এমনও সময় গিয়েছে, সংস্পর্শ এড়ানোর জন্য বাসা থেকেও বের হন নি মানুষজন। চুল-দাঁড়ি কাটার ব্যবস্থা করেছেন বাড়িতেই। যার প্রভাব সরাসরি পড়েছিলো নাপিতদের ওপর, বিশেষ করে ফুটপাতের অস্থায়ী দোকানগুলোতে। শহরে মানুষ আনাগোনা ছিলো না, ফলে স্বাভাবিক ভাবেই ছিলেন না শ্রমজীবী মানুষ। আর এরাই হলেন ফুটপাতের দোকানগুলোর মূল খদ্দের। তাই নাপিতদেরও পার করতে হয় দীর্ঘ কর্মহীন সময়। শীল সম্প্রদায়ের এসব মানুষের অন্য কোন কাজ তেমন জানা না থাকায় তাদের বিপদ হয়েছিলো অন্যদের চেয়ে বেশি। করোনার সময় কী করেছেন? জিজ্ঞেস করাতে জ্যোতি শীল জানালেন সেই দুঃসহ সময়ের গল্প। করোনার প্রকোপ শুরু হওয়ার পর তিনি লালবাগে তার এক জ্ঞাতি ভাইয়ের দোকানে কাজ নিয়েছিলেন। তবে খদ্দের পাওয়া যেতো না তেমন। দুই একজন আসলেও প্রশাসনের ভয়ে দোকানের ঝাঁপ নামিয়ে কাজ করতে হতো। এমনও দিন গিয়েছে, একবেলা খাবারের টাকাও আয় করতে পারেন নি। তখন নানা জায়গা থেকে সাহায্য নিয়ে চলতে হয়েছে। গুলিস্তানে সাহায্যের জন্য লাইনে পর্যন্ত দাঁড়াতে হয়েছে। তিনি অবশ্য শহর ত্যাগ করেন নি। আরেক নরসুন্দর সুশান্ত শীল করোনার সময়ে চলে গিয়েছিলেন বাড়িতে। গ্রামে কৃষি কাজ করে এসময় সংসার চালাতে হয়েছে তার। 'অন্য কোন কাজ তো শিখি নাই জীবনে। কী করবো বলেন? ছোট বেলা থেকে এই কাজ করছি। কৃষি কাজটা পারতাম। ওইটা করছি।' বলেন সুশান্ত। তার মত মিন্টু শীলও কৃষি কাজ করে টিকে ছিলেন সেই অতিমারির সময়টিতে। এখন অবশ্য সে ক্ষতি পুষিয়ে নিয়েছেন তারা। আবার স্বাভাবিক হয়েছে সব। শহর তার আগের গতিতে চলছে। সাধারণ মানুষ, শ্রমজীবীদের কর্মব্যস্ততা বাড়ার সাথে সাথে আবারও অর্থের দেখা পাচ্ছেন নরসুন্দরেরা। *কাজে ভবিষ্যত আছে, তবে ভবিষ্যত দেখছেন না সন্তানদের* সুশান্তর মতই বাপ-ঠাকুরদার পেশা ধরে রেখেছেন মিন্টু চন্দ্র শীল। বাড়ি পটুয়াখালী। সেখানে স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ে রয়েছে তার। দুইজনকেই পড়াশোনা করাচ্ছেন। কত পুরুষ ধরে এ কাজ করছেন, নিজেই জানেন না, কিন্তু ছেলেকে এ পেশায় আনার পরিকল্পনা নেই তার। ছেলে পড়াশোনা করে চাকরি করুক, এমনটাই আশা করেন তিনি। কিন্তু কেন? তবে বংশপরম্পরায় কোন মূল্য নেই? মিন্টু বললেন ভিন্ন কথা। জানালেন, তিনি অন্য কোন কাজ শেখেন নি, তাই এই কাজ করছেন। ছেলেকে এই কাজ শেখান নি, আনতেও চান না। "আমরা তো ধরেন মুরুক্ষ (মূর্খ) দেইখা করি, আমাগো যারা উপ্রের লেভেলে গেছে, হেরা চাকরি বাকরি করে", বলেন মিন্টু। দুর্যোগের দিনগুলো ছাড়া সারাদিনই লোকজন আসতে থাকে দোকানে। ফলে ব্যবসার ভবিষ্যত ভালোই দেখছেন তারা। 'জনগণ যেহেতু আছে, চুল-দাঁড়ি যেহেতু আছে, কাজ বন্ধ হবে না', বলেন সুশান্ত কুমার শীল। তবু কেন নতুন প্রজন্মকে এ কাজে আনতে চান না কেউ? সুশান্ত জানালেন সামাজিক মর্যাদার কথা। চাকরি করলে যে মূল্য সমাজ দেয়, এধরণের স্বাধীন পেশায় তা পান না শীলেরা। ফলে বংশগত পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। সময় সত্যিই বদলাচ্ছে। পরিবর্তিত হচ্ছে গোত্র ভিত্তিক পেশার সেই আদি রীতি। সকলেই এখন নিজের ইচ্ছা মতো স্বাধীন পেশা বেছে নেয়াতেই বেশি আগ্রহী। সামাজিক মর্যাদা কম এমন পেশায় আর আসতে চান না অনেকেই, যতই তা পূর্বপুরুষের পেশা হোক। একই রকম ভাবছেন শীল সম্প্রদায়ের মানুষও। জ্যোতি শীলের কণ্ঠেও ঝরে এমনই হতাশা। তার মতে, এ কাজে টাকা পয়সা যে নেই, তা নয়। কিন্তু সবাই ছোট চোখে দেখে। তুচ্ছতাচ্ছিল্যও সহ্য করতে হয়। ফলে নতুন প্রজন্ম এ কাজে আসুক, এমনটি তিনিও চান। সেন রাজাদের আমলে সমাজের রীতি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো কর্মভিত্তিক বর্ণবিভাজন। আবার সময়ের দাবিতেই তা শেষের পথে। কারণ অল্প পুঁজিতে 'নরসুন্দর' পেশা ক্রমেই লাভজনক হয়ে উঠছে৷ দিন দিন তাই ধর্মীয় গণ্ডি পেরিয়ে কাজ হয়ে উঠছে সকলের। শীল সম্প্রদায়ের বাইরের মানুষ আসছে এ পেশায়, শীলেরা হয়তো গ্রহণ করছে অন্য কোন বৃত্তি। তাই ঢাকার ফুটপাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাওয়া নরসুন্দরেরা কতদিন টিকে থাকতে পারেন, সেটিই দেখার। *তথ্যসূত্র:* ১. পদবীর উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস- শ্রীখগেন্দ্র নাথ ভৌমিক ২. বাংলাপিডিয়া
Published on: 2023-06-16 12:55:34.994394 +0200 CEST