The Business Standard বাংলা
বাড়ি, গাড়ির মতো তার দোকানে ভাড়া পাওয়া যায় এসি ও ফ্রিজ!

বাড়ি, গাড়ির মতো তার দোকানে ভাড়া পাওয়া যায় এসি ও ফ্রিজ!

সরু এক গলির মধ্যে পুরোনো ছোট্ট স্যাঁতসেঁতে দোকানের মালিক খায়রুল ইসলাম। দোকানের ভেতর পুরোনো ভারী সব যন্ত্রপাতির ঠাসাঠাসিতে দুজনের বেশি তিনজন লোকের বসার জায়গা হয় না। তাই তো দোকানের বাইরে একাধিক পুরোনো ফ্রিজ ও ফ্রিজের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সার বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। মেকানিকের এই দোকানে পুরোনো ফ্রিজ, এসি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজ করা হয়। কিন্তু এসবের বাইরেও বরিশাল জেলার ওই এলাকার মানুষের কাছে ছোট্ট এই দোকানের পরিচিতি গড়ে উঠেছে অন্য এক কারণে। 'খায়রুল রেফ্রিজারেশন এন্ড সার্ভিস' মূলত ফ্রিজ ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি মেরামতের দোকান হলেও এখান থেকে মাসিক ভাড়ায় ফ্রিজ, এসি ও এয়ারকুলার পাওয়া যায়, যেগুলোর বেশিরভাগই পুরোনো। এসব কারণেই অল্পদিনের মধ্যে দোকানি খায়রুল ও তার দোকান বরিশালের ওই অঞ্চলের মানুষের কাছে বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে। ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়ার সঙ্গে বাড়তে থাকে তার ব্যবসার পরিধি। বরিশালের কলেজ রোড এলাকায় অবস্থিত 'খায়রুল রেফ্রিজারেশন এন্ড সার্ভিস'-এর মালিক খায়রুল ইসলামের নতুন-পুরোনো মিলিয়ে ৪০০টির বেশি ফ্রিজ বর্তমানে ভাড়ায় চলছে। এককালীন জামানত ও নির্দিষ্ট পরিমাণ মাসিক ভাড়ার বিনিময়ে যে-কেউ চাইলেই এখান থেকে ফ্রিজ, এসি ভাড়া নিয়ে যেতে পারেন। ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে স্বল্প টাকায় শুরু করা এই ব্যবসায় থেকে বর্তমানে খায়রুল ইসলামের মাসিক আয় লক্ষাধিক টাকা। সাদিয়া আক্তার একজন দ্বিতীয় বর্ষের মেডিকেল শিক্ষার্থী। পড়াশোনার জন্য সাতক্ষীরায় থাকা বাবা-মাকে ছেড়ে বর্তমানে বরিশালে থাকছেন। প্রথম কিছুদিন পরিচিত আত্মীয়ের বাসায় থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যান। আলাদা বাসা খুঁজতে প্রতিদিন বিকেলে ক্লাস শেষ করে বেরিয়ে পড়তেন। অলিতে-গলিতে হাঁটতে সময় বাড়ির দেয়াল থেকে গেটে তাকালেই 'বাসা ভাড়া হবে' এমন টু-লেট প্রায়ই তার চোখে পড়ে। সেখান থেকেই চারজন বান্ধবী মিলে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। বাসা তো পাওয়া গেল, কিন্তু গরমে সারাদিন ক্লাস, ল্যাবের পর একটু ঠান্ডা পানির জন্য রাস্তার ধারে বিক্রি করা শরবত নাহয় মুদি দোকান থেকে পানি কিনে খেতে হতো তাদেরকে। অনেক সময় সেটাও হয়ে উঠত না পড়াশোনার চাপে। সাদিয়া তার সহপাঠীদের থেকে একদিন জানতে পারলেন, বরিশালের এক দোকানে ভাড়ায় ফ্রিজ পাওয়া যায়। ভাড়ায় বাড়ি, গাড়ি পাওয়া গেলেও ফ্রিজ, এসি ভাড়া দেওয়ার ঘটনাটি একেবারেই নতুন এক বিষয়। আগ্রহ নিয়ে দোকানে গিয়ে দেখলেন ছোট্ট একটি পুরোনো দোকানেই ভাড়া দেওয়া হচ্ছে নতুন, পুরোনো ফ্রিজ। এককালীন জামানত বাবদ কিছু টাকা দিয়ে মাসিক ৫০০ টাকা ভাড়ার বিনিময়ে পুরোনো একটি ফ্রিজ নিয়ে আসেন নিজেদের জন্য। অচেনা এক শহরে সাদিয়ার মতো শিক্ষার্থী ও ব্যাচেলরদের জন্য মাসিক স্বল্প ভাড়ায় ফ্রিজ ভাড়া যেন তাদের জীবনকে সহজ করে দিয়ে, গরমে স্বস্তি এনে দিয়েছে। *ভাঙারির* *নষ্ট* *ফ্রিজ* *থেকে* *নতুন* *এক* *ব্যবসায়* ঠিক ১২ বছর আগে খায়রুল ইসলামের ছোট্ট এই রেফ্রিজারেশন দোকানটি ছিল একটি মুদির দোকান। দীর্ঘ ৬ বছর মুদি ব্যবসা করার পর খায়রুলের আয়ের চেয়ে ধারদেনার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় দোকানটি তিনি বিক্রি করে দেন। ধারের টাকা জোগাড় করতে মুদি দোকানের ফ্রিজটি তিনি মাসিক ভাড়ায় দিয়েছিলেন। এটিই ছিল তার প্রথমবারের মতো ফ্রিজ ভাড়া দেওয়া। সে অভিজ্ঞতা অবশ্য তার মোটেও ভালো ছিল না। কয়েকমাস ভাড়ায় চলার পর ক্রেতা সে ফ্রিজটি নিয়ে পালিয়ে যায়। শেষ সম্বল ফ্রিজটি হারিয়ে খায়রুল ইসলাম একরকম পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলেন। ঠিক করলেন, যতো কাঠখড়ই পোড়াতে হোক না কেন, ফ্রিজটি তিনি উদ্ধার করেই ছাড়বেন। শক্ত মনোবল নিয়ে সবরকম চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। বহু চেষ্টা ও ভোগান্তির পর অবশেষে ফ্রিজটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়। মানুষকে বিশ্বাস করে ঠকে যাওয়ার মনঃকষ্ট থেকেই ফ্রিজ ভাড়া দিয়ে নতুন এক ব্যবসা শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন খায়রুল। খায়রুল ইসলাম তার সেই পুরোনো অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে কিছুটা আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন। তিনি বলেন, "আমি মানুষের ক্ষতি করি নাই; তাই অন্য কেউ আমার সাথে এমন কাজ করবে, ভাবতে পারতাম না। ভাবছিলাম মুদি দোকানের ধারের টাকা ফ্রিজ ভাড়ার টাকা দিয়া শোধ করমু। কিন্তু ফ্রিজ নিয়া পালায় যাওয়ার পর ওইটা খুঁইজা আনতে আমার অনেক কষ্ট হইছিল। আমি তহন ভাবলান, এই ফ্রিজটার জন্য যেহেতু আমারে এত কষ্ট করতে হইছে, আর এইভাবে মানুষ আমারে ঠকাইলো, তাইলে আমি এই ব্যবসাই শুরু কইরা দেখি সামনে কী অবস্থা হয়। সেই যে মনে একটা কষ্ট পাইছিলাম, ওইটাই আমারে এই ব্যবসায় আনছে।" খায়রুল বলেন, "নতুন ফ্রিজ কিনার মতো টাকা আছিলো না। ভাঙ্গারির দোকানে দেখতাম পুরান নষ্ট ফ্রিজ ভাইঙ্গা ওগুলার যন্ত্রপাতি কেজিতে বিক্রি করত। আমি ভাঙ্গারির দোকান থিকা ওই নষ্ট ফ্রিজগুলা কিনতাম। ওদের কেনা দামের থিকা কিছু টাকা বেশি দিতা, যাতে ওরা আমার কাছে বিক্রি করতে রাজি হয়। আগে থিকাই মেশিনের টুকিটাকি কাজ করতে পারতাম। ভাঙ্গারির থিকা পুরান, নষ্ট ফ্রিজ কিন্যা ওগুলা আমি নিজে ঠিক করতাম। অনেক সময় লোক দিয়া সারাইতাম। তারপর ওগুলা মানুষের কাছে ভাড়া দিতাম। একদিন বরিশালের কারিগরি প্রশিক্ষণ কলেজের একজন স্যার আমার কাছে চুলা ঠিক করতে আসছিল। আমার কাজ দেইখা তার ভালো লাগে। তিনি আমারে বলেন, তুমি যেহেতু এই লাইনে কাজ করতাছো, আমাদের ওইখান থেকে প্রশিক্ষণ নিলে এইসব কাজ আরও ভালমতো করতে পারবা। আমি প্রশক্ষণ শেষ কইরা ফ্রিজ, এসি মেরামতের পাশাপাশি আরও বেশি ফ্রিজ কিন্যা ভাড়া দেওয়া শুরু করি। এভাবেই ৬ বছর ধইরা আমার এই ব্যবসা চলতাসে।" *দেনার* *বোঝা* *থেকে* *মাসে* *আয়* *লাখ* *টাকা* খায়রুল ইসলাম যখন তার আগের মুদি ব্যবসায় ধার দেনার বোঝায় দিশেহারা, ঠিক তখনই তার মাথায় এমন বিকল্প ও ভিন্নধর্মী ব্যবসায় পরিকল্পনা আসে। নিজের কারগরি দক্ষতাই ছিল তার নতুন ব্যবসার একমাত্র পুঁজি। ভাঙারি থেকে মাত্র দু'হাজার টাকায় নষ্ট ফ্রিজ কিনে সেগুলোর যন্ত্রপাতি পুনরায় ঠিকঠাক করতেন। ফ্রিজের বাইরের অংশ রং করে সেগুলোকে দেখতেও নতুনের মতো করে তুলতেন। তারপর ফ্রিজগুলো গ্রাহকদের নিকট মাসিক ভাড়া দিতে শুরু করেন। ফ্রিজ নষ্ট হলে বা অন্যান্য যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে বিনা পয়সায় আবার ঠিকঠাক করে দিয়ে আসতেন খায়রুল। বরিশাল জেলার কলেজ রোড এলাকার আশপাশের গ্রামের লোকজনও তার কাছ থেকে ভাড়ায় ফ্রিজ নিয়ে চালান। ফ্রিজ নষ্ট বা কোনো কারণে কাজ না করলে ফোন দিতেই গ্রাহকের বাড়িতে খায়রুল ও তার দোকানের কর্মচারীরা হাজির হয়ে যান। খায়রুল ইসলাম জানান, তার ব্যবহৃত ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলে করে তিনি গ্রামে ফ্রিজ ভাড়া নেওয়া গ্রাহকদের বাড়িতে চলে যান। তারপর সমস্যা দেখে সেগুলো মেরামত করে ওই দিনই ফিরে আসেন। একদিনে যাওয়া-আসা সম্ভব এমন দূরত্বের গ্রামগুলোতেই তাই ফ্রিজ ভাড়া দেওয়া হয় বলে জানান তিনি। বর্তমানে তার দোকানে কর্মচারীর পাশাপাশি কাজ শেখার জন্য অনেক তরুণ প্রশিক্ষণ নিতে আসেন। খায়রুল ইসলাম বলেন, "২০১৬ সালে যখন শুরু করছিলাম তখন মাসে দুইশো টাকায় ফ্রিজ ভাড়া দিতাম। শুরুতে ৪০টার মতো ফ্রিজ আছিলো। এখন পুরান ফ্রিজ ভাড়া দেওয়ার সময় এক হাজার টাকা জামানাত রাখা হয়। আর মাসে ভাড়া পাঁচশ টাকা। অনেকে আছে একটু ভালো অবস্থা, তারা নতুন ফ্রিজ ভাড়া নিতে চায়। তারা আমারে ভাড়া নেওয়ার নিশ্চয়তা দিলে নতুন ফ্রিজ কিন্যা আইনা ভাড়া দেই। নতুন ফ্রিজের জামানত হিসেবে দুই হাজার টাকা রাখা হয়, আর মাসে ভাড়া ছয়শো টাকা। এসির জামানাত রাখা হয় পাঁচ হাজার টাকা। ১.৫ টনের এসির মাসে ভাড়া হইলো দেড় হাজার টাকা। বর্তমানে আমার ভাড়ায় ৪০০টা ফ্রিজ চলতাছে। এরমধ্যে নতুন ফ্রিজ আছে ৩০টা। আর এসি, এয়ারকুলার আছে ১০টা।" *'ধানের* *ভেতর* *চিটা* *থাকবেই* ' ফ্রিজ চুরি যাওয়ার প্রথম ধাক্কার পর করোনার সময় আরেক বড় ধাক্কা খেতে হয়েছিল খায়রুলকে। করোনার সময় লোকজনের চাকরি চলে যাওয়ায় অনেকেই ভাড়াবাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। সে সময় খায়রুলের ২৫০টির মতো ভাড়ায় চলা ফ্রিজ ফেরত আসে গ্রাহকদের কাছ থেকে। দীর্ঘদিনের লকডাউনে অনেকেই নিজেদের স্থায়ী ঠিকানায় চলে গিয়েছিলেন। লম্বা সময় ধরে ফ্রিজ বন্ধ থাকায় সেগুলো নষ্ট হয়ে যায়। খায়রুল ইসলাম জানান, সে সময় তার প্রায় ৮০টির মতো ফ্রিজ এভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। যেগুলো তাকে পুনরায় ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। সে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এখনো তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। খায়রুল ইসলাম মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা থেকে দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসা করে আসছেন। এ বিষয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা ও বর্তমানে থাকা আস্থা নিয়ে তিনি বলেন, "সবখানেই ভালো খারাপ আছে। ধানের ভিতর যেমন চিটা থাকে, তেমনি মানুষের মধ্যেও ভালো-খারাপ আছে। এখন দুই-একজনের জন্য তো সবাইরে অবিশ্বাস করলে হইবো না। মাঝেমধ্যে অনেকে ফ্রিজের ভাড়া পরিশোধ করে না। বাকি নিয়া ওইটাও দেয় না। কেউ কেউ আবার ফ্রিজ নিয়া বাড়ি পাল্টায়া অন্যখানে চইলা গেলে জানায় না। এমন ঝামেলা তো আছেই। আমাদের বরিশালে যেসব এলাকা ফরম (বরিশালে এলাকাভিত্তিক কিছু বাসাকে, অনেকটা কোয়ার্টারের মতো, ফরম বলা হয়) আছে, ওইখানে বিদ্যুৎ বিল বেশি আসে। তখন কাস্টমাররা জানায় ফ্রিজের জন্য বিদ্যুৎ বিল বেশি আসতাসে, তাই তারা আর চালাইবো না। তখন ফ্রিজ ফেরত পাঠায়া দেয়। এমন সমস্যা আর ঝামেলা সব ব্যবসাতে থাকবোই। তাই এগুলা যতোটা পারি মানায় নিয়া সামনে কাজ করতে থাকি। আমার বেশিরভাগ কাস্টমার হইতাছে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, আর মেডিকেলের ছাত্র-ছাত্রী। যারা চাকরি করতে এইখানে আইসা থাকেন, তারাও ফ্রিজ ভাড়া নিয়া যান। ফ্যামিলি বাসার চেয়ে ব্যাচেলর বাসার লোকজন বেশিরভাগ আমার থিকা ফ্রিজ, এসি ভাড়া নেয়।" খায়রুল ইসলাম তার ব্যবসা থেকে উপার্জনের পাশাপাশি এলাকায় পরিচিতি ও ক্রেতাদের থেকে সম্মান পেয়েছেন। তিনি জানান, যাদের এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ দিয়ে গরমের মধ্যে ফ্রিজ, এসি কেনার সামর্থ্য নেই তারা স্বল্পমূল্যে এখান থেকে ভাড়া নিতে পেরে খায়রুলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন, এমনকি তার জন্য দোয়াও করেন। এটিই তার বড় প্রাপ্তি হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন। কারণ একসময় অভাব আর ঋণের সমস্যায় থাকা এই ব্যবসায়ী এখন বেশ ভালো অবস্থানে দিন পার করছেন। এই ব্যবসার মাধ্যমেই অনেক অচেনা লোকের সাথে সখ্যতা ও আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে খায়রুলের। তাই এই ব্যবসাকে তিনি আরও বড় করতে চান। ভবিষ্যতে তিনি বরিশালের বাইরের অন্য জেলাগুলোতে ফ্রিজ, এসি ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা চালু করতে চান, যেন স্বল্প আয়ের মানুষ ও কাজের সূত্রে অন্য জেলায় এসে বসবাস করা লোকজন এই সুবিধা পেতে পারে।
Published on: 2023-06-19 08:14:58.12704 +0200 CEST