The Business Standard বাংলা
রাজধানীর বাস-নির্মাণ ওয়ার্কশপের অন্দরে

রাজধানীর বাস-নির্মাণ ওয়ার্কশপের অন্দরে

মোহাম্মদ কবির হোসেন বাস তৈরির মৌলিক ব্যাপারস্যাপার হাতেকলমে শিখেছিলেন তার গুরু লাডলা-র কাছ থেকে, সাভারের রিয়াদ ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপে। লাডলা এসি বাস তৈরিতে বিশেষজ্ঞ হলেও কবিরকে তিনি নন-এসি বাস ও মিনিবাস বানাতেও শেখান। কবির বলেন, '২০০০ সালে ২০ বছর বয়সে আমি হেলপার হিসেবে ওই ওয়ার্কশপে যোগ দিই। পুরো বডি বানাতে শেখার আগে বিভিন্ন পার্ট মেরামত করতে শিখি। এখন আমি পুরো বাস তৈরি করতে পারি।' ৪২ বছর বয়সি কবির এখন সাভারের বলাইপুরে বাস তৈরির কারিগর বা মেকানিক হিসেবে কাজ করেন। ঢাকা-আরিচা হাইওয়ে ধরে হেঁটে গেলেই কয়েকটি সড়কের দুপাশের বাস-নির্মাণ ওয়ার্কশপ থেকে কানে আসবে হাতুড়িপেটার আওয়াজ। এর মাঝে কিছু ওয়ার্কশপ অনেক বছর আগে গড়ে উঠেছে, কিছু গড়ে উঠেছে সাম্প্রতিককালে। ওয়ার্কশপগুলো কর্মমুখর। কেউ কেউ ব্যস্ত বাসের কঙ্কালে প্লেইন শিট ওয়েল্ডিং করতে, আবার কেউ ব্যস্ত গ্রাইন্ডিং মেশিন দিয়ে ফ্রেম ও প্লেইন শিট তৈরিতে। একটি বাস নির্মাণে সাত ধরনের শ্রমিক বা মেকানিক যুক্ত থাকেন। যারা বাসের বডি বানান, তারা শুধু এ কাজই করেন। সিট নির্মাতারাও শুধু সিটই তৈরি করেন। আর সিলিং তৈরি করেন 'গদি মিস্ত্রিরা'। জানালা বানান কাচ শ্রমিকরা, আর বৈদ্যুতিক কাজ করেন ইলেকট্রিশিয়ানরা। তাছাড়া দু-ধরনের বাস পেইন্টার আছেন। প্রথম শ্রেণির পেইন্টাররা বাসের ভেতরের ও বাইরের দিকটা শুধু রং করেন; দ্বিতীয় শ্রেণির পেইন্টাররা বাসের বডিতে নাম, বিভিন্ন রুট ইত্যাদি লেখেন। ওয়ার্কশপের দায়িত্বে যিনি থাকেন, তাকে বলা হয় ফোরম্যান। বাস মালিকরা সাধারণত চেসিস কিনে তারপর ওয়ার্কশপে বডি তৈরি করেন। বাস নির্মাতারা সাধারণত বাস নির্মাণের চুক্তি পান। তারা তাদের ওয়ার্কশপে কাজ করার জন্য বাইরের লোক ভাড়া করে আনেন। সব কর্মীই প্রথমে নিজ নিজ ক্ষেত্রে তাদের গুরুর কাছে হেলপার হিসেবে কাজ করে দক্ষ হয়ে ওঠেন। শিক্ষানবিশ হেলপারদের শেখা শুরু হয় ওয়ার্কশপের সরঞ্জামাদির সঙ্গে পরিচিত হয়ে। মেকানিকরা কাজ করার সময় হেলপাররা তাদের সরঞ্জাম বহন করেন। মাঝে মাঝে মেকানিকরা হেলপারদের সাহায্য করতে বলেন, যেমন, স্ক্রু টাইট দেওয়া। ধীরে ধীরে হেলপাররা যন্ত্রপাতির নাম ও সেগুলোর ব্যবহার শিখে নেন। হেলপাররা ঝালাই করা শিখে যাওয়ার পর মাঝে মাঝে মেকানিকরা তাদেরকে দক্ষতা দেখাতে বলেন। এর মাঝে ফ্রেম বানানোর জন্য অ্যাঙ্গেল কাটার ও শিট প্লেইন করার গাণিতিক দক্ষতাও শিখে নেন। কেউ কেউ দ্রুত শিখে ফেলেন, আবার কেউ একটু সময় নেন। তবে দক্ষ বাস নির্মাতা হওয়ার জন্য তাদের দুটি প্রধান দক্ষতা আয়ত্ত করতে হয়: ওয়েল্ডিং ও গ্রাইন্ডিং মেশিন চালানো। কবির বলেন, 'একজন হেলপার যখন এই দুটি দক্ষতা শিখে ফেলে, তখন আমরা তাকে দক্ষ মেকানিক গণ্য করি। একজন হেলপারের ওয়েল্ডিং আর শিট ও ফ্রেম কাটা শিখতে প্রায় তিন বছর লেগে যায়।' তিনি বলেন, একটি এসি বাস বানাতে আড়াই মাস সময় লাগে, আর নন-এসি বাস তৈরি করতে সময় লাগে ৪০ দিনের মতো। একটি মিনিবাস তৈরি করতে প্রায় এক মাস লাগে। কবির জানান, প্রথমে তারা ধাতব ফ্রেম ব্যবহার করে বাসের কঙ্কাল তৈরি করে নেন। এরপর মেঝে ও ছাদ তৈরি করেন। তারপর পর্যায়ক্রমে তারা চেয়ার ও অন্যান্য জিনিস স্থাপন করেন। সব কাজ শেষ হলে পেইন্টাররা বাস রং করেন, পাশাপাশি এতে শৈল্পিক কাজ করা হয়। ওয়ার্কশপে একটি এসি বাস তৈরি করতে প্রায় ৩৫ থেকে ৩৭ লাখ টাকা লাগে বলে জানান কবির। এছাড়া নন-এসি বাস নির্মাণে একজন বাস মালিকের খরচ পড়ে প্রায় ১৭ থেকে ১৮ লাখ টাকা। ঢাকার রাস্তায় চলাচলের জন্য একটি মিনিবাস তৈরি করতে ওয়ার্কশপগুলো ৯ লাখ টাকা নেয়। তবে বাস তৈরির খরচ নির্ভর করে মূলত বাস মালিকরা কী চান তার ওপর। কর্মীদের বেতনের বিষয়ে কবির বলেন, 'একজন সিনিয়র [কর্মী] মাসিক বেতন পান সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা। কাজের চাপ থাকলে ওভারটাইম পান। এতটুকুই।' হেলপাররা মাসে প্রায় ৩ হাজার টাকা পান। দক্ষতা কিছুটা বাড়লে এবং ঝালাই করা শিখে গেলে তাদের বেতন বেড়ে ৫ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা হয়। ৩২ বছর বয়সি মোহাম্মদ হোসেন ২০০২ সালে বাসের বডি ও এর ভেতরে আঁকতে শেখা আরম্ভ করেন। অভাবের কারণে স্কুল ছেড়ে দিয়ে কাজের সন্ধানে বের হতে হয়েছিল তাকে। শেষতক হোসেনের ঠাঁই হয় সাভারের হেমায়েতপুরে হানিফ ওয়ার্কশপে। তার গুরু বাস পেইন্টার মানিক মিয়া। তবে মানিক এখন আর কাজ করতে পারেন না। হোসেন বলেন, 'আমি পেইন্টিংয়ের কাজ করি, কারণ এই কাজে কঠোর পরিশ্রম নেই। তাছাড়া কাজটা দেখতেও সুন্দর।' ২০০২ সালে হেলপার থাকার সময় হোসেন দৈনিক ২০ টাকা এবং মাসে ৬০০ টাকা পেতেন। একজন পূর্ণাঙ্গ পেইন্টার হতে তার সময় লেগেছে তিন বছর। সাধারণত দুজন পেইন্টার ও চারজন হেলপার থাকলে একটি বাস রং করতে এক সপ্তাহ সময় লাগে। হোসেন বলেন, পেইন্টিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পুটিং করা ও ঘষামাজা করা। 'যত বেশি ঘষা হবে, পেইন্টিং তত উজ্জ্বল হবে।' তিনি বলেন, ভালো মানের রং দিয়ে পেইন্ট করলে একজন বাস মালিকের খরচ হয় প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। বাস মালিক যদি নিম্নমানের রং ব্যবহার করতে চান, তাহলে তার খরচ পড়ে প্রায় ৯০ হাজার টাকা। মাঝারি মানের রং ব্যবহার করে ১ লাখ টাকায় একটি বাস পেইন্ট করা যায়। হোসেন বলেন, 'একটা বাসে রং করার জন্য তিন রকমের রেট আছে—৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পড়ে।' সাভারের বলিয়ারপুর এলাকায় বিসমিল্লাহ গ্লাস গ্যালারি চালান জাবেদ হোসেন। আগে তিনি নিজ শহর কুষ্টিয়ায় একটি মেকানিকের দোকানে কাজ করতেন। সেখানেই বাসের জানালা ঠিক করতে শেখেন। সাত বছর আগে ঢাকায় আসেন জাবেদ। ঢাকার গাবতলীর একটি ওয়ার্কশপে বাসের কাচের জানালা বসানোর কাজে দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। জাবেদ বলেন, বর্গফুটের হিসাবে কাচ কাটা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ। 'গ্লাস কাটা খুব কঠিন, কারণ ভুল করলে এই গ্লাস জয়েন দেওয়া কিংবা ঠিক করা যাবে না।' জাবেদ তার কাজে কাচ কাটা কলম ব্যবহার করেন। *কাঁচামালের দাম বাড়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাস নির্মাণ শিল্প* সাভারের হেমায়েতপুরের গাউসিয়া মটরসের মালিক মোকসেদ আলী জানান, ৩০ বছর আগেও দেশে সম্পূর্ণভাবে নির্মিত বাসের ৫০ শতাংশই আমদানি করে আনা হতো, কিন্তু এখন এই দৃশ্যপট বদলে গছে। স্থানীয় অটোমোবাইল ওয়ার্কশপগুলোই এখন কমবেশি ৮০ শতাংশ বাস তৈরি করে বলে জানান তিনি। শুধু ছোট ওয়ার্কশপগুলোই নয়—ইফাদ অটোস লিমিটেড ও আফতাব অটোমোবাইল লিমিটেডের মতো বড় কোম্পানিও বাজারে এসেছে। মোকসেদ বলেন, এই মুহূর্তে তার ওয়ার্কশপে তিনটি বাস বডি তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি হাইগারের, আরেকটি অশোক লেল্যান্ডের। ঈদুল আজহার আগেই কাজ শেষ হবে। তিনি বলেন, 'তিনটা বাসই ৩০-সিটের এসি স্লিপার হবে। এর মধ্যে দুটি শ্যামলী এনআর ট্রাভেলসের জন্য, আরেকটি ইম্পেরিয়ালের জন্য।' এসি বাস নির্মাণের জন্য ৩০ থেকে ৩২ লাখ টাকা এবং মালিক নিজে এসি দিলে ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা নেন বলে জানালেন তিনি। মোকসেদ বাংলাদেশ অটোমোবাইল বডি ম্যানুফ্যাকচারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিও। তিনি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে জানান, বর্তমানে প্রায় ২০ শতাংশ সম্পূর্ণ নির্মিত বাস আমদানি করে আনা হচ্ছে। ১৯৭৯ সালে বাস নির্মাণ শিল্পে প্রবেশ করেন মোকসেদ। তিনি জানান, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের আগে এই শিল্পের তেমন প্রসার ঘটেনি। 'তিনজন গুরু ছিলেন, যারা ১৯৭১ সালের আগে দেশের বাস নির্মাণ শিল্পে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সেই সময় মূলত বিহারীরা এই কাজটা করত,' বলেন তিনি। মোকসেদ বলেন, মিরপুরের মাজার রোডে ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে ওস্তাদ হালিম খানের একটি ওয়ার্কশপ ছিল। ওস্তাদ হালিম খান ও ওস্তাদ ইরফান খান মূলত বাস নির্মাতা ছিলেন। ওস্তাদ গাফফার খান বাসের আসন তৈরির জন্য সুপরিচিত ছিলেন এবং ওস্তাদ ওয়াদুদ খান পেইন্টার হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৭১ সালের পর কয়েকটি অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে জিয়া ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপটি শ্যামলী রিং রোডে এবং ইয়েলোস্প্রে কলাবাগানের ডলফিন গলিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। ডলফিন ছিল বাসের নাম। কোম্পানিটি বাস বডি তৈরি করত। মোকসেদ জানান, চট্টগ্রামে মেনকা নামে একটি ওয়ার্কশপ ছিল। পরে ইয়েলোস্প্রেও এখানে একটি শাখা খোলে। তবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে খাতটি বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে জানান তিনি। তিনি বলেন, ২০১০ সালে কাঁচামালের দাম কম থাকায় তাদের ব্যবসা ক্রমেই বড় হচ্ছিল। কিন্তু এখন কাঁচামালের দাম এত বেড়ে গেছে যে বাস তৈরির ওয়ার্কশপগুলো টিকে থাকতেই হিমশিম খাচ্ছে। তিনি বলেন, 'আগে আমরা এক কেজি প্লেইন শিট ৫০ থেকে ৬০ টাকায় কিনতে পারতাম। এখন প্রতি কেজি প্লেইন শিট ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে।' মোকসেদ বলেন, এই ওয়ার্কশপগুলো যাতে আরও সম্প্রসারিত হতে পারে, সেজন্য সারা দেশে অন্যদের মতো তাদেরও আলাদা শিল্পাঞ্চল প্রয়োজন। 'শিল্পাঞ্চলের পাশাপাশি এ শিল্পের প্রসারের জন্য সরকারকে একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট স্থাপন করতে হবে,' পরামর্শ দেন তিনি। তিনি জানান, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ শিল্পের অনেক দক্ষ কর্মী বিদেশে গেছেন এবং ভালো করছেন।
Published on: 2023-06-20 12:56:38.451538 +0200 CEST