The Business Standard বাংলা
জিপিএ ফাইভ পেয়েও কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাশ নাম্বার জুটছে না?

জিপিএ ফাইভ পেয়েও কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় পাশ নাম্বার জুটছে না?

আমাদের নীতি-নির্ধারকদের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে কোনটি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন নাকি শিক্ষার মানোন্নয়ন? অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে অবকাঠামোগত উন্নয়ন। কয়েকশো কোটি টাকা খরচ করে অবকাঠামোগত উন্নয়নে যে প্রকল্পগুলো আমরা প্রতিষ্ঠা করছি, সেই প্রকল্প চালানোর মতো যোগ্য হাত ও হাতিয়ার কি দেশে তৈরি হচ্ছে? যে অনুপাতে দরকার, সেই অনুপাতে হচ্ছে না। কারণ বড় প্রকল্প, বড় কর্পোরেট, কলকারখানা, তেল-গ্যাস উৎপাদন ক্ষেত্র, ব্রীজ নির্মাণ, ব্যবসা প্রশাসন চালানোর জন্য দেশের বাইরে থেকে যোগ্য লোক আনতে হচ্ছে। ছোটবেলা থেকে জেনেছি, বীজ ও চারা রোপণের পর সার, মাটি, পানি, আলো, যত্ন ও ভালবাসা না পেলে, বৃক্ষ শক্ত হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। সামান্য হাওয়াতে ভেঙে পড়ে, ফুল-ফল, ছায়া কিছুই দিতে পারেনা। ঠিক তেমনি শিক্ষার মান কখনোই উন্নীত হবে না, যদিনা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাকে শক্তভাবে দাঁড় করানো যায়। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার গাঁথুনি দুর্বল বলেই অসংখ্য ছাত্রছাত্রী গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ পাওয়ার পরও তাদের সামগ্রিক মান দুর্বলই থেকে যাচ্ছে। এই আশংকার প্রতিফলন দেখা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট (স্নাতক-সম্মান) ভর্তি পরীক্ষার ফলাফলে। এবার অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তীর্ণ (ভর্তিযোগ্য) হয়েছেন মাত্র ৯ দশমিক ৬৯ শতাংশ। পরিষ্কার করে বললে, এরা পাস নম্বর পেয়েছেন। উচ্চমাধ্যমিকের বিজ্ঞান, ব্যবসায় শিক্ষা ও মানবিক এই তিন শাখার শিক্ষার্থীরাই এই অনুষদের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। শুধু এবার নয়, কয়েক বছর ধরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় এমন ফলাফল আসছে। (সূত্র: প্রথম আলো) প্রশ্ন উঠেছে, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন নূন্যতম পাস নম্বর পাচ্ছেন না? শুধু ভর্তি পরীক্ষায় নয়, ভর্তি হয়েও অনেকেই উচ্চশিক্ষা নেয়ার সময় অসুবিধায় পড়েন। আবার 'কোনোমতে' উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের সময় অনেক তরুণ-তরুণী বিপদে পড়েন। শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, আসলে দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাতেই বড় ধরনের সমস্যা রয়েছে। এই স্তরে দুর্বলতার কারণেই মূলত পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। তাহলে তো একথাই প্রমাণিত হচ্ছে যে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম অনুযায়ী যতটুকু শেখার কথা, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী তা শিখতে পারছে না। ফলে এই পর্যায়ে যতটুকু দক্ষতা অর্জন করার কথা, তা না করেই অনেক শিক্ষার্থী ওপরের শ্রেণিতে উঠছে। এই ঘাটতি পূরণ না হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থীর প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পরও পরবর্তী পর্যায়ে গিয়ে ধাক্কা খেতে হচ্ছে। শিক্ষার মান নিয়ে লিখতে গিয়ে মনে হলো, শিক্ষা কি আসলেই এই জাতির মেরুদণ্ড? যদি তাই হয়, তাহলে বছর বছর শিক্ষা খাতে বাজেট কমছে কেন? মেরুদণ্ডকে সোজা রাখাটা তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা। কিন্তু তাতো হচ্ছে না, বরং বাংলাদেশে শিক্ষায় বরাদ্দ ১৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন, দক্ষিণ এশিয়ায় সবার নিচে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানিয়েছে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত জিডিপির শতাংশ হিসেবে বাংলাদেশে আগামী ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ মোট জিডিপি এর ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। বাংলাদেশে শিক্ষাখাতে গড় ব্যয় ৪১টি স্বল্পোন্নত দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন। মানুষের মেরুদণ্ড শক্ত ও সোজা রাখার জন্য যতটা পরিমাণে খাদ্য, পুষ্টি, আলো, বাতাসের চর্চা দরকার, তা না পেলে শরীর মুখ থুবড়ে পড়বে। ঠিক সেরকম শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড মনে করলে, সেই খাতেও যথেষ্ট পরিমাণে শক্তি যোগানো দরকার। অথচ বাস্তবে আমরা দেখছি শিক্ষায় ব্যয় সংকুচিত করা হচ্ছে এবং সেকারণে দেশে শিক্ষা মানের অধোগতিও ঠেকানো যাচ্ছে না। ভবিষ্যতে কী হবে বা হতে পারে, সেদিকে না তাকিয়েও বলা যায় যে, শিক্ষায় খুব স্বল্প বাজেট বরাদ্দ করার ফল আমরা হাতেনাতে পাচ্ছি। বেসরকারি সংগঠন ওয়েব ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে 'নাগরিক কর্তৃক মূল্যায়ন' নামে এই জরিপ করা হয়েছে। ৫ থেকে ১৬ বছর বয়সী প্রান্তিক শিশুদের উপর। জরিপের তথ্য বলছে, ইংরেজিতে বর্ণ পড়তে পারেনি ১৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ ছেলে এবং ১৫ দশমিক ২২ শতাংশ মেয়ে। ইংরেজিতে গল্প পড়তে পারেনি প্রায় ৮৫ শতাংশ ছেলে ও প্রায় ৮৩ শতাংশ মেয়ে। অন্যদিকে গণিতে একক অঙ্ক শনাক্ত করতে পারেনি ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ ছেলে এবং ১৩ শতাংশ মেয়ে। আর ভাগ অংক করতে পারেনি প্রায় ৯৬ শতাংশ ছেলে এবং ৯৭ শতাংশের বেশি মেয়ে। যদিও এই জরিপটি করা হয়েছে প্রান্তিক ছাত্রছাত্রীদের উপর, কিন্তু বলা যেতে পারে এরকম চিত্র আমাদের অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী জটিল বাক্য ও শব্দ পড়তে পারে না। এসব গবেষণার তথ্য বলছে, বড় ধরনের দক্ষতার ঘাটতি নিয়ে ওপরের ক্লাসে উঠছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীরা। মাধ্যমিকে গিয়েও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে থাকে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ন্যাশনাল অ্যাসেসমেন্ট অব সেকেন্ডারি স্টুডেন্ট (মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের জাতীয় মূল্যায়ন) প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে অবস্থা খারাপ। একই শ্রেণিতে গণিতে ৪৩ শতাংশের অবস্থা খারাপ বা গড়পড়তা। চোখের সামনে প্রাথমিক শিক্ষার প্রকৃত চেহারা ফুটিয়ে তোলার জন্য, একজন শিক্ষকের একটি মন্তব্যই যথেষ্ট, তিনি বলেছেন, "মানসম্মত শিক্ষার অভাবে দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আদতে 'দরিদ্রের বিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে', তখন এরচাইতে দুর্ভাগ্যজনক মন্তব্য আর কী হতে পারে।" কেন প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার এই দৈন্যদশা? শিক্ষাখাতের সাথে যারা সংশ্লিষ্ট, তারা বলছেন বাজেট স্বল্পতার কারণে সারাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শ্রেণীকক্ষে গাদাগাদি করে বসতে হয়, দক্ষ শিক্ষক স্বল্পতা আছে, লাইব্রেরি, খেলার মাঠ, সহপাঠ্যক্রমিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ কম। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের অভাব, শিক্ষা সরঞ্জামের অভাব, ল্যাবরেটরি না থাকা, ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা অনেক বেশি, পিছিয়েপড়া স্কুলগুলোতে বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক কম থাকা ইত্যাদি। যেসব স্কুলে অগণিত সাধারণ ছেলেমেয়েরা পড়ে, সেই স্কুলগুলোতেই অর্থায়নের পরিমাণ কম। ফলে শিক্ষার মান যে ভাল হবে না, তা বোঝাই যাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো যে শিক্ষক সংকটে ভুগছে তা উঠে এসেছে সরকারি তথ্যেও। প্রাথমিক ও গণশিক্ষাতে এখনও ৪৪,৭৯০টি পদ খালি আছে। দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ৩,৯০,০০০। এদিকে, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ যেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ৬.৫১%, সেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ৪.৫৬%। বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২১ অনুযায়ী, দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার অধীনে আছে ২ কোটির বেশি শিক্ষার্থী। পরিসংখ্যান অনুসারে, মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৬৭.০৯% শিক্ষার্থী ৬৫,৫৬৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে। আমরা যারা একটুখানি আর্থিকভাবে সক্ষম, তারা তাদের সন্তানকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পরিবর্তে উন্নত শিক্ষার জন্য কিন্ডারগার্টেনে বা ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে ভর্তি করাই। যেসব অভিভাবকের পক্ষে বেসরকারি স্কুলের খরচ বহন করা সম্ভব নয়, তারাই বাধ্য হন সরকারি প্রাইমারি স্কুলে পড়াতে। সিপিডি বলছে, অপর্যাপ্ত সরকারি তহবিলের কারণে সরকারি প্রাইমারি স্কুলগুলোতে কোন ব্যবস্থাই উন্নত করা সম্ভব হয় না। দেশের ৩০ শতাংশ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে কোনো যত্ন নেওয়া হয় না। যদিও দুর্বলদের বেছে বেছে বাড়তি যত্ন নেওয়ার নির্দেশনা আছে সরকারের এবং এটা নিশ্চিত করা স্কুল কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের দায়িত্ব। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে ব্যয়ের ৭১ শতাংশই বহন করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে। প্রাইভেট পড়ানোর খরচের চিত্র তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রামাঞ্চলে পরিবারের প্রাইভেট পড়ানোর খরচ ২০০০ সালে ছিল ২৮ শতাংশ, যেটা ২০১০ সালে বেড়ে হয়েছে ৫৪ শতাংশ। এ সময় শহরাঞ্চলে হারটি ৪৮ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৬৭ শতাংশ। সাম্প্রতিক চিত্র প্রতিবেদনটিতে ছিল না। আমাদের নীতিনির্ধারকরা উন্নত-সমৃদ্ধ-স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছেন কিন্তু সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি করা যে অত্যাবশ্যক সেদিকে তেমন দৃষ্টি নেই, নেই বিনিয়োগ। প্রাথমিক শিক্ষা থেকে মাস্টার্স ক্লাস পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের যে পরিমাণে বিজ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিভিত্তিক, দক্ষতা বৃদ্ধিকারী ও সৃজনশীলতা-সহায়ক শিক্ষা দেয়া উচিৎ, তা তো আমরা কোনভাবেই নিশ্চিত করতে পারছি না। বরং বৃহত্তর পরিসরে শিক্ষা চলছে ধুঁকেধুঁকে। স্বল্প পরিসরের কিছু ছাত্রছাত্রী অর্থের বিনিময়ে ভালো শিক্ষা পাচ্ছে বা শেখার সুযোগ পাচ্ছে। এদের আবার একটা অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে এবং অনেকেই আর ফিরছে না। কাজেই দেশে শেষপর্যন্ত থেকে যাচ্ছে যারা, তাদের অনেকেই এসেছে সেই ধুঁকে পড়া শিক্ষার হাত ধরে। ফলে এদের গুণগতমান বেশ খারাপ। শিক্ষা খাত দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাত হওয়া দরকার ছিল। কারণ দেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক শিশু থেকে তরুণ-তরুণী। যাদের উপর ভরসা করে দেশ এগিয়ে যাবে বলে আমরা মনে করছি। কারিগরি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আমলাতন্ত্র, রাজনীতি, সামরিক শিক্ষা, কৃষি, ব্যবসা, সামাজিক বিজ্ঞান, সাহিত্য, শিল্প, অভিনয় যা কিছুই বলি না কেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই মূল শক্তি হচ্ছে শিক্ষা। এর মানে এই নয় যে সবাইকে উচ্চশিক্ষিত হতে হবে, সবাইকে এ-প্লাস রেজাল্ট করতে হবে। এর মানে হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায় থেকে যা শেখানো হবে, তা যেন পোক্তভাবে শিশু, কিশোর ও তরুণদের মাথায় ঢুকে যায়। কিন্তু তা হচ্ছে না, বিপরীতে শিক্ষাখাত ক্রমশ অবহেলিত হয়ে পড়ছে। শিক্ষাখাতে জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ইউনেস্কো, যা প্রস্তাবিত বাজেটের চেয়ে অনেক বেশি। সরকার একদিকে সবপর্যায়ে শিক্ষার মানোন্নয়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করার কথা বলছে, অন্যদিকে বাজেট বরাদ্দ কমাতে কমাতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নিয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, "সরকার অবকাঠামোভিত্তিক উন্নয়নকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে শিক্ষায় বরাদ্দ কম রেখেছে।" খুব হতাশাজনক একটি চিত্র ফুটে উঠেছে এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে। শ্রমবাজারকে সামনে রেখে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাজানোর কথা বলা হচ্ছে। এমএ বা বিএ পাশ এখন শিক্ষার মানদণ্ড নয়। বরং বলা হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষাসহ বারো ক্লাস পর্যন্ত শিক্ষাকে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করানোর কথা। এরপর কারিগরি শিক্ষা, ব্যবসা প্রশাসন ও উচ্চশিক্ষা, যে যেটা নির্বাচন করতে চায়। তখন আসবে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে ভালো বাজেট রাখার প্রসঙ্গ। সবার জন্য সেই প্রাথমিক শিক্ষা ও দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাতেই আমরা মার খেয়ে যাচ্ছি। প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে সঠিক যত্ন নেয়া হয় না বলে, অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী দুর্বলভাবে বেড়ে উঠছে এবং তারা পিছিয়ে পড়ছে। এমন একটি প্রক্রিয়ায় বিদ্যালয়ের পাশাপাশি কোচিং-প্রাইভেট মিলিয়ে পরীক্ষার পুল পার হচ্ছে ঠিকই কিন্তু একেকটি শ্রেণিতে শিক্ষার্থীদের যেসব দক্ষতা অর্জন করার কথা, তা আর ঠিকমতো অর্জিত হচ্ছে না এবং এর প্রভাব পড়ছে উচ্চশিক্ষায় ও কর্মক্ষেত্রে। দেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে যেমন মূলধারার শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা। একে 'হরেকরকমবডডনং' অবস্থা বলা যায়। এই অবস্থাও অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফল বয়ে আনছে। ২০২১ সালে বিআইডিএসের করা এক জরিপের তথ্য বলছে, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলো থেকে পাস করা ৬৬ শতাংশ শিক্ষার্থী বেকার থাকছেন। বেকার শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের বাইরে অন্যান্য বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। সিপিডির জরিপে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক সংখ্যা বাড়ানো, শ্রেণির পড়া শ্রেণিতেই সম্পন্ন করা, শিক্ষকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করাসহ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। অথচ সেই একই সময়ে দৈনিক প্রথম আলোর রিপোর্ট বলছে, প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (পিটিআই) প্রতিবছরের জানুয়ারিতে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তবে চলতি বছর এখন পর্যন্ত এই প্রশিক্ষণ শুরু হয়নি। সাড়ে পাঁচ মাস ধরে প্রশিক্ষণ বন্ধ থাকায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা পিছিয়ে পড়ছেন। তাহলে জাতির মেরুদণ্ডকে শক্ত করার জন্য সমাধান কী? ইংরেজি, গণিত ও বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি জোর দেয়া, কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, গবেষণার ওপর জোর দেয়া, প্রণোদনা দিয়ে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আনা। বিশেষ করে প্রথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষকদের। এছাড়া পাহাড়ি এলাকাসহ দুর্গম চর এলাকায় ছাত্রছাত্রী ও কর্মরত শিক্ষকদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া (যেমন আবাসন সুবিধা), স্কুলের সময় কমিয়ে আনা, বার্ষিক ছুটি কমানো, উপবৃত্তি বাড়ানো ও স্কুলে দুপুরের খাবার দেয়া চলমান রাখা, শিক্ষকদের উপর চাপ কমানো। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা। নয়তো একদিন দেখা যাবে জাতির সব অর্জনের যোগফল শূন্য হয়ে যাবে। * *লেখক: যোগাযোগকর্মী*
Published on: 2023-06-25 11:51:06.056816 +0200 CEST