The Business Standard বাংলা
নীলক্ষেত থেকে অনলাইন 'বাডিস': অনলাইনে যেভাবে একাডেমিক পেপার কেনাকাটা হয়!

নীলক্ষেত থেকে অনলাইন 'বাডিস': অনলাইনে যেভাবে একাডেমিক পেপার কেনাকাটা হয়!

ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক-এর কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের একজন গ্র্যাজুয়েট আরিফ হাসান (ছদ্মনাম) একটি কনসালটেন্সি ফার্মে রিসার্চ অফিসার হিসেবে কাজ করছেন। জার্মানিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য আবেদন করেছেন তিনি, কিন্তু এর জন্য তার অনার্সের থিসিস পেপার প্রকাশিত হওয়া প্রয়োজন। "আমার হাতে ইতোমধ্যেই জার্মানি থেকে একটা অফার আছে, কিন্তু আমার অনার্স ফাইনাল ইয়ারের থিসিস পাবলিশ হতে হবে", বলে আরিফ। কিন্তু একজন কনসালটেন্ট হিসেবে ফুল-টাইম চাকরি করে গবেষণায় মনোনিবেশ করার মতো সময় ও শক্তি তার নেই, জানালেন আরিফ। তাই তিনি যখন 'ফাইনাল ইয়ার বাডিস' নামে একটি রহস্যময় অনলাইন প্ল্যাটফর্মের সন্ধান পান, তিনি সাথেসাথেই এই সুযোগটি লুফে নেন। 'ফাইনার ইয়ার বাডিস' প্ল্যাটফর্মে যারা রয়েছেন, তারা 'ঘোস্টরাইটার' বা নেপথ্য লেখক হিসেবে মানুষের গবেষণাপত্র লিখে দেন। এই প্রতিষ্ঠানটি আপনার গবেষণার বিষয় সম্পর্কে জেনে তারপর একটি চুক্তি করবে এবং তারা তাদের কোনো একজনকে এই গবেষণাপত্র লেখার দায়িত্ব দিবে। তিনি হতে পারেন তাদের নয়জন সদস্যের মধ্যে একজন কিংবা বাইরের কেউ। তারা বিষয়টি নিয়ে পড়াশোনা করে আপনার গবেষণাপত্র লিখে দিবে। শুধু তা-ই নয়, এই প্ল্যাটফর্মটি বিভিন্ন জার্নালে, এমনকি কিউওয়ান জার্নালেও আপনার গবেষণাটি প্রকাশের ক্ষেত্রে সাহায্য করবে। এখানেই শেষ নয়, অনেক অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আছে যারা একাডেমিক গবেষণাপত্র লিখে দেওয়ার জন্য তাদের অধীনে লোক নিয়োগ দিতে চাইছে। আপওয়ার্ক, ফিভার ও ফ্রিল্যান্সার থেকে শুরু করে ওয়েব-টেক, ফাইনাল ইয়ার বাডিস ইত্যাদি কোম্পানিগুলোর অন্দরে এমন সব গোপন উপায় আছে, যেগুলোকে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে প্রতারণা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। কিন্তু অনেকের কাছেই এই বিষয়টি নতুন কিছু নয়। রাজধানীর নীলক্ষেতের দোকানগুলোতে রেডিমেইড গবেষণাপত্র বিক্রি হওয়ার বিষয়টি নিয়ে বছরের পর বছর ধরে লিখে যাচ্ছেন সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদরা। *নীলক্ষেতে গবেষণাপত্রের পাইকারি বাজার* দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর এই প্রতিবেদক যখন এনামুলের দোকানে (আসল নাম?) পৌঁছালেন, তখন বৃষ্টি হচ্ছিল। তিনি কাজে ব্যস্ত ছিলেন; আমি যখন তাকে প্রায় ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কোনো রেডিমেইড গবেষণাপত্র পাওয়া যাবে কিনা, তখন তিনি এমনভাবে উত্তর দিলেন যেন এটা বিক্রি করা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। আমি জিজ্ঞেস করলাম, "আপনার কাছে কি সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মিডিয়া স্টাডিজ বিষয়ের উপর কোনো গবেষণাপত্র আছে? তখন তার উত্তরটা ছিল এমন যে, মুদি দোকানের দোকানদার ক্রেতাকে তার পছন্দের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছে কোন পণ্য দিবে তা ভালোভাবে বোঝার জন্য। বিক্রেতা আমাকে উত্তর দিলেন, "কি ধরনের গবেষণাপত্র? আমার কাছে ১৬৯টা ফোল্ডার আছে সামাজিক বিজ্ঞান সম্পর্কিত গবেষণাপত্রের জন্য। আপনি আপনার টপিক বলেন।" এরপর এনামুল তার পুরনো-ভাঙা জিফোর্টি লেনোভো ল্যাপটপটা খুললেন এবং স্ক্রল করে গেলেন। তার ল্যাপটপে ৪৯৯০টি সাবফোল্ডার ছিল, যেখানে সব মিলিয়ে প্রায় ৯০০০ গবেষণাপত্র রয়েছে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, "আপনি এগুলো কোথায় পেয়েছেন?" জবাবে হাসিমুখে এনামুল বলেন, "আমরা তো প্রিন্টিং এর কাজ করি। যখন ছাত্রছাত্রীরা আমার দোকানে তাদের রিপোর্ট প্রিন্ট করাতে আসে, আমি একটা কপি আমার পিসিতে রেখে দেই।" এনামুলের দোকানের মতোই নীলক্ষেতের অলিগলিতে আরও অসংখ্য দোকান রয়েছে যেখানে রেডিমেইড গবেষণাপত্র পাওয়া যায় মাত্র ১৫০ থেকে ৮০০ টাকার বিনিময়ে। ক্রেতা সফট কপি নাকি প্রিন্ট করা কপি নিতে চাইছে, তার ওপর ভিত্তি করে দাম কমবেশি হয়। আর যদি একটু নিজের মতো করে বদলে নিতে চান, তাহলে দাম পড়বে ১৫০০ টাকা। বছরের শেষ দিকে এবং সিমেস্টার শেষে ডেডলাইন যত এগিয়ে আসে, এ ধরনের গবেষণাপত্রের চাহিদা তত বেড়ে যায়। *'আমাদের কাজ নীলক্ষেতের দোকানগুলোর চেয়ে ভালো'* রেডিমেইড গবেষণাপত্র সরবরাহকারী 'ফাইনাল ইয়ার বাডিস' নামক ফেসবুক গ্রুপের একজন নির্বাহী মো. মশিউর রহমান (আসল নাম?) দাবি করেন, তাদের কাজ নীলক্ষেতের দোকানগুলোর চাইতে ভালো। "নীলক্ষেতে আপনি যে গবেষণাপত্র পাবেন সেগুলো অন্য কারো লেখা। দোকানদারদের কাছে চাইলে তারা হুবহু সেটাই আপনার হাতে তুলে দিবে, কখনো হয়তো দুয়েক প্যারা আগেপিছে করে দেয়। কিন্তু মূলকথা হচ্ছে আপনি অন্য কারো গবেষণাপত্র নিয়ে নিজের বলে দাবি করছেন।" অন্যদিকে, ক্রেতার বেশে মশিউরের কাছে গেলে তিনি জানান, ফাইনাল ইয়ার বাডিস প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা আলাদা গবেষণাপত্র তৈরি করে। "আমাদের কাছ থেকে আপনি শুধুমাত্র রেডিমেইড গবেষণাপত্রই পাবেন না, সেইসঙ্গে আমরা আপনাকে পেপার ডিফেন্সের জন্যও তৈরি করে দিব। আপনাকে শুধু মেথোডলজি, ডেটা কালেকশন এবং অন্যান্য প্রক্রিয়াগুলো মনে রাখতে হবে, যাতে করে পরীক্ষকদের সামনে আপনি এই তথ্যগুলো সঠিকভাবে দিতে পারেন", বলেন মশিউর। গবেষণার বিষয়বস্তু, কাজের গভীরতা এবং কোন জার্নালে পাবলিশ করতে চান, তার উপর নির্ভর করে 'রিসার্চ বাডিস' ২০,০০০ টাকা থেকে ৯০,০০০ টাকা পর্যন্ত পারিশ্রমিক নিয়ে থাকে। মশিউর বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেন, "সম্প্রতি কম্পিউটার সায়েন্সের একটা গবেষণাপত্র আমরা তৈরি করেছি, সেটার কথাই ধরা যাক। কোডিংসহ আমরা ক্লায়েন্টকে চার্জ করেছি ৮৫,০০০ টাকা। কিন্তু আরও একটা পেপার আমরা বানিয়েছি যেটায় কোডিং এর অংশ ছিল না, সেটার দাম রেখেছি ২২,০০০ টাকা।" প্রাথমিকভাবে একটি প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই গ্রুপটি (আগে মশিউর ও তার বন্ধুরা টাকার বিনিময়ে ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্টগুলোর কাজ করে দিতেন) একপর্যায়ে ঘোস্টরাইটিং এর কাজ শুরু করে। "প্রথম দিকে আমরা রোবটিক প্রজেক্ট তৈরি করে দিতাম শিক্ষার্থীদের। কিন্তু পরে দেখলাম তাদেরকে পেপারসও জমা দিতে হয়। এরপর ২০২১ সাল থেকে আমরা প্রজেক্ট পেপার এবং একাডেমিক পেপার লিখতে শুরু করি", বলেন তিনি। অবশেষে যখন আমি মিডিয়া স্টাডিজ বিষয়ক একটি গবেষণাপত্রের খরচ কেমন পড়বে তা জানতে চাইলাম, তিনি তখন আমাকে ১০টা রিসার্চ টপিক দিলেন এবং এই তালিকা থেকে একটি বেছে নিতে বললেন। "আমাদের বিভিন্ন গবেষণা সহকারী ও গবেষকদের সাথে যোগাযোগ আছে, যারা নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে গবেষণাপত্র লিখে দেয়। এটা তাদের জন্য একটা পার্ট-টাইম কাজের মতো। তাই আপনাকে সবচেয়ে ভালো মানসম্পন্ন গবেষণাপত্র তৈরি করে দেওয়ার নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি", বলেন মশিউর। *প্রতারণার পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ* ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. ফজলুর রহমান দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, "যদিও অন্য কাউকে টাকাপয়সা দিয়ে গবেষণাপত্র লিখিয়ে নেওয়া খুব সহজ ও সময় বাঁচানোর উপায় বলে মনে হয়, কিন্তু এটা অনৈতিক এবং এই পরিষেবা প্রদান একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এটা নৈতিকভাবেও ঠিক নয়, বুদ্ধিহীন ও দায়িত্বজ্ঞানহীন একটি কাজ।" "আর সত্যি বলতে, একজন শিক্ষার্থী বা একজন শিক্ষক যদি এ ধরনের অনৈতিক কাজে লিপ্ত হন এবং এখন পার পেয়ে যান, তাহলে ভবিষ্যতে একদিন না একদিন তিনি বড় বাধার সম্মুখীন হবেন", বলেন অধ্যাপক ফজলুর রহমান। অধ্যাপকের মতে, শিক্ষার্থীদের এ ধরনের 'শর্টকাট' পদ্ধতি অবলম্বনের পেছনে কিছু কারণ রয়েছে- "প্রথমেই বলা যায়, শিক্ষার্থীদের জন্য এই চর্চাটা শুরু হয় একদম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সিমেস্টার থেকে। তাদেরকে ৫-৬টি অ্যাসাইনমেন্ট সাবমিট করতে হয় প্রতি সিমেস্টারে এবং দেখা যায় সব ডেডলাইন পরপর চলে এসেছে। তাই তারা অনলাইনে কিছু আর্টিকেল দেখে কপি করে একটা রিপোর্ট বানিয়ে জমা দিয়ে দেয়।" শিক্ষার্থীদের 'প্লেজারিজম' বা চুরি বা প্রতারণার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে যথেষ্ট পর্যবেক্ষণের অভাব এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার মানের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর আসলে ভালো বিশ্লেষণ ক্ষমতা নেই, সে কারণে তারা অনৈতিক পথ বেছে নেন। আবার অনেকের কাছে সময়সাপেক্ষ থিসিস নিয়ে কাজ করার মতো সময় থাকে না, এইসব কারণেই তারা অনৈতিক পন্থা অনুসরণ করেন।" কিন্তু এটি গুরুতর শাস্তিযোগ্য একটি অপরাধ হতে পারে। ফজলুর রহমান জানান, 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি একাডেমিক কমিটি রয়েছে যারা এ ধরনের শিক্ষাগত প্রতারণা নিয়ে তদন্ত করে। গত বছর যখন এরকম একটি অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে, তখন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের চাকরি চলে গিয়েছিল, এমনকি ডিমোশনও হয়েছে।" বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি প্লেজারিজম চেক করার জন্য 'আইথেনটিকেট' নামক একটি প্লেজারিজম-চেকিং সফটওয়্যার ব্যবহার করে। "আমরা সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত প্যারাফ্রেজিং করার অনুমতি দেই, কিন্তু সাথে যথাযথ সাইটেশন দিতে হবে এবং একটি উৎস থেকে একজন গবেষক মাত্র ২ শতাংশ প্যারাফ্রেজ করতে পারবেন, এর বেশি নয়", বলেন তিনি। যদিও এই সফটওয়্যারেরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে এবং স্ক্রিপ্ট যদি বাংলায় লেখা হয় তাহলে এখানে প্লেজারিজম শনাক্ত করা যায় না। এমআইটির একাডেমিক ইন্টেগ্রিটি হ্যান্ডবুক অনুযায়ী, "প্রতারণা, প্লেজারিজম, অননুমোদিত কোলাবরেশন এবং শিক্ষাগত ক্ষেত্রে অন্যান্য অসদুপায় অবলম্বনের পরিণাম হতে পারে ভয়াবহ; এতে সাসপেনশন বা প্রতিষ্ঠান থেকে বিতাড়িতও হতে পারে। যেকোনো নিয়মলঙ্ঘন বা গবেষণার দায়িত্বশীল আচরণ থেকে বিচ্যুতি একাডেমিক সততার লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হতে পারে। আর এর পরিণাম হিসেবে, "প্রশিক্ষক সেই শিক্ষার্থীকে কম গ্রেডে পুনরায় অ্যাসাইমেন্টটি করতে দিতে পারেন কিংবা তাকে ফেল দেখাতে পারেন। এমনকি ঐ শিক্ষার্থীর গবেষণা প্রজেক্টে অংশগ্রহণও বাতিল হতে পারে। প্রশিক্ষক বা সুপারভাইজার অফিস অফ স্টুডেন্ট সিটিজেনশিপ-এর কাছে একটি চিঠি বা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আকারে ডকুমেন্টেশন জমা দিতে পারেন, যা একজন ব্যক্তির সুনাম এবং ক্যারিয়ারের বিকল্প সুযোগগুলোও ধ্বংস করে দিতে পারে।" কিন্তু এনামুল বা মশিউর এভাবে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করেন না। এনামুলের ভাষ্যে, 'আমি একটা শিক্ষার্থীকে সাহায্য করছি।' অন্যদিকে, মশিউর মনে করেন, "এটা অবৈধ কিছু নয়। আপনি তো আমাকে চাপ দিচ্ছেন না। আমি নিজে থেকে আপনাকে পড়াশোনার বিষয়ে সাহায্য করছি, বিনিময়ে আপনি আমাকে টাকা দিচ্ছেন। আমার মনে হয় এটা একটা উইন-উইন পরিস্থিতি, এতে দুই পক্ষেরই লাভ হচ্ছে।" আর যদি ধরা পড়েন তাহলে? "সেটা তাদেরকে কে বলতে যাবে? এটা তো শুধু আমার আর আপনার মধ্যে গোপন থাকবে। আপনি যদি কাউকে বলে দেন তাহলে মানুষ আপনার দিকেই প্রথম সন্দেহের তীর ছুঁড়বে", আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন মশিউর।
Published on: 2023-07-10 11:31:00.894942 +0200 CEST