The Business Standard বাংলা
‘পুরান ঢাকা ফুড ম্যাপ’ ধরে খাবার আর ঐতিহ্যের আস্বাদ

‘পুরান ঢাকা ফুড ম্যাপ’ ধরে খাবার আর ঐতিহ্যের আস্বাদ

পুরান ঢাকায় খাদ্য কেবল পুষ্টি গ্রহণের মাধ্যম নয়; এটি ঐতিহ্য উদযাপনের অংশ, স্থানীয় সমাজের প্রতিবিম্ব এবং অতীতের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের একটি উপায়। রাজধানীর এই প্রাণবন্ত অংশের খাবারের ঐতিহ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে চলে আসছে। ঐতিহ্য ধরে রাখার প্রবণতা পুরান ঢাকার নিজস্ব পরিচয় দাঁড় করিয়েছে। আপনি কোলাহলপূর্ণ রাস্তায় ঘুরে বেড়ান কিংবা ঐতিহ্যবাহী খাবারের জন্য বসে থাকুন না কেন, পুরান ঢাকার খাদ্য ঐতিহ্য আপনাকে এমন অভিজ্ঞতা দেবে যা আত্মাকে পুষ্ট করে। একইসাথে এই স্থানের খাবার, মনে স্থায়ী ছাপও ফেলে। সরু ও ব্যস্ত গলিগুলো ছোট ছোট খাবারের দোকানে ভরা। প্রতিটি দোকান আপনাকে মুখরোচক সব খাবারের স্বাদ দেবে। বাতাসে ভেসে আসা বিরায়ানির মুখরোচক ঘ্রাণ থেকে শুরু করে গ্রিল করা সিজলিং কাবাব পর্যন্ত, পুরান ঢাকার স্ট্রিট ফুড যেন স্বাদ ও রসনার এক মহাসম্মেলন। দর্শনার্থীরা চাইলে জিভে জল আনা ফুচকা, চটপটি ও হালিম খেতে পারেন এখানে। এছাড়াও আছে অগণিত সব খাবার আইটেম। এই ঐতিহাসিক স্থানকে ঘিরে একটি উল্লেখযোগ্য প্রকল্প আছে, যা 'পুরান ঢাকা ফুড ম্যাপ' নামে পরিচিত। গ্যেটে ইন্সটিটিউট বাংলাদেশের সহায়তায় এটি বাস্তবায়িত হয়েছে। পুরান ঢাকার খাবার দোকান ও ঐতিহ্য নিয়ে ম্যাপটি তৈরিতে অবদান রাখেন সালাউদ্দিন আহমেদ, খাদেমুল ইনসান এবং ক্রিস্টেন হ্যাকেনব্রোক ও তাদের সৃজনশীল মন। তিনজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জন্ম হয়েছে পুরান ঢাকার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য তুলে ধরার চমৎকার এক উদ্যোগের। *মানচিত্র ধরে পুরান ঢাকা দর্শন* ডিজিটাল মানচিত্রের যুগে, পুরানো ঢাকার ফুড ম্যাপ শরীরী জিনিসের সাথে পুনরায় সংযোগ করার সুযোগ করে দেয়। এই মানচিত্রে এমন একটি কিউআর কোড বসানো হয়েছে, যা স্ক্যান করলে পুরানা ঢাকার বিভিন্ন স্থান ও খাদ্য নিয়ে করা ইউটিউব ভিডিও সামনে আসে। তবে হাতে থাকা কাগুজে মানচিত্র একজনকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক স্বাদ দেয়। সুতরাং, মানচিত্রটি বগলদাবা করে, পুরান ঢাকা ভ্রমণে আমার সঙ্গী হতে আমি এক বন্ধুকে রাজি করালাম। জোন-৩ থেকে হাঁটা শুরু করে জোন-১ এ আসাপর্যন্ত আমরা প্রথমে থামি ঝুনুর পোলাওতে। যে জায়গা ঘিরে আমার ব্যক্তিগত সংযোগ আছে। এই মানচিত্রের কারণে আমি ঢাকার এমন এক অংশের অভিজ্ঞতা নিতে পেরেছি, যেখানে আমার বাবার স্কুলের শুরুর দিনগুলো কেটেছে। ঢাকার ভূ-দৃশ্য ক্রমাগত পরিবর্তন হলেও, এই জায়গাটি আগের মতই থেকে গেছে। আর অতীতের সঙ্গে অমূল্য সংযোগ স্থাপনের সুযোগ দিচ্ছে। ঝুনুর পোলাওতে কর্মরত ব্যক্তিরা জানান, তারা যতদূর সম্ভব প্রস্তুতপ্রণালী একই রাখার চেষ্টা করেছেন। তারা কেবল একটি আইটেম পরিবেশন করেন- 'ঢাকাইয়া স্টাইল' মোরগ পোলাও। মানচিত্রে দেখানো জোন দেখে ঘুরতে ঘুরতে আমরা এসে পড়ি 'বিউটি লাচ্ছি'-তে। ১৯২২ সাল থেকে যে দোকানটি প্রাণ সতেজ করে দেওয়া লাচ্ছি ও অন্যান্য পানীয় পরিবশেন করে আসছে। তাদের ম্যানুতে ফালুদাও আছে। তাদের লাচ্ছির মিষ্টতা এবং ঝাঁঝালো স্বাদের অপূর্ব ভারসাম্য আমাদের সতেজ করে তোলে ও বাকি স্থানগুলো ভ্রমণে উৎসাহ জাগায়। আমরা প্রথমে পায়ে হেঁটে পুরান ঢাকা দেখার পরিকল্পনা করেছিলাম। তবে দিনের বেলা হওয়ায় আমরা রিকশায় চড়ে বসি। এতে যাত্রাপথের সব ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা দেখতে আমাদের সুবিধা হয়। এটা মাথায় রাখতে হবে যে, বিকেল ৫টার পর পুরান ঢাকার অনেক স্থানে প্রবেশ করা যায় না। তাই সে অনুযায়ী, পরিকল্পনা সাজানো জরুরি। আমাদের যাত্রা শেষ হয় জোন-১ এ। সেখানে আমরা নুরানী কোল্ড ড্রিঙ্কসে লেবুর শরবত পান করি এবং আলাউদ্দিন সুইটমিটে যাই। ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন ধরনের মিষ্টির জন্য দোকানটি বিখ্যাত। ডিসপ্লেতে সাজানো মিষ্টান্নগুলো জিভে জল এনে দিতে যথেষ্ট। প্রত্যেকটি যত্ন সহকারে কারুকাজ করা। সেখান থেকে এক কেজি 'কালো জাম' কিনে আমরা বাড়ি ফিরি। *ম্যাপে কী আছে?* এই ম্যাপে আছে ২০টি খাবারের দোকানের ঠিকানা। একটু লক্ষ্য করলেই বুঝবেন বেশিরভাগ দোকানই অন্তত ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে রয়েছে। মানচিত্রের সবচেয়ে নতুন খাবারের দোকান – 'জগন্নাথ ভোজনালয়' ২০১২ সালে চালু হয়। মানচিত্রটি তিনটি ভিন্ন ভিন্ন জোন বা অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। এই বিভাজনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ল্যান্ডমার্ককে ব্যবহার করা হয়েছে। ১ নম্বর জোনের মধ্যে রয়েছে, চকবাজার এলাকা, ছাতা মসজিদ ও তারা মসজিদ। এতে রয়েছে,অর্ধ-শতকের বেশি সময় ধরে একইস্থানে ব্যবসা করে আসা হাজি নান্নার বিরিয়ানি, মাঠাওয়ালা দিলিপ ঘোষের মতো বিভিন্ন দোকান। আছে মিষ্টির দোকান- আলাউদ্দিন সুইটস। ১৮৯৪ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের লখনৌ নগরীতে ব্যবসা শুরু এই প্রতিষ্ঠানের। আরো আছে নুরানি কোল্ড ড্রিংকস, আমানিয়া হোটেল, রয়্যাল রেস্তোরাঁ ও মদিনা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। ২ নম্বর জোনের প্রধান ল্যান্ডমার্ক বিখ্যাত আহসান মঞ্জিল। দোকানের মধ্যে আছে, জগন্নাথ ভোজনালয়, করিম চিকেন পোলাও রেস্তোরাঁ, ছন ঘর, হাজি মাখন বিরিয়ানি, বিউটি লাচ্ছি, হাজি সাহেবের বাকরখানি এবং ইউসুফ কনফেকশনারি। সবচেয়ে ইতিহাস-বিজরিত কিন্তু জোন-৩। এখানে মূল ল্যান্ডমার্ক ভিক্টোরিয়া পার্ক। আছে বুদ্ধু পুরির দোকান, বিউটি বোর্ডিং, ঝুনুর পোলাও ঘর, উত্তম ঘোষ ক্যাফে এবং ক্যাফে কর্নার। এরমধ্যে বুদ্ধির পুরির দোকানের নামকরণের ইতিহাসটা কিন্তু বেশ মজার। সালাউদ্দিন জানালেন, বাংলায় বুদ্ধু মানে বোকার হদ্দ গোছের। তিনি সব সময় ভালো মানের পণ্য তৈরি করতে চাইতেন। তাই ব্যবহার করতেন টাটকা ঘি ও তেল। দিনশেষে বেচে যাওয়া তেল ও ঘি স্থানীয় গৃহিণীদের দিয়ে দিতেন। এক সময় দেখা গেল, মুফতে নিতে গৃহবধুরা তার দোকানের সামনে লাইন দিচ্ছেন। সেখান থেকেই এই নামকরণ। *নেপথ্য ইতিহাস: বন্ধুত্ব ও স্মৃতিরোমন্থন* দিনে দিনে সালাউদ্দিন ও ইনসানের বন্ধুত্ব যত গভীর হয়েছে, তার সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পুরান ঢাকার প্রতি তাদের ভালোবাসা-আবেগ। যেমন দুই বন্ধু দেখা করার জন্য বিভিন্ন রেস্তোরাঁকে ল্যান্ডমার্ক হিসেবে ব্যবহার করেন। পেশায় স্থপতি সালাউদ্দিন ভীষণ রেস্তোরাঁ মালিকও বটে। এই অঞ্চলের ঐতিহাসিক বিভিন্ন স্থাপত্য সংরক্ষণে প্রচণ্ড আবেগ রয়েছে তার। অন্যদিকে, মা-বাবার সাথে পুরান ঢাকার প্রাণস্পন্দন মুখর অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানোর সুখস্মৃতি আজো রোমন্থন করেন ইনসান। ফলে এই প্রাচীন নগরীর সাথে আত্মিক এক সম্পর্ক খুঁজে পান তিনি। মানচিত্রের প্রকল্পটি নিয়ে আলোচনার সময় সেই মুগ্ধতার সুরই প্রকাশ পায় তার কথায়, বলেন, 'জানেন তো আমি পুরান ঢাকারই।' এভাবে ঘোরাঘুরি করতেই একদিন সঙ্গে আনেন তাদের বন্ধু ক্রিস্টেনকে, যিনি সে সময় ছিলেন বাংলাদেশে গ্যেটে ইনস্টিটিটের পরিচালক। দুই বন্ধুর পছন্দের রুটগুলোকে একটি ম্যাপে রূপদান করে অন্যদের সাথে তা শেয়ারের সম্ভাবনা প্রথমে তার মাথাতেই আসে। আর এভাবেই শুরু হয় প্রকল্পটি। গ্যেটে ইনস্টিটিটের সহায়তায় তিন বন্ধু একাগ্রচিত্তে পুরান ঢাকার ফুড ম্যাপ তৈরির কাজ শুরু করেন। কিন্তু, প্রকল্পটি যখন কেবল গতি পাচ্ছিল, তারমধ্যেই করোনা মহামারি ছড়িয়ে পড়লে বিশ্বজুড়ে স্থবিরতা নেমে আসে। একই পরিণতি হয় তাদের প্রকল্পেরও। এই বাধায় অবশ্য দমেননি তারা। বরং মহামারি পরিস্থিতির উন্নতির অপেক্ষায় দিন গুনতে থাকেন। অপেক্ষা করেছিলেন, আবারো কবে পুরান ঢাকার জাদুর টানে সেখানে ছুটবে মানুষ – সেদিনের। সালাউদ্দিনের কথা যেন আমার মনেও ছাপ ফেলে। তিনি বলছিলেন, 'পুরান ঢাকা নিয়ে মানুষের অনেক বেশি রোমান্টিসজম আছে'। এরপর আমাদের কথাবার্তা যতো এগোয়, ততই স্পষ্ট হতে থাকে, কীভাবে এই এলাকা ও ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগ থেকেই শহরের এই অংশটির ফুড ম্যাপ বানান তারা। *অতীতের আস্বাদ* ঢাকা বদলাচ্ছে প্রতিনিয়ত। ছোটবেলায় শহরের কোনো অংশ নিয়ে মা-বাবার থেকে যেসব কাহিনি শোনেন কেউ, বড় হয়ে দেখেন তা আমূল বদলে গেছে। ফলে কখনোই সেই আদিরুপের দেখা হয় না তার। সেই প্রেক্ষাপটে ম্যাপটিকে এক রত্নই বলতে হয়। অতীতকে ফিরে পাওয়ার যে তীব্র আকাঙ্ক্ষা থাকে কারো কারো, এ যেন সেই ইচ্ছেপূরণের জাদুর কাঠি। গ্যেটে ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ফুড ওয়াকের মতোন দারুণ সব আয়োজনের পরিকল্পনা চলছে। ইতিহাস ও রসনার মধ্যে দিয়ে অংশগ্রহণকারীদের পুরান ঢাকার বৈচিত্র্যের স্বাদ পাইয়ে দেওয়া এবং সমৃদ্ধ স্থানীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টিই হবে যার লক্ষ্য।
Published on: 2023-07-15 18:43:26.644415 +0200 CEST