The Business Standard বাংলা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'বিড়াল ধরার বার্ষিক উৎসব' থামালেন যারা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে 'বিড়াল ধরার বার্ষিক উৎসব' থামালেন যারা

কয়েক সপ্তাহ আগের কথা। হঠাৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন গ্রুপে কয়েকটি মৃত বিড়ালের ছবি পোস্ট করা হয়। হত্যা করা হয়েছিল প্রাণীগুলোকে। কোনটিকে গলা কেটে আবার কোনটিকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতির জনক শেখ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের পুকুর পাড়ে গলা কেটে ফেলে রাখা হয়েছিলো বিড়াল ছানাগুলোকে। রক্তাক্ত বিড়ালগুলোর সেই বিভৎস ছবি দেখে এ ঘটনার প্রতিবাদ করেন অনেকেই। মন্তব্যের পর মন্তব্য আসতে থাকে, মানুষ কী করে এত নিষ্ঠুর হতে পারে? এর পর যা সামনে এল, তাও কম অবাক করার মতো নয়। 'বিড়াল ধরা হবে' জানিয়ে নোটিশ টানানো হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে। জানা গেলো, এ ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বিড়াল ধরা কার্যক্রম চলেছে হলগুলোতে। এ যেন একটি উৎসব; 'বাৎসরিক বিড়াল নিধন উৎসব'! এ ঘটনার পর কিছুদিন বেশ আলোচনা চলে ফেসবুকে। ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। কেউ আবার এ পদক্ষেপের পক্ষেও যুক্তি দেখাতে থাকেন, বিড়াল-কুকুরের যন্ত্রণায় যে ক্যাম্পাস জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে, তাও জানাতে ভুলেন না। দেশের মূলধারার গণমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়, প্রতিবাদ জানিয়ে লেখা হয় কলাম। তারপর যা হয়, একসময় সবাই ভুলে যান বিষয়টি, ব্যস্ত হয়ে পড়েন যার যার কাজে। কিন্তু এ ঘটনা সহসা ভুলতে পারেন নি একদল মানুষ। এই মানুষগুলো আজ ৯-১০ বছর যাবত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রাণীদের নিয়ে কাজ করছেন। যাদের একান্ত প্রচেষ্টায় হলের 'বিড়াল ধরা' কার্যক্রম সাময়িক স্থগিত হয়েছে, সে সংগঠনটির নাম 'এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার টিম অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি'। শুরু থেকেই এ সংগঠনটির সংকল্প ছিল ক্যাম্পাসে নিরপরাধ প্রাণিগুলো যেন নিরাপদে বাঁচতে পারে, একই সাথে আশেপাশে থাকা মানুষেরাও যেন এদের থেকে নিরাপদ থাকেন। তাদের আবেদনে সাড়া দেয় হল কর্তৃপক্ষ। এরপরই সাময়িকভাবে বন্ধ হয়েছে বিড়াল ধরা কার্যক্রম। নানা ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে তারা প্রাণীদের নিরাপত্তাই শুধু নিশ্চিত করেন নি, ওদের কাছ থেকে যেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে ব্যবস্থাও করছেন। বিড়ালদের প্রতি ঘটে যাওয়া নিশংস ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না নয়, গ্রহণ করেছেন সে ব্যবস্থা। *যেভাবে বন্ধ হলো 'বিড়াল ধরা' কর্মসূচি* বিভিন্ন আবাসিক হলে বিড়াল ধরার নোটিশ দেওয়ার পরই এ বিষয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয় 'এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার'। এর আগে বিড়াল নিয়ে নানা ধরনের কার্যক্রম তাদের ছিলো। চিকিৎসা দেওয়া, বিড়ালের পরিমাণ বেড়ে গেলে তাদের দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। এমনকি এ ঘটনার অনেক আগে রোকেয়া হলে বিড়ালদের বন্ধ্যাকরণের কাজ শুরু করেছিলেন সংগঠনের অন্যতম সদস্য তাসনিম মাহজাবিন তানহা। এবারের ঘটনার অন্যান্য হল, বিশেষ করে মেয়েদের হলে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে বন্ধ্যাত্বকরণ প্রক্রিয়ায় বিড়ালের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও র‌্যাবিস ভ্যাক্সিন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তাসনিম মেহজাবিন তানহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৭-১৮ সেশনের শিক্ষার্থী। কোভিড পরবর্তী সময়ে তিনি এ সংগঠনে কাজ করছেন। এর আগে রোকেয়া হলে বিড়ালদের দেখাশোনা করতেন ব্যক্তিগতভাবে। করোনা শেষে হলে ফিরে প্রাণীদের করুণ অবস্থা দেখে তিনি বড় পরিসরে কাজ শুরু করেন। সেই থেকে যুক্ত হন 'এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার টিম অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি' সংগঠনের সাথে। বিড়ালদের প্রতি ঘটে যাওয়া নিষ্ঠুরতা বন্ধে তাদের কার্যক্রম জানতে চাইলে তিনি জানালেন বিভিন্ন ভূমিকার কথা। মেয়েদের হলে বিড়াল নিয়ে প্রায়ই নানা ঘটনা ঘটে। অথচ এ বিষয়ে কোন কার্যকরী ভূমিকা হল কর্তৃপক্ষকে নিতে দেখা যায় না, শুধু বছর বছর বিড়াল ধরে অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়া ছাড়া। কোন একটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সেখানে অবস্থান করা প্রাণীগুলোও যে জরুরি, তা বুঝতে পেরে 'এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার' সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেয়। "বিড়াল ফেলে দেওয়া, মেরে ফেলা, বিশেষ করে ছোট বাচ্চাদের ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া- এগুলো কিন্তু খুবই কমন ঘটনা। এবার যেটা হয়েছে, একদিনে ৫ টা বিড়াল মেরে ফেলা হয়েছে। এরপর আমরা প্রত্যেকটা মেয়েদের হলে এপ্লিকেশন করেছি। হল ধরে ধরে সবগুলো বিড়ালকে স্ট্যারিলাইজ (বন্ধ্যা) করে দিচ্ছি। আর তিন মাসের কম বয়সী বিড়ালগুলোর মধ্যে নব্বই শতাংশকে এডাপশনে দিয়ে দেওয়া হয়েছে," জানালেন তাসনিম মেহজাবিন। যদিও সব হল প্রশাসন থেকে সমান সহযোগিতা পান নি তারা। তবুও মেয়েদের হলের বেশিরভাগ বিড়ালকেই ভ্যাক্সিনের আওতায় নিয়ে এসেছেন। ভ্যাক্সিন দেওয়া হয়েছে এমন বিড়ালের গলায় বিশেষ বেল্ট ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। যাতে করে এদের ওপর কোন রকম আক্রমণ না করা হয়। সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাবরিনা সাব্বির জানালেন, বিড়াল ধরার এ ইস্যুটা নতুন নয়। "এর আগে সুফিয়া কামাল হলে এমন একটি ঘটনার কথা জানা গিয়েছিলো। আমরা যখন তাদের প্রপোজ করি, তারা কেন যেন আগায়নি। তখন যদি বন্ধ্যা করা যেত, তাহলে কিন্তু সংখ্যাটা বাড়তো না। হয়তো নতুন বিড়াল আসতো। নতুন এ ঘটনা ঘটার পর আমরা হল প্রশাসনকে চিঠি দিয়েছে, তারা এগিয়ে এসেছে। ১৬-১৭ টা বিড়াল আমরা ইতোমধ্যে বন্ধ্যা করে হলে ফিরিয়ে দিয়েছি। তারা সুস্থ আছে। এক মাস পরে আমরা রিপোর্ট দিবো।" প্রাণী কল্যাণ আইন- ২০০৯ এর মতে গৃহপালিত প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা, অবহেলা-অযত্ন যেমন অপরাধ, এক এলাকার প্রাণী অন্য এলাকায় জোরপূর্বক স্থানান্তরও বেআইনি। তাছাড়া একটি স্থান থেকে প্রাণীদের ধরে অন্যত্র পাঠানো সমস্যার সমাধান নয়। কারণ ঢাকার মত জনবহুল অঞ্চলে একটি প্রাণীকে সরালে স্বাভাবিকভাবেই অন্য আরেকটি এসে জায়গা দখল করবে। সাবরিনার মতে, কুকুর বিড়াল বন্ধ্যাকরণ একটি ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। প্রতিটি প্রাণীর পেছনে প্রায় দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়। "বিড়ালের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ যখন জরুরি, তখন ওই হলের প্রশাসনের এগিয়ে আশা জরুরি। আমরা না হয় সাহায্য করবো, মেয়েরা গিয়ে বিড়াল ধরে দিবে, কিন্তু হল প্রশাসনকে তো অন্তত ফান্ড দিয়ে সহায়তা করতে হবে।" *ঢাবি ক্যাম্পাসে প্রাণীদের সত্যিকারের বন্ধু 'এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার'* সংগঠনের শুরুটা হয়েছিল সেই ২০১৩ সালে, প্রাণীবিদ্যা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সাবরিনা সাব্বিরের হাত ধরে। সাবরিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন ২০১২-১৩ সেশনে। বিজ্ঞান অনুষদের পড়ার সুবাদে তার বেশিরভাগ সময় কাটতো কার্জন হলে। একবার এমন একটি ঘটনা ঘটে, যা তাকে উদ্ধুদ্ধ করে প্রাণীদের নিয়ে কাজ করতে। তার চোখের সামনে কোনো এক হলের আবাসিক শিক্ষকের গাড়ির নিচে চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে যায় একটি কুকুর ছানা। এ ঘটনার প্রতিবাদ করতে গেলে উল্টো তাকেই উদ্ধত আচরণের শিকার হতে হয়। তখন থেকেই সিদ্ধান্ত নেন, ক্যাম্পাসে বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকা কুকুর, বিড়াল, যাদের নেই কোন থাকার জায়গা কিংবা অসুস্থ হলে চিকিৎসার ব্যবস্থা, তাদের জন্য কাজ করবেন। সমমনা কয়েকজন বন্ধু মিলে এরপরেই শুরু করেন সংঘবদ্ধ কার্যক্রম। শুরুতে কাজকর্ম সীমাবদ্ধ ছিলো কার্জন হলে। তাদের দলটি ছিলো ৪-৫ জন সদস্যের। প্রথমদিকে অসুস্থ ও মুমূর্ষু কুকুর বিড়ালদের উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই ছিলো প্রধান কাজ। এছাড়াও প্রাণীদের খাবারে ব্যবস্থা করতেন তারা। শুরুর দিকে কাজ সম্পর্কে সাবরিনা জানালেন, বিড়ালের বাচ্চাদের এডাপশনের ব্যবস্থা করার কথা। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ তারা তখন করেছিলেন, বন্ধ্যাকরণের আওতায় নিয়ে এসেছিলেন কার্জনের প্রায় সব কুকুরকে। "কুকুর বিড়ালের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় কাজটি করেছিলাম কর্জনে। জুলোজি ডিপার্টমেন্টের সহায়তায় 'অভয়ারণ্য' থেকে স্ট্যারিলাইজেশন (বন্ধ্যাকরণ) করে ফেলেছিলাম। কুকুর-বিড়ালের যেটা দরকার, জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণে, 'র‌্যাবিস' ভ্যাক্সিন। আমরা প্রতিবছর একবার করে র‌্যাবিস ভ্যাক্সিনেশন করতাম," বললেন সাবরিনা। সেই থেকে শুরু। এরপর শুধু নিরন্তর কাজ করে যাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ হয়েছে সাবরিনার, সন্তানের জননী হয়েছেন, তবুও থেমে নেই অসহায় প্রাণীদের নিয়ে তার ভাবনা। সংগঠনটির কাজ সবচেয়ে বেশি প্রশংসিত হয় করোনাকালীন লকডাউনের মধ্যে। সেসময় অন্যান্য জায়গায় মতই জনশূন্য ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ফলে দেখা দেয় প্রচণ্ড খাবারের অভাব। এসময় অভুক্ত প্রাণীদের খাবার ও চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় 'এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার টিম অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি'। সাবরিনা সাব্বির জানান, লকডাউনে তাদের প্রচুর কাজ করতে হয়েছে। "করোনাকালীন পুরো ক্যাম্পাস সামলানোর জন্য আমাদের একাধিক দল গঠন করতে হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আনিকা বুশরা, কম্পিউটার সাইন্সের তানজিম সহ অনেকে মিলে আমরা টিম গঠন করি। তখন প্রতিদিন খাবার গেছে। তবুও কুলাতো না। বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রাণীরা আসতো। কার্জনে খাবার দিলে কাক এমনকি চিল পর্যন্ত নেমে আসতো।" বর্তমানে সংগঠনের কোন সাংগঠনিক কাঠামো নেই। ৫-৬ সদস্য নিয়মিত কাজ করেন। সকলেই সমান মর্যাদায়, দলের সাধারণ সদস্য। সাবরিনা অবশ্য প্রসংশাই করলেন বর্তমান দলটির। সকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলেও একজন সদস্য রয়েছেন বাইরে। তার নাম নিপর্ণা দে। সাবরিনা তাকে ভূষিত করলেন 'রেসকিউয়ার' উপাধিতে। এছাড়া সরাসরি মাঠে কাজ করছেন তাসনিম মেহজাবিন তনয়া, সারাহ ইশরাত, সুমাইয়া এশা, দিশা অপরাজিতা, আনিকা বুশরা, আবিদা নদী এবং সিদ্ধার্থ সাম্য। এর বাইরে আরও কয়েকজন রয়েছেন যারা নিজ নিজ হলে প্রাণীদের দেখাশুনা করে তাদের সাহায্য করে থাকেন। শুরুর দিকের কাজগুলো চালিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি এখন আরও বেশ কিছু দায়িত্ব সামলাতে হয় সদস্যদের। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে প্রাণীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনে চিকিৎসা ও খাবার দেওয়া একধরনের নিয়মিত কাজ। এর বাইরে সংগঠনের নামে পরিচালিত একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতে হয় তাদের। এ পেজেই চলে প্রচারণা এবং ফান্ড সংগ্রহ। এছাড়া প্রাপ্ত অর্থের হিসাবও এখানে জানিয়ে দেওয়া হয়। সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় বেশ কয়েকটি সংগঠন দীর্ঘ সময় ধরে সাহায্য করে আসছে তাদের। সাবরিনা জানালেন, তাদের কথা উল্লেখ না করলে তা হবে অকৃতজ্ঞতা। "আমাদের সবচেয়ে বড় সাহায্যকারী দুটো সংগঠন হলো 'অভয়ারণ্য বাংলাদেশ' যার প্রতিষ্ঠাতা রুবাইয়া আহমেদ আপু, এবং এমিল ভাইয়ের 'প ফাউন্ডেশন'। এ দুটো সংগঠনের কথা আসলে না বললেই নয়।" *প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসাই একমাত্র অনুপ্রেরণা* সকাল সকাল চলে এসেছে সিটি করপোরেশনের গাড়ি। একে একে কুকুরদের ধরে গাড়িতে তোলা হচ্ছে। কুকুর বন্ধ্যাকরণ ও টিকাদান কর্মসূচীর আওতায় ওদের পাঠানো হচ্ছে 'অভয়ারণ্য বাংলাদেশে', সাথে সাহায্য করছে 'বাংলাদেশ সোসাইটি ফর দ্য প্রিভেনশন অফ ক্রুয়েলটি টু এনিম্যালস' (বিএসপিসিএ)। এদের সঙ্গে কাজ করছেন এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার টিমের সদস্য তাসনিম মেহজাবিন তনয়া, নিপর্ণা দে এবং মোহাম্মদ কামাল হোসেন। ক্যাম্পাসের প্রাণীগুলো তাদের কাছে বন্ধুর মত। সকালের কার্যক্রম সেরে তনয়া, নিপর্ণা যখন চা খেতে গেলেন টিএসসিতে, তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে চলে এলো একদল কুকুর। তনয়া জানালেন, এখানে একটি বাদে বাকি সবাই ক্যাম্পাসের কুকুর। এদের প্রত্যেকের কানের ছোট একটি অংশ কাটা। কুকুরদের ভ্যাক্সিনেশন করার সময়ই সনাক্তের জন্য এ অংশটুকু কেটে রাখা হয়। কুকুরেরা দল বেধে বসে গেলো তনয়া, নিপর্ণার চারপাশে। এক এক করে প্রত্যেকের নাম বলে গেলেন তনয়া। একটির এখনো নামকরণ হয়নি, সেটিও জানালেন। 'এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার' টিমের আরেকজন সক্রিয় সদস্য রিকশা চালক মোহাম্মদ কামাল হোসেন। একটু পরেই খাবার নিয়ে এলেন তিনি। হাত বাড়িয়ে খাবার দিতেই শান্ত সুবোধ কুকুরগুলো খেতে লাগলো। কামালের বাড়ি বরিশাল অঞ্চলে। ছোটবেলা থেকেই পশুপাখিদের প্রতি গভীর ভালোবাসা ছিলো তার। ক্যাম্পাসে রিকশা চালাতে এসে এ দলের সাথে যুক্ত হয়ে গিয়েছেন। ক্যাম্পাসের স্থায়ী প্রায় সব কুকুরই তাকে চেনে। ডাক দিলেই দৌড়ে কাছে চলে আসে। তার রিকশার সিটের নিচে থাকে নানা রকমের অষুধ, স্প্রে এবং খাবার। নিজের কাজ রেখে তিনি ঘুরে বেড়ান হল থেকে হলে। অসুস্থ প্রাণীদের রাখেন নিবিড় পর্যবেক্ষণে। নিপর্ণা, তনয়া কিংবা কামাল কেন করেন এ কাজগুলো? এখানে নেই কোন অর্থপ্রাপ্তি, নেই বিরাট কোন স্বীকৃতি। তবুও কীসের অনুপ্রেরণায় প্রাণীদের সেবা করে যান দিনের পর দিন? জানালেন, অনুপ্রেরণা কেবলই ভালোবাসা। তাদের এ কার্যক্রমের ফলে অবলা প্রাণীদের কষ্ট যদি সামান্য হলেও লাঘব হয়, সেটুকুই তাদের প্রাপ্তি। ক্যাম্পাসের প্রাণীগুলো ভালো থাক, এ জন্যই তাদের এই নিরন্তর প্রচেষ্টা। *রয়েছে অসংখ্য পরিকল্পনা* প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা পেলে নানা ধরনের পরিকল্পনার কথা জানালেন সাবরিনা সাব্বির। বললেন, সহযোগিতা পেলে তারা ক্যাম্পাসের সব কুকুর-বিড়াল একবারে ভ্যাক্সিনেশনের আওতায় নিয়ে আসবেন। "এরা যাতে কারো ক্ষতির কারণ না হয়, স্টুডেন্টরাও যেন ওদের ক্ষতির কারণ না হয় তাই এ পরিকল্পনা আমাদের।" আরেক সদস্য তনয়াও জানালেন একই কথা। তিনি ক্যাম্পাসে নানা ধরনের সচেতনামূলক ক্যাম্পেইন করতে চান। "আমাদের যেটা করতে হবে, কুকুর বিড়ালের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি। কোন একটি স্থান কিন্তু কখনোই বিড়াল শূন্য হয় না। কোথাও না কোথাও থেকে কিন্তু ঠিকই ফেরারি বিড়াল চলে আসে। আমাদের খুবই সমস্যা হয় ওদের নিয়ে কাজ করতে। বরং হলে যারা বড় হয়, ওদের নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।" তবে পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে অনেক কাজই করা যাচ্ছে না। করোনার সময় আমাদের প্রচুর খরচ হতো। প্রতিদিন কুকুর বিড়ালদের খাওয়াতে তাদের দুই থেকে তিন হাজার টাকা খরচ হয়ে যেতো। নানা ধরনের ওষুধ, ভ্যাক্সিন কিনতেও মোটা অংকের অর্থের প্রয়োজন হতো। সে সময়ে তারা প্রথম ক্রাউড ফান্ডিং শুরু করেন। বর্তমান সময়ে এসে অনেক বেশি অর্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ছে। তনয়া জানালেন, অসুস্থ কোন প্রাণীকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কম হলেও দেড়-দুই হাজার টাকা খরচ হয়। তাই কুকুর বিড়ালদের ভালোবাসেন, তাদের নিয়ে কাজ করতে চান, এমন কেউ চাইলে এ সংগঠনকে যেন অর্থয়ান করেন, এ আহ্বান তাদের। *প্রয়োজন নতুন সদস্য* প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পরম মমতায় প্রাণীদের দেখাশোনা করে আসছে 'এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার'। করোনাকালীন লকডাউনে তাদের ছিলো সমূহ কার্যক্রম। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়ে সংগঠনের অনেক সদস্যই পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেছেন, কেউ বা পড়তে গিয়েছেন বিদেশে। ফলে সক্রিয় কর্মীর অভাব বোধ করছেন বর্তমান সদস্যরা। 'এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার' এ বিভিন্ন সময়ে পুরুষ সদস্যরা কাজ করলেও বর্তমানে বেশিরভাগ সদস্যই নারী। এর ফলে ছেলেদের হলগুলোতে কাজ করতে বেশ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তারা। তাসনিম মেহজাবিন তনয়া জানালেন, ম্যান পাওয়ারের অভাবে তাদের অনেক কাজই ব্যাহত হচ্ছে। "আমরা যতজন ভলান্টিয়ার আছি, প্রতিদিনই আমাদের চার-পাঁচটা করে প্রাণীর ট্রিটমেন্ট করতে হচ্ছে। আমাদের টিমে কিন্তু আগে একটিভ ছেলে মেম্বার ছিল। কোভিডের পর থেকে ছেলেরা আর তেমন আগ্রহ দেখায় নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন ছেলে এখন আমাদের সদস্য নেই। এটা খুবই আনফরচুনেট।" সংগঠনের সদস্য হওয়া খুবই সহজ। 'এনিম্যাল ওয়েলফেয়ার টিম অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি' নামক ফেসবুক পেজে ম্যাসেজ করে নিজের আগ্রহের কথা জানাতে হবে। এরপর তিন-চার মাস কাজ করার পর যদি সংগঠনের পক্ষ থেকে উপযুক্ত মনে হয়, তবেই আনুষ্ঠানিকভাবে দলে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এ সংগঠনে নেই কোন বড় ধরনের স্বীকৃতি, নেই অর্থ উপার্জন কিংবা কোন আর্থিক লাভ। প্রাণীদের প্রতি পরম মমতা যাদের, যারা ভালোবেসে কাজ করতে চান, তারা চাইলে এ সংগঠনে যুক্ত হতে পরেন। বিনিময়ে একটি প্রাপ্তি নিশ্চিতভাবেই থাকবে- প্রাণীদের পক্ষ থেকে অকৃত্রিম ভালোবাসা।
Published on: 2023-07-17 08:45:15.734967 +0200 CEST