The Business Standard বাংলা
মৃত ও জীবিত নদীর জাদুঘর: ৩০৪ নদীর পানি, নদীর জীবন-ইতিহাস

মৃত ও জীবিত নদীর জাদুঘর: ৩০৪ নদীর পানি, নদীর জীবন-ইতিহাস

পানিভর্তি ছোট ছোট কাঁচের বোতল মুখবন্ধ অবস্থায় সাজিয়ে রাখা হয়েছে। কাঠের তাকে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা এসব বোতলে প্রায় ৩০৪টি নদী, সাগর ও হাওর-বিলের পানি সংরক্ষিত আছে। প্রতিটি বোতলের গায়ে লাগিয়ে রাখা কাগজে নদীগুলোর নামসহ বৃত্তান্ত লিখে রাখা হয়েছে। এতগুলো বোতল একসাথে দেখে মনে হবে এটি কোন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষণ ল্যাব। হারিয়ে যাওয়া মৃত নদনদীর পানি সংরক্ষণের পাশাপাশি, নদীমাতৃক দেশের গল্প তুলে ধরার প্রয়াস থেকে জাদুঘরটিতে 'নদী গ্যালারি' নামের বিশেষ একটি অংশ গড়ে তোলা হয়েছে। বাঁশের তৈরি বড় প্রবেশপথে 'লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর' লেখাটির নিচেই বাঁশের তৈরি ছোট মই, লাঙ্গল, মাথাল (কৃষকদের মাথায় পরিহিত টুপি), নিড়ানি সেঁটে টানিয়ে রাখা হয়েছে। তার একটু দূরেই বাঁশ দিয়ে বানানো হয়েছে আরেকটি প্রবেশদ্বার। ঠিক সামনেই ছোট একটি ঢেউ খেলানো সেতু। যেটি তৈরি করা হয়েছে সম্পূর্ণ বাঁশ ও কাঠ দিয়ে। প্রকৃতির মাঝে প্রাকৃতিক বিষয়গুলোকে সুন্দরভাবে উপস্থাপনের উদ্দেশ্য থেকে গতানুগতিকের চেয়ে ভিন্ন আঙ্গিকে লোকায়ন জাদুঘরটিকে সাজিয়ে তোলা হয়েছে। *হারিয়ে গিয়েও যা রয়ে গেছে* "গ্রামীণ সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রাকে স্মরণে রাখতে এই জাদুঘরটি গড়ে তোলা হয়েছে। সময়ের সাথে গ্রামীণ সংস্কৃতির অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। আধুনিকতার ছাপ গ্রামের মানুষের জীবনে পড়লেও, শিকড়কে তো ভুলে যাওয়া যায় না। সেসব হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে এই জাদুঘর নির্মাণ করা। তাইতো আমাদের এই জাদুঘরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে, 'শেকড়ের টানে অস্তিত্বের সংকটে'। শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপনে ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী এই জাদুঘরে রাখা হয়েছে। বাঙালির জীবনযাপনে এইসব সামগ্রী একসময় নিত্যকার সঙ্গী ছিল। সেসব লোকজ সংস্কৃতি ও লোক মানুষের জীবনযাপনের নানাদিক সংরক্ষণের ভাবনা থেকেই জাদুঘরটি গড়ে তোলা হয়েছে। যার জন্য এর নামকরণ করা হয়েছে, লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর"- এমনটিই জানাচ্ছিলেন জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা, ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান। ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের অদূরে পূর্ব আকচা গ্রামের অবস্থান। গ্রামের নিরিবিলি গাছগাছালিময় পরিবেশের মধ্যে গড়ে তোলা হয়েছে 'লোকায়ন জীবনবৈচিত্র্য জাদুঘর'। বাহ্যিক সাজসজ্জা দেখে এটিকে পার্ক বা বিনোদন কেন্দ্র বলে মনে করেন অনেকে। জাদুঘরটি ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর, ২০১৬ সালে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। আলাদা আলাদা চারটি গ্যালারি ভাগ করে জাদুঘরটি সাজানো হয়েছে- নদী গ্যালারি, সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী গ্যালারি, তৃণমূল লোকজ গ্যালারি, মুক্তিযুদ্ধ গ্যালারি। গ্রামবাংলায় একসময় ব্যবহৃত জিনিসপত্র সযত্নে ঠাঁই পেয়েছে জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে। মাটির দেয়াল ও খড়ের চালা দেওয়া ছোট কুঁড়েঘরে বানানো হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গ্যালারি। কুড়েঘরের মাটির দেয়ালের ওপর রঙ দিয়ে হাতে আঁকা নানারকম ফুল, পাখি ও নকশা। অন্যান্য গ্যালারিগুলোর ভেতরে প্রবেশ করতেই মনে হবে টাইম ট্রাভেল করে যেন কয়েক দশক পেছনে চলে এসেছে কেউ। গরুর গাড়ি, ঢেঁকি, নাগরদোলা, চরকা, পালকি, প্রাচীনকালে ব্যবহৃত মুদ্রা ও গৃহস্থালির পুরনো বিভিন্ন তৈজসপত্র সারি সারি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। পাথর, মাটি, পিতল, কাঁসার তৈরি এসব সামগ্রী এখন গেরস্ত বাড়িতে ব্যবহার করতে দেখা যায় না বললেই চলে। এখানে রাখা কিছু সামগ্রী এতটাই পুরোনো, যা এগুলোর আধ ভাঙা অবস্থা দেখে বোঝা যায়। পুরোনো বাদ্যযন্ত্র- কলেরগান, প্রেমজুড়ি, সানাই, ঝিঁঝি ও স্থানীয় লোক নাট্যধামের গানের সময় পরিহিত একধরনের বিশেষ পোশাক জাদুঘরের অন্য একটি গ্যালারিতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। *নদীর জন্য যে জাদুঘর* লোকায়ন জাদুঘরে থাকা বেশিরভাগ জিনিস বিলুপ্তপ্রায় হলেও অর্থমূল্যে এগুলোর দাম বেশি নয়। লোক মানুষের জীবনযাপনের নিত্য সামগ্রীর পাশাপাশি, নদীর পানি সংরক্ষণের বিষয়টি যে কাউকে কিছুটা অবাক করবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের কয়েকটি নদীর নাম ছাড়া, বেশিরভাগ নামই মানুষের কাছে অজানা। কালক্রমে কিছু নদীর অস্তিত্ব হারিয়ে গেলেও, জাদুঘরটিতে এখনো সেসব নদীর পানি সংরক্ষিত রয়েছে। যে নদী হারিয়ে যাচ্ছে, তারও পানি থেকে যাচ্ছে এই নদী গ্যালারিতে। নদীভিত্তিক বিভিন্ন তথ্য গ্যালারিতে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কেবল নদীরগুলোর নাম ও পানি নয়- নদীর উৎপত্তি স্থান, ইতিহাস সহ সব তথ্যই ম্যাপ করে লিখে রাখা হয়েছে জাদুঘরের নদী গ্যালারিতে। নদীকেন্দ্রিক পেশা, নৌকাবাইচ, ভাটিয়ালী গান, বন্যা, চর, জলজ উদ্ভিদ, মৎস্য, বর্ষা, পাখিসহ নদীর সাথে সম্পর্কিত নানা তথ্য দিয়ে এ গ্যালারি সাজানো হয়েছে। নদীমাতৃক দেশে মানুষের শিকড় কীভাবে নদীর সাথে জড়িয়ে আছে, তা যেন ছোট্ট ঘরের এই গ্যালারি জানিয়ে দিচ্ছে। নদীর পানি কে বা কারা সংগ্রহ করেছে, কোথায় এই নদীর ঠিকানা এবং কবে নাগাদ সংগ্রহ করা হয়েছে- সবকিছুই বোতলের গায়ে লিখে রাখা হয়েছে। বোতলে সংরক্ষিত নদীর পানির নাম পড়তে গেলে বেশকিছু নদীকে নতুন বা অপরিচিত বলে মনে হবে। নাম না জানা নদীর মধ্যে আছে- ফুলকুমার, বহুলী, লেংগা, সুগন্ধা, সোনাভরী, পুনর্ভরা, চাওয়াই, দুধকুমার, নীলকমল, ধরনী, হলহলিয়া, কালজানি, ভেরগাঁ, জিঞ্জিরাম, কালো, হাইল হাওর, জালশিরা, আখিরা, ঘাঘট, মরাসতি, সাতপোয়া, দশআনি, জারখালী,  হুড়া সাগর, সন্ধ্যা, হালতি, ধলাই, ঢেপা, ছাতনাই, তালমা, মর্মর সাগর, নীল সাগর, শিববাড়িয়া, সুখ সাগর, রাঙামাটি, আন্ধারমানিক, রনচন্ডী ইত্যাদি। দেশের বাইরের সংরক্ষিত নদীর পানির মধ্যে রয়েছে- লন্ডনের টেমস নদী, জার্মানির দানইয়ুব, আন্দামান সাগর, আরব সাগর ও উত্তর সাগরের পানি। এছাড়াও রয়েছে 'সাত সাগর' তথা আর্কটিক, উত্তর ও দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগর; উত্তর ও দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগর, ভারত সাগর ও দক্ষিণ মহাসাগরের বালি। প্রতিষ্ঠাতা ও উদ্যোক্তা শহীদ উজ জামান বলেন, "মধ্যযুগে আমাদের দেশে ১৩০০-এর অধিক নদ-নদী ছিল। যেগুলোর বেশিরভাগ সময়ের সাথে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে ৪০৫টির মতো নদী আছে, তারমধ্যে ৩০৪টির পানি এই জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। বাইরের দেশের ২০টি নদী ও সাগরের পানিও এনে সংরক্ষণ করা হয়েছে। জাদুঘরের কর্মকর্তারা বিভিন্ন স্থান থেকে এগুলো সংগ্রহ করেছেন। জাদুঘরের সাথে সম্পৃক্ততা নেই এমন ব্যক্তিরাও বিভিন্ন সময় ভ্রমণে গিয়ে পানি সংগ্রহ করে আমাদের জানাতো। তারপর তাদের থেকে সেগুলো নিয়ে আসা হতো। কাঁচের বিশেষ জার প্রথমে বায়ুমুক্ত করে, সেগুলোতে এসব নদীর পানি সংরক্ষণ করা হয়।" "লোক মানুষের জীবনবৈচিত্র্য তুলে ধরার বেশিরভাগ সামগ্রী সেসব মানুষদেরই দেওয়া। অনেকের পরিবার ও নিজেদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে বহুবছর পুরোনো জিনিস ছিল, যেগুলো তারা জাদুঘরে সংরক্ষণের জন্য দিয়েছেন। এভাবেই বিভিন্ন মানুষের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে ধীরে ধীরে এই জাদুঘর গড়ে উঠেছে। লোকায়ন জীবনের হারিয়ে যাওয়া ও অজানা বৈচিত্র্য নিয়ে কাজ করতে গিয়েই এই নদী গ্যালারির সৃষ্টি। নদ-নদী প্রকৃতি প্রদত্ত অনেক বড় সম্পদ। কালের স্রোতে নদীর স্রোতও থেমে যাচ্ছে। যে সব নদী হারিয়ে যাচ্ছে, সেগুলোর পানি ও ইতিহাস থেকে যাচ্ছে এই নদী গ্যালারিতে। যা ভবিষ্যতে নদী গবেষণা ও এই সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে কাজে আসবে।" নদী গ্যালারি ও অন্যান্য গ্যালারিসহ প্রায় ৭০ রকমের ফল এবং ১২০ রকমের ঔষধি গাছ রয়েছে এখানে। যেগুলো জাদুঘরের চারিদিক ঘিরে রেখেছে। জাদুঘরটির আরেকটি বিশেষ আকর্ষণ হচ্ছে, দর্শনার্থীরা এখানে এসে সুইচে চাপ দেওয়া মাত্র বিভিন্ন জেলার ভাষা শুনতে পারেন। 'আঞ্চলিক ভাষা' নামের একটি গ্যালারি রাখা হয়েছে। গ্যালারিটিতে ৬৪ জেলার জন্য ৬৪টি সুইচ রয়েছে। যে জেলার সুইচ চাপ দেওয়া হয়, সে জেলার আঞ্চলিক ভাষা তৎক্ষণাৎ শুনতে পাওয়া যায়। জাদুঘরটিতে ঐতিহ্যগত স্মৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি, গ্রামীণ জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন চলে। নবান্ন, পিঠা উৎসব ও বর্ষামঙ্গলের মতো নানা উৎসব নিয়মিত এখানে উদযাপন করা হয়। বলতে গেলে পুরো বাংলাদেশের শ্রমজীবী ও খেটে খাওয়া মানুষের জীবনযাত্রার চিত্র ফুটিয়ে তোলা হয়েছে 'লোকায়ন জীবন বৈচিত্র্য জাদুঘরে'। আদিপুরুষদের জীবনযাপন ও বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের স্থির বর্ণনা জাদুঘরের প্রতিটি গ্যালারি জানান দিয়ে যাচ্ছে। যা হারিয়ে গেছে তাও যেন এখানে কালের সাক্ষী হয়ে ইতিহাসের গল্প বলে যাচ্ছে।
Published on: 2023-07-17 15:32:14.036244 +0200 CEST