The Business Standard বাংলা
বরাদ্দ কম, ধীরগতিতে চলছে অধিকাংশ রেলওয়ে প্রকল্প

বরাদ্দ কম, ধীরগতিতে চলছে অধিকাংশ রেলওয়ে প্রকল্প

চলমান বেশিরভাগ রেলওয়ে প্রকল্প যে গতিতে তহবিল পাচ্ছে, তাতে সেগুলো সম্পন্ন করার মেয়াদ যুক্তিসংগত সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশ রেলওয়ের সীমিত সক্ষমতা ও চলমান প্রকল্পগুলোর সঙ্গে আরও নতুন প্রকল্পের বোঝার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে বলে মনে করেন তারা। কয়েকটি উদাহরণ দিতে গিয়ে তারা বলেন, বগুড়া-সিরাজগঞ্জ ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণে ২০১৮ সাল থেকে চলমান প্রকল্পে পাঁচ বছরে অগ্রগতি মাত্র ০.২ শতাংশ। স্থবির প্রকল্পটিতে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৪৪০.৫০ কোটি টাকা। এই হারে বরাদ্দ দিলে ৫,৫৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পের কাজ শেষ করতে সময় লাগবে আরও এক যুগ। ৩,৫০৬.৭৫ কোটি টাকা ব্যয়ের খুলনা-দর্শনা ডাবল রেল ট্র্যাক প্রকল্পটিও একই রকম বিপর্যয়ের মুখোমুখি। ২০১৮ সালে নেওয়া প্রকল্পটিতে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৪০.৭৬ কোটি টাকা। এরকম ধীর গতিতে বরাদ্দ দিতে থাকলে ১২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ নির্মাণে সময় লাগবে আরও ৩২ বছর। সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর ব্যাপার দেখা গেছে রেলওয়ের ২০০ মিটারগেজ ক্যারেজ কেনায়। ২০১৬ সালে নেওয়া এই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ২ কোটি টাকা। এই হারে বরাদ্দ দিলে ৯২৮ কোটি টাকার প্রকল্পটি শেষ করতে সময় লাগবে আরও ৯২৭ বছর। অন্যান্য উপেক্ষিত প্রকল্পের মধ্যে তিনটিতে চলতি অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১ লাখ টাকা করে—বাকি দুটি প্রকল্পে ১ কোটি টাকা করে ও একটি প্রকল্পে ২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১০০ কোটি টাকার কম করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে অন্তত ১৮টি প্রকল্পে। এভাবেই আর্থিক সামর্থ্যের অতিরিক্ত প্রকল্প হাতে নিয়ে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিতে পারছে না বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর ফলে বছরের পর বছর ধরে স্থবির প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ছে সংস্থাটির। এরই মধ্যে প্রতি বছরই নতুন করে প্রকল্প অনুমোদন দেওয়ায় এই সংকটের পরিধি বাড়ছে। সামর্থ্যের অতিরিক্ত প্রকল্প অনুমোদনের কারণে আগামীতে বাংলাদেশ রেলওয়ের আর্থিক শৃঙ্খলায় বড় ধরনের অবনমন হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মোহাম্মদ ইয়াসিন দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, অর্থবছরের শুরুতে প্রকল্প পরিচালকের কার্যালয় থেকে নির্দিষ্ট তহবিল চাওয়া হয় এবং সে অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়। কম-বেশি বরাদ্দের সুযোগ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, 'কাজ শেষ করার চাপ থাকলে অনেক সময় কিছু প্রকল্পে বাড়তি বরাদ্দ দেওয়া হয়।' বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ প্রকল্পে কম বরাদ্দ প্রসঙ্গে ইয়াসিন বলেন, চলমান নকশার কাজ শেষ হলে এবং ফিল্ডওয়ার্ক শুরু হলেই বরাদ্দ বাড়বে। ঢাকা-টঙ্গী-জয়দেবপুর রেল প্রকল্পের কাজ সম্পর্কে অতিরিক্ত সচিব বলেন, নানা কারণে প্রকল্পটির কাজে জটিলতা ছিল। 'সম্প্রতি এর দ্বিতীয় সংশোধন অনুমোদন পেয়েছে। কাজের গতি বাড়লে বরাদ্দও বাড়বে।' এছাড়া জয়দেবপুর থেকে ঈশ্বরদী রেললাইন প্রকল্পে স্বল্প বরাদ্দের বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, এ কাজ চীনের অর্থায়নে করার কথা থাকলেও দেশটি অর্থায়ন বাতিল করেছে। প্রকল্পটিতে এখন জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) অর্থায়ন করবে বলে জানান তারা। এরই অংশ হিসেবে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হালনাগাদ করার কাজ শুরু হচ্ছে। নতুন প্রকল্পের বোঝা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পর্যালোচনায় দেখা গেছে, রেলওয়ের চলমান ২৮টি উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় ধরা আছে ১.৪৬ লাখ কোটি টাকা। এসব প্রকল্পে ইতিধ্যে ৫৩ হাজার ১০৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ করতে আরও ৯২ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা লাগবে। প্রকল্পগুলোতে চলতি অর্থবছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। এই হারে বরাদ্দ চলতে থাকলে নির্ধারিত ব্যয়ে প্রকল্পগুলো শেষ করতে আরও ৬.৪৫ বছর লাগবে। তবে নতুন এডিপিতে ১.৩৯ লাখ কোটি টাকা ব্যয় প্রাক্বলন করে আরও ৩২টি প্রকল্প জুড়ে দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য বলছে, রেলওয়ের জন্য সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল ১৪ হাজার ৮৮৬ কোটি টাকা। কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি বছর রেলের উন্নয়নে বরাদ্দ ৭-১০ শতাংশ বাড়লেও নতুন প্রকল্প অনুমোদনের হার বাড়ছে আরও বেশি হারে। *সক্ষমতার বাইরে প্রকল্প নিচ্ছে রেলওয়ে* অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, মধ্যমেয়াদি বাজেটারি ফ্রেমওয়ার্কে (এমটিবিএফ) প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের আগামী কয়েক বছরের বরাদ্দ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া থাকে। কিন্তু রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা নতুন প্রকল্প প্রক্রিয়া করার আগে এই বরাদ্দের সিলিংয়ের বিষয়টি বিবেচনায় রাখেন না বলে মন্তব্য করেন তিনি। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, 'বাড়তি প্রকল্প হাতে নিলে কোনোটিতেই প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া যায় না। তাছাড়া লোকবলের ঘাটতির কারণে অতিরিক্ত দায়িত্ব প্রকল্প পরিচালক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করতে হয়। এর ফলে কোনোটির কাজই সময়মতো শেষ হয় না।' ব্যবস্থাপনা-দক্ষতা বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কারে হাত না দেওয়ায় রেলের রাজস্ব বাড়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন আহসান এইচ মনসুর।। এ অবস্থায় নতুন রেললাইন নির্মাণ না করে বিদ্যমান লাইনগুলোর সংস্কার ও পরিচালনা-দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন এ অর্থনীতিবিদ। জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের একজন কর্মকর্তা বলেন, এডিপিতে নতুন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত না করে চলমান প্রকল্পের কাজ শেষ করতে বেশ কয়েক বছর ধরে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও একাধিকবার নির্দেশনা এসেছে। কিন্তু রেলপথ মন্ত্রণালয় এসব নির্দেশনা আমলে নিচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন ওই কর্মকর্তা। রেলের মাস্টারপ্ল্যানে থাকা প্রকল্পগুলোর অগ্রাধিকার চিহ্নিত না থাকায় অনুমোদিত প্রকল্পের সংখ্যা বেড়েই চলেছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হাদিউজ্জামান। সাধারণত ভূমি অধিগ্রহণ ও দরপত্রে বিলম্বের কারণে রেলের কোনো কাজ সময়ে শেষ হয় না বলে দাবি করা হয়ে থাকে। তবে এর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালণা করা দরকার বলেও মন্তব্য করেন তিনি। হাদিউজ্জামান বলেন, রেলের অধিকাংশ প্রকল্পের কাজ গুটিকয়েক ঠিকাদারের হাতে কুক্ষিগত অবস্থায় আছে। এসব প্রতিষ্ঠানেরও লোকবল ও সরঞ্জামাদির ঘাটতি রয়েছে। বিকল্প ঠিকাদার গড়ে তুলতে প্রয়োজনে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন তিনি। জবাদিহি না থাকায় অন্যান্য দেশে ভালো কাজ করছে এমন অনেক ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানও এদেশে ভালোভাবে কাজ করছে না বলে মনে করেন হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, কাজে বিলম্ব করতে পারলে এসব ঠিকাদারকে বাংলাদেশে শাস্তির আওতায় না এনে উল্টো ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে উৎসাহিত করা হয়। এ অবস্থা চলতে থাকলে সময়মতো কোনো কাজ শেষ হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি। *৩ প্রকল্পই পাচ্ছে ৭৪ শতাংশ বরাদ্দ* চলতি অর্থবছরে রেলওয়ের প্রকল্পগুলোর মধ্যে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প সবচেয়ে বেশি ৫,৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩,৭৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু, আর তৃতীয় সর্বোচ্চ ১,৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার রেলপথ প্রকল্প। অর্থাৎ এই তিনটি শীর্ষ-অগ্রাধিকার প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১০ হাজার ৬৭৮ কোটি টাকা বা মন্ত্রণালয়ের মোট এডিপির ৭৪ শতাংশ। ব্যয়ের দিক থেকে, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে রেলওয়ের এই প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে মোট ৭,২৭১.৫১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে সর্বোচ্চ ৩,৬১৩.৮১ কোটি টাকা। এরপর শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু প্রকল্পে ১,৮৩৮.৭১ কোটি টাকা ও দোহাজারী কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পে ৯০৫.৭১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অফিশিয়াল তথ্য বলছে, এ হিসাবে তিনটি প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের মোট এডিপি ব্যয়ের ৮৭ শতাংশ। অন্যদিকে রেলওয়ের অপর ৩১টি প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে মাত্র ৯১৩.২৮ কোটি টাকা। এ বিষয়ে অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর বলেন, উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলোতে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ায় নতুন রোলিংস্টক কেনা ও রেলপথ ব্যবস্থাপনায় অবহেলা করা হয়েছে। 'এর ফলে রেলের সেবার মানের উন্নতি না হয়ে উল্টো অবনমন হয়েছে।'
Published on: 2023-07-30 19:23:17.610015 +0200 CEST