The Business Standard বাংলা
১৩৩ বছর ধরে ইন্দ্রমোহন সুইটস, এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী!

১৩৩ বছর ধরে ইন্দ্রমোহন সুইটস, এখনও অপ্রতিদ্বন্দ্বী!

১৮৯০ সাল। ভৈরব নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা খুলনা শহরের বড় বাজারে হাজির হলেন কিশোরবয়সী ইন্দ্রমোহন দে। এসেছেন সুদূর মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার ধূলসরা গ্রাম থেকে। সাহেবের বাজার তখন ব্যবসায়ী-বণিকদের ভিড়ে গমগম করছে, এর ঘাট-বন্দরে নিয়মিত ভিড়ছে পণ্যবাহী নৌকা-জাহাজ। এর প্রায় শতবছর আগে খুলনা শহরে হাজির হয়েছিলেন নীলকর চার্লস, খুলনা অঞ্চলে নীল বাণিজ্য বিস্তারের জন্য। খুলনা শহরে নিজের নীলকুঠি আর বাড়ি তো বানিয়েছিলেনই, সাথে বাণিজ্যের জন্য বানিয়ে ফেলেন একটি বাজারও। নিজের নামে নামকরণ করা চার্লির বাজার পরবর্তীতে নাম পাল্টে হয়েছে চার্লি সাহেবের বাজার, সাহেবের বাজার আর শেষমেশ বড় বাজারে। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে যশোর জেলার অধীনে মহকুমা হিসেবে থাকার পর ১৮৮২ সালে আলাদা জেলা হিসেবে ইংরেজদের প্রত্যক্ষ শাসনে চলে আসে খুলনা। বাড়তে থাকে এর বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু বড় বাজারের গুরুত্ব। আর সেখানেই হেলাতলা রোডের ১০ নম্বর বাড়িতে মিষ্টির পসরা সাজিয়ে বসলেন ইন্দ্রমোহন দে। সেখান থেকেই শুরু। এরপর সময়ের সাথে সাথে বড় বাজার আরও বড় হয়েছে। ইংরেজরা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তানি আমলও শেষ হয়েছে। বাংলাদেশ জন্ম নেওয়ার পর পেরিয়ে গিয়েছে আরও ৫২ বছর। তবে ইন্দ্রমোহন দে-এর হাত ধরে খুলনা শহরাঞ্চলে 'ইন্দ্রমোহন সুইটস'-এর মোলায়েম সুস্বাদু মিষ্টির যে রাজত্ব শুরু হয়েছিল, তা ১৩৩ বছর পরেও চলমান। *ইন্দ্রমোহন সুইটসের পথচলা* ইন্দ্রমোহন সুইটসের শুরুটা হয়েছিল হেলাতলা রোডের এক গোলপাতার ঘরে। ঐ সময়েই বরিশালের গৈলা থেকে হাজির হয়েছিলেন সুরেন দাশ। ইন্দ্রমোহন তাকে নিয়োগ দেন মিষ্টির কারিগর হিসেবে। কালক্রমে সেই গোলপাতার ঘর পরিবর্তন হয়ে বাঁশ-টিনের ঘর এবং শেষমেশ দোতলা দালানে পরিণত হয়। ১৯৭২ সালে ৯৩ বছর বয়সী ইন্দ্রমোহন মারা যান, ব্যবসার হাল ধরেন তার ছেলে বেণীমাধব দে। বর্তমানে দোকানটি মূলত দেখাশোনা করছেন বেণীমাধব দে-এর ৫৭ বছর বয়সী বড় ছেলে সঞ্জয় দে। ২০১৯ সাল পর্যন্তও হলুদরঙা দেয়ালের ওপর নীলরঙা টিনের সাইনবোর্ডে সাদা অক্ষরে লেখা জ্বলজ্বলে 'ইন্দ্রমোহন সুইটস'-এ ভিড় জমাতো মিষ্টিপ্রিয় খাদকরা। দূর-দূরান্ত থেকে খুলনার এই ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির স্বাদ নিতে বড়বাজারে ঢুঁ মারতো সাধারণ ব্যক্তি থেকে বিখ্যাত ব্যক্তিরাও। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেও বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার ইন্দ্রমোহন সুইটসে এসে হাতে নিয়ে কামড় বসিয়েছেন ইন্দ্রমোহনের রসালো সুস্বাদু মিষ্টিতে। বিভিন্ন লেখায় ইন্দ্রমোহন সুইটসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এসেছিলেন এমন দাবি শোনা গেলেও এ বিষয়ে জানতে চাইলে সঞ্জয় দে জানান, "নেতাজি সুভাষচন্দ্র আসেননি। উনি খুলনায় এসে মূলত খুলনা জেলার প্রথম পাবলিক লাইব্রেরি উমেশ চন্দ্র লাইব্রেরিতে গিয়েছিলেন। তবে সেই ইংরেজ আমল থেকে বাংলাদেশ আমলের বহুদিন পর্যন্ত পুরো শহরে মিষ্টির দোকান ছিল এই একটিই। ফলে মিষ্টির স্বাদ পেতে হলে তাদেরকে বড়বাজারের হেলাতলাতেই আসতে হতো। খুলনা শহরের নানা বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গও কোনো না কোনো সময় ইন্দ্রমোহনের চেখে দেখেছেন।" ২০১৯ সালের জুন মাসের ৩০ তারিখ বন্ধ হয়ে যায় হেলাতলা রোডের ১০ নম্বর বাড়িতে থাকা 'ইন্দ্রমোহন সুইটস'। বহুবার হাত বদল হওয়া বাড়িটির মালিক সেলিনা হক বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে দোকানটি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে প্রায় ১৩০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঐ জায়গা থেকে যেতে চাননি তারা। দীর্ঘ ১৮ বছরের মামলা লড়ে অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশে দোকানটি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন তারা। এদিকে স্থানীয় ব্যক্তিরা খুলনার এই ঐতিহ্যকে হারিয়ে যেতে দেননি। এক-দেড় মাসের মধ্যেই দোকানটির মূল অবস্থান থেকে সামান্য দূরে হেলাতলা জামে মসজিদের পাশেই ১৭ নম্বর হেলাতলা রোডের নিচতলায় জায়গা পেয়েছেন তারা। জায়গা বদলালেও কারিগর বা মিষ্টি তৈরির প্রক্রিয়ার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি, পরিবর্তন হয়নি মিষ্টির স্বাদেও। তবে সামান্য হলেও বিক্রিতে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ইন্দ্রমোহন সুইটসে মিষ্টি বানিয়ে চলছেন কমলচন্দ্র সরকার। তিনি জানান, "পুরনো জায়গাটিতে আগে প্রচুর লোক আসতো। এখনও আসে, বিশেষ করে নিয়মিত ক্রেতা আর এলাকার স্থানীয়রা নতুন জায়গা খুঁজে বের করতে সময় নেয়নি। তবে জায়গার পরিবর্তনে প্রায় ৪০ শতাংশ বিক্রি কমে গেছে। পুরনো ভবনটিতে নতুন জায়গার ঠিকানার সাইনবোর্ড টাঙানো হলেও এখন সেই ভবনটিই আর নেই। ফলে নতুন ক্রেতা বা বহুবছর আগে যারা এসেছে, তারা দোকানটি খুঁজে না পেয়েই চলে যায়।" *যেভাবে তৈরি হয় মিষ্টি* ১৩৩ বছর আগে ইন্দ্রমোহন দে যে পাঁচ ধরনের মিষ্টি বিক্রির মাধ্যমে তার ব্যবসা শুরু করেছিলেন, সেই পাঁচ ধরনের মিষ্টি দিয়েই এখনো ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন তার বংশধরেরা। রসগোল্লা, পানতোয়া বা লেডিকেনি, সন্দেশ, চমচম আর দানাদার; কোনো মিষ্টিই হারিয়ে যায়নি। তৈরি হচ্ছে ঠিক একইভাবে, যেভাবে বানানো হতো শতবর্ষ আগে। ইন্দ্রমোহনের রসগোল্লা আর পানতোয়া এতটাই মোলায়েম যে মুখে দেওয়ার সাথে সাথেই গলে যায়। এই মোলায়েমের কারণ লুকিয়ে আছে মিষ্টি তৈরির উপকরণ আর পদ্ধতির মধ্যে। কমলচন্দ্র জানান, "মিষ্টি বানানোর সময় আটা বা সুজি ব্যবহার করা হয় না। দুধ থেকে বানানো ছানা আর মিষ্টি জমাট বাঁধার জন্য ন্যুনতম পরিমাণ ময়দা, এই হলো মিষ্টি তৈরির উপকরণ। এ কারণেই মিষ্টিগুলো এত নরম আর মোলায়েম, মুখে দেওয়ার সাথে সাথে মাখনের মতো গলে যায়।" তাদের মিষ্টি তৈরির জন্য প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৬০ কেজি দুধ সংগ্রহ করে ইন্দ্রমোহন সুইটস। আগে তেরখাদা থেকে দুধ সংগ্রহ করা হতো। এছাড়াও ফুলতলা আর ডুমুরিয়ার বাজারে গিয়েও দুধ সংগ্রহ করতেন দোকানের কর্মচারীরা। তবে এখন খুলনা শহরের স্থানীয় খামারগুলোই নিজ উদ্যোগে চাহিদামতো দুধ পাঠিয়ে দেয়। প্রতিদিন বিকাল-সন্ধ্যার সময় পাওয়া যায় গরম গরম পানতোয়া-রসগোল্লা। ইন্দ্রমোহন সুইটসের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর পরিবেশনের প্রক্রিয়া। শুরুতে কেবল কলাপাতার ওপরেই মিষ্টি পরিবেশন করা হতো। নেই কোনো চামচ বা অন্য কিছু, খেতে হবে হাত দিয়েই। কমলচন্দ্র জানান, "বাঙালির অভ্যাস হাত দিয়ে খাওয়া। সেই ঐতিহ্যের কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। ১৩০ বছর আগে যেভাবে পরিবেশন করা হতো, এখনো সেভাবেই করা হয়। কেবল যোগ করা হয়েছে পিরিচ।" মূলত পানতোয়া আর রসগোল্লার ঝোল যেন না পড়ে যায়, সেজন্যই এখন একটি স্টিলের পিরিচের ওপর কলাপাতা রেখে পরিবেশন করা হয়। তবে বাকি মিষ্টিগুলোর ক্ষেত্রে চলে সেই কলাপাতাই। ইন্দ্রমোহন দে আর সুরেন দাশের হাত ধরে পরবর্তী প্রজন্মও একইভাবে মিষ্টি তৈরি শিখেছে। দুধ থেকে ছানা তৈরি, চিনির সিরায় ছানার মণ্ড ডোবানো থেকে শুরু করে পানতোয়া ভাজা পর্যন্ত মিষ্টি তৈরির সবকিছু হাতে-কলমে শিখিয়ে যাওয়া হয়েছে। কমলচন্দ্র সরকারের ছেলে আশীষ সরকারও আত্মস্থ করে নিয়েছেন ইন্দ্রমোহনের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টিগুলো তৈরির রেসিপি। ফলে সেই পুরনো স্বাদ-গন্ধ ১৩০ বছর পরেও রয়েছে অক্ষুণ্ণ। ইন্দ্রমোহন সুইটসের আরেকটি বিশেষত্ব হলো এই মিষ্টিগুলো তৈরি হয় দোকানের মধ্যেই। ক্রেতাদের চোখের সামনেই তৈরি হয় মিষ্টিগুলো, নেই কোনো লুকোছাপা। কমলচন্দ্র জানান, "আমাদের কখনোই বেশি মিষ্টি তৈরির লক্ষ্য থাকে না। ইন্দ্রমোহনবাবুর সময় থেকে যে পরিমাণ মিষ্টি বানানো হতো, এখনো ঠিক সেই পরিমাণই মিষ্টি বানানো হয়। আর প্রতিদিনের মিষ্টিই প্রতিদিনই বিক্রি হয়ে যায়।" এ কারণেই মিষ্টি থাকে একেবারেই তাজা আর গরম। দোকানটিতে সন্দেশ ছাড়া বাকি সবগুলো মিষ্টিই বিক্রি হয় কেজি হিসেবে নয়, বরং পিস হিসেবে। বড় আকারের পানতোয়া এবং রসগোল্লা বিক্রি হয় ২০ টাকায়, আর বাকি সব ছোট আকারের মিষ্টির দাম পড়ে পিসপ্রতি ১০ টাকা। ব্যবসার ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সঞ্জয় দে জানান, "আলাদাভাবে তেমন কোনো পরিকল্পনা নেই। যেভাবে চলে আসছে সেভাবেই চলতে থাকবে। ভবিষ্যৎ বংশধররা ব্যবসার হাল ধরবে কিনা তা সময়েই বলে দেবে।" সাতক্ষীরার সন্দেশ, বগুড়ার দই, কিংবা কুমিল্লার রসমালাইয়ের মতো অঞ্চলের নাম গেঁথে যায়নি ইন্দ্রমোহনের মিষ্টির সাথে। যার ফলে দোকানটির মৌলিকত্ব টিকে রয়েছে জোরালোভাবে, গজিয়ে ওঠেনি অসংখ্য শাখা-প্রশাখা। তাই এখনো খুলনা শহরের ঐতিহ্যের কথা বলতে হলে সবার আগে সগৌরবে উঠে আসে প্রতিষ্ঠাতার নাম, 'ইন্দ্রমোহন!'
Published on: 2023-07-07 10:52:03.999373 +0200 CEST