The Business Standard বাংলা
হাওরে ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার

হাওরে ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার

কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরের মধ্যে তৈরি করা সড়ক ধরে আমরা অষ্টগ্রাম থেকে মিঠামইন যাচ্ছিলাম। তখন কেবল সূর্যোদয়ের সময়, অথচ হাওরবাসী ইতিমধ্যেই কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। হাওর এক অদ্ভুত জায়গা। যেখানে বছরের দুই পৃথম সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। শুষ্ক মৌসুমে, নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত আপনি শুধুমাত্র দিগন্ত বিস্তৃত খোলা মাঠ দেখতে পাবেন। আর বছরের বাকি সময়ে পুরো জায়গাটি মিঠা পানির সাগরে পরিণত হয়। ক্রমবর্ধমান পানি ফসলের জমিকে প্লাবিত করে এবং খাল, নদী ও বিলের মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। আমি সবসময় ভাবতাম, হাওর অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষ কীভাবে এই নাটকীয় পরিবর্তনগুলিকে সামলায়? অষ্টগ্রাম থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে, বাতশালা হাওরের মাঝখানে একটি বিষয় আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। রাস্তার পশ্চিম পাশে একটা ছোট্ট 'দ্বীপ' এর মতো দেখতে জায়গা। দুটি টিনশেড ঘর এবং একটি খড়ের গাদা ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল এখানে একটি পরিবার বাস করে। তবে আমার নজর কেড়েছিল অন্য একটি বিষয়। শুকনো থাকলে জায়গাটি হয়তো সামনের উঠান হিসেবে বিবেচিত হতো, তবে এখন আছে পানির নিচে। সেখানে দেখতে পেলাম একটি ঘের। স্পষ্টভাবে চোখে ধরা পড়ার কারণ সেটি ছিল উজ্জ্বল-নীল মাছ ধরার জাল দিয়ে বেড়া দেওয়া। আর বেড়ার ভেতরে সাঁতার কাটছিল শত শত হাঁস। হাঁস পানি পছন্দ করে, বেশিরভাগই এটি ছাড়া বাঁচেও না। তাই, পরিবারটি আসলে হাওরে একটি 'পুকুর' তৈরি করে, যেখানে হাঁসগুলি সাঁতার কাটতে পারে, খাবারের সন্ধান করতে পারে এবং যখনই মন চায় জমিতে বিশ্রাম নিতে পারে। আমি আগে অনেক হাঁসের খামার দেখেছি, কিন্তু এরকম কিছু দেখিনি। কিছুক্ষণ পর আমরা একটি নৌকায় চড়ে সেই খামারাবাড়ির পথ ধরলাম। খামারের মালিক আবু কাশেম। তবে সেদিন তিনি সেখানে ছিলেন না। তার তিন সন্তান ও বিধবা বোনকে আমরা সেখানে পাই। খানিক পরে কাশেমের ভাই আবু কালাম আমাদের সাথে আলপচারিতায় যোগ দেন। এই খামারে হাঁস ছিল ১,২০০টি। সাঁতার কেটে যাতে দূরে চলে না যায় তাই দেওয়া হয়েছে বেড়া। তবে শুষ্ক মৌসুমে এমন কিছুর প্রয়োজন হয় না। কালাম জানান, জমিতে হাঁস নিয়ন্ত্রণ করা সহজ। একবার তাদের খাওয়ানো হলে তারা বেশি নড়াচড়া করে না। বেড়াটি এক মাস আগে তৈরি করা হয়েছিল, এবং তখন হাঁসগুলি এখানে ছিল না। আর বর্ষা শেষ হলে হাঁসগুলি আর এখানে থাকবে না। তাদের বিলের কাছাকাছি কিছু মাঠে নিয়ে যাওয়া হবে, যেখানে তারা সাঁতার কাটবে এবং তাদের খাওয়ানো হবে। এভাবেই চলে হাওরের ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার। জানা গেলো, ডিমের জন্য হাঁসগুলো বড় করা হচ্ছে। কালাম বলেন, এই হাঁসগুলো ছোট। এদের বয়স পাঁচ মাস। এরা দুই মাসের মধ্যে ডিম পাড়বে। পিছনের উঠোনে হাঁসের জন্য একটি শেডও ছিল, যেখানে পানি নেই। শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা এই শেডটি নতুন জায়গায় সরিয়ে নেবেন। 'দ্বীপটি' ছিল ২০ ডিসিম জায়গাজুড়ে। আর বেড়া দেওয়া জায়গাটি ১৫ ডিসিম। বাড়িটি তৈরি হয়েছে মাত্র আট মাস আগে। পালের মধ্যে পুরুষ হাঁস ছিল প্রায় ৫০টি এবং বাকিগুলি ছিল মহিলা। কালাম বলেন, যখন সময় হবে, ১,১৫০টি হাঁসের সবকয়টি ডিমি পাড়বে। ভালো খাবার পেলে সারা বছরই ডিম দিতে পারে। তিনি বলেন, বিক্রি করাও কঠিন না। পাইকাররা কিনতে আসবে। প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য হাওরকে হাঁস পালনের উপযুক্ত স্থান করে তুলেছে। মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে দেখা হল আরেক হাঁস খামারি মাহফুজ আলীর সঙ্গে। যদিও তার কৌশল ছিল ভিন্ন। মাহফুজ শুয়ে ছিলে রাস্তার ধারেই। তার হাঁসগুলো সাঁতার কাটছিল উন্মুক্ত পানিকে। হাঁস ভেসে যাওয়া নিয়ে মাহফুজকে চিন্তিত মনে হলো না। মাহফুজের সাথে কথা বলতে বলতে আমাদের কৌতূহল মিটে গেল। মাহফুজ রাস্তার কাছে একটা ছোট জমির দিকে ইশারা করে বললেন, ওদের (হাঁস) যাবার কোন জায়গা নেই। আশেপাশে কোন উঁচু মাঠ নেই, এই ছোট্ট জমিটা ছাড়া। এই হাঁসগুলি রাস্তার পূর্ব দিকে ছিল এবং আশেপাশে কোনো দ্বীপ গ্রাম ছিল না। তাই হাঁসের দেখভালের জন্য মাহফুজের রাস্তায় বসে থাকাই ছিল যথেষ্ট। হাঁসগুলো পানিতে গোসল করছিল, আর কোন কোনটি মাটিতে বিশ্রাম নিচ্ছিল। হাঁসগুলোকে খাওয়ানোর সময় হলে মাহফুজ উঠে দাঁড়িয়ে পানির দিকে এগুতে লাগলেন। এসময় হাঁসগুলোর ডাক আরো জোরালো হলো, তার দিকে সেগুলো ছুটে আসতে শুরু করল। একটি বস্তা থেকে মাহফুজ তিনটি প্লাস্টিকের বাটিতে ধান ঢেলে দেন। এবং হাঁস সেগুলো খাওয়া শুরু করে। উভয় চাষিই জানান, বর্ষায় হাঁসদের খাওয়াতে বেশি খরচ হয়। কারণ এসময় ধান ও শামুকের উপর নির্ভর করতে হয়। বিশেষভাবে ডিজাইন করা জাল দিয়ে শামুক ধরা হয়। মাহফুজ থাকেন দুই কিলোমিটার দূরে কাস্তুল গ্রামে। হাঁসও সেখানে বাস করে। সূর্যোদয়ের সময়, মাহফুজ এবং দুই সহকর্মী হাঁসগুলো সেখানে নিয়ে যান। হাঁস সাঁতার কাটে এবং চাষীরা নৌকা দিয়ে এগিয়ে নেয়। একসঙ্গে তারা ১,৫০০ হাজার হাঁসকে নিয়ন্ত্রণ করেন। আবু কাশেমের মতো মাহফুজও হাঁস নিয়ে জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়ান। মাত্র এক মাস আগে, তিনি তার সব হাঁসকে একটি বড় নৌকায় করে ভৈরবের একটি চর এলাকায় নিয়ে যান, যেখানে হাঁসগুলি কেবল প্রাকৃতিক খাবার খায়। সেখান থেকে এক সপ্তাহ পরেই ফিরে আসতে হয়। কারণ চরে প্রাকৃতিক খাদ্য ছিল কম। মাহফুজও হাঁসগুলো পালছেন ডিমের জন্য। তবে হাঁসের বয়স হয়ে গেলে মাংসের জন্য বিক্রি করা হয়। মাহফুজ বলেন, 'হাঁস ছয় মাস থেকে দুই বছরের মধ্যে বেশি ডিম পাড়ে।' বছরে পাঁচ মাস হাঁস প্রকৃতিতে বেঁচে থাকতে পারে। 'এই সময়ে বিভিন্ন ধরণের জলজ উদ্ভিদ এবং ঘাস, অমেরুদণ্ডী প্রাণী, মাছ - সবই প্রাকৃতিকভাবে হাওরে পাওয়া যায়,' বলেছেন অষ্টগ্রামের আরেক হাঁস খামারি নমোজ খা৷ নমোজের খামারে আড়াই হাজার হাঁস রয়েছে। তার ভাইয়ের আরও ১,৪০০টি হাঁস আছে। হাঁসের পাল এবং ফসলের মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক আছে। হাঁস সেখানে খাদ্য খোঁজার সময় ফসলের ক্ষেতে সার দেয়। শুধু ফসল কাটার সময়, হাঁসগুলিকে জালের ঘেরে রাখা হয় যাতে তারা ধান খেতে না পারে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্য ও খামারিদের মতে, অষ্টগ্রামে ৩০ থেকে ৩৫টি হাঁসের খামার রয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে খামারের সংখ্যা দ্বিগুণ হয়। বর্ষাকালে জমির স্বল্পতার কারণে অনেক হাঁস চাষি তাদের হাঁস বিক্রি করে দেয়। ভাতশালা গ্রামে, আমরা পানির উপরে বাঁশের মাচায় একটি হাঁসের খামার দেখেছি। ছোট ঘেরে সেখানে একসঙ্গে পাঁচশো হাঁস জড়ো করা হয়েছে। পুরো হাওর অঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য হাঁসের খামার, হ্যাচারি। স্থানীয় হাঁসের বাজারও খুবই ভালো। ডিম পাড়ে না এমন হাঁসের বাচ্চা হ্যাচারিগুলো ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করে। ডিম প্রতি পিস ১৪ টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি হয়। যে ডিমগুলো ফুটবে সেগুলো হ্যাচারিতে বেশি দামে বিক্রি করা যায়, প্রতি পিস ১৬ থেকে ২০ টাকা। হাঁসের বয়স হলে সেগুলো পাইকারদের কাছে বিক্রি হয় প্রায় ৭০০ টাকায়। অবশ্য একটি মোটা হাঁস ৯০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। পাইকাররা সাধারণত একসঙ্গে শত শত হাঁস কেনেন।
Published on: 2023-08-12 08:20:36.867104 +0200 CEST