The Business Standard বাংলা
কোনো সন্তানকে বেশি আদর করার যে ক্ষতিকর প্রভাব থেকে যায় আজীবন

কোনো সন্তানকে বেশি আদর করার যে ক্ষতিকর প্রভাব থেকে যায় আজীবন

একাধিক সন্তান থাকলে যেকোনো এক সন্তানের প্রতি বাবা-মায়েদের টান একটু বেশি থাকাটা বিরল ঘটনা নয়। অনেকসময়ই দেখা যায় বাবা-মায়েরা কোনো সন্তানকে বাকিদের চেয়ে একটু বেশিই স্নেহ করেন, প্রশ্রয় দেন। গবেষণা বলছে, প্রায় ৬৫ শতাংশ পরিবারে এমনটা ঘটতে দেখা যায়। তবে কোনো সন্তানকে একটু বেশি স্নেহ করার নেতিবাচক প্রভাব জীবনজুড়ে বয়ে বেড়াতে হতে পারে অন্য সন্তানদের। এটি মানুষের আবেগীয় সমস্যায় এত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর যে মনোবিদরা এর একটি নামও দিয়েছেন: 'প্যারেন্টাল ডিফারেনশিয়াল ট্রিটমেন্ট' বা পিডিটি। যুক্তরাষ্ট্রের নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির অ্যাপ্লাইড সাইকোলজির অধ্যাপক লরি ক্রেমার বিবিসিকে বলেন, অনেক সময় বাবা-মায়ের এক সন্তানদের অন্যদের বেশি সময়, মনোযোগ কিংবা স্নেহ দেন। তাকে একটু কম শাসন করেন। এর ফলে বাকি সন্তানরা নিজেদের একটু কম প্রিয় মনে করতে পারে। অবশ্য পরিবারের সব ভাইবোনই ব্যাপারটায় আঘাত না-ও পেতে পারে। তবে যে সন্তান মনে করে তাকে কম মনোযোগ ও ভালোবাসা দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর গভীর প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণা বলছে, একেবারে ছোট থেকেই শিশুরা বাবা-মায়ের আচরণে বৈষম্য ধরতে পারে। যেমন বাবা-মা কোন ভাই বা বোনের সঙ্গে একটু বেশি স্নেহপূর্ণ আচরণ করছে, তা বুঝতে পারে যেকোনো শিশু। বাবা-মায়েদের এরকম আচরণ সন্তানদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে। পাশাপাশি তাদের উদ্বেগ, বিষাদ ও আচরণগত সমস্যা বাড়াতে পারে। এ ধরনের আচরণ শিশুদের আবেগীয় সুস্থতার ওপরও প্রভাব ফেলে, যা অন্যান্য আরও পরোক্ষ সমস্যা তৈরি করে। চীনা গবেষকরা দেখিয়েছেন, বাবা-মায়ের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ কিশোর-কিশোরীদের ফোনে আসক্ত হওয়ার অন্যতম প্রভাবক। আটজন গৃহহীন টিনেজারের ওপর চালানো ছোট পরিসরের একটি কানাডীয় গবেষণায় সাতজন টিনেজারই বলেছে, তাদের মনে হয়েছে যে বাবা-মা তাদের চেয়ে অন্য কোনো ভাই বা বোনকে বেশি প্রশ্রয় দিয়েছেন, স্নেহ করেছেন—আর তাদেরকে 'প্রবলেম চাইল্ড' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাবা-মায়েদের এই দৃষ্টিভঙ্গি পারিবারিক বন্ধনের ওপর প্রভাব ফেলেছে বলে জানায় ওই সাত টিনেজার। কানাডার গবেষণাটি অনেক ছোট পরিসরে হলেও, শিশুর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা কতটা খারাপ হতে পারে, তার একটি উদাহরণ এটি। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এ ধরনের আচরণের প্রভাব পরিণত বয়সেও দেখা যায়। যেমন, মায়েরা কোনো সন্তানের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ দেখালে অন্য সন্তান বড় হলে তার বিষণ্ণতায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এমনকি সন্তানরা প্রাপ্তবয়স্ক হলেও বাবা-মা যেকোনো একজনকে বেশি স্নেহ করতে পারেন। এই আচরণ ভাইবোনদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা ও বিবাদ সৃষ্টি করতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কাজটি যেহেতু ক্ষতিকর, তাহলে বাবা-মায়েরা কি যেকোনো সন্তানের প্রতি বেশি টান বা ভালোবাসা দেখানো বন্ধ করতে পারেন না? ক্রেমারের মতে, বাবা-মায়েরা হয়তো কাজটি ইচ্ছাকৃতভাবে করেন না। এবং কাজটি যে করছেন, তা বুঝতে পারেন না। তিনি বলেন, 'কোনো শিশুকে সামলানো তুলনামূলক সহজ হওয়ার কারণে হয়তো বাবা-মায়েরা তাকে একটু স্নেহ করেন। ওই শিশুর সঙ্গে তারা হয়তো টান বেশি অনুভব করেন।' কিশোর-কিশোরী ও তাদের বাবা-মায়ের ওপর চালানো ক্রেমারের গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারগুলো এটা নিয়ে কথা বলতে চায় না। সে কারণে কোনো সন্তানকে আঘাত দিলে বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হলে, তার সমাধান করা আরও কঠিন হয়ে যায়। ক্রেমার বলেন, এরকম পরিস্থিতিগুলো সংবেদনশীল উপায়ে সামলানো হলে দারুণ ফল পাওয়া যেতে পারে। এরকম পরিস্থিতি নিয়ে সন্তানদের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করা যায়—এ সময় বাচ্চার ওপর দোষ চাপানো যাবে না। বাবা-মা যদি বাচ্চার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনার পর তাকে বুঝিয়ে বলেন কেন অন্য সন্তানের সঙ্গে একটু আলাদা আচরণ করা হচ্ছে, তাহলে অসাধারণ ফল পাওয়া যাবে। ইউনিভার্সিটি অভ মিসৌরির হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সায়েন্স-এর সহযোগী অধ্যাপক মেগান গিলিগান আরও কয়েকজন গবেষকের সঙ্গে মিলে একটি প্রকল্পে কাজ করেছেন। ওই প্রকল্পে এক প্রজন্মের সঙ্গে অপর প্রজন্মের সম্পর্কের ধরন বোঝার জন্য দুই দশক বিভিন্ন পরিবারকে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। ওই গবেষণার অংশ হিসেবে গবেষকরা বাবা-মায়েদেরকে সন্তানদের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন। বাবা-মায়েদের যে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সেটি হলো: 'কোন সন্তানের সঙ্গে আপনি সবচে আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা অনুভব করেন?' প্রথমে একটু দ্বিধা করলেও, অধিকাংশ মা-ই (৭৫ শতাংশ) পরে একটি সন্তানের নাম নির্দিষ্ট করে বলেছিলেন। বাকিরা কারও নামই আলাদা করে বলেননি—অথবা বলেছেন, সব সন্তানকেই তারা সমান ভালোবাসেন বা আবেগীয়ভাবে সমান ঘনিষ্ঠ মনে করেন। ওই বাবা-মায়েদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, কোন সন্তানকে নিয়ে হতাশ এবং কার সাথে সম্পর্ক খারাপ? অধিকাংশই উত্তর দিয়েছেন, একেবারে ছোটবেলায় যে সন্তান তাদের 'হতাশ' করেছে, পরবর্তীতে সারা জীবন সেই সন্তানের ব্যাপারেই এই মনোভাব পোষণ করেছেন তারা। অনেকেই মনে করেন, সাধারণত প্রথম সন্তানকে বাবা-মায়েরা একটু বেশি ভালোবাসেন। তবে এ ধারণার পেছনে বিজ্ঞানসম্মত কোনো গবেষণার সমর্থন নেই। তবে মাঝের বা প্রথম সন্তানদের চেয়ে সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়েরা আবেগীয় ঘনিষ্ঠতা বেশি অনুভব করেন বলে জানান গিলিগান। গিলিগান আরও বলেন, সন্তানদের সঙ্গে আলাদা আচরণ করার অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব হলো ভাইবোনেদের মধ্যে সম্পর্ক তেমন মজবুত হয় না। মনোযোগ ও ভালোবাসা কম পাওয়া সন্তানদের সঙ্গে বাবা-মায়ের ইতিবাচক সম্পর্ক একটু কম হয়। তবে 'আদরের সন্তান' হওয়ার যন্ত্রণাও আছে বলে জানান গিলিগান। তিনি বলেন, বেশি আদর পাওয়া সন্তানের সঙ্গে বাকি সন্তানদের একটা চাপা বিবাদের সম্পর্ক থাকে। এই চাপা উত্তেজনা পরিণত বয়সে তার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনেকসময় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গিলিগান দেখেছেন, সন্তানের ওপর বাবা-মায়ের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের প্রভাব তাদের পরিণত বয়সে, এমনকি বৃদ্ধ হওয়ার পরও থেকে যায়। এই গবেষক দেখেছেন, শৈশবে প্রিয় সন্তানকে বাবা-মা অন্যদের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় দেন—আবার পরিণত বয়সে তাকে হয়তো আর্থিক সহায়তাও একটু বেশি দেন। তবে সব সন্তানের সঙ্গে একই রকমের আচরণ করা সম্ভব নয় বলেও জানান ক্রেমার। তিনি বলেন, 'সব পরিস্থিতিতে বাচ্চাদের সঙ্গে একই রকম আচরণ করা সম্ভব নয়, আর বাচ্চারাও তা চায় না। তারা চায়, বাবা-মা যেন তাদের বয়স, আগ্রহ, লিঙ্গ, ব্যক্তিত্ব বোঝেন।' আত্মসচেতন হলেই বাবা-মায়েরা প্রতিনিয়ত পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ও অন্যায্য পরিস্থিতি এড়াতে পারবেন বলে মন্তব্য করেন ক্রেমার। * *[সংক্ষেপিত অনুবাদ]*
Published on: 2023-08-14 15:50:28.74305 +0200 CEST