The Business Standard বাংলা
হিপ-হপের ৫০ বছর: ব্রঙ্কস থেকে যেভাবে হলো বিশ্বজয়

হিপ-হপের ৫০ বছর: ব্রঙ্কস থেকে যেভাবে হলো বিশ্বজয়

১৯৭৩ সালের ১১ আগস্ট, নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কসের একটি অ্যাপার্টমেন্টের পার্টিতে জন্ম হয় হিপ-হপের। দুটি টার্নটেবল ব্যবহার করে ডিজে কুল হার্ক 'ফাঙ্ক' ও 'সোল' সংগীতের দুটি রেকর্ডিং একসঙ্গে মিশিয়ে বাজাতে থাকেন। কোথাও কোথাও বিটকে আলাদা করেন, কোথাও থামিয়ে দেন। সে সাথে মাইক্রোফোনে এখনকার ডিজেদের মতোই গানের তালে তালে দিতে থাকেন নানা ঘোষণা। এরপর বাকিটা ইতিহাস। তবে সংগীত দল 'লাস্ট পয়েটস' এবং 'ডিজে হলিউড- এর হাত ধরে আগেই হিপ-হপের গোড়াপত্তন হয়েছিল। তবে ১৯৭৩ সালের ১১ আগস্টই এর প্রতীকী জন্ম তারিখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। মূলত ব্লক পার্টির জনপ্রিয়তার কারণেই এসময় ডিজেদের কদর ছিল। তারা নতুনত্ব আনতে চাইতেন। সে প্রচেষ্টা থেকেই হিপ-হপের উত্থান। এরপর থেকেই ডিজেরা নিজেদের বৈচিত্র্য নিয়ে হাজির হতে থাকেন। এসময় বিটের তালে র‌্যাপ করে সেগুলোর রেকর্ডিং বাজারে আনেন এমসিরা (র‌্যাপারদেরই আরেক নাম এমসি)। প্রথম হিপ-হপ রেকর্ডিং প্রকাশ পায় ১৯৭৯ সালে। সুগারহিল গ্যাং-এর র‌্যাপার 'ডিলাইট' সে গান তৈরি করেন। তবে প্রথম দিকে কিছুটা সমালোচনাও হয়। বলা হচ্ছিল কেবল জনপ্রিয়তা অর্জনের কৌশল হিসেবেই এমন সংগীত নিয়ে আসা হয়েছে। তবে ব্লক পার্টিগুলোতে এগুলো জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। গানের মিশ্রন, র‌্যাপিং, ব্রেকড্যান্সিং এবং গ্রাফিতি; এই চারটি বিষয় তখন হয়ে ওঠে বিদ্রোহ বা নীরব আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার। ব্রঙ্কসের আরেক ডিজে, আফ্রিকা বামবাটা গঠন করেন হিপ-হপ সচেতন গোষ্ঠি 'ইউনিভার্সাল জুলু নেশন'। যার কাজ ছিল গান বাজানোর পাশাপাশি বিভিন্ন হিপ-হপ গ্যাংয়ের মধ্যে ব্রেকড্যান্স প্রতিযোগিতার আয়োজন করা। টিভিতেও দ্রুত জায়গা পায় হিপ-হপ। নিউ ইয়র্কের শীর্ষ গ্রাফিতি শিল্পী 'জিন মিচেল বাসকুয়াট' এবং সংগীত শিল্পী 'ফেব ৫ ফ্রেডি'-এর র‌্যাপ গান প্রথমবার প্রচারিত হয় এমটিভি-তে। হিপ-হপ ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে গানগুলো জনপ্রিয় সংগীতের তালিকায় উঠে আসতে থাকে। বিভিন্ন সংগীত দলের সঙ্গে মিলে কাজ করার সুযোগও বাড়ে। ১৯৮৬ সালে রক ব্যান্ড 'অ্যারোস্মিথ'- এর 'ওয়াক দিজ ওয়ে'-এর হিপ-হপ সংস্করণ নিয়ে আসেন র‌্যাপার রান ডিএমসি'স। সাথে সাথে এই গান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। আর রান ডিএমসি'স বনে যায় হিপ-হপের প্রথম বৈশ্বিক মহাতারকা। আর হিপ-হপকে প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে সাহায্য করেন 'গ্রান্ডমাস্টার ফ্লাশ'। তিনি স্ক্যাচিং (ইচ্ছাকৃতভোবে গান আগে-পিছে কর বাজানো) জনপ্রিয় করেন। বিটের ইতিহাস বদলে দেওয়া রোলান্ড টিআর-৮০৮ ড্রাম মেশিনের সাথেও পরিচয় করিয়ে দেন ফ্লাশ। এসময় কৃষ্ণাঙ্গদের বাইরে গিয়েও হিপ-হপের চর্চা শুরু হয়। সল্ট-এন পেপা গ্রুপে শ্বেতাঙ্গরাও র‌্যাপ সংগীত চর্চায় নামেন। এরপর বিস্টি বয়েজ হিপ-হপকে নিয়ে যায় নতুন উচ্চতায়। প্রথম র‌্যাপ অ্যালবাম হিসেবে তাদের 'লাইসেন্সড টু ইল' বিলবোর্ড অ্যালবাম চার্টের শীর্ষে উঠে আসে। *প্রতিবাদের ভাষা হিপ-হপ* র‌্যাপাররা শুরু থেকেই রাজনৈতিক এবং সামাজিক সমস্যা তুলে ধরেছে। ১৯৬০-এর ব্ল্যাক পাওয়ার মুভমেন্ট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে, র‌্যাপ দল পাবলিক এনিমিস-এর গান 'ফাইট দ্য পাওয়া ' এ তরুণ কৃষ্ণাঙ্গদের মুখোমুখি হওয়া সমস্যাগুলি তুলে ধরা হয়েছে। র‌্যাপার ন্যাসের গান 'এনওয়াই স্টেট অফ মাইন্ড' - আফ্রিকান আমেরিকান সাহিত্যের নর্টন অ্যান্থোলজিতে প্রদর্শিত কয়েকটি র‌্যাপ গানের মধ্যে একটি – 'গর্ডন পার্কস ফটোগ্রাফ বা ল্যাংস্টন হিউজের কবিতা হিসাবে ঘেটো জীবনের একটি স্পষ্ট চিত্র' প্রদান করে। এনডব্লিউএ-এর 'এক্সপ্রেস ইউরসেলফ' এ যেমন কাজের ফাঁকে বিশ্রাম নেওয়ায় কৃষ্ণাঙ্গদের উপর শ্বেতাঙ্গের অত্যাচারের চিত্র দেখানো হয়েছে আর নানা বৈষম্যের কথা উঠে আসে গানের লিরিক্সে। আর হিপ-হপের এই ঘরানা বিভিন্ন প্রান্তে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শ্রোতা সংখ্যা বাড়তে থাকে। গানের শব্দে আসতে থাকে বৈচিত্র্য। ডি লা সোলের প্রথম অ্যালবাম 'থ্রি ফিট হাই এন্ড রাইজিং' শ্রোতাদের মধ্যে আলাদা ছাপ ফেলে। আন্ডারগ্রাউন্ড হিপ-হপের উত্থানেও এর অবদান অনেক। এরপর আসে মস ডেফ আর দ্য রুট। টিভি উপস্থাপক জিমি ফ্যালনের হাউজ ব্যান্ড 'দ্য রুট' আমেরিকার ঘরে ঘরে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দ্য রুটকে প্রথম 'বৈধ হিপহপ ব্যান্ড' বলেন অনেকে। এ ছাড়া কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের সমস্যা নিয়ে সচেতনভাবে একটি সংগ্রাম চলতে থাকে হিপ-হপের মাধ্যমে। মনি লাভ, কুইন লতিফারা তাদের 'ইউ.এন.আই.টি.আই' এর মতো গানের মাধ্যমে বিষয়গুলো তুলে ধরেন। পরে লৌরিন হিলও একই ধারায় গান রচনা করেন। *স্বর্ণযুগ* ১৯৮০-এর দশকের শেষ থেকে ৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়টা ছিল হিপ-হপের স্বর্ণযুগ। ১৯৯০ সালে ভানিলা আইসের গান 'আইস আইস বেবি' প্রথম একক হিপ-হপ সংগীত হিসেবে বিলবোর্ডের শীর্ষস্থানে আসে। তখন সংগীতের এই ঘরানা থেকেই বেশি আয় হতো। হিপ-হপের অবস্থান তখন আরো দৃঢ় হয়। 'টুপাক ঠাকুর' এবং 'দ্য নটোরিয়াস বি. আই. জি'-এর হাত ধরে আসে ক্যালিফোর্নিয়া লাভ, চেঞ্জেস এবং জুসির মতো গান। ড. ড্রে এবং স্নুপ ডগ ''নুথিন বাট আ 'জি' থাং'' এর মতো গানের মাধ্যমে গ্যাংস্টার লাইফস্টাইল প্রসিদ্ধ করেন। তবে পরিস্থিতি কুৎসিত রূপ নেয় ১৯৯৬-৯৭ সালে। তখন পূর্ব উপকূল-পশ্চিম উপকূল দ্বন্দের ফলে একসময়ের বন্ধু ক্যালিফোর্নিয়ার টুপাক ঠাকুর ও ব্রুকলিনের 'বিগি'-এর মৃত্যু হয়। উভয় হত্যার রহস্য উন্মোচন হয়নি। তবে এর ফলে দুই পক্ষের মধ্যে চলমান উত্তেজনা থেমে যায়। তবে প্রযোজক টিম্বাল্যান্ডের নেতৃত্বে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এবং নতুন তারকা মিসি ইলিয়টের ব্যক্তিত্বের প্রভাবে হিপ-হপে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়। নিকি মিনাজ এবং মেগান দি স্ট্যালিয়ন পরে এই ধারা বজায় রাখেন। টিভি অনুষ্ঠান বেল-এয়ার তারকা উইল স্মিথ 'গেটিন জিগি উইট ইট' এর মতো গানের মাধ্যমে হিপ-হপের একটি পরিবার-বান্ধব ধারা তৈরি করেন। আর ১৯৯৯ সালে ইতিহাস রচনা করেন র‌্যাপার/অভিনেত্রী লৌরিন হিল। সে বছর তিনি 'দ্য মিসএডুকেশন অব লৌরিন হিল' অ্যালবাম এবং 'এলপি' গানের মাধ্যমে পাঁচটি গ্র্যামি পুরস্কার জিতে নেন। লৌরিন হিলই মূলত হিপ-হপ এবং মূলধারার জনপ্রিয় সংগীতের মাঝে পার্থক্য কমিয়ে আনেন। তার র‌্যাপিং স্টাইলে পরবর্তীতে অনুপ্রাণিত হন ব্রিটিশ র‌্যাপার মার্কুরি পুরস্কার বিজয়ী এমএস ডায়নামাইট, স্পিচ ডেবেলে এবং এস্টেলে। বিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে ড. ড্রের পরামর্শ ও তার অনুপ্রেরণায় মার্শাল ম্যাথার্স, আকা এমিনেম ও আকা স্লিম শেডির মতো শ্বেতাঙ্গ র‌্যাপাররাও হিপ-হপ জগতে আসনে এবং জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ড্রের গানে ছিল গভীর রসিকতা, রাজনৈতিক ভুলের বার্তা। তার র‌্যাপের ধরনও ছিল একদম আলাদা। র‌্যাপ যুদ্ধ নিয়ে তৈরি 'এইট মাইল' চলচ্চিত্রে তাকে নিয়ে একটি চরিত্র ছিল। সেখানে তিনি নিজেই অভিনয় করেন। *উত্তরাধিকার* আউটকাস্ট, ক্যানিয়ে ওয়েস্ট, টাইলার দ্য ক্রিয়েটর এবং কেন্ড্রিক লামার মতো র‌্যাপাররা ডিজিটাল যুগ আসার পরপরই হিপ-হপকে একটি শিল্পে পরিণত করেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে কেন্ড্রিক লামার। ২০১৫ সালে প্রকাশিত তার অ্যালবাম 'টু পিম্প আ বাটারফ্লাই' গ্র্যামি পুরস্কার জিতে নেয়। কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর পর 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার' আন্দোলনে তার এই অ্যালবামের গানগুলো 'অবজ্ঞার শিকারদের সংগীত' হয়ে ওঠে। ২০১৮ সালে প্রকাশি 'ড্যাম' পুলিৎজার পুরস্কার জেতে। একই সময়ে কানাডিয়ান র‌্যাপার ডেইক তার জনপ্রিয় 'ওয়ান ডান্স' গান দিয়ে প্রথম হিপ-হপ শিল্পী হিসেবে বিলবোর্ডের বর্ষসেরা শিল্পীর তকমা পান। সমকামী র‌্যাপার লি নাস এক্স-এর 'ওল্ড টাউন রোড' টানা ১৯ সপ্তাহ বিলবোর্ডের শীর্ষে থেকে নতুন রেকর্ড গড়ে। প্রথম দিকে র‌্যাপ সংগীত যখন প্রথম আটলান্টিকের অপর প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে তখন যুক্তরাজ্যের শিল্পীরা মার্কিন গায়কদের নকল করতেন। তবে র‌্যাপার রুটস ম্যানুভা, সংগীত দল সো সলিড ক্রু এবং তারপর দ্য স্ট্রিটের হাত ধরে ব্রিটিশদের একটি স্বতন্ত্র হিপ-হপ ধারার জন্ম হয়। ব্রিটিশ শ্রোতাদের কাছে দৃশ্যপট পাল্টে দেওয়া মুহূর্ত হয়ে ওঠে ২০০৮ সালের দেশের সবচেয়ে বড় সংগীত উৎসব গ্লাস্টনবারিতে প্রধান সংগীতশিল্পী হিসেবে '৯৯ প্রবলেম' তারকা 'জে-জ'-এর নাম ঘোষণার পর। এরপর বিয়ন্সে এবং কানইয়ের মতো শিল্পী একই মঞ্চে পারফরম্যান্স করেন। 'স্টর্মজি' প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ব্রিটিশ র‌্যাপার হিসেবে গ্লাস্টনবারিতে প্রধান শিল্পী হিসেবে মঞ্চে গান পরিবেশন করেন। ২০২২ সালে এক জনপ্রিয় অনুষ্ঠানে স্নুপ ডগ, ড্রে এবং ম্যারি জে ব্লাইজের সাথে মঞ্চে গানের মাঝেই 'ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার'- এর সমর্থনে হাঁটু গেড়ে বসেন শ্বেতাঙ্গ র‌্যাপার এমিনেম। এ ঘটনা আলোড়ন তোলে সংগীত দুনিয়ায়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ছাড়িয়ে বিশ্বের সব প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে হিপ-হপ। আধুনিক চলচ্চিত্র, ফ্যাশন, জীবানধারণ থেকে সব জায়গায় হিপ-হপের প্রভাব বিদ্যমান। এভাবেই ব্লঙ্কসের একটি বেসমেন্ট থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস, লন্ডন, প্যারিস, পুয়ের্তো রিকো হয়ে গ্লাস্টনবারির পিল্টন মাঠ পর্যন্ত একটি দীর্ঘ যাত্রার মধ্য দিয়ে বিশ্বজয় করেছে হিপ-হপ।
Published on: 2023-08-19 10:59:11.652051 +0200 CEST