The Business Standard বাংলা
ঢাকাকে (নদীগুলোকে) এখনও বাঁচানো সম্ভব?

ঢাকাকে (নদীগুলোকে) এখনও বাঁচানো সম্ভব?

গত দুই দশকে প্রকল্পের পর প্রকল্প গ্রহণ করেও বাঁচানো সম্ভব হয়নি বুড়িগঙ্গাকে, ফলে এখনও নদীটির ধারা আগের মতো দূষিত রয়ে গেছে। ঢাকার চারপাশের আরো চারটি নদী – তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু এবং আরেকটু দূরের ধলেশ্বরীও– অবাধ দখল আর দূষণে মৃত্যুশয্যায়। শোচনীয় এই পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে, আগামী সাত বছরের মধ্যে ঢাকার আশেপাশে ও মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত পাঁচটি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করতে আরেকটি মেগা-প্রকল্প নিচ্ছে সরকার। এই উদ্যোগের আওতায়, প্রায় ৪০টি উপ-প্রকল্প ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে, যার ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ২০ বিলিয়ন ডলার। ঢাকার প্রাণদায়ী ধমনী এই নদীগুলো, কিন্তু বর্তমানে তাদের যে দুরবস্থা– সে বিবেচনায় একে এক কঠিন প্রচেষ্টাই বলা যায়। তবে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রস্থল ঢাকাকে বাঁচাতে হলে প্রাণ ফেরাতে হবে নদীগুলোর, যার কোনো বিকল্প নেই বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 'আমব্রেলা ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান – ঢাকা রিভার্স' শীর্ষক সাম্প্রতিক এই মহাপরিকল্পনাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ রয়েছে। এতে নদীর প্রবাহ এবং পানির মানের দ্রুত অবনতির বিভিন্ন অনুঘটক – শহরের স্যুয়ারেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নদীতে শিল্পকারখানার অশোধিত তরল বর্জ্য ফেলা ও নদী দখলের মতো বিভিন্ন বিষয়কে বিবেচনায় রাখা হয়েছে। সরকারের একটি বিস্তৃত কর্মসূচির অংশ হিসেবে, ঢাকার পাঁচ নদীর দূষণ কমাতে– অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) ২০৩০ সাল নাগাদ ২৯টি প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে। সরকারের জন্য এই আমব্রেলা ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান প্রস্তুত করেছে বিশ্বব্যাংক, যা চার ধাপে বাস্তবায়িত হবে।  গত ১৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেওয়া একটি প্রেজেন্টেশন অনুযায়ী, এটি বাস্তবায়নে প্রতিবছর প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার করে মোট ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের দরকার হবে। ইআরডির কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে, চলতি অর্থবছর থেকেই কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন শুরু হবে। তবে সব প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট অর্থায়নের দিকগুলো এখনও চূড়ান্ত হয়নি। অবশ্য, বিশ্বব্যাংক শীর্ষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত কিছু প্রকল্প অর্থায়নে এর আগে রাজি হয়েছিল বলে জানান তারা। ঢাকার মধ্যে ও চারপাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোকে রক্ষায় ২০১৬ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিকে একটি সমন্বিত কর্মসূচি নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছে কারিগরি সহায়তা চায়। এর প্রতিক্রিয়ায় বৈশ্বিক দাতাসংস্থাটি (টঙ্গী খালসহ) পাঁচটি নদী– বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু, তুরাগ ও ধলেশ্বরীর ওপর তিন বছরের বেশি সময় ধরে একটি বিস্তৃত জরিপ চালায়। জরিপের ফলাফল ও পরামর্শের ভিত্তিতে, নদী দূষণ হ্রাস ও রক্ষায় ইআরডি সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রস্তাবিত ৪৮টি প্রকল্পের মধ্যে ২৯টিকে বাছাই করে। কর্মকর্তারা জানান, বিশ্বব্যাংকের কাছে বড় আকারের অর্থায়ন প্রত্যাশা করছে সরকার। এছাড়া এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপানার সরকারের আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থাসহ (জাইকা) অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীদের কাছেও  অর্থায়নের প্রস্তাব দেওয়া হতে পারে। *কোনো পদক্ষেপ না নিলে ২০ বছরে নদীদূষণে ক্ষতি হবে ৫১ বিলিয়ন ডলার* বিশ্বব্যাংকের করা সমীক্ষায় ঢাকার আশেপাশে নদীগুলো দূষণমুক্ত করতে ২০৩০ লাগাদ ২৯টি প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়েছে। আমব্রেলা ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (ইউআইপি) বাস্তবায়নের জন্য বার্ষিক ৩.২ ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন, এছাড়া পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বাবদ ২০৩০ সাল পর্যন্ত আরো দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার দরকার হবে। এভাবে ২৯ প্রকল্পের জন্য মোট ব্যয় দাঁড়াবে ২০ বিলিয়ন ডলারে। কিন্তু, নদী দূষণ বন্ধে কোনো পদক্ষেপ না নিলে – এর জনস্বাস্থ্য, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি আগামী ২০ বছরে ৫১ বিলিয়ন ডলার হবে বলে বিশ্বব্যাংকের 'রিস্টোরেশন অব রিভার্স অব ঢাকা' শীর্ষক সম্ভব্যতা অধ্যয়নে বলা হয়েছে। *ঢাকার কেন আমূল সংস্কার দরকার* দেশের মোট জিডিপিতে ৩৫ শতাংশ অবদান রাখে ঢাকা। ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের তৃতীয় বৃহৎ শহরে পরিণত হবে বাংলাদেশের রাজধানী। নগরীর জনসংখ্যা আড়াই কোটির বেশি বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু, ২০২১ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত 'ঢাকা রিভার্স ইকোলজিক্যাল রিস্টোরেশন প্রজেক্ট ইনফরমেশন' নথি অনুসারে, নদীগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকার কারণেই বিশ্বের বসবাসের অনুপযুক্ত শহরের তালিকায় রয়েছে ঢাকা। নদী ও খালের বিস্তৃত জাল ঐতিহাসিকভাবে এই শহর গড়ে ওঠায় যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে তাও স্মরণ করা হয়েছে নথিটিতে। বৃহত্তর ঢাকার অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ও জীবনমান নিশ্চিতে সঠিকভাবে নদীগুলোর ব্যবস্থাপনা যে আজও অপরিহার্য, সেকথাও উল্লেখ করা হয়। 'পূর্ব ঢাকায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত উদ্যোগ– বালু নদীর পুবপাড় ধরে বাঁধ নির্মাণ, পরিবহন অবকাঠামোর উন্নয়ন ও নতুন এলাকাটিতে ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমালে – উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা আছে। এতে ২০১৫ সালের মূল্যমান অনুযায়ী, মাথাপিছু আয় ৯ হাজার ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে'- এতে আরো বলা হয়। ঢাকার নদীগুলোর পানির মানকে 'খুবই খারাপ' বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে। ৩০-৪০ শতাংশ নদী দূষণের জন্য দায়ী বাসাবাড়ির বর্জ্য পানি, আর বাকি ৫০-৬০ শতাংশের জন্য দায়ী শিল্প প্রতিষ্ঠান।  নদীদূষণের আরেক বিপজ্জনক উৎস হাসপাতালের বর্জ্য। ঢাকার বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান দিনে ২০০ টনের বেশি কঠিন ও তরল বর্জ্য উৎপন্ন করে। এদিকে বিদ্যমান স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্কের আওতায় রয়েছে নগরীর মাত্র ২০ শতাংশ। পাগলায় অবস্থিত ঢাকার একমাত্র স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট দৈনিক মাত্র ৩০ থেকে ৪০ মিলিয়ন লিটার (এমএলডি) পরিশোধন করতে পারে। বাংলাদেশে স্যুয়ারেজ নিস্কাশনে মান কার্যকরের কোনো কর্তৃপক্ষ না থাকায় ঢাকার বাকি সমস্ত দূষিত পানি বা ১,২৫০ এমএলডি সরাসরি নদীতে গিয়ে পড়ছে বলে জানায় বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন। এখানেই শেষ হয় না নদী দূষণ। ২০০৮ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, ঢাকার নদীগুলোয় ১,৩০০ এমএলডি দুষিত পানি নিঃসরণ করে শিল্প প্রতিষ্ঠান। ঢাকায় পানি দূষণের প্রধান দুটি খাত হলো- টেক্সটাইল ও চামড়া শিল্প। রাসায়নিক ও ওষুধ শিল্পও তার সাথে দূষণে ভূমিকা রাখছে। বুড়িগঙ্গা ও ঢাকার অন্য চার নদীতে – চারটি প্রধান শিল্প ক্লাস্টার– টঙ্গী, হাজারীবাগ, তেজগাঁও, তারাবো, নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল ও ঘোড়াশাল থেকে ৬০ হাজার ঘনমিটার বিষাক্ত বর্জ্য এসে পড়ছে। এরমধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ শিল্প প্রতিষ্ঠানের তরল বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা বা এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) রয়েছে। তবে বিদ্যমান অনেক ইটিপি-ই দুর্বল নকশার। ফলস্বরূপ; বৃহত্তর ঢাকায় অশোধিত শিল্প বর্জ্য পানি নিস্কাশনের কারণে স্বাস্থ্য, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ বছরে ১৫০ থেকে ১৭০ মিলিয়ন ডলার বলে হিসাব করা হয়েছে। এক দশকের বেশি সময় ধরে চেষ্টার পর বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে ঢাকার ট্যানারিগুলো হাজারীবাগ থেকে সরিয়ে সাভার ট্যানারি শিল্পপার্কে নেওয়া সম্ভব হয়। কিন্তু, এই শিল্পাঞ্চলের সিইটিপি পূর্ণাঙ্গ না হওয়ায়, এর কাছাকাছি আরেকটি নদী এখন মরণাপন্ন। আশেপাশের জলাভূমিতে ঢাকা শহর সম্প্রসারিত হওয়ায়– প্রাকৃতিকভাবে পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা ধবংস হয়ে গেছে। এছাড়া, বিপুল পরিমাণ বর্জ্য ফেলা ও দখলের কারণে – বৃষ্টির পানি নিস্কাশনে অবদান রাখা ঢাকার মধ্যে ও আশেপাশের ৫০টি খাল হারিয়ে যাচ্ছে। দুর্বল নিস্কাশন ব্যবস্থার কারণে দুই ধরনের বিপর্যয় দেখা দেয়। এতে কিছু স্থানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ হ্রাস পায়, একইসঙ্গে অন্যত্র দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। *ঢাকার নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগগুলো কেন সফল হয়নি* ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিগুলোকে স্থানান্তরে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। গত দুই দশকে আরো পাঁচ প্রকল্পে ব্যয় করা হয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। তারপরও বুড়িগঙ্গার ২৯ কিলোমিটারের পানিতে মাছের শ্বাস নেওয়ার মতো দরকারি অক্সিজেন নেই। প্রকল্পগুলো কেন ব্যর্থ হয়েছে, তা তুলে ধরেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, যেখানে তারা নগর উন্নয়ন চিন্তাববিদদের মতামতকে যুক্ত করেছে। এর আগে ফিলিপাইনের ম্যানিলার পাসিগ নদীকে পূর্বাবস্থায় ফেরানোর উদ্যোগগুলো ব্যর্থ হয়েছিল। সেই ব্যর্থতার শিক্ষা উল্লেখ করে দাতাসংস্থাটি জানিয়েছে যে, আগের প্রচেষ্টাগুলোর ফলাফল খুবই স্বল্পস্থায়ী। তবে নদীরক্ষার সকল কার্যক্রম একটি একক কর্তৃপক্ষ– রিভার কমিশনকে দেওয়ার পর ১৯৯১ সালে নেওয়া পদক্ষেপের মাধ্যমে মাত্র এক দশকের মধ্যে সাফল্য আসে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক তখন জানায়, 'আগের প্রচেষ্টাগুলো ব্যর্থ হয়, কারণ যারা নদীকে দূষণমুক্ত করতে চেয়েছিলেন, তারা শুধু নদীর দিকেই মনোযোগ দেন। কিন্তু, শহরের পরিবেশের যেসব কারণে নদীর পানির মানে অবনতি হয় বা নদীর অপব্যবহার হয়– সেসমস্ত অনুঘটকের মিলিত পরিণতির দিকে তারা মনোযোগ দেননি।' *ঢাকার নদীগুলোকে কি পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব?* বিশ্বব্যাংকের জরিপের ফলাফলে চারটি অগ্রাধিকারকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে প্রথমটির আওতায় রয়েছে চারটি বিনিয়োগ প্রকল্প: ঢাকা রিভার্স ইকোলজিক্যাল রেস্টোরেশন প্রজেক্ট, ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (ডিআইএসপি), বাংলাদেশ এনভায়রোমেন্টার সাসটেইনিবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্ট (বেস্ট), এবং এক্সেলেরেশন অব ঢাকা স্যুয়ারেজ মাস্টার প্ল্যান (মিরপুর, রায়েরবাজার, উত্তরা ও দাশেরকান্দি)। ইআরডি কর্মকর্তাদের মতে, এরমধ্যে ঢাকা রিভার্স ইকোলজিক্যাল রেস্টোরেশন প্রজেক্ট- সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ। এ প্রকল্পের তহবিল অনুমোদন করেছে বিশ্বব্যাংক। এর প্রধান লক্ষ্য হবে– ঢাকার নদী ও খালগুলোয় পানি প্রবাহ বাড়ানো। একইসঙ্গে ঢাকা রিভার্স মাস্টারপ্ল্যান ও ঢাকা স্যুয়ারেজ মাস্টারপ্ল্যান অনুসারে, বাসাবাড়ির বর্জ্যজল পরিশোধনের ব্যবস্থা। প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়,স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ এনভায়রোমেন্টার সাসটেইনিবিলিটি অ্যান্ড ট্রান্সফরমেশন প্রজেক্ট (বেস্ট)- ও প্রথম অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে। এই প্রকল্পের জন্য বিশ্বব্যাংকের ২৫০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন পাওয়া গেছে। এর লক্ষ্য হবে, নির্দিষ্ট কিছু খাতে সবুজ বা পরিবেশসম্মত বিনিয়োগ উৎসাহিত করা। এছাড়া, ঢাকা স্যানিটেশন ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (ডিআইএসপি)-র লক্ষ্য হবে, ঢাকা ওয়াসার আওতাধীন এলাকায় পয়নিস্কাশন ব্যবস্থার কার্যকারিতা বাড়ানো। দ্বিতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে কল্যাণপুর এলাকায় একটি রিটেনশন পন্ডসহ হাইড্রো ইকো-পার্ক নির্মাণের প্রস্তাব, যা বাস্তবায়ন করবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। এ তালিকায় আরো রয়েছে, বুড়িগঙ্গা নদীতীর উন্নয়ন প্রকল্পের সঙ্গে গোড়ানচাটবাড়িতে আরেকটি ইকো-পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা। তৃতীয় অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে, ঢাকা শহরের খালগুলো পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন। বুড়িগঙ্গার ভাঙন থেকে পোস্তাগোলা ক্যান্টনমেন্ট রক্ষা এবং আদি বুড়িগঙ্গা পুনরুদ্ধার। এই অগ্রাধিকার তালিকায় আরো আছে ঢাকা সার্কুলার রুট: ইস্টার্ন বাইপাস প্রকল্প ও বিডব্লিউডিবি অংশ। চতুর্থ অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীপাড় ধরে পিলার নির্মাণ, নদীতীর রক্ষা, পায়ে হাটার পথ ও জেটি নির্মাণ (তৃতীয় পর্যায়); ৫৭৪ কিলোমিটার বিস্তৃত নৌপথ চালু, মাল্টিমোডাল হাব উন্নয়ন এবং ঢাকা ইনার সার্কেল রুট (দ্বিতীয় পর্যায়) বাস্তবায়ন। বিভিন্ন ধাপে আরো সমীক্ষা ও অধ্যয়নের মাধ্যমে অন্যান্য পদক্ষেপ চিহ্নিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন, ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকার বাসিন্দাদের জীবনমান ও স্বাস্থ্যের উন্নতি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এভাবে এটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে অবদান রাখবে, যা একটি উচ্চ-মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্য অর্জনে আবশ্যক বলে প্রকল্প নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। *সাফল্যের উদাহরণ আছে দেশ-বিদেশে* শহরের বাসিন্দাদের কল্যাণে নদ-নদী পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বীকৃতি পাচ্ছে। নদীকে পুনরুজ্জীবিত করার সফল দৃষ্টান্ত দেখিয়েছে ম্যানিলা। তার সুবাদে এককালে মৃত নদী বলে কুখ্যাত পাসিগ এখন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এডিবি ও ড্যানিডার মতো বৈশ্বিক সংস্থাগুলোর সাথে যৌথভাবে এই উদ্যোগ নিয়েছিল স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। চারদিক থেকে ভূমি দ্বারা আবদ্ধ ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি; পৃথিবীর অন্যতম এই মহানগর পানির জন্য পাশের রাজগুলোর ওপর নির্ভর করতো। যা কাটিয়ে উঠতে তারা 'সিটি অব লেকস' শীর্ষক প্রকল্প নেয়। এর আওতায় তারা প্রায় ৬০০ জলাশয়কে প্রাকৃতিক জলাধারে পরিণত করেছে, যেখানে বৃষ্টির পানি জমা হয়। এভাবে এক সময়ের অবহেলিত ও দূষিত তিমারপাড়া লেকের মতো অনেক জলাশয়ের সংস্কার ও উন্নয়ন করা হয়েছে। এই লেকটি এখন সুপেয় পানির উৎস। সপরিবারেও অনেক দিল্লিবাসী সেখানে ঘুরতে যান। আরেক সাফল্যের উদাহরণ রয়েছে চীনের জিয়াংজিং প্রদেশের আকসু'তে। বেশকিছু সিরিজ প্রকল্পের মাধ্যমে মরুপ্রবণ এই এলাকাকে প্রাণবন্ত জলাভূমি পার্কে রূপ নেওয়া হয়েছে। এতে আকসু নদীর একটি উৎসও সুরক্ষিত হয়েছে। থাইল্যান্ডের ব্যাংকক-সহ ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের অনেক শহরেই নদীই হচ্ছে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম। নদী ঘিরেই চাঙ্গা হয়েছে পর্যটন। গড়ে উঠেছে ভাসমান বাজার ব্যবস্থা। ঢাকার ক্ষেত্রেও সাফল্যের উদাহরণ দেওয়া যায়। ১৯৯০ এর দশকে নাগরিক সমাজের দাবির মুখে কর্তৃপক্ষ ধানমণ্ডি, গুলশান ও বনানী লেক রক্ষার উদ্যোগ নেয়, নির্মাণ করে হাঁটার পথ। শহরের জলাভূমি রক্ষার আরেক গর্বিত উদাহরণ হাতিরঝিল প্রকল্পও। যেটি এখন বিনোদনের জায়গার পাশাপাশি বাসের ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে জলপথে চলাচলের বিকল্প সুযোগও দিচ্ছে কিছু এলাকার বাসিন্দাদের। ২০১৯ সালে আদি বুড়িগঙ্গার নদী খাত পুনরুদ্ধারে বিআইডব্লিউটির অবৈধ স্থাপনা অপসারণের উদ্যোগও সাফল্যের মুখ দেখেছিল। কিন্তু, পরবর্তীকালে এসব উদ্যোগ অব্যাহত না রাখায়– নদীরক্ষার সে সাফল্য আর ধরে রাখা যায়নি।
Published on: 2023-08-21 19:39:49.338051 +0200 CEST