The Business Standard বাংলা
ডিম-পেঁয়াজ-মরিচের ‘উত্তাপ’: যেভাবে ৫০ টাকার মোগলাই এখন ৮০ টাকা

ডিম-পেঁয়াজ-মরিচের ‘উত্তাপ’: যেভাবে ৫০ টাকার মোগলাই এখন ৮০ টাকা

মাঝেমধ্যেই সন্ধ্যায় অফিস শেষে তেলেভাজা কিনে বাড়ি ফেরার অভ্যাস মাসুমের। বেশিরভাগ সময়ে পেঁয়াজু, চপ কিনলেও সেদিন হোটেলে গিয়েছেন মোগলাই পরোটা কিনতে। দোকানদার ডাবল ডিমের একটা মোগলাইয়ের দাম মাসুমের কাছে হাঁকলেন ৮০ টাকা। দাম শুনে খানিকক্ষণ বিহ্বল হয়ে শেষতক মাসুম বাড়ি ফিরলেন ৪টি পুরি কিনে। তাতেও অবশ্য টাকা যে খানিকটা কম খরচ হয়েছে, তা নয়। প্রতিটা পুরির দাম পড়েছে ১০ টাকা। মোগলাইয়ের দাম কেন এত বেশি জানতে চাইলে মাসুমের দিক থেকে সেই অবধারিত উত্তরটিই আসে: 'ডিম, পেঁয়াজ, মরিচের দাম বেশি।' নিত্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যাওয়ার পর সান্ধ্যকালীন খাবারের ওপরেও প্রভাব পড়েছে অনেক। বিশেষ করে ডিম, পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি খাবার মোগলাই পরোটা এবং ডিম, চিনি দিয়ে তৈরি বিভিন্ন কেকের দাম বেড়েছে। কিছু সময়ের ব্যবধানে এগুলোর দাম বেড়েছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ শতাংশ। কোনো কোনো খাবারে তার চেয়েও বেশি। ঢাকা শহরের সান্ধ্যকালীন আড্ডায় খাবার হিসেবে মোগলাই পরোটা বেশ জনপ্রিয়। অথচ কয়েক বছরের ব্যবধানে এ খাবারটির দাম ৪০–৫০ টাকা থেকে ৮০–৯০ টাকায় পৌঁছেছে। একটি ডিমের (সিঙ্গেল) মোগলাই কয়েক বছর আগে যেখানে ৩০ কিংবা ৪০ টাকায় পাওয়া যেত, সময়ের ব্যবধানে তা এখন ৫০–৬০ টাকার নিচে পাওয়া যায় না। কোনো কোনো হোটেল আবার এক কাঠি সরেস — সিঙ্গেল ডিমের মোগলাই বিক্রিই তারা বন্ধ রেখেছে। কিনতে হলে ডাবল ডিমের মোগলাই কিনতে হবে, যার দাম ছুঁয়েছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত। 'দাম কেন বাড়তি' — এ প্রশ্নের জবাবে বিক্রেতাদের কাছ থেকে ঘুরেফিরে পাওয়া যায় কিছু 'তৈরি উত্তর'। নিত্যপণ্যের বেশি দামকেই দায়ী করেছেন বেশিরভাগ বিক্রেতা। কেউ কেউ অবশ্য দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে রাশিয়া-ইউক্রেনের যুদ্ধকেও হাতিয়ার করেছেন। মোগলাইয়ের দামে কেরামতি ডাবল ডিমের একটি মোগলাই কিনতে যেহেতু ৮০ থেকে ৯০ টাকা খরচ করতে হয়, তাই মোগলাইয়ের পেছনে ডিম, মরিচ, পেঁয়াজ ইত্যাদি বাবদ আনুমানিক কত টাকা খরচ হয় তার একটি সহজ হিসাব দেখা যাক। মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে একটি ডিমের উৎপাদন খরচ সাড়ে ১০ টাকা এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১২ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয় বলে জানিয়েছে। রাজধানীর সেগুনবাগিচার পাইকারি বাজারে বিক্রেতারা একটি ডিম ১২ টাকা ৩০ পয়সায় বিক্রি করেন। অন্যান্য পাইকারি বাজার ঘুরে দেখা গেছ, প্রতিটি ডিমের দাম সর্বোচ্চ সাড়ে ১২ টাকা। হোটেলে যেহেতু প্রচুর ডিমের প্রয়োজন পড়ে, তাহলে ধরে নেওয়া যাক হোটেল কর্তৃপক্ষ পাইকারি মূল্যেই ডিম ক্রয় করে থাকে। সেক্ষেত্রে ডাবল ডিমের মোগলাইয়ে দুটি ডিম বাবদ তাদের খরচ হয় ২৫ টাকা। যদি খুচরা বাজারমূল্যে হিসাব করা হয়, তাহলে দুটি ডিমের দাম দাঁড়ায় ২৭ থেকে সাড়ে ২৭ টাকা। খুচরা বাজারে এক কেজি মাঝারি আকারের দেশি পেঁয়াজের দাম ১০০ টাকা এবং ভারতীয় পেঁয়াজের দাম ৬০ টাকা। যদিও ভারতের রপ্তানি শুল্কারোপের ঘোষণার পর থেকেই দেশের বাজারে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে পেঁয়াজের দাম। একদিনের ব্যবধানে প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ১৪ থেকে ২৪ টাকা। এক কেজি দেশি পেঁয়াজের মধ্যে পেঁয়াজ থাকে আনুমানিক ৪৪ থেকে ৪৮টি। সেক্ষেত্রে ১০০ টাকা কেজি হিসেবে প্রতিটি দেশি পেঁয়াজের দাম দাঁড়ায় দুই থেকে দুই টাকা ৩০ পয়সা। অন্যদিকে প্রতি কেজি মরিচের দাম খুচরা বাজারে ২০০ টাকা। প্রতি কেজিতে ৪১২ থেকে ৪২০টির মতো মরিচ পাওয়া যায়। প্রতিটি মরিচের দাম সে হিসেবে ৪৮ পয়সা। একটি ডাবল ডিমের মোগলাইয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত ২টি ডিম, দেড়টি পেঁয়াজ ও বেশি ঝালের জন্য ২টি মরিচ ব্যবহার করা হয়। সেক্ষেত্রে ডিম, পেঁয়াজ, মরিচ বাবদ মোট খরচ আনুমানিক ২৯ থেকে ৩২ টাকা। মোগলাইয়ে ব্যবহৃত বাকি আটা-ময়দা, তেল, লবণ এবং সার্বিক উৎপাদন খরচ মিলিয়ে যদি আরও ১২ থেকে ১৫ টাকাও খরচ করা হয় তাহলে প্রতিটি মোগলাই বাবদ খরচ দাঁড়ায় আনুমানিক ৪১ থেকে ৪৭ টাকা। অথচ সেই মোগলাই বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। কিছু দোকানে যদিও ৭০ টাকায় এখনো মোগলাই পাওয়া যায়, তবে এগুলোও মূল্য বৃদ্ধি করারই চিন্তা করছে। পুরিতে সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে মোগলাইপ্রেমীদের তবে মজার বিষয় হলো, ডাবল ডিমের মোগলাইয়ের দাম কিন্তু চলতি বছরের উত্তপ্ত বাজারের আঁচে বাড়েনি। বেড়েছে ২০২১ ও ২০২২ সালে। মৌচাক মোড়ে অবস্থিত একটি কনফেকশনারির কর্ণধার বলেন, 'এক বছর আগে যখন গ্যাসের দাম বেড়েছিল, তখন মোগলাইয়ের দাম বেড়ে ৮০ টাকা হয়েছিল। গতবছর দাম ছিল ৭০ টাকা। আগে ডিম কিনতাম আট–নয় টাকায় পিস, এখন প্রতিটা ডিম কিনি ১২ থেকে ১৩ টাকায়।' পেঁয়াজ, মরিচ ও ডিমের দাম বাড়ায় বর্তমানে তাদের ক্ষতি হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। মোগলাইয়ের দাম বাড়ায় ক্রেতারা অনেকেই পুরি কিনেই সন্তুষ্ট থাকছেন। মৌচাকের আরেকটি রেস্তোরাঁর কর্মচারীরা জানান, মোগলাইয়ের দাম শুনে অনেক ক্রেতাই পাঁচ কিংবা ১০ টাকায় পুরি কেনেন। রাজধানীর শাহজাহানপুরের বাসিন্দা আরিফ বলেন, 'এখন মোগলাইয়ের চেয়ে বেশি পুরি কিনি। টাকাও বাঁচে আর পেটও ভরে।' পেঁয়াজুতে পেঁয়াজের আকাল পেঁয়াজের বাড়তি দামের প্রভাব পড়েছে সান্ধ্যকালীন আরেকটি জনপ্রিয় খাবার পেঁয়াজুতে। ডাল ও পেঁয়াজ দিয়ে তৈরি পেঁয়াজুতে কমেছে পেঁয়াজের পরিমাণ। মৌচাক মোড়ে অস্থায়ী দোকানে গত দেড় বছর পেঁয়াজু, রসুনের চপ, ফুলকপির চপ, সবজির চপসহ বিভিন্ন তেলেভাজা বিক্রির ব্যবসা করছেন জায়েদা। তবে ইদানীং পেঁয়াজের দাম বাড়ায় পেঁয়াজুর স্বাদের সঙ্গে আপস করতে হচ্ছে তাকে। সাধারণত একটি পেঁয়াজুর দাম পাঁচ টাকা। দাম বাড়ালে বিক্রিবাট্টা কমে যাওয়ার ভয় জায়েদার রয়েছে। তাই ডালের সঙ্গে পেঁয়াজের পরিমাণ কমিয়ে ভেজে বিক্রি করছেন। 'আগে এক কেজি ডালের সাথে এক কেজি পেঁয়াজ মেশাতাম। এখন এক কেজি ডালে আধা কেজি পেঁয়াজ ব্যবহার করি,' সরল স্বীকারোক্তি জায়েদার। ডিম-চিনির উত্তাপে বেড়েছে কেকের দামও টং দোকান থেকে শুরু করে বড় দোকান — সব জায়গাতে বেড়েছে কেকের দাম। বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের বিপরীত পাশের টং দোকানগুলোতে গিয়ে দেখা গেছে, এক টুকরো কেক বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকায়। অথচ এ বছরের শুরুতেও একই ধরনের কেকের দাম ছিল ১০ টাকা। চিনির দাম বাড়ার পর থেকেই তার প্রভাব কেকে পড়তে শুরু হয়েছে। দাম বৃদ্ধি নিয়ে কিছুটা হতাশা ঝড়ে পড়েছে বিক্রেতা পান্থপথের একটি টং দোকানের পরিচালক হানিফের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, 'দাম বাড়ার পর প্রথম কদিন কেকের বিক্রি কম ছিল। এরপর আস্তে আস্তে মানুষ কেনা শুরু করে।' তবে আগের মতো বিক্রি এখন আর হয় না জানিয়ে হানিফ বলেন, 'আগে প্রতিদিন ৩০–৪০ পিস কেক বেচতাম। এখন ১০–১৫ পিস বিক্রি হয়। আগে রিক্সাচালক, ভ্যানচালকেরা চা আর কেক খেত। দাম বাড়ার পর তারাও কম খায়।' হাতিরপুল–পান্থপথ এলাকার রিক্সাচালক শামীম বলেন, 'অনেক রিক্সাওয়ালা ১৫ টাকা দাম শুনে এখন আর কেক নেয় না। আগে আমিও এই কেক খেতাম। এখন চায়ের সাথে অন্যকিছু খাই।' শুধু টং দোকানগুলোতেই নয়, কেকের বড় দোকানেও কেজিপ্রতি খাবারটির দাম বেড়েছে। কেক ও বেকারি সামগ্রী বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান 'কেক টাউন'-এ প্রতি কেজি কেকের দাম বেড়েছে ২০০ টাকা পর্যন্ত। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয়কর্মী সৈয়দ সামিয়া বলেন, '২৭ রমজান থেকে আমাদের কেকের দাম বেড়েছে। ৩০০ গ্রাম কেক আগে পাওয়া যেত ৫০০ টাকায়, এখন সেটির দাম সাড়ে ৫০০ টাকা। দাম বাড়ার পরে কেক বিক্রি কিছুটা কমেছে।' কেকের পাশাপাশি ডিম সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় পুডিংয়ের ক্ষেত্রে। ৬০০ গ্রামের পুডিংয়ের জন্য সাধারণত তিন থেকে ৪টি এবং ১৫০০ গ্রাম পুডিংয়ের জন্য পাঁচ থেকে ৬টি ডিমের প্রয়োজন হয়। তাই আচমকা ডিমের দাম বাড়ায় পুডিং ব্যবসায়ীরাও খানিকটা বিপাকে পড়েছেন। 'ডাইভ ইন পুডিং'-এর কর্ণধার পপি খালিদ বলেন, 'আমি দেড় মাস আগে পুডিং-এর ব্যবসায় শুরু করেছি। শুরু থেকেই একটা নির্দিষ্ট দামে পুডিং বিক্রি করে আসছি। নতুন ব্যবসা হওয়ার কারণে হুট করে ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমি দাম বাড়াতে পারছি না। এজন্য লাভ অনেক কমে গেছে।' তার আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে দুই–চার মাস পর পুডিংয়ের দাম বাড়ানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না তার কাছে।
Published on: 2023-08-23 15:23:47.778141 +0200 CEST