The Business Standard বাংলা
বাংলাদেশের ১৪ জেলা করিডরে ২৮৬ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনার রূপরেখা তুলে ধরেছে এডিবি

বাংলাদেশের ১৪ জেলা করিডরে ২৮৬ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনার রূপরেখা তুলে ধরেছে এডিবি

উত্তরপূর্ব ও দক্ষিণপশ্চিমের ১৪ জেলা মিলে — খুলনা বিভাগ থেকে ঢাকা হয়ে উত্তরপূর্বে সিলেট ও ময়মনসিংহ পর্যন্ত – বাংলাদেশ যদি অর্থনৈতিক করিডর হিসেবে গড়ে তুলতে পারে, তাহলে ২০৫০ সাল নাগাদ এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উৎপাদন- ২০২০ সালের ২০ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৮৬ বিলিয়ন ডলার হবে বলে জানিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। বুধবার (২৩ আগস্ট) রাজধানীতে একটি অনুষ্ঠানে 'বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডর ডেভেলপমেন্ট হাইলাইটস' শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি খাতগুলোর প্রতিনিধিরাও এতে অংশ নেন। আন্তর্জাতিক দাতাসংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে নাগাদ এই করিডর ২৩ লাখ অতিরিক্ত কর্মসংস্থান তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এই সংখ্যা বেড়ে ২০৫০ সাল নাগাদ ৪ কোটি ৭ লাখে উন্নীত হবে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডর (বিইসি) অঞ্চলে ১২ ধরনের প্রস্তুতকারক শিল্প স্থাপনের মাধ্যমে অতিরিক্ত উৎপাদন ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা যাবে। কর্মচঞ্চল শিল্পাঞ্চলগুলোর সাথে শহুরে ক্লাস্টারগুলিকে যুক্ত করতে প্রধান প্রধান যোগাযোগ নেটওয়ার্ক ধরে এই করিডরে অবকাঠামো নির্মাণের দরকার হবে। আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের সুবিধাভোগী জনসংখ্যাকে সর্বোচ্চ করাও এর অন্যতম লক্ষ্য। বর্তমানে বাংলাদেশের সিংহভাগ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগ কেন্দ্র করে। সে তুলনায়, খুলনা, মোংলা, সিলেট, রংপুর, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, পঞ্চগড়, নীলফামারীসহ অন্যান্য জেলা ও বিভাগ পিছিয়ে পড়েছে। ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক বিকাশে অবদান রাখতে পারার মতো যথাযথ ভৌত ও সামাজিক অবকাঠামোর ঘাটতিও আছে এসব অঞ্চলে। এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর এডিমন গিনটিং তার বক্তব্যে বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশজুড়ে অবকাঠামোগত রুপান্তর ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করবে, বাংলাদেশকে এমন সার্বিক উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করতে হবে। প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, 'একটি অর্থনৈতিক করিডর সমন্বিত উন্নয়নের এমন এক অনুঘটক যা অবকাঠামো শক্তিশালী করে, শিল্পের বিস্তারকে সক্ষম করে,  কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, উৎপাদন কেন্দ্রগুলিকে শহুরে ও সামাজিক সমষ্টির সাথে সংযুক্ত করে এবং দেশের উন্নত এলাকা থেকে দূরে উন্নয়নকে বিকেন্দ্রীকরণ করে।' বাংলাদেশের উত্তরপূর্ব ও দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যাচাই করার জন্য বিইসি গড়ে তোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিপুল পরিমাণ জনসংখ্যা ও ভৌগলিক অঞ্চলকে আওতাধীন রাখার পাশাপাশি করিডর অঞ্চলের কৌশলগত অবস্থানের সুবিধা আছে বলে জানায় এডিবির প্রতিবেদন। করিডর অঞ্চলে ৮টি প্রধান বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার রয়েছে, এগুলো হলো: মোংলা সমুদ্রবন্দর, পায়রা সমুদ্রবন্দর, বেনাপোল স্থলবন্দর, ভোমরা স্থলবন্দর, আখাউড়া স্থলবন্দর, তামাবিল স্থলবন্দর, বিবিরবাজার স্থলবন্দর এবং নাকুগাঁও স্থলবন্দর। এরমধ্যে মোংলা ও পায়রা বন্দর আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য রুটগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সংযোগের সুবিধা দেয়। বর্তমানে বাংলাদেশের সমুদ্রপথের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের অবদান প্রায় ১১ শতাংশ। অন্যদিকে, এই অঞ্চলের স্থলবন্দরগুলো প্রতিবেশী ভারতের সাথে বাণিজ্যের প্রধান গেটওয়ে হিসেবে কাজ করছে। ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের তাদের অবদান ৩৬ শতাংশ। তাই, কাঁচামাল আমদানি অথবা উৎপাদিত পণ্য রপ্তানি করার দৃষ্টিকোণ থেকেও করিডোর অঞ্চলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য-নির্ভর শিল্পগুলির জন্য অন্তর্নিহিত সুবিধা আছে। পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতের সাথে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য সম্ভাবনার ক্ষেত্রে উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের একটি অতিরিক্ত অবস্থানগত সুবিধা আছে। ভারতের ভূমিদ্বারা বেষ্টিত এই অঞ্চলে প্রায় ৩৮.৫ বিলিয়ন ডলারের বাজার চাহিদা আছে বলে জানায় এডিবি। প্রতিবেদনে বলা হয়, লজিস্টিকস সুবিধাগুলোর কাজে লাগানো হলে– বাংলাদেশের উত্তরপূর্বাঞ্চলের কৃষি ও শিল্পগুলোর উৎপাদিত পণ্য – উত্তর-পূর্ব ভারতে সম্ভাবনাময় ভোক্তা-বাজার তৈরি করতে পারবে। একইভাবে, প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল থেকে স্থানীয় শিল্পের জন্য রাবার, চুনাপাথরসহ অন্যান্য খনিজ সম্পদ আমদানি করা যাবে। বাংলাদেশের উত্তরপূর্বাঞ্চল নেপাল ও ভুটানের মতো দেশের সাথে ভৌগলিক নৈকট্যের সুবিধাও নিতে পারবে। শুধু অবস্থানগত সুবিধাই নয়, অর্থনৈতিক করিডর (বিইসি) অঞ্চল কৃষি উৎপাদন ও প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকেও সমৃদ্ধ। যেমন এই অঞ্চল দেশের মোট মাছ উৎপাদনে ২৭ শতাংশ অবদান রাখে, চা উৎপাদনে অবদান ৫০ শতাংশ এবং ধানে ২০ শতাংশ। এছাড়া, উত্তরপুর্বাঞ্চলে ৪ হাজার বিলিয়ন ঘনফুটের বেশি প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত আছে – যা অধাতব খনিজ শিল্পসহ বিদ্যুৎ উৎপাদনেও ব্যবহার করা যাবে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এ  ধরনের করিডোর বাস্তবায়নে অবকাঠামো ও নীতি সহায়তায় বিনিয়োগের প্রতি গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, আমাদের অর্থনীতির দুটি প্রধান মেরুদণ্ড রয়েছে। এর একটি খুলনা থেকে সুনামগঞ্জের হাওর পর্যন্ত এবং আরেকটি উত্তরাঞ্চল থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার এমনকি টেকনাফ পর্যন্ত। বাংলাদেশে পরিবহনের প্রধান বাধা রাজধানী ঢাকার অবস্থান। রাজধানীর যানজটের কারণে ঢাকা পার হয়ে প্রধান সড়কে উঠতে অনেক সময় লাগে। ঢাকাকে বাইপাস করার বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের দৃঢ়ভাবে ভাবা উচিত। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, 'সরকার এর আগে দুটি করিডরে দুটি বড় কাজ করেছে– একটি যমুনা নদীর উপর বঙ্গবন্ধু সেতু এবং আরেকটি পদ্মা সেতু। এখন সাতক্ষীরা থেকে সুনামগঞ্জ কিংবা টেকনাফ থেকে পঞ্চগড় পর্যন্ত গাড়িতে যাতায়াত করা যায়, যা কয়েক বছর আগেও ছিল অকল্পনীয়।' 'ব্যবসাবাণিজ্যের কোনো সীমানা নেই' উল্লেখ করে মান্নান বলেন, 'এটা করা গেলে সীমান্তে কালোবাজারি কমে আসবে।' এদিকে সড়ক, রেল ও নৌপথের সুবিধা থাকার পরেও বাণিজ্যের গেটওয়েগুলোয় সীমিত সক্ষমতার কবলে ভুগছে করিডর অঞ্চল। করিডর অঞ্চলে চারটি সচল বিমানবন্দর রয়েছে: ঢাকা, যশোর, বরিশাল ও সিলেটে। তবে ঢাকা ও সিলেট বিমানবন্দরেও সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। অবকাঠামোর অভাবে শিল্প উৎপাদন ও সেবা খাতের উচ্চ বেতনের চাকরির অভাব রয়েছে এখানে। কর্মে নিযুক্ত মোট জনসংখ্যার ৫৮ শতাংশই কৃষিখাতের সাথে যুক্ত। শিল্প, পরিবহন ও সামাজিক অবকাঠামোর ঘাটতি দূর করার মাধ্যমে ভারসাম্যপূর্ণ ও উন্নয়ন বিকেন্দ্রীয়করণের লক্ষ্য রয়েছে বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডর প্রস্তাবনায়। প্রস্তাবিত উন্নয়ন কাজ দুই ধাপে বাস্তবায়িত হবে: প্রথমে দক্ষিণপশ্চিম অংশ, এরপর ঢাকা থেকে সিলেট ও ময়মনসিংহ পর্যন্ত উত্তরপূর্ব অংশে তা করা যাবে বলে জানিয়েছে এডিবি। অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নেন এডিবির পরিচালক সব্যসাচী মিত্র, প্রাণ-আরএফএলের পরিচালক উজমা চৌধুরী ও পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. মাসরুর রিয়াজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অতিরিক্ত সচিব মোস্তাফিজার রহমান ও বাংলাদেশ ইকোনমিক জোনের (বেজা) চেয়ারম্যান শেখ ইউসুফ হারুন। সমাপনী বক্তব্য দেন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী সদস্য অভিজিৎ চৌধুরী।
Published on: 2023-08-23 20:59:36.94359 +0200 CEST