The Business Standard বাংলা
বাংলা থ্রিলার চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ কে?

বাংলা থ্রিলার চলচ্চিত্রের পথিকৃৎ কে?

বহুমুখী পরিচয় আছে প্রেমেন্দ্র মিত্রের। গল্পকার, কবি, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লেখক হিসেবে অনেকেই চেনেন তাকে। ফেরারী ফৌজ , সাগর থেকে ফেরা র মতো কবিতা কিংবা তেলেনাপোতা আবিষ্কার , ভস্মশেষ -এর মতো গল্পের জন্য আজও স্মরণীয় তিনি। স্মরণীয় ঘনাদা, পরাশর বর্মা, ভূতশিকারি মেজকর্তা ও মামাবাবুর মতো চরিত্রগুলোর স্রষ্টা হিসেবেও। তবে এসব পরিচয়ের আড়ালে অনেকেই হয়তো ভুলে যান তার আরেকটি পরিচয়। চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও বেশ খ্যাতি কুড়িয়েছিলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। শুধু প্রাত্যহিক জীবনের কাহিনীই নয়, বরং তার হাতে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল রহস্য-রোমাঞ্চ তথা 'থ্রিলার' চলচ্চিত্রও। থ্রিলার বই কিংবা চলচ্চিত্রের ইদানীং বেশ রমরমা অবস্থা চলছে। গত শতাব্দীর বিশের দশকে দ্য ক্যাবিনেট অভ ডক্টর ক্যালিগেরি (১৯২০), নসফেরাতু (১৯২২), হাক্সান (১৯২২), দ্য ফ্যান্টম অভ দ্য অপেরা (১৯২৫)-এর মতো সিনেমাগুলো চলচ্চিত্রের নির্বাক যুগে দর্শকের সামনে ভয়ের নতুন সমীকরণ তৈরি করেছিল। সেই ঢেউ বাংলা চলচ্চিত্রে আছড়ে পড়তেও বেশি সময় লাগেনি। নির্বাক যুগ পেরোনোর পর পাশ্চাত্যের মতো বাংলা চলচ্চিত্রও পায় ভাষা। গত শতাব্দীর চল্লিশ দশকের কথাই ধরা যাক। চলচ্চিত্র তখন মূলত পৌরাণিক কাহিনীনির্ভর, নয়তো সামাজিক/প্রাত্যহিক জীবনের গল্প। সালটা ১৯৪৩। প্রেমেন্দ্র মিত্র তখন লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। গল্প কিংবা কবিতা — দুটোতেই দেখিয়েছেন হাতযশ। এর বাইরে করেছেন সাংবাদিকতাও। তবে কোনো কাজের সঙ্গেই একটানা বেশিদিন থাকতে পারতেন না তিনি। মূলত আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই চিত্রজগতে পদার্পণ ঘটে তার। ১৯৪৩-এ মুক্তি পায় প্রথম ছবি সমাধান । নিজ গল্প থেকেই সিনেমাটি বানান তিনি। সাফল্য আসে, অণুপ্রাণিত হন প্রেমেন্দ্র মিত্র। এর ধারাবাহিকতায় পরের বছরগুলোয় একে একে নির্মাণ করেন বিদেশিনী , পথ বেঁধে দিলো , রাজলক্ষ্মী , নতুন খবর -এর মতো সিনেমা। প্রায় সবগুলোই আর্থিকভাবে ও শিল্পগুণে সফল সিনেমা। বিশেষত পথ বেঁধে দিলো তাকে খ্যাতি এনে দেয়। এরপর ১৯৪৮ সালে নতুন চমক নিয়ে হাজির হলেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। নিজের গল্প নিয়েই নির্মাণ করলেন কালো ছায়া । সদ্যস্বাধীন ভারতে সময়ের চেয়েও অনেক এগিয়ে ছিল তার চলচ্চিত্রভাবনা। এ সিনেমায় দ্বৈত চরিত্রে অনবদ্য অভিনয় করেছিলেন ধীরাজ ভট্টাচার্য। সিনেমাটি তুমুল শোরগোল তুলতে সমর্থ হয়। চল্লিশের দশক 'ফিল্ম নোয়ার' ধাঁচের চলচ্চিত্রের সোনালি সময়। বাংলাতেও সেই ধাঁচ নিয়ে আসেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। রহস্য-রোমাঞ্চে ভরপুর এ সিনেমার সাফল্য তাকে উৎসাহিত করে তোলে। পরের বছরই নৃপতি চট্টোপাধ্যায়কে মূল চরিত্রে নিয়ে নির্মাণ করেন কুয়াশা (১৯৪৯) সিনেমাটি। আবারও সফল হলেন তিনি। এ সিনেমাগুলোর সাফল্য অন্যান্য পরিচালকদেরও এ ধরনের সিনেমার প্রতি আগ্রহী করে তোলে। ১৯৫০ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প অবলম্বনে নরেশ ভট্টাচার্য নির্মাণ করেন কঙ্কাল । ১৯৫১ সালে অজয় কর তৈরি করেন জিঘাংসা — মুখ্য চরিত্রে ছিলেন বিকাশ রায়। সিনেমাটির অণুপ্রেরণা ছিল শার্লক হোমসের সুবিখ্যাত কাহিনী দ্য হাউন্ড অভ দ্য বাস্কারভিলস । এসবের মাঝে প্রেমেন্দ্র মিত্র নিজের উপন্যাস হানাবাড়ি কে চিত্ররূপ দেওয়ার কাজে নিয়োজিত হয়েছেন। ১৯৫২ সালে মুক্তি পায় হানাবাড়ি । ধীরাজ ভট্টাচার্য ও নবদ্বীপ হালদারের মতো অভিনয়শিল্পীরা ছিলেন অভিনয়ে। সিনেমাটি তুমুল আলোচিত ও ব্যবসাসফল হয়। বিকটদর্শন এক প্রাণীর আক্রমণ, রহস্যময় এক চিত্রশিল্পী আর ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে রহস্য উদঘাটন করতে আসা এক প্রাইভেট ডিটেকটিভ — সবমিলিয়ে একেবারে 'জমে ক্ষীর' হয়ে ওঠে সিনেমাটি। এরপর দুই বিয়ে , ময়লা কাগজ নামক দুটো সিনেমা পরিচালনা করেন প্রেমেন্দ্র। তবে রোমাঞ্চের ভুবনে আবারও ফিরে আসেন শীঘ্রই। ১৯৫৫ সালে নিজের গল্প থেকেই নির্মাণ করেন ডাকিনীর চর । এটি মোটামুটি সফল হয়। তবে এরপর বিরতি — এক–দুই নয়, একেবারের পাঁচ বছরের। ১৯৬০-এ প্রেমেন্দ্র মিত্র তৈরি করেন তার শেষ সিনেমা চুপি চুপি আসে । আগাথা ক্রিস্টির দ্য মাউসট্র‍্যাপ -এর বাংলা সংস্করণ ছিল এটি। যদিও সিনেমার কোথাও সেটি উল্লেখ করা হয়নি। এ চলচ্চিত্রটি মোটের ওপর সফল ছিল। তবে পাশ্চাত্যে যেমন ততদিনে নোয়ার ধাঁচের সিনেমা অস্তাচলে, বাংলা চলচ্চিত্রেও তেমনি পরিবর্তন আসছিল। এর মধ্যে প্রয়াত হন ধীরাজ ভট্টাচার্য। উত্তম-সুচিত্রা ও উত্তম-সুপ্রিয়া যুগের শুরু হয়। পরবর্তী দশকগুলোয় অবশ্য নিশাচর , কুহক , নিশীথে , কখনো মেঘ , কুহেলি- এর মতো কিছু রোমাঞ্চকর চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তবে এটি নিয়মিত বা মূলধারা হয়ে ওঠেনি। প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রয়াত হন ১৯৮৮ সালে। ১৯৬০ সালে চুপি চুপি আসে' র পর আর কোনো চলচ্চিত্র পরিচালনা করেননি তিনি। কোনো কাজ একটানা বেশিদিন করতে পারতেন না ভদ্রলোক। কিন্তু ১৯৪৩ থেকে ১৯৬০ — চলচ্চিত্রশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রায় দেড় যুগ। এ সময়ে পরিচালনার পাশাপাশি চলচ্চিত্রের কাহিনী লেখক হিসেবেও কাজ করেছেন তিনি। ইদানীং থ্রিলারের ব্যাপক জনপ্রিয়তা আমরা দেখতে পাই বইয়ের জগতে, ওয়েব সিরিজে ও সিনেমায়। ফিল্ম নোয়ার ধাঁচে নিও নোয়ার ফিল্ম নিয়েও কাজ হচ্ছে। তবে চল্লিশ দশক ও পঞ্চাশ দশকের সূচনালগ্নের সে সময়ে প্রেমেন্দ্র মিত্র দর্শককে দিয়েছিলেন রহস্য, রোমাঞ্চ ও ভৌতিকতার অন্য স্বাদ। তখন স্বল্প বাজেটে অল্প সিকোয়েন্সেও রেখেছিলেন মেধার স্বাক্ষর। তার সেসব কাজ যে আজও সতেজ, তার প্রমাণ ২০১৭-তে রিমেক হওয়া হানাবাড়ি । চলচ্চিত্রের কারিগরি দিক — যেমন চিত্রগ্রহণ, আলোক প্রক্ষেপণ, শিল্প নির্দেশনা, সম্পাদনার মতো কাজগুলোতেও বেশ যত্নের ছাপ চোখে পড়ে প্রেমেন্দ্র মিত্রের সিনেমাগুলোয়। সে সময়ের চলচ্চিত্রে যাত্রাশিল্পের অনুসরণে 'লাউড অ্যাক্টিং'-এর বেশ প্রচলন ছিল। প্রেমেন্দ্র মিত্র সে জায়গায় এনেছিলেন পাশ্চাত্যের সাবলীল ও স্বভাবসিদ্ধ সংলাপ বিনিময়ের রীতি। এছাড়া, পাশ্চাত্যের হরর/থ্রিলার চলচ্চিত্রের মতোই নিজের পরিচালিত সিনেমায় আলাদাভাবে তেমন গান রাখতেন না তিনি। তার সিনেমার আবহসঙ্গীতে নোয়ার ফিল্মগুলোর অণুপ্রেরণা পাওয়া যায়, দৃশ্য থেকে দৃশ্যে আরও জমে ওঠে সাসপেন্স। বাংলা চলচ্চিত্রের সেরা পরিচালকদের তালিকা করলে প্রেমেন্দ্র মিত্র কি থাকবেন সে তালিকায়? না থাকার সম্ভাবনাই হয়তো বেশি। কিন্তু গল্পকার হিসেবে তার যে পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা, কবিতায় যে সাবলীলতা — তা তিনি দেখিয়েছেন ক্যামেরার গল্পবলিয়ে হিসেবেও। তাই প্রেমেন্দ্র মিত্রের কথা উঠলে তার সিনেমার কথাও খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই আসবে। চিরসবুজ রোমাঞ্চের স্বাদ দিয়ে যাবে কালো ছায়া , হানাবাড়ি কিংবা চুপি চুপি আসে ।
Published on: 2023-08-24 09:48:42.135544 +0200 CEST