The Business Standard বাংলা
উত্তর কোরিয়ার বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর অদ্ভুত, গোপন জগৎ

উত্তর কোরিয়ার বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর অদ্ভুত, গোপন জগৎ

ফিলিপাইনের উদ্দেশ্যে একটি বিমান উড়ে যাচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে। হঠাৎ কয়েকজন যাত্রী চিৎকার শুরু করে। শীঘ্রই ক্যাপ্টেন ঘোষণা করেন যে, বিমানে একটি বোমা আছে এবং বিমানটি ১০ হাজার ফুটের নিচে নামলেই বিস্ফোরিত হবে। বিমানের ভেতরটা অনেকটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। পাইলট নিরর্থকভাবে চিৎকার করতে থাকা আতঙ্কিত যাত্রীদের শান্ত করার চেষ্টা করছিলেন। তবে তাদের মধ্যে কেবল একজন শান্ত অবস্থায় বসে রইলেন। উত্তর কোরিয়ার তরুণ এই কূটনীতিকের বিশ্বাস তার দেশ সমাধান খুঁজে বের করবেই এবং সবাইকে রক্ষা করবে। এবং তার ভাবনাই সঠিক হলো। উত্তর কোরিয়ার বিজ্ঞানী এবং প্রকৌশলীরা মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নিষ্ক্রিয় করা ভাসমান একটি ক্ষেত্র তৈরি করে মাঝ আকাশে বিমানটিকে থামিয়ে দেয়। বোমাটি নিষ্ক্রিয় করা হয়, সবাই বিমান থেকে নেমে আসে এবং তাদের নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনা হয়। উপরের অংশটি উত্তর কোরিয়ার উই কুমচোলের লেখা বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী 'চেঞ্জ কোর্স' থেকে নেওয়া। যে গল্পে মাতৃভূমির প্রতি অগাধ বিশ্বাস এবং ভালোবাসার কথা তুলে ধরা হয়। একই সাথে রাজনীতি ও সাহিত্যের জটিল এক সম্পর্কও চিত্রায়িত করে। ২০০৪ সালে এক ম্যাগাজিনে এটি প্রকাশিত হয়। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং দক্ষিণ কোরিয়ার কোরিয়া অ্যাডভান্সড ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ ডং-ওন কিম বলেন, রাজনৈতিক বার্তা ছাড়া উত্তর কোরিয়ার কোনো সাই-ফাই গল্পই তৈরি হয় না। কল্পকাহিনীর এই ধারা বেড়ে ওঠে দেশটির সর্বোচ্চ নেতাদের ছত্রছায়ায়। প্রয়াত নেতা কিম জং-ইল  লেখকদের জন্য নির্দেশিকা ঠিক করেন। দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যত সম্পর্কে লিখতে উতসাহিত করেছেন। গল্পগুলিতে প্রায়শই মহাকাশ ভ্রমণ, উপকারী রোবট, রোগ নিরাময়কারী ন্যানোবট এবং গভীর সমুদ্র অনুসন্ধানের মতো বিষয় উঠে আসে। এলিয়েন বা সুপারাপাওয়ার থাকা চরিত্র পাওয়া যায় না। তারচেয়ে বরং উত্তর কোরিয়ার বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদদের নায়কোচিত করে দেখানো হয়। উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা জ্যাং হুক বলেন, গল্পগুলো রাজনৈতিক উত্তেজনায় ঠাসা। উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শ্বাসরুদ্ধকর দ্বন্দ্ব তুলে ধরা হয়। চেঞ্জ কোর্সের মতো উত্তর কোরিয়ার সাই-ফাইগুলোতে সাধারণত কাউকে বাঁচানো হচ্ছে এমন কিছু দেখানো হয়। আর আমেরিকানদের দেখানো হয় খলনায়ক হিসেবে। যারা বিশ্বের উপর আধিপত্য বিস্তার করার জন্য একচেটিয়াকরণ এবং অস্ত্র প্রয়োগ করতে চায়। একজন পশ্চিমা পাঠকের কাছে প্লটগুলো হাস্যকর মনে হতে পারে তবে খুব সূক্ষ্মভাবে দেখলে এ বিষয়ে গভীর বোধগম্যতা আসবে। সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচারার বেনোইট বার্থেলিয়ার-যিনি কোরিয়ান সাহিত্যের উপর বেশ কিছু গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন- বলেন, যখন আমি 'চেঞ্জ কোর্স' পড়ি তখন ভাবতে থাকি, আমি যদি এই একই গল্প হলিউডের সিনেমা হিসাবে দেখতাম এবং নায়করা আমেরিকান হয়, তবে আমার প্রতিক্রিয়া খুব আলাদা হত। গল্পের কাহিনী যখন একই হয় এবং নায়ক ও খলনায়ক বদলে যায় তখন এই ভালো ও খারাপের ভূমিকাকে বিতর্কিত মনে হয়। *স্বর্গরাজ্য রূপে দেখানো* প্রথমদিকে উত্তর কোরিয়ার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন নির্ভর। ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর উত্তর কোরিয়ার প্রথম শাসক কিম ইল-সুং অনুপ্রাণিত ছিলেন জোসেফ স্টালিন থেকে। এই সোভিয়েত নেতার সময়ে লেখক ও কবিদেরকে লেখতে হতো সরকারি নির্দেশনা মেনে। তাই প্রতিটি কবিতা, ছোট গল্প এবং উপন্যাসে অবশ্যই দলের মতাদর্শ থাকতে হতো। সাহিত্যের মাধ্যমে প্রচারণার এই কৌশলে উৎসাহী ছিলেন কিম ইল-সুং। তিনি উত্তর কোরিয়ার লেখকদের সোভিয়েত রচনাগুলি অনুবাদ করার পরামর্শ দেন। একটি সমৃদ্ধ কমিউনিস্ট সমাজকে চিত্রিত করে এমন নিজস্ব গল্প লিখতেও বলা হয়েছিল। উত্তর কোরিয়ার প্রথম দিকের সাই-ফাইয়ের মূল বিষয়বস্তু সাধারণ মানুষের জীবন এবং তাদের সংগ্রাম ঘিরে  আবর্তিত ছিল, যারা নিজেদের এবং বিশ্বের উন্নতির জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে। স্নায়ুযুদ্ধ তীব্র হওয়ার সাথে সাথে উত্তর কোরিয়ায় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং ১৯৫৭ সালে যখন স্পুৎনিক-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়, তখন উত্তর কোরিয়ার লেখকরা এই সাফল্য তাদের লেখায় তুলে ধরে। স্পুৎনিক-১ মিশনের সাফল্যের মানে হল, আমেরিকানরা আর এককভাবে আকাশ নিয়ন্ত্রণ করছে না। উত্তর কোরিয়ানদের কাছে এটি একটি শক্তিশালী বার্তা ছিল। কারণ কয়েক বছর আগেই কোরিয়ান যুদ্ধের সময় দেশটিতে বোমাবর্ষণ করেছিল মার্কিন বিমান বাহিনী। অনুমান করা হয়, এসময় মার্কিন বিমানগুলো থেকে ৩২ হাজার টন নাপাম বোমাসহ প্রায় ৬ লাখ ৩৫ হাজার টন বোমাবর্ষণ করা হয়। এতে দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ মারা যায়। পিয়ংইয়ং এবং অন্যান্য বড় শহরগুলো প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল। কোরিয়ান সাহিত্য গবেষক কিম মিনসুন বলেন, এই প্রেক্ষিতে স্পুৎনিক-১ সম্পর্কিত কবিতা আসলে প্রতীকী। এতে সোভিয়েতদের প্রশংসা করা হয়, মুক্তি এবং স্বাধীনতার মতো ধারণাগুলিকে তুলে ধরে। স্যাটেলাইট মিশনটিকে 'সাম্যবাদের শক্তি এবং পরম নৈতিকতার প্রমাণ' হিসেবে তুলে ধরা হয়। ১৯৫৯ সালে রাশিয়ার লুনা-২ প্রথম মহাকাশযান হিসেবে চাঁদের পৃষ্ঠ স্পর্শ করে। এসময় চন্দ্রাভিযান নিয়ে রচিত বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী উত্তর কোরিয়ায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। যেহেতু চাঁদ এমন একটি বস্তু যা সমস্ত বয়সের মানুষকে কৌতূহলী করে। কিন্তু নাগরিকদের সবাই স্যাটেলাইট এবং চন্দ্রাভিযানে আগ্রহী ছিলেন না। গ্রামাঞ্চলের মানুষদের আবেগ নাড়া দিতে সাই-ফাই লেখকরা কৃষি প্রযুক্তি নিয়ে লেখা শুরু করেন। যেমন ট্রাক্টর নিয়ে লেখা হতো। যে কৃষি যন্ত্র তাদের জীবন পরিবর্তন করতে এবং তাদের সমাজে উচ্চ মর্যাদায় নিয়ে যেতে সহায়তা করে। ট্রাক্টর সোভিয়েত প্রচারণার একটি শক্তিশালী প্রতীকও ছিল। এটি অনেক রোমান্টিক নাটক এবং কমেডিতে প্রদর্শিত হয়েছে। ইসরায়েলের বার ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রিনা ল্যাপিডাস তার গবেষণাপত্র 'দ্য ইরোটিক ট্র্যাক্টর ইন দ্য সোভিয়েত সিনেমা'-তে লেখেন, সোভিয়েত সিনেমায় নারীদের কাছে সুদর্শন পুরুষ নয়; বরং ট্রাক্টর চালনায় দক্ষ পুরুষই আকর্ষণীয়। তবে উত্তর কোরিয়া নিজেদের জুচে মতার্দশ নিয়ে আসার পর ১৯৬০ এর দশকের শেষ দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তাদের বন্ধন ম্লান হতে শুরু করে। জুচে দর্শনে রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতার উপর জোর দেওয়া হয়। জুচে দর্শন বিজ্ঞান কল্পকাহিনীকে প্রভাবিত করেছিল। এসময় মহাকাশ অভিযান, নতুন জ্বালানি ও খনিজ অন্বেষণ, স্বনির্ভর প্রযুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে কল্পকাহিনীতে উত্তর কোরিয়ান বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের নায়কোচিত চিত্র তুলে ধরা হয়। একই সময়ে লেখকরা চীন থেকেও অনুপ্রেরণা নিতে শুরু করেন। উভয় দেশের বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতেই জাতীয়তাবাদ ও দেশপ্রেমের উপর জোর দেওয়া হয়। বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ ডং-ওন কিম বলেন, এমনকি সাহিত্য তত্ত্বের উপর একটি বই-ও ছিল উত্তর কোরিয়ায়। যেখানে 'কীভাবে কিম-এর মতাদর্শ দেশের ভবিষ্যতের কাজে প্রয়োগ করতে হবে এবং তার দর্শনের ব্যাখ্যা' তুলে ধরতে হবে সেসব লেখা ছিল। ১৯৮০ এর দশকে কিং জং-ইল যখন আনুষ্ঠানিকভাবে তার পিতার উত্তরসূরি হিসাবে নিযুক্ত হন, তখন এই প্রবণতা আরো বেড়ে যায়। কিম জং-ইল জোর দিয়েছিলেন যে, সাই-ফাই লেখকদের এমন সাহিত্য তৈরি করতে হবে যা দলীয় আদর্শ অনুসরণ করে। তাদের দেখাতে হয়েছিল সমাজতন্ত্র পুঁজিবাদের উপর বিজয়ী হয়েছে এবং কীভাবে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি দেশকে নিরাপদ রেখেছে। এমনি লেখকদেরকে সেন্সরশিপ ব্যুরো থেকে অনুমোদন নিতে হতো। সামান্য ভুলে বড় পরিণতি ভোগ করতে হওয়ায় প্রায় লেখকই ঝুঁকি নিতেন না। তারা অনুমোদনের অপেক্ষা করতেন। এবং অবশ্যই, কোন গল্প বা উপন্যাসে উত্তর কোরিয়ার নেতাদের কথা উল্লেখ করার কথা কল্পনাই করা যেতো না। *সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী* প্রচলিত ধারার বাইরে রচিত উত্তর কোরিয়ার শ্বাসরু্দ্ধকর সব বিজ্ঞান কল্পকাহিনী পশ্চিমা দেশগুলোয় অপরিচিতই বলা যায়। খুব কম গল্পই বিদেশে প্রকাশিত হয়েছে। এবং এখন পর্যন্ত কোন লেখাই ইংরেজিতে অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়নি। বেনোইট বার্থেলিয়া, যিনি চেঞ্জ কোর্সের অনুবাদ প্রদান করেছিলেন, তিনি আশা করেন যে একদিন অনেকগুলি সাই-ফাই গল্প সংগ্রহ করতে সক্ষম হবেন। তিনি উত্তর কোরিয়ার এসব গল্পে মুগ্ধ বলে জানান। তিনি বলেন, চেঞ্জ কোর্স স্নায়ুযুদ্ধের বিরোধী, গুপ্তচর উপন্যাস এবং উদ্ভাবনী সামরিক প্রযুক্তির মিশেলে তৈরি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর এক অন্যন্য শৈলী। গল্পের শুরুতেই এসব উপাদানের উপস্থিতি দেখা যায়। উই কুমচোলের প্রধান চরিত্র কিম সাকজিন। প্রথমে তার পরিচয় দেওয়া হয়। কিম সাকজিন উত্তর কোরিয়ার একজন নির্ভীক কূটনীতিক যিনি যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে বাড়ি ফিরছেন। বিমানে চড়ার পরপরই, সাকজিন তার বিদেশে থাকা সময়ের কথা মনে করতে থাকেন। লেখক দীর্ঘ বর্ণনায় তা তুলে ধরেন। যেমন-সাকজিন সেসব বিদেশীদের দেখেছিলেন যারা 'মুক্ত বিশ্বের প্রতিশ্রুতিতে প্রলুব্ধ' হয়ে নিজ দেশ ত্যাগ করে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। প্রায়শই এই লোকেরা নিউইয়র্কের মতো জায়গায় 'উদ্দেশ্যহীনভাবে রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়'। উঁচু উঁচু ভবনের উপরে বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্ট, ম্যানহাটনের প্রাণবন্ত রাস্তা, হারলেমের বস্তি এবং সেখানকার ভয়াবহ দুর্গন্ধ- সবই আছে বর্ণনায়। বিমানে সাকজিন বসেন রাশিয়ান তরুণী নিনা ভ্যাসিলিভনার পাশে। তিনিও যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফিরছেন। তরুণী তার জ্যোতির্পদার্থবিদ বাবা ভ্যাসিলি ইভানোভিচের সাথে বিমানে চড়েন। নিনা নিউ ইয়র্কের এক সড়ক দুর্ঘটনায় তার মা-কে হারিয়েছেন। এরপর রাশিয়া ফেরার জন্য তারা আর অপেক্ষা করতে পারলেন না। কারণ রাশিয়ায় তারা নিরাপদ বোধ করেন। যখন বোমার কথা বিমানে ছড়িয়ে পড়ে তখন সাকজিন শান্ত ছিলেন। তার দেশের কথা ভেবে সাকজিন সান্ত্বনা খুঁজতে লাগলেন। ভাবতে লাগলেন, তার মাতৃভূমি কতটা দুঃখিত হবে যখন জানবে যে তার একটি সন্তান ছাই হয়ে গেছে। এভাবে মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের দীর্ঘ বর্ণনা শেষে গল্প এগিয়ে যায়। যাত্রীদের পর ভূমিতে থাকা লোকজনদের অবহিত করেন ক্যাপ্টেন। পুরো বিশ্ব ঘটনা যেনে যায়। সব দেশকে সমাধান খুঁজতে বলা হয়, তবে একটি দেশই সে সমাধান নিয়ে হাজির হতে সক্ষম হয়; উত্তর কোরিয়া। এরপর বিমানের রুট পরিবর্তন করে পিয়ংইয়ংয়ের দিকে নিয়ে আসা হয়। এদিকে যাত্রীরা জানতে পারে যে, বোমাটি স্থাপন করেছে আমেরিকানদের একটি গ্রুপ। যারা রাশিয়ান ভ্যাসিলি ইভানোভিচকে হত্যা করতে চায়। এই জ্যোতির্পদার্থবিদ 'স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের দ্বারা প্রলুব্ধ' হয়ে একটি মার্কিন কর্পোরেশনের হয়ে কাজ করেছিলেন। কিন্তু আমেরিকানরা তার দক্ষতা সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে চায় বুঝতে পেরে তিনি পদত্যাগ করেন। সেই আমেরিকান গোষ্ঠি 'মহাকাশে পারমাণবিক অস্ত্র স্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।' সব যাত্রী যখন মৃত্যুর অপেক্ষায় তখন জ্যোতির্পদার্থবিদ বলেন, এই বিমানের যাত্রীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক কৌশলের নতুন শিকার হতে চলেছে। কিন্তু কোনো ট্রাজেডি ঘটেনি। উত্তর কোরিয়ার বিজ্ঞানীরা সবাইকে রক্ষা করে। মাধ্যাকর্ষণ শক্তি নিষ্ক্রিয় করা ভাসমান ক্ষেত্র তৈরি করে বিমানটিকে পিয়ংইয়ংয়ের উপরে মাঝ আকাশে থামিয়ে দেওয়া হয়। সব যাত্রীকে রক্ষা করা হয়। পিয়ংইয়ংয়ে জড়ো হওয়া আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের ভিড়ের সামনে রাশিয়ান বিজ্ঞানীর মুখে উত্তর কোরিয়ার বিজ্ঞানীদের প্রশংসার মাধ্যমে গল্পটি শেষ হয়। লেখক গল্পের ইতি টানেন এই যুক্তি দিয়ে যে, ভাসমান ক্ষেত্র যেভাবে প্লেনটিকে রক্ষা করেছে, প্রকৃতপক্ষে তা পুরো দেশকে রক্ষা করতে পারে। 'পুরো উত্তর কোরিয়া এমন একটি অদৃশ্য ঢাল দ্বারা আচ্ছাদিত হতে পারে।' কোরিয়ান সাহিত্য গবেষক কিম মিনসুনের মতে, গল্পটি এই উপসংহারের জন্যই তৈরি বলে মনে হচ্ছে। এখানে যা প্রদর্শন করতে চায়, তা হলো বিশ্ব উত্তর কোরিয়ার শক্তি সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। *ভবিষ্যৎ কল্পনা* সারাজীবন পশ্চিমা দেশে কাটানো লোকদের কাছে চেঞ্জ কোর্স এবং উত্তর কোরিয়ার অন্যান্য বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী বিভ্রান্তিকর মনে হতে পারে। এসব গল্পের নায়কদের দুই সংস্করণ থাকে। একদিকে তারা প্রযুক্তি সম্পর্কিত সমস্ত কিছু নিয়ে প্রশ্ন তোলে, বৈজ্ঞানিক সত্যের অন্বেষণের জন্য প্রতিটি পূর্ব ধারণাকে বিতর্কিত করে। আবার একই সময়ে, তারা দলের সিদ্ধান্ত বা কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ না করে অন্ধভাবে দলের নির্দেশনা অনুসরণ করে। দেশ ছেড়ে পালানো জ্যাং হুক বলেন, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে, আদর্শগতভাবে নায়কের সর্বোচ্চ নেতার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থাকে। সর্বোচ্চ নেতার ভাবমূর্তি বড় করে দেখানো হয়। প্রচার যন্ত্র স্লোগান দিয়ে যায়, 'দল যা সিদ্ধান্ত নেয় আমরা তাই করি' অথবা 'আত্মনির্ভর সমৃদ্ধি'। এসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ কল্পনা করে লেখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে ওঠে। উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সিনেমা নিয়ে গবেষণা করা চলচ্চিত্র নির্মাতা আন্তোইন কপোলা বলেন, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী তৈরি হয় প্রত্যাশা থেকে। অর্থাৎ মানুষ ভবিষ্যতে কি চাইতে পারে তা নিয়ে গল্প হয়। আর এটি একটি বড় সমস্যা। তিনি বলেন, দেখানো হয় যে 'উত্তর কোরিয়ার সমাজ ব্যবস্থা নিখুঁত, শ্রেণিবিভাজন নিখুঁত। আর সমাজ যখন নিখুঁত হয় তখন ভবিষ্যতের কল্পনা করা যায়? বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ ডং-ওন কিম তার এক গবেষণাপত্রে লেখেন, উত্তর কোরিয়ায় বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী আর মানুষের দৈনন্দিন জীবনের মধ্যে বৈসাদৃশ্য কেবল তীব্রতর হয়েছে। অন্তত ১৯৯০ এর দশক থেকে উত্তর কোরিয়ার বিজ্ঞান কল্পকাহিনীতে চিত্রিত উন্নত ভবিষ্যত এবং দেশটিতে জীবনযাপনের বাস্তবতার মধ্যে কেবল একটি ফাঁক নয় বরং অতল গহ্বর লক্ষ্য করা গেছে। তবে বার্থেলিয়ার বলেন, এই ঘরানা কঠিন বাস্তবতার পাশাপাশি লেখকদের সামনে কিছুটা সুবিধা নিয়েও হাজির হয়। উত্তর কোরিয়ার অন্যান্য সাহিত্য যেসব দেখানো হয় না, যেমন- অন্যান্য দেশের চিত্রায়ন, আন্তর্জাতিক চক্রান্ত, এমনকি সহিংসতা- সেগুলোও বিজ্ঞান কল্পকাহিনীতে তুলে ধরা যায়। তিনি বলেন, যুদ্ধ আর প্রতিরোধের গল্প ব্যতিত সাহিত্যের অন্যান্য ঘরানায় সহিংসার উপস্থিতি সীমিত। কারণ সরকারি বক্তব্য হলো উত্তর কোরিয়ায় কোন অপরাধ নেই, আমাদের লোকেরা ভাল মানুষ। উত্তর কোরিয়ার লেখকরা পশ্চিমাদের কাছে আরও বেশি উন্মোচিত হওয়ার সাথে সাথে তাদের লেখা গল্পও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে। বার্থেলিয়ার বলেন, সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীতে চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি, উৎকণ্ঠা, ষড়যন্ত্রের গন্ধের উপস্থিতি সম্ভবত উত্তর কোরিয়ায় ক্রমবর্ধমান বিদেশি গণমাধ্যমের উপস্থিতির ফল। তিনি বলেন, আমার কাছে এটা একধরনের বিপ্লব। কারণ দেশটির সাহিত্যের ইতিহাসে এরকম কিছু আগে দেখা যায়নি।
Published on: 2023-08-29 07:58:07.671858 +0200 CEST